এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: পাঁচ

এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: পাঁচ

-মূর্শেদূল মেরাজ

বিষয়টা এমন নয় যে অদম্য সাহসী বলেই আমরা আত্মহত্যার মতো হীন কর্মটি সম্পাদন না করে বুক চিতিয়ে পৃথিবীর বুকে বেঁচে আছি। বরঞ্চ ভেতরে উঁকি দিলে দেখা যাবে। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সাহস করতে পারিনি বলে আমাদের মধ্যে অনেকেই বহুবার আত্মহত্যা করা থেকে বেঁচে গেছি।

এতো এমন নয় মশাই, হঠাৎ করে কেউ পিঠ চুলকাতে চুলকাতে আয়েশ করে বলে উঠলো, যাই একটু আত্মহত্যা করে আসি। এটা চায়ের কাপে বিস্কুট ডুবিয়ে খাওয়ার মতো সরল কোনো ঘটনা নয়। বিষয়টা খুবই জটিল এক মনস্তাত্বিক সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত এক বাস্তবায়িত রূপ।

সারাবিশ্বে চলমান এই নাজুক পরিস্থিতে ‘আত্মহত্যা’ কথাটি বারবারই আলোচনায় ফিরে ফিরে আসছে। তাই এ পর্বে সে বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করছি। আত্মহত্যার জটিল মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণে না গিয়ে বিষয়টাকে একটু ভিন্নভাবে বোঝার চেষ্টা মাত্র। এর বেশি কিছু না।

সঙ্গত কারণেই বাকিতগ্রস্ত-বিকারগ্রস্ত আর অপ্রাপ্ত বয়স্কদের এই আলোচনার বাইরেই রাখা হলো। কারণ তাদের সিদ্ধান্তকে কোনো যুক্তিতে বা বিশ্বাসে ফেলে বিবেচনায় আনা সাধারণ জ্ঞানে সম্ভব নয়।

সাধারণভাবে বলা যায়, কেহই খুব সাধ করে নিজেই নিজের জীবন নাশের সিদ্ধান্ত নেয় না। নিতে পারে না। তথাপিও যখন বেঁচে থাকা অপেক্ষা মৃত্যুকেই সহজতম মনে হয়। যখন বেঁচে থাকার আর কোনো মানে খুঁজে পায় না জীবন। সম্ভবত তখনই অনেকে আত্মহত্যার মতো রূঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।

তারপরও বলতেই হয় এই সুন্দর ভুবন ছেড়ে কে-ই বা চলে যেতে চায়? থাক না শত-সহস্র-লক্ষ-কোটি অবহেলা-অনাদর-অবজ্ঞা। তারপরও মানুষ বেঁচে থাকতে চায়। তারপরও মানুষ স্বপ্ন দেখে পরিবর্তনের। ডুবতে ডুবতেও খড়কুটো ধরে টিকে থাকার লড়াইটা চালিয়ে যায়।

যারা মানুষিক বা শারীরিক যন্ত্রণা অথবা প্রতিবন্ধকতা থেকে পরিত্রাণ পেতে জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়; সে সময় তাদের মনস্থিতি কেমন হয়-কোন পর্যায় পৌঁছায়, সেটা বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। কেনো তারা এমন সিদ্ধান্ত নেয়? এটি জেনেও যে কখনোই এই মানবদেহে এই বেশে আর ফিরতে পারবে না।

যেখানে চূড়ান্ত রায় হাজির হওয়ার পরও একজন ফাঁসির আসামী ভাবে, এমন কিছু একটা ঘটবে যাতে সে বেঁচে যাবে। মৃত্যুপথযাত্রী রোগীরও ভাবনা এমনটাই থাকে বেশিভাগ ক্ষেত্রে। তবে কেনো মানুষ নিজ হাতে নিজ জীবন শেষ করে দিতে উদ্যত হয়? আত্মহত্যা কি আসলই কোনো সমাধান? নাকি নতুন সমস্যার সূচনা??

আত্মহত্যা বিষয়ে শাস্ত্র কি বলে… বিজ্ঞান কি বলে… ধর্ম-দর্শন-মতবাদ কি বলে… বিশেষজ্ঞরা কি বলে… সাধু-গুরুরা কি বলে… আত্মহত্যাকারীর কাছে সেসব কোনো মানে রাখে না। বেঁচে থাকা মানুষরা সেসব নিয়ে গবেষণা করে। আলোচনা করে। শিল্প বিনির্মাণ করে। কিন্তু বেশিভাগই মূলে পৌঁছায় না।

ইতিমধ্যেই এই চলমান ক্রান্তিকাল তার প্রাথমিক ভয় ও এর রোমান্টিকতা হারিয়েছে। এতে অভ্যস্ত হওয়ার বদলে চির মুক্তির বাসনা মনে পুষে রাখা মানবজাতি ক্রমশ বিরক্ত হয়ে উঠছে। একঘেয়ামী এই বন্দি জীবন দিন দিন তার মাত্রা অতিক্রম করছে। বন্দিদশায় মানুষ হাঁপিয়ে উঠছে মানুষ।

হঠাৎ বদলে যাওয়া এই পরিস্থিতিতে মানুষ খাপ খাইয়ে নিতে শিল্পচর্চা, খেলাধুলা, বই পড়া, চলচ্চিত্র-নাটক-টকশো-লাইভ ইত্যাদি দেখা, গান শোনা, আবৃত্তি করা, নৃত্য করা ইত্যাদি ইত্যাদি সবই করে দেখেছে এবং দেখে চলেছে। কিন্তু কিছুতেই বিরক্তি কাটিয়ে উঠতে পারছে না কেউ। বিনোদন মাধ্যম এখন আর এতোটা বিনোদিত করতে পারছে না যতটা হলে মন শাস্ত হয়-স্থির হয়।

অন্যদিকে সঞ্চিত অর্থ-সম্পদ যতই ফুরিয়ে আসছে আর পাল্লা দিয়ে যে হারে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে আসছে মানুষ ততই অস্থির হয়ে উঠছে। ভবিষ্যত ভাবনার আতঙ্ক গ্রাস করে নিচ্ছে মন-মস্তিষ্ক সর্বত্র। যাদের অর্থ সম্পদের অভাব নেই তারা হাসপাতালের সিট, অক্সিজেন সিলিন্ডার, প্লাজমা, আইসিও, বেড, মাস্ক, পিপিই, খাবার ইত্যাদি ইত্যাদি সকল কিছুই রিজার্ভ করে রাখছে। আরেকদিকে আগামীকাল কি খাবে এই ভাবনা নিয়ে ঘুমাতে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলেছে।

আরেকদিকে অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে, তুলে নেয়া হচ্ছে লকডাউন। শিথিল করা হচ্ছে বিধিনিষেধ। ওষুধ আর খাবার দোকানের পাশাপাশি বিলাশ পণ্যের দোকানপাটও খুলে যাচ্ছে। সামনে হয়তো বিনোদন কেন্দ্রগুলোও খুলতে শুরু করবে।

সেই সাথে জেগে উঠবে সুপ্ত চাহিদাগুলো। জাগ্রত হতে শুরু করবে এতোদিনে অবদমিত চাহিদামালা। সেই ফাঁকে অভাব জানালা গলে বিছানায় লুটোপুটি খাচ্ছে। একদিকে বিজ্ঞাপনে বিলাশ পণ্যে অবিরাম ডাকাডাকি। অন্যদিকে শূন্য পকেটের পরিহাস। মোট কথা বাস্তবতায় ফিরছে মানুষ।

এমন পরিস্থিতিতে কার কখন কিভাবে হতাশা জেগে উঠবে, তা আগে থেকে কে বলতে পারে? এভাবে চলতে থাকলে সামনে হয়তো সময় আরো খারাপ হবে। আর কে না জানে, হতাশার সংক্রমণ ভাইরাসের চেয়েও অনেক দ্রুত গতিতে ছড়ায়। আর এই ক্রমাগত এগিয়ে আসা হতাশার স্রোতে মনকে স্থির রাখা সবচেয়ে জরুরী। নইলেই ঘটে যেতে পারে অনাকাঙ্খিত ত্রুটি-বিচ্যুতি।

আজ হয়তো আমাদের মধ্যে অনেকেই অন্যের হতাশা দেখে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করছি। কাল হয়তো অন্যরা আমাদের হতাশার চিত্র দেখে একই আচরণ করবে। তাই সময় থাকতে একটু মানবিক হওয়া-বোধের জায়গাটা একটু সচল করে নেয়ার এটিই উপযুক্ত সময়।

কারণ ঘুরে দাঁড়ানোর সবচেয়ে উপযোগী সময় হলো খাদের ঠিক কিনারায়। যার এর এক পা সামনে মরণ; আর এক পা পেছনে জীবন। তবে সকলেই যে খাদের কিনারায় দাঁড়ালেই নিজেকে শেষ করে দেয়া একমাত্র সমাধান বলে মনে করে; তা কিন্তু নয়। অনেকে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়েও জীবনকে উপভোগ করে আনন্দে। কিন্তু সেই ইস্পাত কঠিন মনোবল আর আমাদের কয় জনার আছে?

যখন মানুষ অন্তরের অন্তস্থল থেকে প্রকৃত অর্থেই অনুভব করতে শুরু করে সে সম্পূর্ণ একা, আমার কেউ নেই, আমি কারো নই, কোথাও কেউ নেই। সকল সম্পর্ক-বন্ধন যখন মিথ্যা প্রতীয়মান হয়। ভাবতে শুরু করে আমি হেরে গেছি, আমার আর কিছুই করার রইলো না, কারো প্রত্যাশাই আমি আর পূরণ করতে পারবো না, আমার কাছ আর কিছুই রইলো না। তখন মানুষ সত্যি সত্যিই কতটা স্থির থেকে ভাবতে পারে?

মানুষকে শাস্তি হিসেবে বন্দি করে রাখা হয় কেনো? -এই প্রশ্ন করা হলে উত্তর হিসেব হয়তো আপনি বলবেন, অপরাধী যাতে নতুন করে আর কোনো অপরাধ না করতে পারে সে জন্যই বন্দি রাখা হয়। মনে রাখবেন, এটা অনেকাংশে সত্য হলেও পুরোপুরি কিন্তু নয়।

কারণ মানুষকে বন্দি রাখার নিগূঢ় কারণ হলো, তাকে তার নিজের মুখোমুখি দাঁড় করানো। মানুষকে যখন একা করে ফেলা হয়। সবার থেকে আলাদা করে ফেলা। পরিচিত জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। তখন সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজের মুখোমুখি হতে শুরু করে। তখন সে ভীত হতে শুরু করে-আতঙ্কিত হতে শুরু করে।

জানলে অবাক হবেন, পৃথিবীর ভয়ংকর সব কারাগারগুলো শুধু তাদের জঘন্যতম শাস্তির জন্যই বিখ্যাত নয়। সেগুলোর একক সেলগুলোর জন্যও অনেকাংশে বিখ্যাত। সেসব কারাগারের বেশিভাগ একক ডিটেনশন সেলগুলো হয় খুবই ছোট আর অন্ধকার-স্যাতস্যাতে। যাতে বন্দি নড়াচড়া করার সুযোগ না পায়।

সে যত স্থির হবে, যত এক জায়গায় বসতে বাধ্য হবে, ততই সে নিজের ভেতরে ডুব দেবে। আর যার পাপের ইতিহাস যত দীর্ঘ সে তত অস্থির হয়ে পরবে। ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও তাকে বারবার নিজের মুখোমুখি হতেই হবে। কারণ পরিবেশটাই এমন। এ যন্ত্রণা অনেক সময় মৃত্যু যন্ত্রণা থেকেও ভয়ঙ্কর।

মানুষকে যত ছোট বৃত্তের মধ্যে রাখা যায় ততই সে নিজের ভেতরটা দেখতে শুরু করে। আর অন্ধকার হলে তো পোয়া বারো। নিজের এই মুখোমুখি হওয়াকে বেশিভাগ মানুষই সহ্য করতে পারে না। এ জন্যই সদা সর্বদা আমরা মানুষের মাঝে-মানুষকে ঘিরে থাকতে চাই। বা একাকী থাকলে ক্রমাগত টিভি দেখি বা গান শুনি।

অর্থাৎ কোনো না কোনো শিল্পের মাঝে ডুবে থাকতে চাই। এ শিল্পে ডুবে থাকার অর্থ কিন্তু এই নয় যে আমরা সকলেই খুব শিল্পমনা। প্রকৃত অর্থে আমরা একাকী থাকতে ভয় পাই। নিজের মুখোমুখি হওয়া থেকে বিরত থাকতে চাই। আর এই বিরত থাকার জন্যই আশ্রয় খুঁজি শিল্পে বা ক্রিড়ায়।

মোট কথা, নানা কাজে আমরা নিজেকে ব্যস্ত রাখি। কিন্তু যখনি কোনো ঘটনা, কারণ, পরিস্থিতি বা কেউ আমাদের নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। তখনই ঘটে গণ্ডগোল। বাঁধে বিপত্তি। আমরা নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। চোখের সামনে ভেঙে পরে বিশ্বাসের দেয়াল। খসে পরে মিথ্যে সম্পর্কের বন্ধন।

সে কারণে সাধককুল বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বন্ধন মুক্তির শিক্ষা দেন শিষ্যদের। সে বন্ধন হোক না বস্তুগত-ভাবগত বা বায়ুবীয়। কারণ যাবতীয় বন্ধনের মোহ থেকে মুক্ত হতে পারলেই সাধক নিজের মধ্যে প্রবেশের অধিকার লাভ করে। নইলে চর্তুপাশ থেকে বন্ধন টেনে ধরে রাখে। ভাব জন্মালেও ডুবতে পারে না নিজের অর্ন্তহীনতায়।

এই নিজের মুখোমুখি হবার বিষয়টা যে প্রত্যেকের জন্য অনিবার্য তা ভারতীয় মুণি-ঋষি-সাধকরা জানান দিয়েছেন বরাবারই। এর জন্য বাতলে দিয়েছেন নানাবিধ পথ-মত-দর্শন-আচার-উপাচার। পৃথিবীর তাবৎ তাবৎ ধর্মীয় শাস্ত্রগুলোর অন্তর্নিহিত ভাব বুঝলেও দেখা যাবে সেখানে একই কথা বলেছে।

আসলে সাধন-ভজনের অভীষ্ট লক্ষ্যই হলো নিজেকে জানা। আর যে জন নিজেকে জেনেছে, সেই দিব্যজ্ঞানী হয়েছে। আর যে জন দিব্যজ্ঞানী হয়েছে, সেই জগৎকে জানতে পেরেছে। আর যে জন জগৎ অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ডকে জানতে পেরেছে তার কাছে এককীত্ব হতাশা নয় বরঞ্চ শক্তির প্রতীক।

একবার এক সাধক বলেছিল, ‘যে খোদায় জগৎ সৃষ্টি করছে; সেই খোদাই তো একলা। আর তার সৃষ্টি দোকলা হইবো কেমনে? সেই কারণেই জগতে আমরা সবাই একলা… একা। সব কিছু থাকলেও একা। কিছু না থাকলেও একা। সবাই থাকলেও একা। কেউ না থাকলেও একা।’

আসলেই তাই। আমরা সকলেই প্রকৃত অর্থে একা এবং নি:সঙ্গ। তাই এ নিয়ে হতাশার কিছু নেই। ভেঙে পরারও কিছু নেই। আগামী দিন কি হবে সেটা ভেবে আতঙ্কিত হওয়ারও কিছু নেই। কারণ ভবিষ্যত কি হবে তা আমরা কেউ বলতে পারি না। হয়তো আগামী কালের নতুন সূর্যই নতুন হাসি নিয়ে আসবে।

পাল্টে যাবে পৃথিবী। আবার সকলে মিলে মিশে একসাথে বাঁচার আনন্দে ডুবে যেতে পারবো। আশাই তো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই আশায় থাকুন কিন্তু মনে রাখবেন কোনো মতেই তা যেন অতি আশা নয়। নইলে নিরাশায় ডুবতেও সময় লাগবে না।

আসলে মানুষ যত জড়িয়ে ফেলে নিজেকে, ততবেশি প্রত্যাশা শুরু হয়। সাধকরা তাই বলে, সংসারে থাকো পদ্মের মতো, যাতে জলে থেকেও জল ছুঁতে না পারে। অর্থাৎ সমস্ত কিছুর মাঝে থেকেও কোনো কিছুর সাথেই এমন সম্পর্ক বা বন্ধন তৈরি করো না যা ছাড়া তুমি বাঁচতে পারবে না।

নিরাপদ দূরত্বে বসে বা সু-অবস্থায় স্বস্তির জীবন যাপন করে এমন অনেক কথাই বলা সহজ। পাতার পর পাতা লিখেও ফেলাও কঠিন নয়। কিন্তু প্রকৃত পরিস্থিতিতে পরলে আমাদের মধ্যে কতজন স্থির থাকতে পারবো সেটাই বড় প্রশ্ন। কারণ একই পরিস্থিতি ভিন্ন ভিন্ন স্থিতি বা মনস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলে।

যেমন ধরুন, একটি অসহায় শিশু যখন জানতে পারে তার পিতামাতা পৃথক হতে যাচ্ছে; অথবা পিতা বা মাতা অন্য কাউকে বিয়ে করছে; তখন তার মনস্থিতি যেমন হয়। ঠিক তা উল্টে যায়, যখন এটি শিশুর পরিবর্তে স্বাবলম্বী কোনো মানুষের জীবনে ঘটে।

অনেক সময় দেখা যায়, স্বাবলম্বী-নিশ্চিত জীবনের অধিকারী সন্তান নিজ উদ্যোগেই পিতা বা মাতার নতুন করে ঘর বাঁধায় ভূমিকা নেয়। ঘটনা একই কিন্তু খেলা কেবল সহায় আর অসহায়ত্বের।

একসময় পত্রিকার পাতায় যৌতুকের প্রেক্ষাপটে আত্মহত্যার খবর ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। প্রতিদিনই অসংখ্য ঘটনা উঠে আসতো। আজও যে তা হয় না, তা নয়। তবে তা আগের তুলনায় হয়তো অনেকটাই কম বা এই খবর আর বিক্রি হয় না বলে প্রকাশিত হয় না।

ঘটনা যাই হোক না কেনো একথা স্বীকার করতেই হবে, বর্তমানে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নারীদের আর্থিক সহায়ত্ব-সক্ষমতা-স্বাবলম্বিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সে কারণে একই পরিস্থিতিতে পরলেও নারীর হাতে আজ রয়েছে অনেক বিকল্প পথ। ঘটনা-প্রেক্ষাপট-মানুষিক চাপ সবই আছে কিন্তু সচ্ছলতা সিদ্ধান্তের গতিপথ পাল্টে দিয়েছে।

আবার একই ঘটনা মধ্যবিত্ত সমাজে বা মানুষিকতায় ঘৃণ্য-অপমানিত মনে হলেও উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্তে হয়তো তা খুবই স্বাভাবিক। বিষয়টি উল্টোও হতে পারে। আবার একই ঘটনা বা পরিস্থিতি ভিন্ন ভিন্ন বয়সে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিকৃয়া সৃষ্টি করে। তাই আমরা যতই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে যাই ততই তার জ্বালে আবদ্ধ হয়ে যাই।

কারণ কখন কোন প্রেক্ষিতে কোন ঘটনার মুখোমুখি জীবন আমাদের দাঁড় করাবে তা আমরা নিশ্চিত হয়ে কেহই বলতে পারি না। আজ যে অতীতের ঘটনা স্মরণ করে পেট ফেটে হাসি পাচ্ছে; অতীতে হয়তো সে ঘটনা ঘটার সময়ই মরে যেতে ইচ্ছে করেছিল। হয়তো আজ যে ঘটনার প্রেক্ষিতে আপনি জীবন শেষ করে দিতে চাইছেন। ভবিষ্যতে হয়তো সেটি ভেবেও হাসবেন।

তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে একবার নয় বারবার ভাবুন। সে বিষয়ে কথা বলুন যাদের আপনি ভরসা করতে পারেন তাদের সাথে। যদি এমন কাউকেই না খুঁজে পান তাহলে আকাশকে বলুন… নদীকে বলুন… বৃক্ষকে বলুন… পাহাড়কে বলুন… সমুদ্রকে বলুন…। অর্থাৎ মনের কথা খুলে বলুন।

খ্রিস্টানদের গির্জায় কনফেশন বক্স নামে একটা কক্ষ দেখা যায়। সেখানে গিয়ে যে কেউ তাদের মনের কথা বলতে পারে। অনেক সময় সেই কক্ষের অন্য অংশে একজন ফাদার থাকেন। তিনি শোনের এবং শান্তনা দেন। অনেক সময় কেউ থাকে না। তাতেও ক্ষতি হয় না কিছুই। মনের কথা খুলে বলার পর মানুষ এমনিতেই স্বস্তি বোধ করে। শান্ত হয়ে ওঠে। আর এটাই বড় ভূমিকা রাখে।

তাই যখনই সব কিছু অন্ধকার হয়ে আসবে তখন হতাশাকে গুরুত্ব না দিয়ে কথা বলুন। দেখবেন পরিস্থিতি ও মনস্থিতি সবই পাল্টে যাবে। যদিও এটা চূড়ান্ত সমাধান নয়। তবে তাৎক্ষণিক প্রতিকৃয়া পরিবর্তনে বিশাল ভূমিকা পালন করে এই কৌশল।

আর গোড়া থেকে এই ভাব নির্মূলের জন্য পরিস্থিতি নিয়েন্ত্রণের চেয়ে মনস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করাই যথাযথ। যাতে সকল ঘটনার মুখোমুখিও স্বাভাবিক থাকা যায়। যদিও কাজটা মোটেও সহজ নয়। তারপরও সুস্থ-সুন্দর জীবনের জন্য তো তা করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

আমরা অনেকে নিজেকে কঠিন মনের অধিকারী মনে করলেও, জীবনে অনেক ঘটনাই ঘটে যা আমাদের এমন এক খাদের কিনারায় নিয়ে দাঁড় করায়। যা মেনে নেয়া বা মনে নেয়া সহজ নয় মোটেও। ভিত নড়িয়ে দেয় সকল বিশ্বাসের। অস্তিত্ব সংকটে পরে সমগ্র চিন্তা-চেতনা।

তবে একটা বিষয় ভাবতে হবে, আত্মহত্যা কে যতদিন কেবল মানুষিক দুর্বলতা বলে মালা জপে যাওয়া হবে ততদিন এর শিকড়ে পৌঁছানো একটু কঠিনই হবে। কারণ আত্মহত্যার জন্য আত্মহত্যাকারী যেমন দায়ী তেমনি তার চারপাশের পরিবেশ-পরিস্থিতি-সমাজ ও উপস্থিত মানুষগুলো অর্থাৎ দেশ-কাল-পাত্রের দায়ও নেহাত কম নয়। তাই অন্যের দিকে এক আঙ্গুল তোমার সময় দেখতে হবে হাতের অন্য আঙ্গুলগুলো নিজের দিকেই নির্দেশ করছে।

নিজের জীবন নিজে নাশ করাকে সাধারণ দৃষ্টিতে কাপুরুষতা বলা হলেও; কেবল অপূর্ণতাতেই মানুষ জীবন নাশ করে এমনটাও কিন্তু নয়। পূর্ণতাতেও মানুষ নিজ ইচ্ছায় দেহত্যাগ করে। তাকে মানুষিক অস্থিরতা বা দুর্বলতা ভাবা যথাযথ হবে না। কারণ পূর্ণতায় যারা জীবন ত্যাগ করে দেহ ছেড়ে দেন তারা মোটেও সাধারণ কেউ নন। তারা সিদ্ধ যোগী পুরুষ।

সিদ্ধ যোগীদের অনেকের জীবন কথাতেই দেখা যায় তারা দিন-ক্ষণ-লগ্ন মেনে রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে দেহ ত্যাগ করেছেন। তবে সেটা বেশিভাগই জীবনের অন্তে এসে তারা তা করেন। তিব্বতীয় বৌদ্ধ তান্ত্রিক এবং তাদের রীতি অনুসরণকারী অন্যান্য দেশে বিশেষ করে চীন-কোরিয়া-জাপানের বৌদ্ধ তান্ত্রিকদের মধ্যে উপযুক্ত সময় নিজেকে নাশ করার রীতি দেখা যায়। যখন শিষ্যরা পুরোপুরি প্রস্তুত হয়, তখন গুরু দেহত্যাগ করে চলে যান।

কেউ বলে ‘আত্মহত্যা মহাপাপ’ আবার কেউ বলে ‘পাপের ফলেই আত্মহত্যা হয়’। কারণ-প্রেক্ষপট যাই হোক না কেন একথা সত্য যে প্রতি চল্লিশ সেকেন্ডে বিশ্বে কেউ না কেউ আত্মহত্যা করছে। তাই একে হালকা করে দেখার উপায় নেই। কারণ জীবন যখন অনিশ্চিত হয়ে যায় তখন স্থূল জ্ঞান কাজ করে না।

লেখক ভার্জিনিয়া উলফ তার সুইসাইড নোটে লিখে যান- ‘আমি নিশ্চিতভাবে অনুভব করছি যে, আমি আবার পাগল হয়ে যাচ্ছি। আমি অনুভব করছি যে, ওরকম আরেকটি ভয়াবহ সময়ের ভেতর দিয়ে যেতে পারবো না আমরা এবং আমি এবার সেরে উঠবো না। আমি কণ্ঠ শুনতে আরম্ভ করেছি।’ আর জগৎ বিখ্যাত চিত্রকর ভিনসেন্ট ভ্যানগগ লিখে গেছেন- ‘দুঃখ সবসময়ই টিকে থাকবে!’

উপরে উল্লেখিত এতো সব আবোল-তাবোল আলোচনার সার কথা হলো- আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বাঁচার অনেক মত থাকলেও; পথ কিন্তু মাত্র দুটি। একটা হলো মনকে নিয়ন্ত্রণ বা ‘মনস্থিতি’কে স্থির করা অর্থাৎ নিজেকে জানার পথে অগ্রসর হওয়া। যাতে যে কোনো পরিস্থিতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়া যায়। তার জন্য প্রয়োজন তপস্যা-ধ্যান-জ্ঞান-সাধন-ভজন।

আর অন্য উপায়টা হলো ‘পরিস্থিতি’কে নিয়ন্ত্রণ করা বা মনকে বোকা বানিয়ে রাখা অর্থাৎ ভুলে থাকার চেষ্টা করা বা পালিয়ে বেড়ানো। এতে নিজের মুখোমুখি হতে হয় না। সমস্যা গোড়া থেকে উপড়ে না ফেলে তাকে না দেখার ভান করে থাকার চেষ্টা করা। আর এই চেষ্টা করে যেতে হয় অনবরত। কারণ মন বেটা অসম্ভব চালাক; তাকে বোকা বানিয়ে রাখা মোটেও সহজ কাজ নয়।

যদি উদ্দেশ্য হয় সাময়িক বোকা বানিয়ে হলেও মনকে কেন্দ্রে স্থির করা সেটা চালাকির কৌশল হলেও মন্দ নয়। কিন্তু যদি অনর্গল বোকা বানিয়েই কার্য হাসিলের উদ্দশ্যে মনকে ফাঁকি দেয়া হয়। তাহলে সেটা হয় ভয়ঙ্কর। কারণ জমতে জমতে একদিন যখন তা বিস্ফোরণ হবে তখন পরিণাম হবে ভয়াবহ। যা আগে থেকে কিছুই আঁচ করা যায় না।

মনকে বোকা বানাতে অগণিত উপায় থাকলেও। মানব সৃষ্ট সবচেয়ে নান্দনিক এবং সৃষ্টিশীল আশ্রয় হলো শিল্প ও ক্রিড়া। অর্থাৎ সুকুমার বৃত্তিতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা। এই নান্দনিক ও সৃষ্টিশীল চর্চা নিজে যেমন করা যায়। আবার অন্যের চর্চা উপভোগ করেও তাতে আশ্রয় নেয়া যায়।

শিল্পে আশ্রয় নেয়ার আগে প্রকৃত শিল্প কি সে বিষয়ে যৎকিঞ্চিৎ ধারণা থাকা অতি আবশ্যক। বুঝতে হবে, সুকুমার বৃত্তি চর্চা করলেই যে ‘শিল্প’ সৃষ্টি হয়ে যায় বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। ভোগবাদী মানুষের দ্বারা আদৌতে শিল্পের নামে ‘পণ্য’ নির্মিত হয়। সেই ফাঁদে পরলে কার্য হাসিল হবে না।

তাই শিল্প আর পণ্যের পার্থক্য বোঝা এখানে অত্যন্ত জরুরী। নইলে শিল্পে আশ্রয় নিতে গিয়ে পণ্যে আশ্রিত হয়ে পড়লে হিতে বিপরীত হবার সম্ভবনাই বেশি। আর এই বাজার অর্থনীতির যুগে বিজ্ঞাপনের নব নব পন্থায় পণ্যকে শিল্প হিসেবে চালিয়ে দেয়ার যে জোরদার প্রচেষ্টা সর্বত্র তাতে ধোঁকা খাওয়া বিচিত্র কিছু নয়।

পণ্য নির্মাতারা তাদের বাজার চাহিদার উপর ভিত্তি করে তাদের পণ্য নির্মাণ ও বাজারজাত করে থাকে। তাই তাদের হতে হয় কৌশলী ও সুচতুর। আর এই চাতুরীর নির্মাণে মগ্ন হলে আখেরে পতন অনিবার্য।

যাদের মধ্যে অজানাকে জানার, অদেখাকে দেখার, সর্বোপরি নিজেকে জানার বাসনা ক্রিয়া করে তাদের সৃষ্টিতেই মূলত শিল্প ভূমিষ্ঠ হয়। আর সেই শিল্পে যথাযথ ডুবতে পারলে আখেরে মনের স্থিরতার একটা পথ খোলার উপযোগিতাও সৃষ্টি হয়।

তাই প্রকৃত শিল্পীরা যেমন সকলের কাছ থেকে সম্মান পায়। তেমনি পায় অগণিত মানুষের ভালোবাসা। মানুষের ভালোবাসাই প্রকৃত শিল্পীর পাথেয়। তাই সর্বজীবের ভালোবাসা প্রত্যাশী প্রকৃত শিল্পীরা হয় কোমল হৃদয়ের অধিকারী। তাদের সেই হৃদয়ে সামান্য আঘাত লাগলে-আত্মসম্মানে ব্যাঘাত ঘটলে তারাও স্থির থাকতে পারে না।

প্রকৃত শিল্পীদের আরেকটি সমস্যা হচ্ছে ‘অসন্তুষ্টি’। কারণ প্রকৃত শিল্পের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কোনো সৃষ্টিই তাকে সন্তুষ্টি দিতে পারে না। আর এই অসন্তুষ্টি শিল্পীকে যেমন শিল্পের স্বর্ণ দুয়ারের দিকে ধাবিত করে; একই সাথে তার চিত্তকে করে রাখে অশান্ত।

অন্যদিকে সাধনার গুরুত্বপূর্ণ একটি তপস্যা হলো ‘সন্তুষ্টি’। যতটা আছে ততটা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা, মনকে যখন তখন অস্থির হয়ে উঠা থেকে বিরত রাখে। জীবনের চলাচলে চাওয়া-পাওয়ার স্রোতে বিষয়বাসনার আকাঙ্খা জাগা অস্বাভাবিক নয় মোটেও। তবে তা অতি আশা বা সাধ্যের অতীত হলে দুরাশায় পরিণত হতেও বেশি সময় লাগে না।

ক্রমাগত বাড়তে থাকা চাহিদা আমাদেরকে সন্তুষ্ট হতে দেয় না। চারপাশের চকচকে আভিজাত্য, লোক দেখানো জীবনযাপন, রঙচঙে বিজ্ঞাপন, আশপাশের মানুষের জীবনাচার আমাদেরকে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করে চাহিদার তালিকা দীর্ঘ করতে।

আর এই চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকা চাহিদার জোগান দিতে জীবনের স্বাভাবিক গতিকে পেছনে ফেলে লোকজন দৌড়ে বেড়ায় অর্থ-ধনসম্পদ-প্রভাব-প্রতিপত্তির পেছনে। এই খেলায় সকল কিছু ভুলে ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে মানুষ যেমন জীবন বাজি রাখি, তেমনি অনেকক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়ে নানা অনৈতিক ক্রিয়াকলাপেও।

এতে সফলতা যে আসে না, তাও নয়। তবে এতে প্রাপ্তি যোগ যেমন আছে, তেমনি থাকে হারাবার ভয়ও। এই হারানোর তালিকার অন্যতম হলো মানুষিক শান্তি-স্বস্তি-সুস্থতা। কে না জানে মানুষিক এই ত্রিরত্ন হারালে জীবন হয়ে উঠে বিষাদময়।

আর বিষাদময় হলেই জীবনকে শেষ করে দিতে হবে এমনটা ভাববার কারণ নেই। আপনি চাইলে প্রতি মুর্হূতেই বাঁক ঘুরিয়ে জীবনকে দাঁড় করাতে পারেন নতুন দিগন্তে। তাই হতাশাকে প্রশ্রয় না দিয়ে-হতাশাকে চর্চা না করে জীবনের গান গেয়ে যাওয়াই উত্তম। তাই আসুন চিৎকার করে বলি এবং বিশ্বাস করতে শুরু করি- ‘জীবন সুন্দর যদি তাকে শুদ্ধতা থাকে।’

আর যদি ভাবেন লোকে কি ভাববে? লোকে কি বলবে? তাহলে আপনাকেই বলছি, যদি ভাবতেই হয় তাহলে লোকে কি ভাববে সেটা না ভেবে আপনি লোকের জন্য কি ভাবেন, কিরূপে ভাবেন বরঞ্চ সেটা ভাবুন। লোকের ভাবনাকে গুরুত্ব না দিয়ে গুরুত্ব দিন আত্মচর্চায়। লক্ষ্য হোক নিজেকে চেনা-নিজেকে জানা।

অনেক সব কথাবার্তা হলো, এবার আসা যাক আজকের অনুশীলনের কথায়। তবে তার আগে এটুকু মেনে নিয়েই পড়তে হবে যে, কেবল পড়লে হবে না অনুশীলনও করতে হবে। নইলে কেবল সময় নষ্ট ভিন্ন আর কিছুই হবে না। এতো পুঁথিগত বিদ্যা নয় যে পরীক্ষায় উত্তর দিতে কাজে আসবে। এ হলো জীবনের বোধের দরজা উন্মুক্তের পথ।

এখন আপনার সামনে প্রশ্ন একটাই হওয়ার কথা। আপনি সেই দরজা খুলে হাঁটতে শুরু করবেন? নাকি বরাবরের মতো দরজার এপাশে দাঁড়িয়েই কল্পনার আকাশে ভাসতে থাকবেন। লেখার দায়িত্ব আমার, মেনে চলা ও অনুশীলনের দায়িত্ব আপনার। জয় হোক যাত্রা-

আমরা এ পর্যন্ত নিজ দেহের মধ্য দিয়ে নিজেকে জানার কয়েকটা অনুশীলন করার উপায় জেনেছি। আজ একটু ভিন্ন একটা ছোট্ট অনুশীলনের কথা বলবো। ক্ষুদ্র পরিসরে প্রকৃতির মধ্য দিয়ে নিজেকে জানার একটা প্রয়াস।

আমাদের পঞ্চ জ্ঞান ইন্দ্রিয় হলো- শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ। আর এই ইন্দ্রিয় পঞ্চের মাধ্যমে আসুন একটু চেষ্টা করি নিজেকে তথা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডকে ধরার। অনুশীলনটি করবার জন্য উন্মুক্ত পরিবেশ সবচেয়ে উপযোগী। পাহাড়, অরণ্য, জলাশয়ের পার্শ্ববর্তী স্থান উপযোগীতার শীর্ষে হলেও; এগুলো ছাড়া যে এই অনুশীলন করা যাবে না, তাও নয়।

এরজন্য ছাদ, বারান্দা, নিদেনপক্ষে একটা খোলা জানালাও হতে পারে এই অনুশীলনের ক্ষেত্র। বরাবরের মতো একাকী নির্জন পরিবেশে সুখাসন, অর্ধাপাদ্মাসন বা আরামদায়ক ভঙ্গিতে বসে পড়ুন। মনে করে, ঢিলেঢালা পোশাক পরবেন অবশ্যই।

আগের নিয়মেই মেরুদণ্ড সোজা করে বসে চোখ আলতো বন্ধ করে ধীরে ধীরে দীর্ঘ নি:শ্বাস নিন এবং তারচেয়েও ধীরে ধীরে নাক দিয়ে শ্বাস ছাড়ুন। এভাবে তিন থেকে পাঁচবার করুন নি:শ্বাসের প্রতি অর্ন্তনজর আর মন ভ্রূমধ্যে রেখে। দুই হাতের মধ্যমা আঙ্গুল দিয়ে আলতো করে কানের ফুটো বন্ধ করে নিন। জোরে চাপ দিবেন না।

এবার লম্বা একটা নি:শ্বাস নিয়ে শ্বাস ধরে রেখে, ধীরে ধীরে দৃষ্টি খুলে আকাশের দিকে তাকান। দু’ চোখ ভরে আকাশ দেখুন। এক থেকে পাঁচ গুণা পর্যন্ত শ্বাস ধরে রেখে অতি ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়তে থাকুন। পাশাপাশি আকাশের বিশালতা দেখুন, মেঘ দেখুন, রং দেখুন, এর পরিবর্তনগুলো দেখতে থাকুন।

এভাবে মিনিট খানেকের মতো দেখতে দেখতে নাক দিয়ে প্রকৃতির গন্ধ বুক ভরে নিতে থাকুন। সূক্ষ্মাতী সূক্ষ্ম গন্ধকে বুঝবার চেষ্টা করতে থাকুন। মিনিট খানেক দেখা ও গন্ধ নিতে নিতে ধীরে ধীরে কান থেকে আঙ্গুল সরিয়ে নিন। এবার দেখা ও গন্ধ নেয়ার পাশাপাশি প্রকৃতির শব্দ শুনবার চেষ্টা করুন। উচ্চ থেকে নিম্ন সকল মাত্রার শব্দ আলাদা আলাদা করে বুঝবার চেষ্টা করুন।

মিনিট খানেক করতে করতে আলতো করে পুনরায় চোখ বন্ধ করুন। হাত দুটি হাঁটুর উপরে রাখুন। অর্ন্তদৃষ্টি নি:শ্বাসের দিকে আর মন ভ্রূমধ্যে রেখে এতোক্ষণ যা যা দেখলেন, শুনলেন ও গন্ধ নিলেন তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে থাকুন।

ভাবতে শুরু করেন, আপনি প্রকৃতিরই অংশ। আপনি বিচ্ছিন্ন কেউ নন। আপনি যে শ্বাস নিচ্ছেন তা প্রকৃতি আপনাকে দিচ্ছে বলেই নিতে পারছেন। এটি প্রকৃতির অপার দান আপনার জন্য। আর এই দান গ্রহণে কৃতজ্ঞ হোন। জীবনে যা ভুল করেছেন তার জন্য অনুতপ্ত হোন।

নিজেকে ক্ষমা করে দিন এই প্রতিজ্ঞায় যে আপনার দ্বারা আর অপরাধ হবে না। যাতে অন্য মানুষ নূন্যতম আঘাত পাবে। প্রকৃতির নূন্যতম ক্ষতি হবে এমন কাজ আর আপনি করবেন না। ক্ষমা করে দিন সকলকে। মনের মধ্যে যত বিষাদ আছে তাদের বলুন। আপনি আর তাদের মায়া জ্বালে আবদ্ধ থাকবেন না।

কারণ আপনি আর ক্ষুদ্র নন। আপনি এই অপার প্রকৃতির অংশ। আপনার দায়িত্ব অনেক। প্রকৃতি যেমন নি:শ্বাস উপহার দিয়ে আপনাকে বাঁচিয়ে রাখছে। আপনিও তাকে শুদ্ধ প্রশ্বাস ফিরিয়ে দিয়ে আপনার যথাযথ দায়িত্ব পালন করবেন। আর তার জন্য চাই মানুষিক চিন্তার শুদ্ধতা আর দৈহিক সূচিতা।

তাই প্রতিজ্ঞা করুন আপনি এই মুর্হূত থেকে মানুষিক শুদ্ধতা চর্চার জন্য আর কোন অযাচিত চিন্তার অনাচারে ডুববেন না। দৈহিক সূচিতার জন্য শুদ্ধ আহারের পাশাপাশি দেহে পাপ বোধ জাগে এমন কিছু করবেন না, দেখবেন না, বলবেনে না, শুনবেন না। এবার আনন্দ মনে ধীরে ধীরে চোখ খুলুন।

এবার শেষ করার পালা। বরাবরের মতো এবারো শেষ করছি গানে গানে। এবারের গান মুনির সরকারের দেহতাত্ত্বিক গান। যার ভেতরে আছে অর্ন্তনিহিত অর্থ আর বাইরে আছে মজাদার শব্দ চরণ। জয় হোক সকলের। জয়গুরু। মুনির সরকারের গান-

হাওয়ার উপর চলে গাড়ি
লাগে না পেট্রোল ডিজেল
মানুষ একটা দুই চাক্কার সাইকেল।।
কি চমৎকার গাড়ির মডেল গো
চমৎকার গাড়ির মডেল
মানুষ একটা দুই চাক্কার সাইকেল।।

দুই চাক্কায় করেছে খাড়া
জায়গায় জায়গায় স্ক্রুপ মারা
বাহাত্তর হাজার ইস্পাত দিয়া
এই সাইকেল গড়া;
চিন্তা করে দেখ না একবার
দুইশ ছয়টা হয় এক্সেল।।

নতুন সাইকেল পুরান হইবে
কলকব্জায় জং যে ধরিবে
বেল বাটির ঐ ঠনঠন
আওয়াজ বন্ধ যে হইবে;
এককদম আগে না বাড়বে
হাজার বার মারলেও প্যাডেল।।

ফুরাইলে সাইকেলের বাতাস
ও সেদিন হবে সর্বনাশ
গিয়ার তোমার কাজ করবে না
রাখিও বিশ্বাস;
মনির সরকার হইয়া লাশ
থাকবে ভব মেডিকেল।।

(চলবে…)

……………………
আরো পড়ুন:
এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: এক
এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: দুই
এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: তিন
এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: চার

এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: পাঁচ
এই ক্রান্তিকালে নিজেকে জানি: ছয়

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!