নবী না চিনলে সে কি, খোদার ভেদ পায় : পর্ব দুই

নবী না চিনলে সে কি, খোদার ভেদ পায় : পর্ব দুই

-নূর মোহাম্মদ মিলু

বেহেস্ত হতে আছিয়া, মরিয়মের আগমন
মা আমেনার পবিত্র গর্ভ হতে দুনিয়ার জমিনে নূর নবী শুভাগমনের সন্নিক্ষণে অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল। যা সাধারণ মানুষ বা অন্য কারো ভূমিষ্ঠের সময়ে দেখা যায় না বা পরিলক্ষিত হয়নি।

দয়াল নবী দুনিয়াতে তাশরিফ আনায়নের পূর্ব মুহুর্তে প্রথমে যে ঘটনা, তা মা আমেনা নিজেই বর্ণনা করে বলেন, “যখন আমার প্রসব ব্যথা কিছুটা শুরু হয়, তখন ঘরে আমি প্রায় একা ছিলাম। আমি দেখতে পেলাম, একটি সাদা পাখির ডানা আমার কলিজায় কি যেন মালিশ করে দিচ্ছে! এতে আমার ভয় ভীতি ও ব্যথা বেদনা দূরীভূত হয়ে গেল।

এরপর দেখতে পেলাম, এক গ্লাস শ্বেতশুভ্র শরবত আমার সামনে। আমি ঐ শরবতটুকু পান করে ফেললাম! অতঃপর, একটি উদ্বর্গামী নূর আমাকে আচ্ছাদিত করে ফেলল। এই অবস্থায় দেখতে পেলাম, কোরাইশদের আবদে মুনাফ বংশের মহিলাদের চেহারা বিশিষ্ট এবং খেজুর বৃক্ষের ন্যায় দীর্ঘাঙ্গিনী অনেক মহিলা আমাকে বেষ্টন করে বসে আছে।

আমি সাহায্যের জন্য ওয়া গাওয়াছা বলে তাঁদেরকে উদ্দেশ্য করে বললাম, আপনারা কোথা থেকে আমার বিষয় অবগত হলেন! উত্তরে তাঁদের থেকে একজন বললেন, আমি ফেরাউনের স্ত্রী বিবি আছিয়া।

আরেক জন বললেন, আমি ইমরানের তনয়া বিবি মরিয়ম এবং আমাদের সঙ্গীরা হচ্ছে, বেহেস্তী হুর।

আমি আরো দেখতে পেলাম, অনেক পুরুষবেশী লোক শুন্যে দণ্ডায়মান রয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের হাতে রুপার পাত্র। আরো দেখতে পেলাম, এক দল পাখি আমার ঘরের কোঠা ঢেকে ফেলেছে।

আল্লাহ তা’আলা আমার চোখের সামনের সকল পর্দা অপসারণ করে দিলেন এবং আমি দুনিয়ার পূর্ব-পশ্চিম সব দেখতে পেলাম।

আরো দেখতে পেলাম, তিনটি পতাকা। একটি দুনিয়ার পূর্ব প্রান্তে স্থাপিত। অন্যটি পশ্চিম প্রান্তে এবং তৃতীয়টি স্থাপিত কা’বা ঘরের ছাদের উপর।

এমতাবস্থায়, প্রসব বেদনা চূড়ান্ত পর্যায়ে আমার প্রিয় সন্তান হযরত মুহাম্মদ ভূমিষ্ঠ হলেন।

বেমেছাল অবস্থায় শুভাগমন
সর্ব সাধারণ যেভাবে মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়, রাসুলে করীম দুনিয়াতে শুভাগমন সে সাধারণ অবস্থায় তো নয়।

বরং নূর নবী এমন বেমেছাল নজিরবিহীন অবস্থায় জমিনে তাশরিফ রেখেছেন যে, দয়া নবী (দরুদ) খতনাকৃত এবং নাড়ী কর্তিত অবস্থায়, বেহেস্তী লেবাছ পরিধান করে, দুই নূরানি চোখে সুরমা মাখা অবস্থায় তাঁর সম্মানিত মায়ের পবিত্র গর্ভ থেকেই দুনিয়াতে তাশরিফ রাখেন।

মা আমেনা বর্ণনা করেন, “যখন আমার প্রিয় পুত্র ভূমিষ্ঠ হলেন, তখন আমি দেখতে পেলাম, তিনি সিজদায় পরে আছেন।

তারপর, মাথা উদ্ধর্গামী করে, শাহাদাত অঙ্গুলি দিয়ে ইশারা করে বিশুদ্ধ আরবি ভাষায় পাঠ করেন, “আশহাদু আল্লা-ই-লাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্নি রাসুলুল্লাহ।”

আর এই অবস্থা জানতে পেরে দাদা আবদুল মুত্তালিব মুগ্ধ হয়ে যান। এই বিষয়ে নূর নবী বলতেন, “আল্লাহর কাছে আমার মর্যাদা একটি হলো, এই যে, আমি খতনাকৃত অবস্থায় দুনিয়াতে শুভাগমন করেছি এবং আমার লজ্জাস্থান কেউ দেখতে পায়নি।”

নূর নবীর শুভাগমনের খবর
দয়াল নবী মায়ের পবিত্র গর্ভ থেকে দুনিয়াতে শুভাগমনের পর, মা আমেনা তাঁর খাদেমার মারফতে খাজা আবদুল মুত্তালিবের নিকট নবজাতক তাশরিফ আনায়নের সুখবরটি পাঠালেন।

যদিওবা, স্বামী হযরত আব্দুল্লাহ ইতিপূর্বে বিবি আমেনা অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ওফাত হন।

খাদেমা সুখবর নিয়ে গিয়ে আবদুল মুত্তালিবকে বললেন, ঘরে গিয়ে দেখে আসুন- আপনার একজন নূরানি নাতি দুনিয়াতে তাশরিফ এনেছেন। এই সুসংবাদ শুনে তিনি ঘরে আসলেন।

তখন মা আমেনা ইতিপূর্বে এই নূরানি সন্তানকে নিয়ে যে সব স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা শ্বশুর আবদুল মুত্তালিবের কাছে ব্যক্ত করলেন। এই নূরানি সন্তানের কি নাম রাখতে আদিষ্ট হয়েছেন, তাও তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই সব শুনে, হযরত আবদুল মুত্তালিব নবাগত শিশু নূর নবীকে কোলে করে বায়তুল্লাহ শরীফে নিয়ে যায়। তিনি সেখানে প্রবেশ করেন, আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করেন এবং দোয়া করেন।

দুনিয়ার প্রথম রাত্রিতে মোজিজা!
তখনকার আরবের কোরাইশ সমাজে প্রথা ছিল যে, কোন সন্তান জন্মগ্রহণ করলে, তারা সে নবজাতককে জন্ম দিন গতরাতের পরবর্তী ভোর পর্যন্ত কতিপয় কোরাইশ মহিলাদের কাছে দিয়ে রাখত। আর মহিলারা সে নবজাতক শিশুকে পাথরের নির্মিত ডেগ দিয়ে ঢেকে রাখত।

দয়াল নবী তাঁর মায়ের পবিত্র গর্ভ থেকে দুনিয়াতে শুভাগমন হলে, আবদুল মুত্তালিব আরবের ঐ নিয়ম অনুযায়ী, শিশু নূর নবীকে কিছু কোরাইশ মহিলার হাতে দিয়ে আসেন।

আরবের সে মহিলারা কানুন মোতাবেক নবজাতক নূর নবীকেও ডেগ দিয়ে ঢেকে রেখে, চলে যান।

মহিলারা ভোরে এসে দেখতে পায়, ঐ ডেগ ফেটে গিয়ে দ্বিখণ্ডিত হয়ে পরে আছে। আর শিশু নূর নবী দুই চোখ খুলে, আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন।

এই অলৌকিক অবস্থা দেখে, মহিলারা দৌঁড়ে দেয় এবং আবদুল মুত্তালিবের কাছে এসে বলল, কি আশ্চর্য! এই রূপ নবজাতক শিশু তো জীবনে কখনো দেখিনি! অতঃপর সেখানে গিয়ে যা যা দেখলেন, তা আবদুল মুত্তালিবকে সব অবহিত করালো।

এইসব শুনে আবদুল মুত্তালিব বললেন, তাঁকে তোমরা হেফাজত করো। আমি আশা করি, এই নবজাতক শিশু, প্রচুর কল্যাণকামী ও অধিকারী হবেন।

নূর নবীর শুভাগমনের দিন তারিখ
“আমুল ফীল” অর্থাৎ বাদশাহ আবরাহা তার সৈন্য সামন্ত আর হাতি বাহিনী নিয়ে বায়তুল্লাহ শরীফ আক্রমণের ঘটনা যে বছর ঘটেছিল, সে বছরই নূর নবী দুনিয়াতে শুভাগমন করেন।

আর ঐ বছরের মাহে রবিউল আউয়াল শরীফ, ১২ তারিখ মতান্তরে ৯ তারিখ, সোমবার দিন এবং সুবেহ সাদিকের শুভ সন্নিক্ষণে দয়াল নবী তাঁর মায়ের পবিত্র গর্ভ থেকে জমিনে তাশরিফ রাখেন।

যার খৃষ্টাব্দীয় হিসাব মোতাবেক ৫৭০ সালের এপ্রিল মাসের ২০ অথবা ২২ তারিখ। এই সময়, শাম দেশের অট্রলিকাগুলো আলোকিত হয়ে যায়।

কিসরা বাদশাহর রাজপ্রসাদে রক্ষিত চৌদ্দ সৌধ চুড়া ভেঙ্গে পরে। প্রাচীন পারসিক যাজক মণ্ডলীর উপাসনালয়গুলোতে যুগ যুগ ধরে প্রজ্বলিত হয়ে আসা অগ্নিকুণ্ড গুলো নিস্তেজ ও নিষ্প্রভ হয়ে পরে।

হযরত হাসসান ইবনে সাবিত এক বর্ণনায় বলেন, আল্লাহর কসম! আমি তখন সাত/আট বছরের বালক হলেও, বেশ শক্তিশালী ও লম্বা হয়ে উঠেছি। যা শুনলাম, তা বুঝবার ক্ষমতা আমার হয়েছিল।

হঠাৎ শুনতে পেলাম, জনৈক ইয়াহুদী ইয়াসরিব (বর্তমান মদিনা তৈয়্যবা) এর একটা দূর্গের উপর আরোহণ করে উচ্চস্বরে “ওহে ইয়াহুদী গণ” বলে ডাক দেয়।

ডাক শুনে লোকেরা তার কাছে হাজির হলো। অতঃপর বলল, তোমার কি হলো? সে বলল, আজ রাতে আহমদের জন্মের নক্ষত্রটা উদিত হয়েছে।

হযরত আবু কাতাদা হতে বর্ণিত রয়েছে যে, এক বেদুঈন জিজ্ঞাসা করলো, ইয়া রাসুলুল্লাহ (দরুদ)! সোমবার দিবসে রোজা সম্পর্কে আপনি কি বলেন! জবাবে রাসুলুল্লাহ বলেন, ঐ দিনই দুনিয়ার বুকে আমার শুভাগমন এবং ঐ দিনই আমার উপর ওহী অবতীর্ণ হয়।

(চলবে…)

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!