সীতারাম

সীতারাম ওঙ্কারনাথের বাণী: সাত

লোভ জয়:
যা খাবে ভগবানকে নিবেদন করে খাবে। ভগবানের রূপে, নামে, গুনে, প্রসাদে ভগবানের ধামে, ভক্তজনের সঙ্গে, সাধু-গুরু সেবায় লোভ করলে অচিরাৎ অন্য লোভ দূর হয়ে যাবে। ব্যাপার হল মন, শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধ এই পাঁচটি বিষয় চাইবেই।

ভালোকথা- মন শব্দ চাচ্ছে, শোনাও তাকে ভগবানের নাম, লীলাগুণ, তাতেই সে ভরে যাবে। মন স্পর্শ পেতে চাইলে, ভগবদ্-বিগ্রহ স্পর্শ করবে, তাঁকে বুকে চেপে ধরবে, তুলসীতলায় দেবমন্দিরে গড়াগড়ি দেবে, সাধুসজ্জনের চরণ স্পর্শ করবে-কিছুদিন করলেই মন আর অন্য স্পর্শ চাইবে না।

মন যখন রূপ চাবে, তখন তাকে রাধাগোবিন্দের রূপ, সীতারামের রূপ, গৌরীশঙ্করের রূপ, অনন্ত আকাশ, অসীম সমুদ্র দেখিও-তাতেই সে তৃপ্ত হয়ে যাবে। মন যখন রস চাবে, তখন শ্রীভগবানের চরণামৃত, প্রসাদ তাকে দিও, ব্যস, মন তাতেই মজে যাবে। মন যখন গন্ধ চাবে, তখন তাকে ভগবানের চরণার্পিত তুলসীর গন্ধ, ধূপের গন্ধ, যখন হোম হবে সেই হোমের গন্ধ আঘ্রাণ করাবে, ব্যস তাহলেই মন আর অন্য কিছু চাইবে না।

মনের গলা টিপে বিষয় তৃষ্ণা দূর করতে পারবে না-একটার বদলে আর একটা দাও। সে জন্ম-জন্মান্তর দুঃখপ্রদ অনিত্য বিষয় সেবা করে বড় জ্বালা ভোগ করছে, তাকে নিত্য-সত্য-পরম আনন্দপ্রদ বিষয় সেবা করাও, সে অচিরাৎ বহির্মুখতা ত্যাগ করে অন্তর্মুখ হবে। তাহলেই অলৌকিক স্পর্শ- রোমাঞ্চ, অলৌকিক রূপ- জ্যোতি, অলৌকিক শব্দ- নাদ, অলৌকিক রস, অলৌকিক গন্ধ লাভ করবেই।

-শ্রীশ্রী সীতারামদাস ওঙ্কারনাথদেব

… … …

সাক্ষাৎ দর্শন:
সাক্ষাৎ দর্শন যারা এ পথে এসেছো, তাদের জীবনের লক্ষ্য হোক- সাক্ষাৎ দর্শন।

অগ্রসর হতে থাকো- ক্ষুদ্র দ্বেষ হিংসা আমি বড়, আমি বুদ্বিমান- এ মূর্খতা দূর হোক। সকলে আমার ইষ্টের অপর মূর্তি ভেবে কায়মনোবাক্যে সকলকে সম্মান করতে শেখো। পর বলে কেউ থাকবে না। পরই পরমেশ্বর-পরই আমার আদরের ইষ্ট, এইটি মনে করে প্রণাম অভ্যাস করবে। অবশ্য এ একদিনের কাজ নয়।

কথা যত কম কবে, তত ভেতরে কাজ হবে। সময় সাবধানে রক্ষা করবে, একটি শ্বাসও যেন বৃথা নষ্ট না হয়, চেষ্টা চলুক। সাধন অবসরে সাধুগণের জীবনচরিত পড়বে। নামকীর্ত্তনের দ্বারা সীতারাম যত প্রীতিলাভ করে এমন অন্য কিছুর দ্বারা সম্ভব নয়। যারা সাধনপথে অগ্রসর হতে চায়, নামকীর্ত্তন তাদের সমস্ত বাধা বিঘ্ন দূর করে দেন।

যেমন যেমন পাপক্ষয় হবে, তেমনি তেমনি আনন্দ আসবে, দেহবোধ তুচ্ছ হবে- নিজেকে ভগবানের দাস বলে নিশ্চিত জ্ঞান হবে। এই জ্ঞান ক্রমে ক্রমে দৃঢ় হলে দুঃখ বলে কিছু থাকবে না, থাকবে শুধু আনন্দ। ইহলোকে আনন্দ-পরলোকেও আনন্দ।

-শ্রীশ্রী সীতারামদাস ওঙ্কারনাথদেব

… … …

আমি:
এ জগতে আমি ভিন্ন দ্বিতীয় কিছু নাই। আমি লীলা করবার জন্য বহুরূপ ধারণ করি। যা দেখা যায়-তা আমি। যা দেখা যায় না- তা আমি। যা শোনা যায়- তা আমি। যা শোনা যায় না- তা আমি। আমি মহান হতে মহান, অণু হতে অণু, জগতে এরূপ কোন ভাষা নাই-যা আমাকে প্রকাশ করতে পারে।

আমি আছি তাই জগৎ আছে, আমি না থাকলে জগৎ নাই। ক্ষুদ্র, বৃহৎ, শুচি, অশুচি, ভাল, মন্দ যা কিছু সব আমি। আমি নির্গুণ, আমি সগুণ, আমি নির্গুণ-সগুণের অতীত। একমাত্র আমিই আছি। আমার একপাদে অনন্তকোটি ব্রহ্মাণ্ড ভেসেছে, তিন পাদের সন্ধান কেহ জানে না।

আমি লীলা করবার জন্য দেহ ধারণ করি, আবার লীলান্তে স্বধামে চলে যাই। আমার জীবকে আমি বড় ভালোবাসি, তাই জীবের উদ্ধারের জন্য বার বার লীলা দেহ ধারণ করে অবতীর্ণ হই- আমি, আমি, আমি।

-ব্রজনাথ গাঁথা

… … …

পরমাণু:
পরমাণুর সাগরে আমরা ডুবে আছি, পরমাণু খুব সূক্ষ্ম। জানালা দিয়ে রোদ এলে তাতে ছোট ছোট কি যেন ভাসতে দেখা যায়। ঐগুলি ছয়টি পরমাণু দিয়ে তৈরী-নাম ত্রসরেণু। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, রোগ, শোক, দুঃখ, জ্বালা, সাত্ত্বিক, রাজস, তামস, প্রাতঃ, মধ্যাহ্ন, পাপ, পুণ্য এককথায় যা কিছু সব পরমাণুময়।

যখন ক্রোধ হয় তখন চারিদিকে ক্রোধের পরমাণু এসে রাগ বর্ধিত করে। কাম এলেও কামের পরমাণু এসে কাম বাড়ায়। জপ ধ্যান করলে, নাম করলে জপ ধ্যান নামের পরমাণু এসে আনন্দ দান করে, আরতির সময় শাঁখ ঘণ্টা বাজালে, ধূপ দিলে, সাত্ত্বিক পরমায়ু জমে আনন্দ দান করে।

যেমন যেমন বাইরের অবস্থা- মনের অবস্থা সেই সেইরূপ হয়। পরমাণুরূপিনী মহাশক্তি এসে প্রত্যেকের জন্মজন্মান্তরের কর্মানুযায়ী পাপ বা পুণ্য দান করত পাপীকে রোগ শোক দুঃখ জ্বালা দিয়ে শেষ পর্যন্ত নরকে পাঠান আর পুণ্যবানকে শাস্ত্রপথে চালিত করে আনন্দের উপর আনন্দ দিয়ে পরমানন্দে ডুবিয়ে দেন।

এই জগৎ শ্রীভগবানের বিরাট দেহ। শ্রীসূর্য্যদেব স্থাবর জঙ্ঘমের আত্মা। তিনি প্রত্যেক জীবের প্রাণরূপে হৃদয়ে এবং মুখমণ্ডলে চক্ষুরূপে অবস্থান করছেন। চক্ষুকে বড় সাবধানে রাখতে হয়। শ্রীভগবান সব সেজে লীলা করছেন- এইভাবে দর্শন ও প্রণাম অভ্যাস করা কর্তব্য।

তিনি মহৎ হ’তেও মহীয়ান, অণু হতেও অণু পরিমাণ। তিনি নরনারীর মস্তকে সহস্রদলে কোটি সূর্য্যের প্রভাসম্পন্ন পরমবিন্দুরূপে অবস্থান করত প্রাণকে চালিত করছেন।

-শ্রীশ্রী সীতারামদাস ওঙ্কারনাথদেব

… … …

নামজপ:
ভক্ত: আমার আসন মুদ্রা প্রাণায়াম শিখতে বড় ইচ্ছা করে।

ক্ষেপা: আমি তো মুদ্রাদি কিছু জানি না বাবা। আমি ও সকলের অধিকারী নই বলে শ্রীগুরুদেব আমায় দেন নি। আমি যোগ যাগ কিছু জানি না। আমায় গুরুদেব নাম করতে বলেছেন। আমি সেই মহাযোগ জানি, তাই নিয়েই আছি।

ভক্ত: কেমন করে নাম করতে হয়?

ক্ষেপা: যেমন করে কথা কচ্ছ। কথায় বিরাম আছে, নাম-মহাযোগে বিরাম-বিশ্রাম দিতে নাই। অবিরাম রাম রাম করবে। উঠতে-বসতে, খেতে-শুতে, দাঁড়াতে, লোকসঙ্গে, নির্জ্জনে,পথ চলতে চলতে সর্ব্বদা রাম রাম কর- এতেই আসন প্রাণায়াম ধ্যানধারণা সমাধি সিদ্ধি হয়ে যাবে। বড় বেশী কথা নয়- দুইটি অক্ষর ‘রাম’- এই নাম জপরূপ মহাযোগ অভ্যাস কর, সব গোলযোগ কেটে যাবে।

ভক্ত: তাহলে যোগের কোন দরকার নাই?

ক্ষেপা: জন্ম-জন্মান্তরে যে যেমন সাধনা করে এসেছে সে ইহজন্মে সেইরূপ সাধনার অধিকারী। যাঁর যোগে দরকার আছে তিনি করুন। তুমি নামই কর, এতেই যোগের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে।

ভক্ত: নাম করলে কি প্রাণায়াম করা হয়?

ক্ষেপা: প্রাণায়াম করা হয় বৈ কি। তোমায় ভ্রূমধ্যে ধ্যান রেখে প্রাণে নাম করতে বললাম। এটাই প্রাণায়াম। ক্রমে নাভিমূল হতে বায়ু গিয়ে মস্তকে আঘাত করবে। এসব প্রাণায়াম। আসন প্রাণায়ামাদির উদ্দেশ্য বায়ুকে সুষুম্না মার্গে নিয়ে যাওয়া, বায়ু স্থির করা। নাম করলেও তা হয়।

ভক্ত: শ্বাসে-শ্বাসে নাম করব কি?

ক্ষেপা: জিহ্বাতেই আরম্ভ কর। কিছুদিন করলে শ্বাসে-শ্বাসে নাম করাটা কি বুঝতে পারবে। কোন অধ্যাত্ম দেশে মনকে ধরে না রেখে শ্বাসে-শ্বাসে নাম করতে গেলে উল্টে বিপত্তির সম্ভাবনা। জিহ্বায় নাম লয়ে গিয়ে প্রাণকে দিক, হৃদয়ে প্রাণবায়ু আছে, প্রাণ নাম করুক- কর, ক্রমশ সব বুঝতে পারবে। ধ্যান ভ্রূমধ্যে রাখবার চেষ্টা করবে।

ভক্ত: আচ্ছা নাম তো করি কিন্তু অন্য চিন্তা দূর করতে পারি না। এ নামের দ্বারা কাজ হবে কি?

ক্ষেপা: আরে পাগল, নাম কখনও ব্যর্থ হয়? রোগী অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে বলে কি ঔষধ কাজ করবে না? প্রমাদবশে খড়ের গাদায় আগুন পড়ে গেছে বলে কি আগুন ক্ষমা করবে? তা করবে না। বাবা নাম কাজ করবেই। ধর, তুমি ত্রিশ বৎসর ধরে বাজে কথা, বাজে চিন্তা করে এসেছো, আজ পনের মিনিট নাম করে, মন অসম্বদ্ধ প্রলাপ ত্যাগ করল না বলে নিরাশ হলে চলবে কেন?

নাম কর, ফল হবেই। ত্রিশ বৎসর যা শুনেছ, যা বলেছ, আজ তাতে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছ। সর্বদা রাম রাম বলা অভ্যাস কর, রাম রাম শোনা অভ্যাস কর, তারপর যখন বিক্ষেপ হবে তখন দেখবে নামেতেই বিক্ষেপ হচ্ছে।

একটা গল্প মনে পড়ল- একজন কবিরাজ রোগীকে দুর্বল দেখে, রোগীর আত্মীয়গণকে বলে গেলেন, রোগীকে দুধ খাওয়াবে। রোগী বড় দুর্ব্বল, দুধ খাওয়ালে বল হবে। রোগীর মা, একপোয়া দুধ নিয়ে এসে এক ঝিনুক দুধ মুখে দিয়েই জিজ্ঞাসা করল- ‘হ্যাঁ বাবা, বল পেলি রে?’ তা বাবা, ও এক-আধ ঝিনুকে বল পাবে না! খুব খাও, রাত্রি দিন খাও, ডুবে যাও বাবা- তাহলেই তো কালোঠাকুরটি তোমাকে বুকে করে রাখবে!

-ক্ষেপার ঝুলি

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!