ত্রিতাপ জ্বালা সাধু সাধক রহস্যবাদ

অতীন্দ্রিয় রহস্যবাদ

-বার্ট্রান্ড রাসেল 

বিজ্ঞান ও ধর্মতত্ত্বের মধ্যে সংঘর্ষ একটা অদ্ভুত ধরনের। সব সময়ে এবং সর্বত্র, আঠারো শতকের শেষপাদের ফ্রান্স এবং রাশিয়া ছাড়া, অধিকাংশ বিজ্ঞানবিদ তাঁদের যুগের ধর্মীয় গোঁড়ামিকে সমর্থন করেছেন। কতিপয় সুবিখ্যাত বিজ্ঞানবিদগণ তো এ-সমর্থনের ব্যাপারে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন।

নিউটন, যদিও একজন আরীয়[১] অন্যান্য সমুদয় ক্ষেত্রে একজন খ্রিষ্ট বিশ্বাসের সমর্থক ছিলেন। ক্যুভিয়ার[২] তো ছিলেন ক্যাথলিক শুদ্ধতার একজন আদর্শ মানুষ। ফ্যারাডে ছিলেন একজন স্যানডিম্যানিয়ান[৩] (Sandymanian)। কিন্তু এই ধর্মীয় উপগোষ্ঠীর ভুলগুলোও, তাঁর কাছে, বৈজ্ঞানিক যুক্তির নিরিখে প্রমাণযোগ্য ছিল না।

বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে সম্পর্কটাও তাঁর ধারণায় এমনই ছিল, যেমনটা প্রতিটি গির্জাগামী মানুষ সমর্থন করতে পারে। সংঘর্ষটা ছিল বিজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মতত্ত্বের, বিজ্ঞানীদের সঙ্গে ধর্মতত্ত্বের নয়। এমনকি যখন বিজ্ঞানবিদের পোষিত ধারণা নিন্দিত হতো, তখনও তাঁরা বিরোধ এড়াতে আপ্রাণ চেষ্টা করতেন।

কোপার্নিকাস, যেমনটা আমরা দেখলাম, তার বই পোপকে উৎসর্গ করলেন; গ্যালিলিও গুটিয়ে নিলেন নিজেকে, দেকৰ্ত, যদিও হল্যান্ডে বাস করাই বিজ্ঞোচিত বিবেচনা করলেন, তিনিও গির্জার পুরোহিতদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে প্রয়াসী হলেন এবং পূর্বানুমিত নীরবতা বজায় রেখে গ্যালিলিওর মতবাদের অংশীদারিত্বের জন্য ভর্ৎসনা এড়িয়ে গেলেন।

উনিশ শতকে বেশির ভাগ ব্রিটিশ বিজ্ঞানবিদ ভাবতেন যে, তাঁদের বিজ্ঞান এবং খ্রিস্টধর্মের বিশ্বাসের সেই অংশ যেটা উদার খ্রিস্টানরা এখনও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, এই দুইয়ের মধ্যে কোনো আবশ্যিক সংঘাত নেই। উদার খ্রিস্টানদের পক্ষে মহাপ্লাবন আক্ষরিক অর্থে এবং এমনকি আদম ও ইভকে ত্যাগ করা সম্ভব হয়েছে।

ও’ হারারের মতে, যেখানে সংঘর্ষ হবে সেখানে উদ্ঘাটনই জয়ী হবে। বিশদ বর্ণনায় ভিন্নতা ছিল ঠিকই, কিন্তু সাধারণ ধারণাটা এভাবেই দেওয়া হয়েছে যে, ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে সংঘাতের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। যা কিছু প্রত্যাশিত, ফলাফলটা তাই হয়েছিল। বক্তা ক্যানন স্ট্রিটার শেষের দিকে বক্তব্য রেখেছেন।

কোপার্নিকাসের বিজয়ের সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত গোটা সময়টা ধরে অবস্থার খুব একটা পার্থক্য ঘটেনি। উপর্যুপরি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে খ্রিস্টান ধর্মীয় মানুষ একটার পর একটা বিশ্বাস পরিত্যাগে বাধ্য হয়েছে যে-বিশ্বাসগুলো মধ্যযুগেও অপরিহার্য বলে বিবেচিত হত।

এবং এই উপযুপরি পশ্চাদপসারণ বিজ্ঞানবিদদের খ্রিস্টান থাকতেই সাহায্য করেছে, যদি না বিতর্কিত সীমান্তে তাঁদের কাজ আমাদের সময়ের সংঘর্ষের পর্যায় উন্নীত করেছে। গত তিন শতকের বেশিরভাগ সময়ে এটা দাবি করা হচ্ছিল যে, বিজ্ঞান ও ধর্মের বিরোধ মিটমাট হয়ে গেছে; বিজ্ঞানীরা সবিনয়ে স্বীকার করেন যে, এমন ক্ষেত্র রয়েছে যা বিজ্ঞানের পরিসরের বাইরে।

এবং উদার ধর্মতত্ত্ববিদরা মেনে নেন যে, বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করা সম্ভব এমন কোনো কিছু তারা অস্বীকারের চেষ্টা করবেন না। এটা সত্য যে, এখনও কিছু শান্তি বিঘ্নকারী রয়েছেন, একাধারে মৌলবাদীরা এবং একগুঁয়ে ক্যাথলিক ধর্মতত্ত্ববিদরা; অন্যপক্ষে জীবরসায়ন এবং প্রাণী মনোবিদ্যার মতো বিষয়গুলোর এমন অধিকতর প্রগতিশীল শিক্ষার্থী রয়েছে যারা অধিকতর আলোকপ্রাপ্ত গির্জাপন্থীদের তুলনামূলকভাবে পরিমিত, বিনয়ী দাবিও মঞ্জুর করতে অস্বীকার করে।

কিন্তু মোটের ওপর লড়াইটা আগের তুলনায় ম্লান। ক্যুনিজম এবং ফ্যাসিজমের নতুনতর মতবাদ ধর্মতাত্ত্বিক সংকীর্ণতার উত্তরাধিকার। এবং সম্ভবত, অচেতনার কোনো গভীর প্রদেশে বিশপ এবং প্রফেসরগণ নিজেদেরকে যুক্তভাবে আগ্রহী মনে করেন পূর্বাবস্থা বজায় রাখার লক্ষ্যে।

বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে বর্তমান সম্পর্ক, যেমনটা রাষ্ট্র বজায় রাখতে চায়, সেটা একখানা শিক্ষণীয় বই থেকে বুঝে নেওয়া যায়। বইখানা হলো, Science and Religion, a Symposium। ১৯৩০ সালে বিবিসি কর্তৃক প্রচারিত বারোটি আলোচনার সংকলন-গ্রন্থ এটি। ধর্মের বিরুদ্ধে স্পষ্টভাষীদের অবশ্য এই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

এর কারণ (অন্য কোনো যুক্তির কথা বলছি না), এঁরা শ্রোতৃমণ্ডলীর মধ্যে অধিকতর ধর্মগোড়াদের আঘাত দিতে পারতেন। এটা সত্য যে, অধ্যাপক জুলিয়ান হাক্সলের একটি অসাধারণ প্রারম্ভিক আলোচনার কথা বলা যায় যে-আলোচনায় এমনকি অস্পষ্ট ধর্মগোঁড়ামির প্রতিও বিন্দুমাত্র সমর্থন ছিল না। কিন্তু এই আলোচনায় এমন কিছু ছিল না যা এখন উদার ধর্মযাজকরা আপত্তিজনক মনে করতে পারেন।

বক্তাগণ নির্দিষ্ট মতবাদ ব্যক্ত করেছেন। নিজেদের অনুকূলে যুক্তিধারা বিন্যস্ত করেছেন। এবং তারা নানাবিধ অবস্থান গ্রহণ করেছেন। অবস্থানসমূহ এমন, অধ্যাপক ম্যালিনস্কির ঈশ্বরে ও অমরত্বে বিশ্বাস এড়িয়ে-যাওয়া অভিলাষের মর্মস্পর্শী ঘোষণা থেকে ও’ হারার বলিষ্ঠ ঘোষণা এটাই যে, উদ্ঘাটনের সত্য বিজ্ঞানের সত্য থেকে অধিকতর নিশ্চিত।

ও’ হারারের মতে, যেখানে সংঘর্ষ হবে সেখানে উদ্ঘাটনই জয়ী হবে। বিশদ বর্ণনায় ভিন্নতা ছিল ঠিকই, কিন্তু সাধারণ ধারণাটা এভাবেই দেওয়া হয়েছে যে, ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে সংঘাতের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। যা কিছু প্রত্যাশিত, ফলাফলটা তাই হয়েছিল। বক্তা ক্যানন স্ট্রিটার শেষের দিকে বক্তব্য রেখেছেন।

তিনি বলেছেন যে, ‘আগের বক্তৃতাগুলোর একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সব ভাষণগুলোই ঘুরে ফিরে একই গতিপথে এগিয়েছে। …একটা ধারণা আলোচনায় বার বার ঘুরে-ফিরে এসেছে যে, বিজ্ঞান নিজে যথেষ্ট নয়।

এটা ঈশ্বরের তিনটি গুণের অধীন একটা ক্রমবর্ধমান জ্ঞান, যার সাহায্যে তিনি মানবজাতির কাছে নিজেকে উদ্ঘাটিত করেছেন–যেগুলোকে কখনও কখনও চরম অথবা চিরন্তন মূল্যবোধ বলা হয় মহত্ত্ব অথবা ভালোবাসা, সত্য এবং সুন্দর।

বিজ্ঞান ও ধর্ম সম্পর্কে এই মতৈক্য ঘটনা কি না অথবা যে-কর্তৃপক্ষ বিবিসি নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁরাও এটাকে ঘটনা মনে করেন কিনা, সে প্রশ্ন তো করা যেতেই পারে। কিন্তু এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, নানাবিধ পার্থক্য সত্ত্বেও সিম্পোসিয়ামের বক্তাগণ ক্যানন স্ট্রিটারের মতবাদের ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন।

স্যার জে আর্থার টমসন্ বলেন, ‘বিজ্ঞান, হিসাবে কখনও “কেন” এই প্রশ্নটা করে না। এটা বলার যে, বিজ্ঞান কখনও এই বহুমুখী ‘বিয়িং, বিকামিং এবং হ্যাভিং বিন’-এর অর্থ অথবা তাৎপর্য কিংবা উদ্দেশ্য নিয়ে অনুসন্ধান করে না। তিনি আরও বলেন, এভাবে বিজ্ঞান সত্যের ভিত্তিভূমি হবার অসঙ্গত দাবি করে না।’

তিনি পুনরায় বলেন, বিজ্ঞান তার পদ্ধতি অতীন্দ্রিয় এবং আধ্যাত্মিকের ব্যাপারে ব্যবহার করতে পারে না। অধ্যাপক জে এস হলডেন মনে করেন, এটা কেবলমাত্র আমাদের ভেতরে, আমাদের সক্রিয় সত্যের আদর্শে, সঠিকতায়, সহৃদয়তায়, সৌন্দর্যে এবং এসবের ফলস্বরূপ অন্যের সঙ্গে সৌহার্দে–এসবের মধ্যেই আমরা ঈশ্বরের উদ্ঘাটন প্রত্যক্ষ করি।’

ড. ম্যালিনস্কি বলেন যে, ধর্মীয় উদঘাটন একটা অভিজ্ঞতা যেটা নীতিগত বিষয় হিসাবে বিজ্ঞানের গণ্ডির বাইরে অবস্থান করে। আমি এই মুহূর্তে ধর্মতাত্ত্বিকদের কথার উল্লেখ করছি না, কারণ এই ধরনের মতের সঙ্গে তাদের ঐকমত্য প্রত্যাশিত।

বেশিদূর যাবার আগে, আমাদের স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে, এসব বক্তব্যে কী বলা হয়েছে, বুঝতে হবে বক্তব্যের সত্যতা এবং অসত্যতা। ক্যানন স্ট্রিটার যখন। বলেন যে, বিজ্ঞান যথেষ্ট নয়’–একথা বলায় তিনি এক অর্থে স্বতঃসিদ্ধতার উচ্চারণ করেন।

বিজ্ঞান শিল্প অথবা বন্ধুত্ব কিংবা জীবনের অন্যান্য মূল্যবান উপাদানসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করে না। কিন্তু অবশ্যই এসবের থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলে। আর একটি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ধারণায় বিজ্ঞান যথেষ্ট নয়’–এটিও আমার কাছে সত্য বলে মনে হয়। মূল্যবোধ সম্পর্কে বিজ্ঞানের কিছু করার নেই।

বিজ্ঞান এমন বক্তব্যও প্রমাণ করতে পারে না যে, ঘৃণা করার চেয়ে ভালোবাসা ভালো অথবা নিষ্ঠুরতার চেয়ে দয়া বেশি বাঞ্ছিত।’ বিজ্ঞান আমাদের ইচ্ছাপূরণের উপায়ের কথা বলতে পারে, কিন্তু একটা ইচ্ছা অন্যটার চেয়ে বেশি কাক্ষিত, এটা বলতে পারে না। এটা একটা বিশাল বিষয়। এটা সম্পর্কে আমি আরও বিশদে বলব পরের কোনো এক অধ্যায়ে।

কিন্তু যে-সব বক্তাদের কথা আমি উল্লেখ করেছি, এঁরা আরও বেশি কিছু বলতে চান, যা আমি মিথ্যা বলে বিশ্বাস করি। ‘বিজ্ঞান সত্যের ভিত্তিভূমি হবার অসঙ্গত দাবি করে না’ বলতে বোঝায়, অন্য একটি অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি রয়েছে সত্যে পৌঁছানোর।’

ধর্মীয় উদ্ঘাটন…বিজ্ঞানের গণ্ডির বাইরে অবস্থান করে’ কথাটা, এই অবৈজ্ঞানিক পন্থাটা কী সে-সম্পর্কে আমাদের কিছু বলছে। ডিন ইনগে আরও সুনির্দিষ্ট, ধর্মের প্রমাণ পরীক্ষামূলক।’ (তিনি অতীন্দ্রিয়তার প্রমাণের কথা বলছেন।

এটা ঈশ্বরের তিনটি গুণের অধীন একটা ক্রমবর্ধমান জ্ঞান, যার সাহায্যে তিনি মানবজাতির কাছে নিজেকে উদ্ঘাটিত করেছেন–যেগুলোকে কখনও কখনও চরম অথবা চিরন্তন মূল্যবোধ বলা হয় মহত্ত্ব অথবা ভালোবাসা, সত্য এবং সুন্দর।

অতীন্দ্রিয় প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতার যুক্তি প্রায় অনির্দিষ্টভাবে প্রসারিত করা যায়। বিজ্ঞানকে অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে, কারণ যুক্তিটা হলো একটি বৈজ্ঞানিক যুক্তি। যুক্তিটা এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে ঠিক যেভাবে একটা অনিশ্চিত পরীক্ষণের যুক্তি পরিচালিত হয়।

এই গুণগুলিই যদি সব হয়, আপনি বলবেন, তাহলে ধর্মকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সংঘাতে আসার আদৌ কোনো কারণ নেই। বিজ্ঞান ঘটনা নিয়ে কাজ করে, ধর্ম মূল্যবোধ নিয়ে। ধরা গেল, দুটোই বাস্তব, এরা ভিন্নতর স্তরের। এটাও কিন্তু পুরোপুরি সত্য নয়।

আমরা দেখেছি বিজ্ঞান নৈতিকতা, কবিতা এবং কি নয়– সবকিছুর উপর অনধিকার প্রবেশ করছে। ধর্মও এসব ক্ষেত্রে অনধিকারে প্রবেশ না করে পারছে না। তাহলে বলতে হয়, ধর্মকে স্পষ্টভাবে বলতেও হবে কী হচ্ছে, কী হওয়া উচিত এটা তার একমাত্র বলার কথা নয়। ডিন ইনগে কর্তৃক মুক্ত কণ্ঠে ঘোষিত এই মতামতটাই নিহিত রয়েছে স্যার জে আর্থার টমসন এবং ড. ম্যালিনস্কির বক্তব্যে।

আমাদের কি স্বীকার করতেই হবে যে, ধর্মের সমর্থনে জ্ঞানের একটা উৎস পাওয়া সম্ভব যেটা বিজ্ঞানের বাইরে এবং সেটাকে যথাযথভাবে ‘উদ্ঘাটন’ বলে ব্যাখ্যা করা যায়? যুক্তিতর্ক দিয়ে বিচারের ক্ষেত্রে এটা একটা কঠিন প্রশ্ন, কারণ যারা বিশ্বাস করেন যে, সত্য তাঁদের কাছেই উদঘাটিত হয়েছে, তারা নিজেদের সম্পর্কে একই পরিমাণ নিশ্চয়তা ব্যক্ত করেন যেটা ধারণার বস্তু হিসাবে আমাদেরও রয়েছে।

যে-ব্যক্তি দূরবিনের সাহায্যে বস্তুনিচয় দেখছেন যা আমরা কখনও দেখিনি তাকে আমরা বিশ্বাস করি। তাহলে কেন তারা এমন প্রশ্ন করবেন, আমাদের কি উচিত নয় তাদের বিশ্বাস করা যখন তাঁরা বলছেন যে তাঁদের দেখা বস্তুনিচয় নিয়ে তারা সমানভাবে প্রশ্নহীন?

যিনি নিজে অতীন্দ্রিয় উদ্ভাসন উপভোগ করছেন তাঁর কাছে এটা নিয়ে যুক্তি উত্থাপন করা মনে হয় অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু আমরা অন্যেরা কেন এই প্রমাণ গ্রহণ করব তা নিয়ে কিছু তো বলাই যায়। প্রথমত, এই প্রমাণ সাধারণ পরীক্ষার অন্তর্গত হয়। কেন?

যখন একজন বিজ্ঞানবিদ একটা পরীক্ষণের ফলাফল আমাদের জানান, তিনি এটাও বলেন যে, কীভাবে এই পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। অন্যেরা এটা পুনরায় করে দেখতে পারেন এবং ফলাফল যদি নিশ্চিতরূপে প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে এটাকে সত্য বলে গ্রহণ করা হয় না।

কিন্তু অনেক মানুষ নিজেদেরকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারেন যেখানে অতীন্দ্রিয় দিব্যদৃষ্টি সংঘটিত হয়েছে একই ধরনের উদ্ঘাটন ছাড়াই। এসব কথায় এটা বলা যায় যে, একজন ব্যক্তির যথোপযুক্ত ধারণা ব্যবহার করা উচিত। যে-ব্যক্তি চোখ বুজে থাকে তার কাছে দূরবিনের কোনো উপযোগিতা নেই।

অতীন্দ্রিয় প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতার যুক্তি প্রায় অনির্দিষ্টভাবে প্রসারিত করা যায়। বিজ্ঞানকে অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে, কারণ যুক্তিটা হলো একটি বৈজ্ঞানিক যুক্তি। যুক্তিটা এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে ঠিক যেভাবে একটা অনিশ্চিত পরীক্ষণের যুক্তি পরিচালিত হয়।

বিজ্ঞান প্রত্যক্ষকরণ এবং সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে। এটার বিশ্বাসযোগ্যতা এই ঘটনার কারণে যে, প্রত্যক্ষকরণটা এমনই যেটা যে-কোনো পর্যবেক্ষক পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। অতীন্দ্রিয়বাদী নিজেই হয়তো নিশ্চিত হতে পারেন যে, তিনি জানেন এবং এইজন্যে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার প্রয়োজন নেই।

আমরা যদি আদালতি (forensic) বিজয় নিয়ে সন্তুষ্ট থাকি, তাহলে আমাদের বলতে হবে যে, বেশিরভাগ অতীন্দ্রিয়বাদী ভাবেন, অন্যান্য বেশিরভাগ অতীন্দ্রিয়বাদীরা বেশিরভাগ পয়েন্টে ভ্রান্ত। যাই হোক, তারা এটাকে একটা অর্ধ-বিজয় হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন যদি তারা মতানৈক্যের বিষয়ের তুলনায় পদার্থের ব্যাপারে ঐকমত্যের গুরুত্ব স্বীকার করেন।

কিন্তু যাদের তিনি এই প্রমাণ গ্রহণ করতে বলেন, তাঁরা তো এটাকে বিজ্ঞানের মতো একই ধরনের পরীক্ষণের অধীনে আনতে চাইবেন, যেমনটা আনা হয় সেইমতো ব্যক্তির ক্ষেত্রে যারা বলেন যে, তারা উত্তরমেরুতে গিয়েছিলেন। সদর্থক কিংবা নঞর্থক, বিজ্ঞানের এমনতর কোনো ফলাফলের ব্যাপারে প্রত্যাশা থাকা ঠিক নয়।

অতীন্দ্রিয়বাদীদের সপক্ষে প্রধান যুক্তি হলো এদের একের সঙ্গে অন্যের বোঝাঁপরা। ডিন ইনগে বলেন, প্রাচীন, মধ্যযুগীয় এবং আধুনিক, প্রোটেস্টান্ট, ক্যাথলিক এবং এমনকি বৌদ্ধ অথবা মোহাম্মদীয়, অতীন্দ্রিবাদীদের ঐকমত্যের চেয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো কিছুই আর জানা নেই, যদিও খ্রিস্টীয় অতীন্দ্রিয়বাদীরা সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য।

আমি এই যুক্তির শক্তিকে খাটো করতে চাইছি না যেটা আমি অনেক আগেই আমার Mysticism and Logic বইতে স্বীকার করেছি। অতীন্দ্রিয়বাদীরা তাদের অভিজ্ঞতার মৌখিক প্রকাশ ঘটাতে অনেকখানি ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু আমি মনে করি যারা সর্বাপেক্ষা সফল হয়েছেন, তাঁরা সবাই মনে করেন যে- (১) সব ধরনের বিভাজন এবং ভিন্নতা অবাস্তব এবং ব্রহ্মাণ্ডটা হচ্ছে। একটি অবিভাজ্য সত্ত্বা (২) অসৎ হচ্ছে অলীক এবং এই অলীকতা সৃষ্টি হয় একটা অংশকে অসারভাবে আত্ম-স্থায়ী অস্তিত্বসম্পন্ন ভাবার ফলে (৩) সময় হচ্ছে অবাস্তব এবং বাস্তবতা হচ্ছে চিরন্তন, চিরকালীন অর্থে নয়, কিন্তু পুরোপুরি সময় বহির্ভূত অর্থে।

আমি এটা বলছি না যে, এটা হলো বিষয়সমূহের একটা পূর্ণ হিসাব যার উপর সমস্ত অতীন্দ্রিয়বাদী সহমত পোষণ করেন। কিন্তু এই তিনটে বিবৃতিতে আমি যেগুলোর উল্লেখ করলাম সেগুলো সামগ্রিকতার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। এবার আমরা আমাদেরকে আদালতের জুরি হিসাবে ভাবতে পারি। জুরিদের কাজ হলো সাক্ষীদের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করে দেখা। এখানে এই আপাত বিস্ময়কর ঘোষণা তিনটে আমরা যাচাই করে দেখব।

প্রথমত আমরা দেখব যে, সাক্ষীগণ একটা নির্দিষ্ট পয়েন্ট পর্যন্ত একমত, ওই পয়েন্টটা ছাড়িয়ে গেলেই তারা ভিন্নমত পোষণ করেন। এরা সবাই একমত এবং ভিন্নমতের সময় একইরকম যে-যার যুক্তিতে সুনিশ্চিত। প্রোটেস্টান্ট নয়, কিন্তু ক্যাথলিকদের দিব্যদৃষ্টিতে Virgin-এর আগমন ঘটতে পারে।

বৌদ্ধদের নয়, কিন্তু খ্রিস্টান এবং মুসলমানদের কাছে সর্বোচ্চ মার্গের দেবদূত গ্যাব্রিয়েল কর্তৃক উদ্ঘাটিত মহান সত্য বিশ্বাসযোগ্য। তাও (Tao) ধর্মের চৈনিক অতীন্দ্রিয়বাদীরা আমাদের জানান যে, তাঁদের কেন্দ্রীয় মতাদর্শের প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ, সব সরকারই খারাপ।

অথচ বেশিরভাগ ইউরোপিয় এবং মুসলিম অতীন্দ্রিয়বাদীরা, সমান বিশ্বাসে, সংগঠিত কর্তৃত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু যে-পয়েন্টগুলোতে তারা ভিন্নমত পোষণ করেন তা হলো, প্রতিটি দল বলবে অন্য দলগুলো বিশ্বাসযোগ্য নয়।

আমরা যদি আদালতি (forensic) বিজয় নিয়ে সন্তুষ্ট থাকি, তাহলে আমাদের বলতে হবে যে, বেশিরভাগ অতীন্দ্রিয়বাদী ভাবেন, অন্যান্য বেশিরভাগ অতীন্দ্রিয়বাদীরা বেশিরভাগ পয়েন্টে ভ্রান্ত। যাই হোক, তারা এটাকে একটা অর্ধ-বিজয় হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন যদি তারা মতানৈক্যের বিষয়ের তুলনায় পদার্থের ব্যাপারে ঐকমত্যের গুরুত্ব স্বীকার করেন।

আমাদের অনুমান করতে হবে যে, ঘটনা বলে কোনো কিছু নেই; ব্রহ্মাণ্ডে কেবল একটাই বিশাল সমগ্রতা রয়েছে। এই সমগ্রতা পার্থিব মিছিলের বিভ্রান্তকর চেহারায় যা কিছু বাস্তব সব কিছুতে ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে। আগের এবং পরের ঘটনার মধ্যে আপাত পার্থক্যের মতো বাস্তবে কিছুই থাকা উচিত নয়। আমরা জন্মাই, তারপর বড়ো হই; এবং তারপর মারা যাই, এটা বলা অবশ্যই আর একটি মিথ্যা বলার মতো।

আমরা ধরে নেব যে, তারা তাদের মতানৈক্যের নিষ্পত্তি করেছেন এবং এই তিনটে পয়েন্টকে সুরক্ষা হিসাবে সংহত করেছেন। এগুলো বিশ্বের সংহতি, অসতের অলীক প্রকৃতি এবং সময়ের অবাস্তবতা। নিরপেক্ষ বহিরাগত হিসাবে আমরা তাদের সর্বসম্মত সাক্ষ্যের ব্যাপারে কোনো পরীক্ষা প্রয়োগ করতে পারি কী?

বৈজ্ঞানিক মেজাজের মানুষ হিসাবে আমরা স্বভাবতই প্রথমে প্রশ্ন করতে পারি যে, এমন কোনো পদ্ধতি আছে কিনা যার সাহায্যে আমরা নিজেরাই প্রথমে একই সাক্ষ্য পেতে পারি? এ-প্রশ্নের উত্তরে আমরা নানাবিধ উত্তর পাবো। আমাদের বলা হতে পারে যে, স্পষ্টতই আমাদের মনের সুগ্রাহী কাঠামো নেই।

আমাদের অত্যাবশ্যক দীনতা নেই অথবা উপবাস এবং ধর্মীয় ধ্যান আমাদের থাকা প্রয়োজন কিংবা (যদি আমাদের সাক্ষী ভারতীয় বা চৈনিক হয়) তাহলে আবশ্যকীয় পূর্বশর্ত হবে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামের একটা কোর্স। আমার মনে হয় আমরা বুঝতে পারব যে, পরীক্ষণজাত সাম্যের ওজনটা শেষ ধারণার অনুকূলে, যদিও উপবাসও প্রায়শ ফলপ্রসূ হতে দেখা গেছে।

বস্তুত, যোগ নামে নির্দিষ্ট দৈহিক শৃঙ্খলা রয়েছে যেটা অভ্যাস করা হয় অতীন্দ্রিয়বাদীর নিশ্চয়তা তৈরি করার জন্য। যারা এটা চেষ্টা করে[৪] দেখেছেন তারা বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেই এটা করে দেখতে বলেন। এর সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম। আমাদের উদ্দেশ্যগুলোর জন্য আমরা বাকি সব বাদ দিতে পারি।

যোগ অন্তদৃষ্টি প্রদান করে, এই বিবৃতিটা কীভাবে আমরা পরীক্ষা করব সেটা বুঝতে আমরা কৃত্রিমভাবে এই বিবৃতিটা সরল করে নেবো। আমরা ধরে নিলাম যে, কতিপয় মানুষ আশ্বস্ত করেছেন যে, কিছু সময়ের জন্য আমরা নির্দিষ্টভাবে নিঃশ্বাস নেব, এতে আমরা নিশ্চিত প্রত্যয়ী হবো যে, সময় হলো অবাস্তব।

আমাদের আর একটু এগোতে হবে। এবার আমরা ধরে নেব যে, ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী চেষ্টা করার পর, আমরা নিজেরা তাদের বর্ণনা মতো একটা মানসিক অবস্থার অভিজ্ঞতা পেলাম। এখন আমরা আমাদের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসে ফিরে আমরা সুনিশ্চিত নই যে, ওই দিব্যদৃষ্টিটা বিশ্বাস করতে হবে। আমরা কীভাবে এই প্রশ্নটা তদন্ত করে দেখব?

প্রথমত, সময় অবাস্তব, এটা বলতে কী বোঝানো যায়? আমরা যা বলছি তা যদি বোঝাতে যাই, তাহলে আমাদের অবশ্যই বোঝাতে হবে যে, ‘এটা ওটার পূর্বে’ এ-ধরনের বিবৃতি কেবল অর্থহীন বাগাড়ম্বর। আমরা যদি এর চেয়ে কম কিছু ধরে নেই উদাহরণ স্বরূপ, ঘটনাগুলোর মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে যা এগুলোকে একই ক্রমে সাজায়, আগের এবং পরের সম্পর্ক হিসাবে, কিন্তু এটা একটা ভিন্ন সম্পর্ক।

এতে আমরা কোনো ঘোষণা বিবৃত করিনি যেটা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো সঠিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এটা কেবলমাত্র এমন একটা অনুমানের মতো হবে যে, ইলিয়ড হোমারের রচিত নয়, একই নামের অন্য কোনো ব্যক্তির রচনা এটি।

আমাদের অনুমান করতে হবে যে, ঘটনা বলে কোনো কিছু নেই; ব্রহ্মাণ্ডে কেবল একটাই বিশাল সমগ্রতা রয়েছে। এই সমগ্রতা পার্থিব মিছিলের বিভ্রান্তকর চেহারায় যা কিছু বাস্তব সব কিছুতে ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে। আগের এবং পরের ঘটনার মধ্যে আপাত পার্থক্যের মতো বাস্তবে কিছুই থাকা উচিত নয়। আমরা জন্মাই, তারপর বড়ো হই; এবং তারপর মারা যাই, এটা বলা অবশ্যই আর একটি মিথ্যা বলার মতো।

সেটি হলো আমরা মারা যাই, তারপর ছোট হই এবং শেষ পর্যন্ত জন্মাই। সত্যটা এই, একটা ব্যক্তিজীবন হলো ব্রহ্মাণ্ডে সময়হীন এবং অবিভাজ্য সত্ত্বার কেবলমাত্র একটা উপাদানের অলীক স্বতন্ত্রীকরণ। উন্নয়ন এবং অবনমনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

এটাও স্পষ্ট যে, যদি নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি অলীক না হয়, তাহলে দৃষ্টিগোচরতা এবং এর পিছনের বাস্তবতার মধ্যে সম্পর্ক থাকতে হবে। যাই হোক, এই পর্যায়ে এসে সবচেয়ে কঠিন অসুবিধা দেখা দেয়। যদি দৃষ্টিগোচরতা এবং বাস্তবতার মধ্যে সম্পর্ককে খুবই ঘনিষ্ঠ করে তোলা হয়, তাহলে দৃষ্টিগোচরতার সমস্ত অপ্রীতিকর বৈশিষ্ট্য বাস্তবতার মধ্যে প্রতিফলিত হবে।

কোনো তফাৎ নেই এমন দুঃখে যা সুখে সমাপ্ত হয় এবং এমন সুখে যা দুঃখে শেষ হয়। আপনি যদি ছোরাবিদ্ধ একটা মৃতদেহ দেখতে পান, তাহলেও মানুষটি ছোরার আঘাতে মৃত, না মৃত্যুর পরে ছোরাটা মৃতদেহে বিধিয়ে দেওয়া হয়েছে এই দুয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই এমনটা বুঝতে হবে।

এ-ধরনের ঘটনা, যদি সত্য হয়, তাহলে সেটা কেবল বিজ্ঞানের সমাপ্তি ঘটায় না, বিচক্ষণতা, আশা এবং চেষ্টারও ইতি ঘটায়। এটা পার্থিব জ্ঞানের সঙ্গে এবং ধর্মে যেটা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ, সেই নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন।

বেশিরভাগ অতীন্দ্রিয়বাদীরা সামগ্রিকভাবে এই সিদ্ধান্ত অবশ্যই মেনে নেন না। কিন্তু যে-মতবাদ থেকে এই সিদ্ধান্তসমূহ অপরিহার্যভাবে অনুসৃত হয়, তাকে প্রণোদিত করেন। এভাবে ইন্‌গে সেই ধরনের ধর্ম বাতিল করেন, যে-ধর্ম বিবর্তনের কাছে আবেদন জানায়। কারণ এটা পার্থিব প্রক্রিয়ার উপর অনেক বেশি গুরুত্ব আরোপ করে।

তিনি বলেন, প্রগতির কোনো নিয়ম নেই, এবং চিরন্তন প্রগতি বলে কিছু নেই। তিনি পুনরায় বলেন, স্বয়ংক্রিয় এবং চিরন্তন প্রগতির মতবাদ সেটা বহু ভিটোরিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম, সেটা চেষ্টা চালায় কেবলমাত্র একটি দার্শনিক তত্ত্বের অসুবিধা অর্জনে যেটা নিশ্চিতভাবেই অপ্রমাণ করা যায়।

এই বিষয়ে যেটা আমি পরে আলোচনা করব, সেটা হলো আমি ডিনের সঙ্গে সহমত পোষণ করি। অনেক বিষয়ে এই ডিনের প্রতি আমার খুবই গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। কিন্তু তিনি স্বাভাবিকভাবে হেতুবাক্য থেকে তার সমস্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছন না, যেটা আমার কাছে অসমর্থনীয় মনে হয়।

এটা গুরুত্বপূর্ণ যে, অতীন্দ্রিয় রহস্যবাদের ক্যারিক্যাচার করা ঠিক নয়। এই মতবাদে, আমি মনে করি, জ্ঞানের মর্মবস্তু রয়েছে। আমাদের দেখতে হবে কীভাবে এটা চরম ফলাফলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায় যেটা সময়ের অস্বীকৃতি থেকে অনুসৃত হয়।

পারমেনিডেস থেকে হেগেল, অতীন্দ্রিয় রহস্যবাদের উপর ভিত্তি করে গড়ে-ওঠা দর্শনের একটা বিরাট ঐতিহ্য রয়েছে। পিরপেনিডেস বলেন, “যেটা বর্তমান, সেটা স্বয়ম্ভ এবং অবিনশ্বর, কারণ এটা হলো পরিপূর্ণ, নিশ্চল এবং অন্তহীন। এটা কখনও ছিল না, এটা কখনও হবে না কারণ বর্তমানে এটা আছে’ আচম্বিতে, ধারাবাহিক।(৫)

তিনি অধিবিদ্যার মধ্যে বাস্তবতা এবং দৃশ্যতার পার্থক্য অন্তর্ভুক্ত করেছেন অথবা সত্যের পথ এবং মতামতের পথের, পার্থক্য যেমনটা তিনি বলেন। এটা পরিষ্কার যে, যিনি সময়ের বাস্তবতা অস্বীকার করেন তাকে এই ধরনের কতিপয় পার্থক্যকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, কারণ স্পষ্টতই পৃথিবী সময়ের মধ্যেই দৃশ্যমান।

এটাও স্পষ্ট যে, যদি নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি অলীক না হয়, তাহলে দৃষ্টিগোচরতা এবং এর পিছনের বাস্তবতার মধ্যে সম্পর্ক থাকতে হবে। যাই হোক, এই পর্যায়ে এসে সবচেয়ে কঠিন অসুবিধা দেখা দেয়। যদি দৃষ্টিগোচরতা এবং বাস্তবতার মধ্যে সম্পর্ককে খুবই ঘনিষ্ঠ করে তোলা হয়, তাহলে দৃষ্টিগোচরতার সমস্ত অপ্রীতিকর বৈশিষ্ট্য বাস্তবতার মধ্যে প্রতিফলিত হবে।

এটা কোনো কিছু বিবৃত করে না, অতএব বিজ্ঞানের দ্বারা এটা স্বীকৃত অথবা অস্বীকৃত হয় না। অতীন্দ্রিয়বাদীরা বিবৃতি প্রদান করেন, কারণ তারা আবেগগত গুরুত্বকে বৈজ্ঞানিক বৈধতা থেকে পৃথক করতে পারেন না। এটা অবশ্যই প্রত্যাশিত নয় যে, তারা এই ধারণা গ্রহণ করবেন। যতদূর আমার মনে হয়, যখন তাদের কিছু পরিমাণ দাবি গ্রহণ করা হয়, সেটা বৈজ্ঞানিক বুদ্ধির প্রতিকূল নয়।

আবার এই দুইয়ের সম্পর্কটা যদি খুব দূরবর্তী করা হয়, তাহলে আমরা দৃষ্টিগোচরতার চরিত্র থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে অসমর্থ হবো। সেক্ষেত্রে বাস্তবতাকে হার্বার্ট স্পেনসারের অস্পষ্ট অজ্ঞের হিসাবে ত্যাগ করতে হবে। খ্রিস্টানদের পক্ষে সর্বেশ্বরবাদকে এড়িয়ে যাওয়া কষ্টসাধ্য।

যদি পৃথিবীটা কেবল আপাত হয়, ঈশ্বর কিছুই সৃষ্টি করেননি এবং পৃথিবীর অনুরূপ বাস্তবতা হল ঈশ্বরের অংশ। কিন্তু পৃথিবী যদি যে-কোনো পরিমাণে বাস্তব এবং ঈশ্বর থেকে স্পষ্ট হয়, তখন আমরা সব কিছুর সামগ্রিকতাকে পরিত্যাগ করি। এটা অতীন্দ্রিয়বাদের আবশ্যিক মতবাদ।

আমরা এটা ধরে নিতে বাধ্য যে, যতটা পর্যন্ত পৃথিবী বাস্তব, যে-ইচ্ছা এটা ধারণ করে সেটাও বাস্তব। এই ধরনের অসুবিধা অতীন্দ্রিয় রহস্যবাদকে একজন গোঁড়া খ্রিষ্টানের কাছে মুশকিলের বিষয় করে তোলে। বিরমিংহামের বিশপ বলেন, ‘সর্বেশ্বরবাদের সমুদয় আকার… আমার যেমন মনে হয়, অবশ্যই ত্যাগ করতে হবে কারণ মানুষ যদি বাস্তব ঈশ্বরের অংশ হয়, তাহলে মানুষের অসততা ঈশ্বরের মধ্যেও বর্তমান।

এত সময় ধরে আমি এটা ধরে নিয়ে চলেছি যে, আমরা সবাই জুরি, অতীন্দ্রিয় রহস্যবাদের সাক্ষ্য শুনে চলেছি এবং এটা গ্রহণ না, বর্জন করব সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার চেষ্টা করছি। যদি, যখন তারা ধারণাগত পৃথিবীর বাস্তবতা অস্বীকার করে, আমরা তখন এটা বুঝি যে, তারা ‘বাস্তবতা’ বলতে আদালতের সাধারণ ধারণার বাস্তবতার কথা বলছে। এক্ষেত্রে ওনারা যা বলেন সেটা প্রত্যাখান করতে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই।

কারণ আমাদের এটা বোঝা উচিত, এই ধারণা অন্য সমুদয় প্রমাণের বিপরীত। এমনকি তাদের একঘেয়ে মুহূর্তগুলোতে তাদেরও এমনটা মনে হবে। সুতরাং আমাদের অন্য কোনো ধারণার দিকে তাকাতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, যদি অতীন্দ্রয়বাদীরা ‘বাস্তবতাকে’ ‘দৃষ্টিগোচরতার’ সঙ্গে পৃথক করেন, তাহলে ‘বাস্তবতা’ শব্দটার যুক্তিগত নয়, কিন্তু আবেগগত তাৎপর্য রয়েছে। এর অর্থ, যা আছে, কোনো ধারণায় সেটা গুরুত্বপূর্ণ।

যখন এটা বলা হয় যে, সময় ‘অবাস্তব’, তাহলে যা অবশ্যই বলতে হবে সেটা হলো এই যে, কতিপয় ধারণায় এবং কতিপয় ঘটনায়, ব্রহ্মাণ্ডকে সামগ্রিকভাবে বুঝতে হবে। এর কারণ স্রষ্টা, যদি তিনি বর্তমান থাকেন, তিনি এটা সৃষ্টি করার চিন্তা করেছেন। যখন এমনটা চিন্তা করা হলো, সমুদয় প্রক্রিয়া একটি সমগ্রতার মধ্যে চলে এল।

অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ-একটা ধারণায় এসবই অস্তিত্বশীল। এবং বর্তমান’-এর সর্বাগ্রগণ্য বাস্তবতা নেই। এমন বাস্তবতার ধারণা রয়েছে পৃথিবীকে বোধগম্যতার পক্ষে আমাদের সাধারণ ভাবনায়। যদি এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হয় তাহলে অতীন্দ্রিয় রহস্যবাদ একটা আবেগ প্রকাশ করে, কোনো ঘটনা নয়।

এটা কোনো কিছু বিবৃত করে না, অতএব বিজ্ঞানের দ্বারা এটা স্বীকৃত অথবা অস্বীকৃত হয় না। অতীন্দ্রিয়বাদীরা বিবৃতি প্রদান করেন, কারণ তারা আবেগগত গুরুত্বকে বৈজ্ঞানিক বৈধতা থেকে পৃথক করতে পারেন না। এটা অবশ্যই প্রত্যাশিত নয় যে, তারা এই ধারণা গ্রহণ করবেন। যতদূর আমার মনে হয়, যখন তাদের কিছু পরিমাণ দাবি গ্রহণ করা হয়, সেটা বৈজ্ঞানিক বুদ্ধির প্রতিকূল নয়।

নিঃশ্বাস এবং প্রশান্তি এবং গভীরতা–এসব কিছুরই উৎস রয়েছে আবেগের মধ্যে। যার মধ্যে মুহূর্তের জন্য সমস্ত আত্মকেন্দ্রিক ইচ্ছার মৃত্যু ঘটছে, এবং মনটা ব্রহ্মাণ্ডের বিশালত্বের একটা দর্পণ হয়ে ওঠে। যাদের এই অভিজ্ঞতা হয়েছে, এবং যারা বিশ্বাস করে যে, ব্রহ্মাণ্ডের প্রকৃতির বিষয়ে বিবৃতির সঙ্গে এটা বন্ধনযুক্ত, তারা স্বভাবত এই বিবৃতিতে দৃঢ় সংলগ্ন হয়।

একটা ঘটনার প্রমাণ গ্রহণে নিশ্চয়তা এবং অতীন্দ্রিয় বাদীদের আংশিক ঐকমত্য কোনো তর্কাতীত যুক্তি নয়। বিজ্ঞানবিদ নিজে যা দেখেছেন, সেটা তিনি অন্যদের দেখাতে চাইলে, অনুবীক্ষণযন্ত্র অথবা দূরবিনের ব্যবস্থা করেন। বলতে হয়, তিনি বাহ্যিক পৃথিবীতে পরিবর্তন ঘটান, কিন্তু পর্যবেক্ষকের কাছে কেবল সাধারণ দৃষ্টিশক্তির দাবি করেন।

পক্ষান্তরে, অতীন্দ্রিয়বাদী পর্যবেক্ষকের নিজের পরিবর্তন দাবি করেন, উপবাসের মাধ্যমে, নিঃশ্বাসের ব্যায়ামের মাধ্যমে এবং বাহ্যিক পর্যবেক্ষণ থেকে সতর্ক অনুপস্থিতির মাধ্যমে। (কেউ কেউ এই শৃঙ্খলা সম্পর্কে আপত্তি করেন এবং ভাবেন যে, অতীন্দ্রিয়বাদী উদ্ভাসন কৃত্রিমভাবে পাওয়া যায় না।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটা তাদের বিষয়টাকে আরও জটিল করে তাদের বিষয়টার তুলনায়, যারা যোগের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রায় সবাই স্বীকার করেন যে, উপবাস এবং একটা তপস্বী জীবন এ ব্যাপারে সহায়ক।) আমরা সবাই জানি যে, আফিম, হাসিস এবং অ্যালকোহল পর্যবেক্ষকের উপর কিছু প্রভাব তৈরি করে।

কিন্তু আমরা এসব প্রভাবকে প্রশংসনীয় ভাবি না বলে আমরা আমাদের ব্রহ্মাণ্ডের তত্ত্বের মধ্যে এসব অন্তর্ভুক্ত করি না। এগুলো কখনও কখনও সত্যের অসম্পূর্ণ প্রকাশ ঘটাতে পারে। কিন্তু আমরা এগুলোকে সাধারণ জ্ঞানের উৎস বলে বিবেচনা করি না।

একজন মাতাল সাপ দেখার পরে এমনটা ভাবে না যে, অন্যদের কাছে লুকানো কোনো বাস্তবতার উদ্ঘাটন সে প্রত্যক্ষ করেছে। যদিও কতিপয় অন্য ধরনের বিশ্বাস অন্যকে Bacchus-এর উপাসনার দিকে নিয়ে যেতে পারে। আমাদের নিজেদের এই সময়ে, যেমনটা উইলিয়াম জেমস্ট বর্ণনা করেছেন, এমন মানুষও থাকতে পারে যারা বিবেচনা করে যে, লাফিং-গ্যাসে যে নেশার ঘোর তৈরি করে সেটা ‘সত্যকে উদ্ঘাটন করে, যে-সত্যটা স্বাভাবিক সময়ে গুপ্ত থাকে।

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে যে-মানুষটি কম খায় এবং স্বর্গ দেখতে পায়, আর যে-মানুষটি প্রচুর পান করে এবং সাপ দেখে–এই দু’জনের মধ্যে কোনো তফাৎ করতে পারি না। উভয়ই থাকে অস্বাভাবিক দৈহিক অবস্থায় এবং সেই কারণে এদের অস্বাভাবিক প্রত্যক্ষকরণ ঘটে।

স্বাভাবিক প্রত্যক্ষকরণগুলো যেহেতু জীবনের জন্য সগ্রামে প্রয়োজনীয়, এগুলোর তাই ঘটনার সঙ্গে সংযোগ থাকতেই হয়। কিন্তু অস্বাভাবিক প্রত্যক্ষকরণে এই ধরণের কোনো সংযোগের প্রত্যাশা করার কারণ নেই। এবং এসবের সপক্ষে সাক্ষ্য স্বাভাবিক প্রত্যক্ষকরণকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না।

অতীন্দ্রিয় আবেগ, যদি এটাকে অসমর্থিত বিশ্বাস থেকে মুক্ত করা যায়, এবং অতটা প্রবল নয়, একজন মানুষকে যদি পুরোপুরি জীবনের সাধারণ ব্যস্ততা থেকে সরিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে কিছুটা মহৎ মূল্য তৈরি করতে পারে। দিতে পারে একই ধরনের বস্তু, বৃহত্তর আকারে, যেটা ধ্যানের দ্বারা প্রদত্ত হয়।

নিঃশ্বাস এবং প্রশান্তি এবং গভীরতা–এসব কিছুরই উৎস রয়েছে আবেগের মধ্যে। যার মধ্যে মুহূর্তের জন্য সমস্ত আত্মকেন্দ্রিক ইচ্ছার মৃত্যু ঘটছে, এবং মনটা ব্রহ্মাণ্ডের বিশালত্বের একটা দর্পণ হয়ে ওঠে। যাদের এই অভিজ্ঞতা হয়েছে, এবং যারা বিশ্বাস করে যে, ব্রহ্মাণ্ডের প্রকৃতির বিষয়ে বিবৃতির সঙ্গে এটা বন্ধনযুক্ত, তারা স্বভাবত এই বিবৃতিতে দৃঢ় সংলগ্ন হয়।

আমি নিজেও বিশ্বাস করি যে, বিবৃতিসমূহ গুরুত্বহীন এবং এদের সত্য বলে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। বিজ্ঞানের পদ্ধতি ছাড়া সত্যে পৌঁছানোর অন্য কোনো পদ্ধতি আমি স্বীকার করতে পারি না। কিন্তু আবেগের ক্ষেত্রে আমি অভিজ্ঞতার মূল্যকে অস্বীকার করি না।

এটাই সৃষ্টি করেছে ধর্ম। মিথ্যা বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত থেকে এরা মন্দ এবং ভালো করেছে। মিথ্যা বিশ্বাসের এই সঙ্গ থেকে মুক্ত করতে পারলে, এটা আশা করা যায় যে, কেবল ভালোটাই থেকে যাবে।

……………………..
১. ইংরেজি কথাটা Arian চতুর্থ শতাব্দীর ধর্মতাত্ত্বিক Arius (আরিয়াস)–এর মতাবলম্বী সম্প্রদায়।–অনুবাদক
২. ফরাসি প্রাণীবিদ এবং রাষ্ট্রনেতা, যিনি শারীরসংস্থানবিদ্যা এবং জীবাশ্মবিদ্যার তুলনামূলক বিজ্ঞানের শাখা প্রতিষ্ঠা করেন।–অনুবাদক
৩. স্যানডিম্যানিয়ান তিনিই যিনি কঠোর নৈতিকতা এবং মদ্যপানবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত।–অনুবাদক
৪. চৈনিক যোগ সম্পর্কে জানতে পড় ন Waley–এর The Way and its Power, পৃষ্ঠা ১১১৭-১১৮
৫. Burnet রচিত Early Greek Philosophy থেকে উদ্ধৃত, পৃষ্ঠা ১৯৯
৬. এই লেখকের Varieties of Religious Experience বইটি দেখুন।

……………………..
মূল- বার্ট্রান্ড রাসেল
অনুবাদ – আতা-ই-রাব্বি

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

……………….
আরও পড়ুন-
দর্শনের ইতিহাস বিচার
আইয়োনীয় দর্শন
টোটেম বিশ্বাস
নির্ধারণবাদ
বিতণ্ডাবাদী
অতীন্দ্রিয় রহস্যবাদ
জনগণের দর্শন ও বস্তুবাদী দর্শন
লোকায়ত ও সাংখ্য
লোকায়ত, বৈষ্ণব, সহজিয়া
প্রকৃতিবাদী দার্শনিকবৃন্দ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!