ভবঘুরেকথা
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব সৃষ্টিতত্ত্ব

পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব দুই

-মূর্শেদূল মেরাজ

পঞ্চভূতের বিবর্তন –

বলা হয়, আকাশ থেকে বায়ু, বায়ু থেকে সূর্য(তেজ), সূর্য থেকে জল এবং জল থেকে পৃথিবীর উৎপত্তি হয়েছে। আবার এই পৃথিবী(মাটি) জলে বিলীন হয়, জল সূর্যে বিলীন হয়, সূর্য বায়ুতে এবং বায়ু আকাশে লীন হয়ে থাকে। পাঁচ তত্ত্ব থেকেই সকল কিছুর সৃষ্টি হয় এবং এই পঞ্চতত্ত্বেই সকল তত্ত্ব লয়প্রাপ্ত হয়।

ফকির লালন সাঁইজি বলেছেন-

জীব ম’লে যায় জীবান্তরে
জীবের গতি মুক্তি রয় ভক্তির দ্বারে,
জীবের কর্ম বন্ধন না হয় খণ্ডন
প্রতিবন্ধন কর্মের ফেরে।।

ক্ষিতি-অপ-তেজ-মরুত-ব্যোম
এরা দোষী নয় দোষী আদম,
বেহুঁশে খেয়ে গন্ধম
তাইতে এলো ভাবনগরে।।

আত্মা আর পরম-আত্মা
ত্রিসংসারে জগৎকর্তা,
ভুলে আত্মা জগৎকর্তা
লক্ষ যোনী ঘুরে মরে।।

গুরু ধরে জ্যান্তে মরে
বসাও গুরুর হৃদমাঝারে,
সিরাজ সাঁইয়ের চরণ ভুলে
লালন মিছে কেন বেড়াও ঘুরে।।

পঞ্চভূতের দোষ-গুণ-

পঞ্চভূতের প্রতিটির আবার একটি করে গুণ বিদ্যমান। এই পঞ্চগুণ হলো- শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ। যা জীবের পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় নামে পরিচিত। এই পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় প্রতিটি ভূতের এক একটি একক গুণ হিসেবে বিদ্যমান।

অন্যদিকে পঞ্চভূতের সম্মিলিত গুণ তিনটি। তা হলো- সত্ত্ব, রজ, ত্বম। সত্ত্বগুণ সুখাত্বক, স্বচ্ছ, লঘু ও প্রকাশক। রজোগুণ দুঃখাত্মক, চঞ্চল ও চালক (প্রবর্তক)। তমোগুণ মোহাত্মক, গুরু, আবরক ও নিয়ামক। আবার পঞ্চভূতের সম্মিলিত দোষও তিনটি। যথা- বাত, পীত ও কাফ।

ব্রহ্মাণ্ডের অনুরূপ জীব দেহও পঞ্চভূতের মিশ্রণে সৃষ্ট। স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণ দেহেও কোনো না কোনো ভাবে পঞ্চভূতের তত্ত্ব কাজ করে যায়। দেহের এই স্তর ভেদে পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মরূপে বিরাজ করে। পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, অহংকারের এই পঞ্চভূত ক্রিয়া করে চলে।

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছেন, “পঞ্চভূত লয়ে যে দেহ, সেইটি স্থূলদেহ। মন, বুদ্ধি, অহংকার আর চিত্ত, এই লয়ে সূক্ষ্মশরীর। যে শরীরে ভগবানের আনন্দলাভ হয়, আর সম্ভোগ হয়, সেইটি কারণ শরীর। তন্ত্রে বলে, ‘ভগবতী তনু।’ সকলের অতীত ‘মহাকারণ’ (তুরীয়) মুখে বলা যায় না।”

পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়

  • চোখ- রূপ, আকৃতি প্রভৃতি গুণ জ্ঞান করেন।
  • কান- শব্দাদি গুণ জ্ঞান করেন।
  • নাক- সুগন্ধ, দুর্গন্ধাদি গুণ জ্ঞান করেন।
  • জিহ্বা- তিক্ত, মিষ্টাদি গুণ জ্ঞান করেন।
  • ত্বক- শীত, উষ্ণাদি স্পর্শগুণ জ্ঞান করেন।

পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়

  • বাক্- কথা বলে।
  • হাত- দ্রব্যাদি ধারণ করে।
  • পা- গমনাগমন করে।
  • পায়ু- মলাদি ত্যাগ করে।
  • উপস্থ- শুক্র, মূত্রাদি ত্যাগ করে।

মন-বুদ্ধি-অহংকার

আত্মা তত্ত্ব বিশ্বাসীরা বলেন, জীব যখন প্রাণ পায় তখন সে দুটি জিনিস লাভ করে দেহ ও মন। দেহ হলো পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়ের সমন্বয়। আর এই পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়ের সমন্বয়ে যে প্রতিক্রিয়া দেয় জীব তাই মন।

আর জন্মজন্মান্তরের যে সংস্কার জীব বহন করে চলে তার ভিত্তিতে যে বিচার-বিবেচনার বোধ লাভ করে তাই বুদ্ধিরূপে প্রকাশ পায়। আর এই বুদ্ধি যদি রিপু (ষড়রিপু- কাম, ক্রোধ, লােভ, মােহ, মদ, মাৎসর্য) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় তাহলে জন্মায় অহংকার।

জীবের এই পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় ও মন-বুদ্ধি-অহংকারকে ঘিরে জীবের মাঝে পঞ্চভূতের দোষগুণ প্রত্যক্ষ হয়।

[শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ তম গুণ; হাত, পা, নাক, কান, জিহ্বা ইন্দ্রিয় রজ গুণ; মন বুদ্ধি অন্তঃকরণ হলো সত্ত্ব গুণ। দেহ তম গুণ, ইন্দ্রিয় রজ গুণ আর মন বুদ্ধি চিত্ত অহংকার সত্ত্ব গুণ]

মানবদেহে পঞ্চতত্ত্বের অবস্থান –

ব্রহ্মাণ্ডের প্রকাশ্য সকল কিছুর মতো জীবদেহও পঞ্চভূতে গঠিত। দেহে যে পঞ্চতত্ত্ব বিদ্যমান, বৃহৎ ব্রহ্মাণ্ডেও, সেই একই পঞ্চতত্ত্ব। এই পঞ্চভূত যেমন স্থূলরূপে প্রকাশিত তেমনি আছে এর সূক্ষ্মরূপ। বলা হয়- ‘যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে তাহা আছে দেহভাণ্ডে।’

দেহে পঞ্চভূতের অস্তিত্ব-

  • দেহে মাটি তত্ত্বের অস্তিত্ব- অস্থি, মাংস, নখ, ত্বক ও পশম – ক্ষিতি।
  • দেহে জল তত্ত্বের অস্তিত্ব- রক্ত, শুক্র, শোনিত, মজ্জা, মল ও মূত্র – অপ।
  • দেহে আগুন তত্ত্বের অস্তিত্ব- ক্ষুধা, তৃষ্ণা, নিদ্রা, ক্লান্তি, আলস্য ও বায়ু – তেজ।
  • দেহে বায়ু তত্ত্বের অস্তিত্ব- ধারন, চালন, ক্ষেপন, সংকোচন, প্রসারণ ও দেহের শ্বাসপ্রশ্বাস – মরুৎ।
  • দেহে আকাশ তত্ত্বের অস্তিত্ব- কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, লজ্জা ও দেহের শূন্যস্থান – ব্যোম।

মানবদেহের চক্রে পঞ্চভূত –

মানবদেহে মেরুদণ্ডের শুরুর বিন্দু থেকে মাথার ব্রহ্মতালু পর্যন্ত সাতটি চক্র নির্দিষ্ট করেছেন মুনি-ঋষিরা। এই চক্রগুলো খালি চোখে দৃশ্যমান না হলেও সাধন বলে এদের জাগ্রত করে শক্তির সঞ্চার করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করা হয়। এই সপ্তচক্রের পঞ্চচক্রে আবার পঞ্চভূতের অবস্থান নির্ণয় করা হয়। মানদেহের চক্র ও পঞ্চভূত-

মূলাধার চক্র
দেহের মূলাধার চক্রে ক্ষিতিতত্ত্বের অবস্থান। এই চক্রটি দেহের মেরুদণ্ডের নিম্নাংশের শেষ প্রান্তে অবস্থিত। এটি কুণ্ডলিনী নামেও পরিচিত। অস্থিধাতুর শক্তি উদ্দীপ্ত এই চক্রের বর্ণ লাল। কামশক্তির আধার এই চক্র চেতন থেকে অবচেতন পর্যন্ত বিস্তৃত। জন্ম, মৃত্যু, জরা, ব্যাধি- এ চারটির নিয়ামক এ চক্র।

স্বাধিষ্ঠান চক্র
দেহের স্বাধিষ্ঠান চক্রে জলতত্ত্বের অবস্থান। এই চক্র দেহের তলপেট বা অগ্নাশয় নিয়ে গঠিত। মেদ ধাতুর শক্তিতে উদ্দীপ্ত এই চক্রের বর্ণ কমলা। এটি আমাদের লোভ, কামনা, বাসনা নিয়ন্ত্রণ করে।

মণিপুর চক্র
দেহের মণিপুর চক্রে তেজস্‌তত্ত্বের অবস্থান। এই চক্র দেহের নাভির নিচের শিরাজাল নিয়ে গঠিত। মাংসধাতুর শক্তিতে উদ্দীপ্ত এই চক্রের বর্ণ হলুদ। তেজশক্তির আধার এই চক্র উচ্চ চেতনা, জীবনীশক্তি, আবেগ, বাসনা নিয়ন্ত্রণ করে।

অনাহতচক্র
দেহের অনাহত চক্রে বায়ুতত্ত্বের অবস্থান। এইচক্র বুকের মাঝখানে অবস্থিত। রক্ত ধাতুর শক্তি উদ্দীপ্ত এই চক্রের বর্ণ সবুজ। এটি আবেগ, রাগ-অনুরাগ, প্রেম, বিরহ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

বিশুদ্ধ চক্র
দেহের বিশুদ্ধ চক্রে ব্যোমতত্ত্বের অবস্থান। বিশুদ্ধ চক্র কণ্ঠে অবস্থিত। শক্তি উদ্দীপ্ত এই চক্রের বর্ণ নীল। এটি ভাবপূর্ণ মন ও বাহির মনকে নিয়ন্ত্রণ করে। স্নিগ্ধশক্তির ধারখ এ চক্র মানসিক শক্তি ও মনের সব ভাব প্রকাশ করে থাকে।

আজ্ঞা চক্র
আজ্ঞা চক্র দুই ভ্রূ’র মাঝখানে অবস্থিত। মজ্জা ধাতুর শক্তিতে উদ্দীপ্ত এই চক্রের বর্ণ আকাশি। এটি গতিময় মন, ইচ্ছা, দিব্যদৃষ্টি, মানসিক গঠন ও মনের সব চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করে।

সহস্রার চক্র
সহস্রার চক্র মাথার ঠিক ওপরে অর্থাৎ ব্রহ্মতালুতে অবস্থিত। এই চক্রের বর্ণ বেগুনী। এটি অর্ন্তদৃষ্টি, বোধিসত্ত্ব চেতনা, দিব্য চেতনা নিয়ন্ত্রণ করে।

মানবদেহের হস্তে পঞ্চভূতের স্থান-

পঞ্চভূত বা পঞ্চতত্ত্ব সূক্ষ্মরূপে কেবল দেহের চক্রে বা স্থিতিতেই নয়; থাকে তরঙ্গরূপেও। যোগ মতে, দেহের অঙ্গুল দ্বারা তরঙ্গরূপে পঞ্চভূত প্রবাহিত হয়ে বাইরে যায় ও প্রবেশ করে। আর এই তরঙ্গকে নানা ভাবে ব্যবহার করার জন্য আবিষ্কার হয়েছে অগনতি মুদ্রা।

যোগাসন বা যোগাভ্যাসে হাতের আঙ্গুলের বিভিন্ন মুদ্রা ব্যবহার করে দেহের পঞ্চভূতের সমতা আনার কাজ করে যোগীকুল। হাতের বিভিন্ন আঙ্গুলে পঞ্চভূতের তরঙ্গের অবস্থান-

  • বৃদ্ধাঙ্গুলিতে- অগ্নি তত্ত্ব।
  • সাহাদাতে- বায়ু তত্ত্ব।
  • মধ্যমাতে- আকাশ তত্ত্ব।
  • অনামিকায়- মাটি তত্ত্ব।
  • কনিষ্ঠায়- জল তত্ত্ব।

(চলবে…)

<<পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব এক ।। পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব তিন>>

………………….
কৃতজ্ঞতা স্বীকার-
পুরোহিত দর্পন।
উইকিপিডিয়া।
বাংলাপিডিয়া।
শশাঙ্ক শেখর পিস ফাউন্ডেশন।
পঞ্চভূত – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বাতাসের শেষ কোথায় : ইমরুল ইউসুফ।
ন্যায় পরিচয় -মহামহোপাধ্যায় ফনিভূষণ তর্কবাগীশ।
পঞ্চভূত স্থলম ও পঞ্চভূত লিঙ্গম- দেবাদিদেব শিবঠাকুরের খোঁজে: আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়ের।

…………………………..
আরো পড়ুন-
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব এক
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব দুই
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব তিন
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব চার
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব পাঁচ
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব ছয়
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব সাত
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব আট
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব নয়
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব দশ
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব এগারো
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব বারো
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব তেরো
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব চোদ্দ
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব পনের

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!