পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব সৃষ্টিতত্ত্ব

পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব চার

-মূর্শেদূল মেরাজ

মাটি:
পঞ্চভূতের সবচেয়ে স্থূল তত্ত্ব হলো মাটি। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘গন্ধ’। পাশাপাশি অন্য চারটি গুণ অর্থাৎ শব্দ, স্পর্শ, রূপ ও রস তো রয়েছেই। ভারতবর্ষের দর্শন মতে, কেবল মাটিই ‘মাটি তত্ত্ব’ নয়। মাটি হচ্ছে দৃশ্যমান জগতের সকল ঘন, কঠিন পদার্থ।

মাটিতে রয়েছে পঞ্চগুণ অর্থাৎ শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ। অস্থি, মাংস, নখ, রোম, চর্ম প্রভৃতি মাটি থেকেই সৃষ্টি। মাটি বা পৃথিবীর স্থিতি নাসিকায় বা নাকে, অর্থাৎ পৃথিবীর যে বিশেষ গুণ গন্ধ তা জীব নাক দ্বারা উপলব্ধি করতে পারে।

মাটির গুণ গন্ধ। আর গন্ধের দুটি ভাগ। একটি গন্ধ নেয় বা গ্রহণ করে। আর অন্যটি গন্ধ ত্যাগ। আর এই গন্ধের দুই ভাগে দুটি গুণের ভিন্ন রূপ। একটি সত্ত্বগুণ আর অপরটি রজগুণ রূপ-

  • সত্ত্বগুণ ভাগ
    • জ্ঞানেন্দ্রিয় ঘ্রাণেন্দ্রিয় নাক দ্বারা গন্ধ গ্রহণ করে।
    • এটা জ্ঞানেন্দ্রিয়ের কাজ। এটা করতে হয় না এমনিতেই হয়ে যায়। গন্ধ পেলেই নাক তা গ্রহণ করে।
  • রজগুণ ভাগ
    • কর্মেন্দ্রিয় উদ্বাহু ইন্দ্রিয় গন্ধ ত্যাগ করে।
    • ত্যাগ করতে হয়। এটা কর্ম।
      [নাক আর উদ্বাহর মাঝে মিত্রতাও আছে। একজন গ্রহণ করে আরেক জন ত্যাগ করে। ]

পঞ্চভূততত্ত্ব-

মাটিতত্ত্ব

সূক্ষ্মতার বিচারে পঞ্চভূতের সবচেয়ে স্থূল হলো মাটিতত্ত্ব। এই হিসেবে পঞ্চভূতে মাটিতত্ত্বের অবস্থান পঞ্চমে। আর স্থূলতার বিচারে প্রথম। সূক্ষ্মতার ক্রমানুসারে সর্বশেষ ভূত হওয়ায় মাটিতত্ত্বে অন্যান্য সকলভূতের ধর্মও বিরাজ করে বিভিন্ন হারে।

মাটির বিপরীত তত্ত্ব হলো আকাশ। আকাশ সবচেয়ে সূক্ষ্ম আর মাটি সবচেয়ে স্থূল। একটি দৃশ্যমান, অপরটি অদৃশ্য। মাটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অর্থাৎ ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করা যায়। অন্যদিকে আকাশ অতীন্দ্রিয় ও সর্বব্যাপী; যা ইন্দ্রিয়জ্ঞানের ঊর্দ্ধে। মাটিকে ধরা ছোঁয়া যায়, গন্ধ নেয়া যায়, আকার-আকৃতি দেয়া যায়।

অন্যদিকে আকাশকে কেবল কল্পনাই করা যায়। ধরে নেয়া যায়। তাকে না যায় দেখা। না যায় ছোঁয়া। কেবল কান পেতে যায় শোনা। আদতে আকাশতত্ত্বকে নিয়ে ভাবতে গেলে বোঝা যায় পঞ্চভূতকে বোঝা মোটেও সহজ কাজ নয়। এর যতটুকু ব্যক্ত; ততটুকুই গুপ্ত।

মাটিতত্ত্ব পঞ্চগুণ সম্পন্না। এর আকার, আকৃতি, রঙ, গন্ধ, রস, শব্দ সবই আছে। একে পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় দিয়েই অনুধাবন করা যায়। পঞ্চগুণ বিরাজ করলেও এর প্রধান গুণ হলো ‘গন্ধ’

অন্নংভট্ট তার তর্কসংগ্রহ গ্রন্থে মাটিতত্ত্ব সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন- “তত্র গন্ধবতী পৃথিবী। সা দ্বিবিধা নিত্যা অনিত্যা চ। নিত্যাপরমাণুরূপা। অনিত্যা কার্যরূপা।”

অর্থাৎ- ‘পৃথিবী বা মাটি হলো সেই দ্রব্য যা গন্ধযুক্ত। নিত্য ও অনিত্য ভেদে পৃথিবী দ্বিবিধ। পরমাণুরূপ পৃথিবী নিত্য, কার্যরূপ পৃথিবী অনিত্য।’

সবচেয়ে স্থূল হওয়ায় পঞ্চভূতের মধ্যে মাটির স্থিতিই সবচেয়ে বেশি। তুলনামূলকভাবে মাটি সবচেয়ে ভারী। তাই এটি নিচে অবস্থান করে। এর উপর অন্য সকল তত্ত্ব অবস্থান নেয়। মাটি হলো আশ্রয়। মাটি স্থিরতার প্রতীক। আবার মাটি সৃষ্টিশীলতারও প্রতীক। মাটিতেই প্রাণ পায় বেশিভাগ বৃক্ষরাজি।

যা সৃষ্টিকে আহার জোগাতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। যদিও কোনো তত্ত্বই একা সকল কাজ সম্পাদন করে না। প্রতিটা কর্মেই এক ভূতের সাথে থাকে অন্য ভূতের সম্পর্ক।

কথায় বলে, ‘মানুষ মাটির তৈরি’। এই কথার অনেক রকম ব্যাখ্যা হতে পারে। যেমন সৃষ্টির দৃশ্যমান যাবতীয় কঠিন বস্তুকেই চিহ্নিত করা হয় মাটি হিসেবে। আর মানুষের দৃশ্যমান বহিরাঙ্গ তুলমানমূলক কঠিন ও ঘন তত্ত্বে গড়া তাই এ কথা বলা চলে।

শাহ আব্দুল করিম লিখেছেন-

“মাটিরও পিঞ্জিরায় সোনার ময়নারে
তোমারে পুষিলাম কত আদরে!
তুমি আমার, আমি তোমার এই আশা করে
তোমারে পুষিলাম কত আদরে!”

হাসন রাজা লিখেছেন-

“মাটির পিঞ্জরার মাঝে বন্দি হইয়ারে
কান্দে হাসন রাজার মন মুনিয়ায়রে।।”

অন্যদিকে রাজ্জাক দেওয়ান বলেছেন-

“আমার মাটির ঘরে বসত করে
এক জংলা পাখি,
কয়না কথা ময়না তোতা
করি মাখামাখি।।”

এভাবে কাব্য-গান-শিল্প-সাহিত্যে দেহমাটির কথা বারবারই উঠে এসেছে। ধর্মগ্রন্থ ও শাস্ত্রেও একই কথার উল্লেখ পাওয়া যায়। পবিত্র কোরানের সুরা সাদ ও সুরা মুমিনুন যথাক্রমে বলা হয়েছে, “আমি মানুষ সৃষ্টি করছি কাদামাটি থেকে।” (আয়াত ৭৩) এবং “আমি তো মানুষ সৃষ্টি করেছি মাটির উপাদান (মাটি জাতীয় উপকরণ) থেকে।” (আয়াত ১২)

অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বলা হয়, মাটির মধ্যে যে সকল উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া যায়। সে সকল উপাদান মানবদেহেও পাওয়া যায়। তাই এ কথা এই প্রেক্ষিতেও খাটে। আর সহজ কথায় বলতে গেলে, সৃষ্টির যা কিছু দৃশ্যমান কঠিন পদার্থ তার সবই মাটি। তাই মানুষও মাটির তৈরি।

আবার বিস্তারিত ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়, পঞ্চভূতের অন্যান্য ভূতগুলো বহিরাবণে সে ভাবে দৃশ্যমান হয় না বলে মানবদেহকে মাটির বলেই ধরা হয়। যদিও এতে পঞ্চভূতই উপস্থিত।

মাটি যেমন তার বুকে অতি যত্নে সৃষ্টি করে চলে সবুজের সমাহার। উৎপন্নে সহায়তা করে যায় সমগ্র সৃষ্টির আহার। জোগান দেয় ছায়া। রক্ষা করে চলে জল। শীতল রাখে বাতাস। সংযত করে তেজকে।

তাই মাটির মমত্বকে তুলনা করা হয় মমতাময়ী মানুষের সাথে। বলা হয় ‘মাটির মানুষ’ বা ‘মাটির স্বভাব’। অন্যদিকে অধিক স্থিরতার অপর নাম অলসতা। মাটিতে অলসতার গুণও বিদ্যমান। তাই দেহে মাটি তত্ত্ব অধিক বৃদ্ধি পেলে মানুষ অলস হয়ে উঠে।

সাধককুল পঞ্চভূতের মাটিতত্ত্বকে যেমন ব্রহ্মাণ্ড থেকে বোঝার প্রয়াশ করে, তেমনি নিজ দেহের মাটিকেও বুঝে নিতে চায় কড়ায়গণ্ডায়। ব্রহ্মাণ্ডজ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার জন্য পঞ্চভূত জ্ঞান আবশ্যক। তাই সাধক দেহ খাঁচাকে বুঝবার জন্য করে নানান ক্রিয়া। পালন করে বিধি-বিধান, আচার-বিচার।

এক জায়গায় বসে থাকতে পছন্দ করে। কোনো কিছুতে দ্রুত সাড়া দেয় না। সবকিছু ধীরে ধীরে করতে পছন্দ করে। আর অলসতা অনেক সময় মানুষের মধ্যে স্বার্থপরতার জন্ম দেয়। নিজের বাড়তি সুবিধা আদায় করতে গিয়ে স্থূলকায় মানুষ মমতাময়ী হলেও স্বার্থপরতাও এড়াতে পারে না সকলক্ষেত্রে।

আর স্বভাবদোষে অসল-স্বার্থপর জীব ব্যক্তিসুখের দিকেই অধিক মনোযোগী হয়। তাই তারা নতুন কিছু গ্রহণ করতে পারে না যেমন। তেমনি প্রাপ্তিশূণ্য কর্মে তারা মনোযোগী হয় না। হয়ে উঠে স্বভাবে কৃপণ।

তবে মাটির সাথে অন্য কোনো তত্ত্ব সবচেয়ে বেশি পরিমাণে তার ক্রিয়া করে এর উপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। যেমন মাটির সাথে জল থাকলে একরকম। অগ্নি থাকলে ভিন্নরূপ। আবার আকাশ বা বায়ু থাকলে অন্য। এছাড়া ভূতের সমতা থাকলে বা পরিমাণে পরিবর্তন আসলে স্বভাব-চরিত্রেও আসে পরিবর্তন।

মাটির বিপরীত তত্ত্ব যেমন আকাশ; তেমনি বিপরীত গুণ হলো বায়ু। মাটি স্থির আর বায়ু গতি, প্রবাহমানতা। বায়ু হালকা আর মাটি ভারী।

সাধককুল পঞ্চভূতের মাটিতত্ত্বকে যেমন ব্রহ্মাণ্ড থেকে বোঝার প্রয়াশ করে, তেমনি নিজ দেহের মাটিকেও বুঝে নিতে চায় কড়ায়গণ্ডায়। ব্রহ্মাণ্ডজ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার জন্য পঞ্চভূত জ্ঞান আবশ্যক। তাই সাধক দেহ খাঁচাকে বুঝবার জন্য করে নানান ক্রিয়া। পালন করে বিধি-বিধান, আচার-বিচার।

দেহের মাটিকে শুদ্ধ না করলে শুদ্ধজ্ঞান প্রাপ্ত হওয়া কঠিন। তাই সাধক দেহে যেমন অশুদ্ধ কিছুর স্পর্শও নিতে চায় না। তেমনি আহারও করে শুদ্ধ বস্তু। পালন করে নানান উপাচার। তাই তো সাধক জালালউদ্দিন খাঁ বলেছেন-

“মাটির দেহ খাঁটি কর, খোল তোমার দিল-কোরান।
বাড়ি জমির হিসাব নিবে, সাক্ষ্য দিচ্ছে বেদ পুরান।।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘পঞ্চভূত’ প্রবন্ধে রূপকের ছলে ক্ষিতি বা মাটির পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছেন, “শ্রীযুক্ত ক্ষিতি আমাদের সকলের মধ্যে গুরুভার। তাঁহার অধিকাংশ বিষয়েই অচল অটল ধারণা। তিনি যাহাকে প্রত্যক্ষভাবে একটা দৃঢ় আকারের মধ্যে পান, এবং আবশ্যক হইলে কাজে লাগাইতে পারেন, তাহাকেই সত্য বলিয়া জানেন।

তাহার বাহিরেও যদি সত্য থাকে, সে সত্যের প্রতি তাঁহার শ্রদ্ধা নাই, এবং সে সত্যের সহিত তিনি কোনো সম্পর্ক রাখিতে চান না। তিনি বলেন, যে-সকল জ্ঞান অত্যাবশ্যক তাহারই ভার বহন করা যথেষ্ট কঠিন। বোঝা ক্রমেই ভারী এবং শিক্ষা ক্রমেই দুঃসাধ্য হইয়া উঠিতেছে।

(চলবে…)

<<পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব তিন ।। পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব পাঁচ>>

………………….
কৃতজ্ঞতা স্বীকার-
পুরোহিত দর্পন।
উইকিপিডিয়া।
বাংলাপিডিয়া।
শশাঙ্ক শেখর পিস ফাউন্ডেশন।
পঞ্চভূত – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বাতাসের শেষ কোথায় : ইমরুল ইউসুফ।
ন্যায় পরিচয় -মহামহোপাধ্যায় ফনিভূষণ তর্কবাগীশ।
পঞ্চভূত স্থলম ও পঞ্চভূত লিঙ্গম- দেবাদিদেব শিবঠাকুরের খোঁজে: আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়ের।

…………………………..
আরো পড়ুন-
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব এক
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব দুই
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব তিন
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব চার
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব পাঁচ
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব ছয়
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব সাত
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব আট
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব নয়
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব দশ
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব এগারো
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব বারো
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব তেরো
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব চোদ্দ
পঞ্চভূতের পঞ্চতত্ত্ব : পর্ব পনের

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!