কোরানের সৃষ্টিতত্ত্ব : পর্ব এক

কোরানের সৃষ্টিতত্ত্ব : পর্ব এক

সুফি সদর উদ্দিন আহমদ চিশতী স্মারক বক্তৃতা ২০১৯

সম্মানিত সভাপতি,
সমবেত সাধু সজ্জন মণ্ডলী,

আপনাদের সবাইকে জানাই সাধুসম্ভাষণ। জয় গুরু। সর্বগুরুর চরণে আমার ভক্তি নিবেদন করি। লালন বিশ্বসংঘের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক, প্রথিতযশা লেখক ও গবেষক জনাব আবদেল মাননান আমার মতো ক্ষুদ্র ভাবুককে এ বছর আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ‘কোরানের সৃষ্টিতত্ত্ব’ শীর্ষক শাহ্ সুফি সদর উদ্দিন আহ্মদ চিশতী স্মারক বক্তৃতা প্রদানের জন্য। সাধুবাদ জানাই তাঁকে। সবই দয়াময় শাঁইজীর কৃপাপূর্ণ ইচ্ছা।

কোরানুল করিম তত্ত্বভিত্তিক সৃষ্টিলীলারহস্যের রূপক বর্ণনাময় উচ্চাঙ্গিক ধর্মদর্শন। নূরতত্ত্ব অর্থাৎ নূরে মোহাম্মদী কোরানের প্রধান উৎস বা কোরান জ্ঞানের মূলতত্ত্ব। আল্লাহর নূর থেকে নবীর নূর এবং নবীর নূর থেকে সমগ্র জগৎ সৃষ্টি হয়েছে। কোরানের দ্বিতীয় তত্ত্ব তাই নবীতত্ত্ব। নবীজী সর্বসৃষ্টির মূলাধার। তাঁর আদর্শিক ধারক-বাহক উত্তরসুরী রসুল (আহলে বাইতে রসুল তথা সম্যক গুরুরগণ) আল কোরানের জাগ্রত প্রকাশ-বিকাশ স্বরূপ সত্তা বলেই রসুলতত্ত্ব কোরানিক তত্ত্বসাহ্যিতের তৃতীয় বা সর্বশেষ ভিত্তি যার উপস্থিতি সর্বকালীন ও সর্বজনীন (হায়াতুল মুরসালিন)।

যাঁর স্মরণে এই মহতী আয়োজন সেই মহৎ কোরান ব্যাখ্যাতা সুফি সদর উদ্দিন আহ্মদ চিশতী তাঁর ‘অখণ্ড কোরানদর্শন’এর পটভূমিকায় লিখেছেন, “কোরানুল আজিম পূর্ণাঙ্গ একটি জীবনদর্শন। সাধক ব্যতীত কেহই এই জীবন দর্শনের সন্ধান পাইতে পারে না। এইজন্য ‘আলে রসুল’ বা ‘আহলে বাইতে রসুল’ ব্যতীত অন্য কাহারও কোরানের তফসির লিখিবার অধিকার নাই। আহলে বাইতে রসুলের শরণাপন্ন হইয়া তাঁহাদের বক্তব্য সমাজে প্রকাশ করা যাইতে পারে মাত্র। …মানব জীবনের উত্থান পতনের পরিপূর্ণ একটি আলেখ্য ব্যতীত কোরান

অন্য আর কিছুই নয়। ভবিষ্যত স্বর্গনরকের বয়ান কোরানে নাই। মানব জীবনে যাহা স্বর্গ ও নরকরূপে উপস্থিত আছে তাহারই বিশদ এবং সূক্ষ্ম বর্ণনা হইল বিজ্ঞানময় কোরান। তাই ইহা সম্পূর্ণ কেতাবভিত্তিক বিষয়। ….কোরানে অঙ্কিত

জীবনদর্শন পুনর্জন্মবাদের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। অবশ্য মোমিন ও প্রকৃত মুসলমানের জন্য পুনর্জন্ম নাই। তাঁহারা জন্মচক্র হইতে চিরমুক্ত। পুনর্জন্মের কথা কোরানের ভাষা চাতুর্যে প্রচ্ছন্ন করিয়া রাখা হইয়াছে। রসুলের শিষ্যবর্গের মধ্যে মোমিনের সংখ্যা ছিল অতি নগণ্য। মোমিনগণ চক্ষুষ্মান হওয়া সত্ত্বেও রসুলাল্লাহর নির্দেশক্রমে উহা প্রকাশ করেন নাই। ইহা সহজ ভাষায় সাধারণভাবে প্রকাশ করিলে তৎকালীন পশুপ্রকৃতির মূর্খ মরুবাসী আরবগণ যাহারা ছিল সংখ্যায় অত্যধিক তাহারা ধর্ম গ্রহণ করিত না; এবং করিলেও আত্মশুদ্ধির ব্যাপারে একেবারেই শিথিল থাকিত।

রাষ্ট্রীয় গোলযোগের কারণে খেলাফতকালে ইহার প্রকাশ হয় নাই। তারপর যদিও মিশরে ফতেমী রাজত্বকালে এই মতবাদ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সেখানেও টিকিয়া থাকিতে পারে নাই। প্রায় আড়াইশত বছর ফাতেমীরা রাজত্ব করেন। সুলতান সালাহউদ্দিন সেইদেশ জয় করেন; এবং এই মতবাদ পুনরায় সেখান হইতে নিশ্চিহ্ন করিয়া দেওয়া হয়”।

অবশ্য জন্মান্তরবাদ বা পুনর্জন্ম বিষয়ক রূপান্তরবাদের ধারণা আমাদের সমাজে অনাদিকাল থেকে সুপরিচিত এক বিষয়। এটি সৃষ্টিরহস্যের এক অসীম আধার। এ বিষয়ে মানুষের বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচল লক্ষ্য করার মতোই বটে। বিশেষ করে মুসলমান নামধারী সংখ্যাগুরু লোকসমাজে বিষয়টি ট্যাবু পর্যায়ের একটি আলোচনামাত্র।

একবাক্যে প্রায় সমস্ত মুসলমানই একে নাকচ করে দেয়। তবে মানুষের দৈনন্দিন (নিরর্থক) আলাপ-আলোচনায় বিষয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই চলে আসে। যে লোক একে একেবারেই অমূলক বলে থাকে মাঝেমাঝে বিষয়টি তাকেও ভাবিয়ে তোলে। তাই কেউ কার্যকারণ বুঝে বিশ্বাস করুক বা না করুক, মনের অবচেতনে এর বিরাট বিস্তার রয়েই গেছে।

প্রথমে জানা দরকার জন্মান্তরবাদ কি? মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায়ের জীব প্রত্যেকের মাঝেই কালের বিবর্তন ধারায় নানাবিধ পরিবর্তন দেখা যায়। সে পরিবর্তনের আর এক নাম জন্মান্তরবাদ বা রূপান্তরবাদ। বস্তুবিজ্ঞানীদের ধারণা মতেও শক্তি অবিনশ্বর এবং তা রূপান্তরণের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন।

স্থূলভাবে আমরা মানুষ ও প্রাণি জীবনের রূপান্তরকেই জন্মান্তর বলে আখ্যায়িত করে থাকি। আমরা বিশ্বাস করি বা না করি, বিশ্বের অসংখ্য মানুষ এ তত্ত্বে বিশ্বাস রাখে এবং তাদের জীবনদর্শনেও এর ব্যাপক ভূমিকা প্রচ্ছন্ন রয়েছে। তবে রাজতান্ত্রিক আচারসর্বস্ব অনুষ্ঠানবাদী ইসলাম ধর্মানুসারী সমাজে এর আবেদন বরাবরই উপেক্ষিত।

ইসলামধর্মে জন্মান্তরবাদ বলে কিছু আছে কিনা তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা নানা মহলে চলে আসছে বহুকাল ধরে। যিনি জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস করেন তিনি নানাভাবে এর সপক্ষে যুক্তি উত্থাপন করেন। আবার এতে যিনি বিশ্বাস করেন না তিনিও তার সপক্ষে নানা যুক্তি দেখান। ফলে মীমাংসিত একটি বিষয় অমীমাংসিত হয়ে আছে বলেই আমাদের মনে হয়। তবে জন্মান্তরবাদীদের বিশ্বাসের জন্মদানকারী একটি হাদিস এখানে সঙ্গত কারণেই উদ্ধৃত করা হলো; রসুলাল্লাহ (স) এরশাদ করেন, “কোনও ব্যক্তি যতবারই জীবনলাভ করুক এবং যতবারই খোদার পথে জেহাদ করে শহিদ হোক, সে যদি তার দেনা বা কর্জ আদায় না করে থাকে, তবে সে কিছুতেই বেহেস্তে যেতে পারবে না।”

এ হাদিসে উল্লিখিত ‘যতবার জন্মলাভ করুক’ কথাটিকে জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসীগণ তাঁদের বিশ্বাস যে যৌক্তিক তা প্রমাণে ব্যবহার করতে চান। তাঁরা বলতে চান, জন্মান্তরবাদ বলে যদি কিছু নাইবা থাকত তাহলে রসুলাল্লাহ (স) কখনোই ‘যতবার জন্মলাভ করুক’ কথাটি উচ্চারণ করতেন না।

জন্মান্তরবাদ শব্দটি কোরানে নাই। যাহা আছে তাহাকে রূপান্তরবাদ বলা যাইতে পারে। জৈব এবং অজৈব সব কিছুর রূপান্তর অবিরত ঘটিতেছে। কোনও কিছুই তাহার আপন অবস্থায় স্থির থাকিতেছে না।এই রূপান্তরকে আমরা স্থূলভাবে পনুর্জন্ম বলিয়া থাকি। এইরূপ রূপান্তরের কারণেই আমি, তুমি বা সে বলিতে কিছুই নাই। যাহা আছে বলিয়া আমরা দেখিতেছি তাহা অদ্বৈত আহাদরূপেরই একক প্রকাশ বা লীলাভঙ্গি। ইহাকেই বিভিন্ন জাতি জন্মান্তরবাদ Transmigration of Soul বলিয়াছে।

কোরানে জন্মান্তরবাদ কিংবা রূপান্তর এইরূপ কোনও একটি শব্দ ব্যবহার করিয়া বিষয়টির প্রকাশ কোথাও করেন নাই। অথচ রূপক বর্ণনার সাহায্যে বিষয়টি অত্যন্ত বিস্তৃত ও ব্যাপকভাবে প্রকাশ করা হইয়াছে। কোরানে যেভাবে রূপান্তর বিষয়টি নিখুঁতভাবে অঙ্কন করিয়াছেন তাহা বিজ্ঞানসম্মত এবং তাহাই জীবন দর্শনের সম্যক বা আসলরূপ।*১

এই দুনিয়ার জিন্দিগি জাহান্নামেরই জিন্দিগি। এই জীবন বহুপ্রকার দুঃখকষ্টে ভরপুর। দৈহিক, মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি বহুপ্রকার কষ্ট হইতে উদ্ধার লাভের জন্য মানুষ আশ্রয় সন্ধান করিয়া থাকে। কখনও ধন-সম্পদকে আশ্রয়রূপে গ্রহণ করে, আবার কখনও বা স্বাস্থ্য, ক্ষমতা, মান-মর্যাদা, আত্মীয়-স্বজন ইত্যাদি অনেক কিছুকেই অর্থাৎ বস্তুগত আশ্রয়কে বিপদ মুক্তির আশ্রয়রূপে গ্রহণ করে। কিন্তু ইহাই আক্ষেপ যে, আল্লাহ ব্যতীত বস্তুর যে কোনও আশ্রয় তাহাকে এক জাহান্নাম হইতে অন্য জাহান্নামে নিক্ষেপ করিয়া থাকে।

শেরেকমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত জন্মচক্র হইতে ইনসানের মুক্তি নাই। তাহাদের শেরেকের অপরাধের কারণে তাহাদিগকে পুনরায় শেরেকযুক্ত পরিবেশের মধ্যেই পাঠানো হয়।*২

বিবর্তনের ধারায় আমরা পশুপক্ষী, জীবজন্তু ইত্যাদি বহু পর্যায় অতিক্রম করিয়া মানবজন্ম লাভ করিয়াছি। মানুষের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর একান্ত অবাধ্য হয় তাহাকে তাহার পৃষ্ঠের অসীম পশ্চাতের পূর্ববর্তী একটি দেহ দেওয়া হয়। অর্থাৎ জাহান্নাম হইতেও নিম্নমানের জীবজগতের একটা দেহ দেওয়া হয়।*৩

এবার আমরা কোরানের কিছু বাক্যের পর্যালোচনা করে দেখব, সেখানে আদে․ জন্মান্তরবাদ সম্পর্কিত কোনও তথ্য আছে কিনা। আর যদি থেকে থাকে তার স্বরূপ সন্ধানে আমরা প্রয়াসী হব।*৪

কেমন করিয়া তোমরা আল্লাহর সঙ্গে মিথ্যা আরোপকর-এবং তোমরা ছিলে মৃত, সুতরাং তিনি তোমাদিগকে জীবিত করেন, তারপর তোমাদিগকে মৃত্যুদান করেন, তারপর জীবনদান করেন, তারপর তাঁহারদিকে প্রত্যাবর্তন। সুরাবাকারা :বাক্য # ২৮

ব্যাখ্যা : মরার আগে মরতে না পারলে অর্থাৎ প্রাকৃতিকভাবে মৃত্যুর পূর্বে সচেতনভাবে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে না পারলে মানুষ মুক্তিলাভ করতে পারে না। যার ফলে সে মৃতের জগতেই বাস করে এবং জন্মমৃত্যুর আবর্তে বন্দি হয়ে থাকে। বাক্যটিতে প্রথমেই বলা হয়েছে ‘এবং তোমরা ছিলে মৃত’-এখানে ‘এবং’ মানবজীবনের অতীতের ইঙ্গিতবহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখান থেকে তিনি মানুষকে জীবনদান করেন, তারপর মৃত্যুদান করেন, তারপর জীবনদান করেন, তারপর তাঁর (আল্লাহর) দিকে প্রত্যাবর্তন। ‘তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন’ কথাটি সংশোধনের জন্য নবজন্মে আনার অর্থে বলা হয়েছে।

বাক্যটিতে ‘তারপর’ কথাটি তিনবার উল্লেখ করে জন্মমৃত্যুর পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। তাছাড়া আলোচ্য বাক্যটিতে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, বাক্যটিতে প্রথমেই বলা হয়েছে, ‘এবং তোমরা ছিলে মৃত’ এখানে প্রশ্ন হতে পারে, পূর্বে জীবিত না থাকলে মৃত হয় কী প্রকারে? এ থেকে এটাই ইঙ্গিত বহনকরে যে, ‘এবং তোমরা ছিলে মৃত’ বলে বাক্যটিতে জন্মমৃত্যুর আবর্তের কথাই বলা হয়েছে।

(চলবে…)

……………………………………………………
*১ সুফি সদর উদ্দিন আহ্মদ চিশতী প্রণীত অখ- কোরানদর্শন, সুরা লাইলের ব্যাখ্যা।
*২ সুফি সদর উদ্দিন আহ্মদ চিশতী প্রণীত অখ- কোরানদর্শন, সুরা কেয়ামতের শব্দটীকা,মন্তব্য।
*৩ সুফি সদর উদ্দিন আহ্মদ চিশতী প্রণীত অখ- কোরানদর্শন, সুরা ইনশিকাকের ১০-১৩ নং বাক্যের ব্যাখ্যা।
*৪ এম এ বারী চিশতী রচিত ‘কোরানের আলোকে কতল’ নামক পুস্তিকা।
……………………………………………………
স্বারক বক্তা : সালেহ আহমেদ শিশির
সভাপতি : অধ্যাপক ড আনিসুজ্জামান
২৫ নভেম্বর ২০১৯
আর সি মজুমদার আর্টস অডিটোরিয়াম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!