রাখিলেন সাঁই কূপজল করে ফকির লালন সাঁইজি

-মূর্শেদূল মেরাজ

মাই ডিভাইন জার্নি : আঠার

এই লেখা লিখতে হবে কখনো ভাবি নাই। তারপরও লিখতেই হচ্ছে। আসলে না লিখে উপায়ও নেই। এই সব কথাগুলো বুকে পুষে রাখবার কোনো মানে নেই। এগুলোই তো আমার ‘মাই ডিভাইন জার্নি’র বাঁক। এগুলো তুলে না ধরলে হয়তো নিজের সাথেই প্রতারণা করা হবে। তাই লিখতেই হচ্ছে- ভাবতেই হচ্ছে-

যে মানুষগুলো তথাকথিত সমাজ মানেন না, তথাকথিত সংসার মানেন না, তথাকথিত বিধিবিধান কিছুই মানেন না। তারা একটা একাডেমীকে মানেন? একটা শিল্পকলাকে মানেন?? প্রশাসনের হুমকিধমকি মানেন??? উগ্রবাদীদের আগ্রাসন মানেন???

তারা কি ভয় পান? যদি পান তা হলে তা কিসের ভয়?? মর্যাদার ভয়? মানের ভয়?? মৃত্যুর ভয়??? কিসের ভয়!!! যে মানুষগুলো দাবী করেন জিন্দা মরার তারা কেনো আমাদের মতো তুচ্ছ বিষয়াদিতে ভয়ে আতকে উঠবেন???

ফকিরকুলের শিরোমণি ফকির লালন সাঁইজি তাঁর একটি পদে বলেছেন-

আয় গো যাই নবীর দ্বীনে।
দ্বীনের ডংকা বাজে শহর মক্কা মদীনে।।

তরিক দিচ্ছেন নবী জাহের বাতনে
যথাযোগ্য লায়েক জেনে,
রোজা আর নামাজ ব্যাক্ত এহি কাজ
গুপ্ত পথ মেলে ভক্তির সন্ধানে।।

অমূল্য দোকান খুলেছেন নবী
যেই ধন চাইবি সেই ধন পাবি,
বিনা কড়ির ধন সেধে দেয় এখন
না লইলে আখেরে পস্তাবি জেনে।।

নবীর সঙ্গে ইয়ার ছিলো চারি জন
চারকে দিলেন নবী চারি মতে যাজন,
নবী বিনে পথে গোল হলো চারি মতে
ফকির লালন বলে যেন গোলে পরিস নে।।

এই পদে সাঁইজি নবীর মতের মহিমা, নবীর তরিকা, তরিকার পথ, নবীর মহিমা, নবীর তরিকার মহিমা বর্ণনার শেষে এসে নবী প্রদত্ত মতের একটা পর্যালোচনা দিয়েছেন।

অন্তনির্হিত ভাব অর্থে না গেলেও শাব্দিক অর্থেই নবী পরবর্তী সময়ে নবীর সার্বক্ষণিক যে সঙ্গীরা ছিল তাদের মাঝেই একটা গোলের সৃষ্টি হয়েছিল তার সূক্ষ্ম এক নির্দেশ করেছেন।

সেই গোল, গণ্ডগোল, ভেদ, প্রভেদের গোলে না ঢুকে বরঞ্চ লালন সাঁইজির দেহত্যাগের পরবর্তী সময়ে। তাঁর মতেও কি এমন কোনো গোল প্রবেশ করেছে কিনা সেটাও ভেবে দেখবার বিষয়। নবী যে তরিক দিয়ে গেলেন তার চার সাহাবীকে তা একই ধারার ছিল না।

অর্থাৎ যে জ্ঞান নবীজী তার সাহাবীদের দিয়েছেন, তা প্রত্যেকের নিজ নিজ জ্ঞানানুসারেই দিয়েছিলেন। তুলনার বিচারে তা তুল্য না হলেও। তা ধারায় যে পার্থক্য ছিল তা বলা যেতেই পারে।

আবার এভাবেও ভাবা যেতে পারে। একই কথা বললেও প্রত্যেকেই তো তার নিজ নিজ জ্ঞানানুসারে কোনো কিছু গ্রহণ করে থাকেন। সাঁইজি অন্য এক পদে বলছেন-

একই কোরান পড়াশোনা
কেউ মৌলভী কেউ মাওলানা,
দাহেরা হয় কতজনা
সে মানেনা শরার কাজি।।”

তাই জ্ঞান এক হলেও গ্রহণে তার পরিবর্তন হয়েই থাকে। একই শ্রেণীতে, একই বই পড়েও যেমন সকলে একই ফল লাভ করতে পারে না। তেমনি সকলকে শিক্ষক একই জ্ঞান প্রদানও করেন না। যথার্থ শিক্ষক ছাত্রের মেধার ভিত্তিতেই শিক্ষা প্রদান করে থাকে।

তাই সদগুরুও তার নিজ শিষ্যকে শিষ্যের জ্ঞানানুসারে যেমন সেই সত্যজ্ঞান, পরমজ্ঞান অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ডজ্ঞান প্রদান করে থাকেন। অর্থাৎ যার যতটা ধারণ ক্ষমতা তাকে ততটাই দিয়ে থাকেন। তেমনি আবার যার যেমন ধারণ ক্ষমতা তাকে তার মতো করে সেই জ্ঞান প্রদান করা হয়।

সদগুরু উপযুক্ত ভক্ত পেলে তবেই তাকে সেই জ্ঞান প্রদান করে থাকেন। তা ভক্তের জ্ঞানের ধারা বা ধারণ করার ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে যেমন ভিন্ন ভিন্ন তরিকা বাতলে দিতে পারেন। আবার তরিকা একই রেখে ভক্তের মেধা অনুযায়ী ভক্তকে বোঝানোর ধারা পাল্টান গুরু।

মোট কথা গুরু যে জ্ঞান ভক্তকে প্রদান করেন তা তার মেধা ও ধারণ ক্ষমতার উপরই নির্ভর করে সে কতটা গ্রহণ করতে পারলো। যদিও সাধককুল বলেন, গুরুকৃপা হলে সকল কিছুই সম্ভব। সকল অসম্ভবই সম্ভব হয় গুরুকৃপায়।

তাই ভক্তের জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেচনা-বোধ যেমনই হোক গুরু তাকে সেই উচ্চকটিতে নিয়ে গিয়ে সেই জ্ঞান-করণকারণ দান করেন। তাতে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। সকল ভক্তই একই জ্ঞান প্রাপ্ত হন। সকলেই একই পর্যায়ের জ্ঞানী হন।

এভাবে এক একজনের প্রকাশ এক এক ভাবে। এক এক ধারায়। তেমনি নবীজি দেহত্যাগের পর তিনি যে তরিকা চারজনকে দিয়ে গিয়েছিলেন। তা চার মতে প্রকাশ পেতে শুরু করে। সেই চার মতে মিলে যে একটা গোলমাল তৈরি হয় আপাত দৃষ্টিতে। সেই গোলের মাঝে না পরতে ফকির লালন সাঁইজি সতর্ক করেছেন।

যদিও এ নিয়ে দ্বিমত থেকেই যায়। কারণ সকল ভক্ত গুরুর জ্ঞানকে ধারণ করে সম মহিমায় উজ্জীবিত করতে যে পারে না। তা সকলক্ষেত্রেই দৃশ্যমান। একজন সদগুরুরও সকল ভক্তই একই মর্যাদা কি পান? অবশ্য গুরুর গুরুতত্ত্ব বিচার করে, সেই ক্ষমতাই বা কার আছে।

এসব আপাত দৃষ্টির কথাই বলছি। অন্যভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, কোনো গুরু হয়তো প্রেমময়, তার দিকে তাকালেই হয়তো প্রেমিককুল ইশকে দেওয়ানা হয়ে তার চরণে সমর্পিত হয়। আবার কোনো গুরুর মুখের বচন এমনই মধুর যে, তার জ্ঞান কতটা সেই প্রশ্ন আসেই না।

তার মুখের কথা শুনেই লোকে ভক্ত হয়ে যায়। আবার কোনো গুরুর জ্ঞানেই হয়তো সকলে কাবু। জ্ঞানের বহরে ভক্ত না হয়ে উপায়ই থাকে না। কোনো গুরুর কর্ম হয়তো এতো ব্যাপক যে, তার কর্মের দিকে দৃষ্টি দিলে সেই দৃষ্টি নত হতে বাধ্য।

আবার কোনো গুরু হয়তো সর্বগুণ সম্পন্ন। কোন গুরু হয়তো গুণ ছাড়িয়েও এমন এক তরঙ্গ নিয়ে বসে আছেন। তার আওতায় গেলেই সব বাহাদুরি শেষ। সমর্পণ ছাড়া গতি থাকে না।

আবার যার বেশি ভক্ত তিনিই যে বড় গুরু। আর যার ভক্ত নেই তিনিই গুরুর মর্যাদায় নিম্নমুখি তাও কিন্তু নয়। কেউ কেউ ভক্ত করতেই অতি আগ্রহী। কোনো কোনো গুরু আবার ভক্তই করতে রাজি নন।

এভাবে এক একজনের প্রকাশ এক এক ভাবে। এক এক ধারায়। তেমনি নবীজি দেহত্যাগের পর তিনি যে তরিকা চারজনকে দিয়ে গিয়েছিলেন। তা চার মতে প্রকাশ পেতে শুরু করে। সেই চার মতে মিলে যে একটা গোলমাল তৈরি হয় আপাত দৃষ্টিতে। সেই গোলের মাঝে না পরতে ফকির লালন সাঁইজি সতর্ক করেছেন।

আর এইখানেই আমার প্রশ্ন। আমরাও কি ফকিরকুলের শিরোমণি ফকির লালন সাঁইজি দেহত্যাগের পর তাঁর মতের চর্তুমুখী ধারার গোলে পরে যাচ্ছি না তো? পরেই যাচ্ছি বা পরেই আছি নির্দিষ্ট করে তা বলছি না। বা পরেই যে যাই নি তাও বলছি না। বলছি বিষয়টি ভাববার সময়ে এসেছে।

যা বলা হচ্ছে, সেটাই কি শেষ কথা? নাকি অতলে আরো অনেক কিছুই আছে; যার চর্চা বন্ধ হয়ে আছে? যে ধারায় জনপ্রিয়তা, লোকপ্রিয়তা, ঐশ্বর্য নেই। সেই পথে হয়তো বেশিভাগই এগোই নি। হতেও তো পারে? নাকি?? যেখানে নবীর তরিকায় নবীজী দেহত্যাগের পরপরই ভেদের সৃষ্টি হয়েছিল!

তাহলে সাঁইজির মতেও এমন ভেদ হয়নি তাইবা নিশ্চিত করে বলতে পারছি কই! আর এই যে প্রশ্ন আজ আমি উত্থাপন করছি, এ ধৃষ্টতা নয় মোটেও। এটাই আমার শিক্ষা ফকির লালন সাঁইজির কাছ থেকে। তিনি এভাবেই শিখিয়েছেন আমাকে।

তার প্রমাণ এই পদ। যে পদ দিয়ে এই লেখার শুরু।

এইখানে ঠাকুর পরিবারের রবী ঠাকুরের সেই কয়েকটা লাইন বলতে ইচ্ছে করছে-

আজি হতে শতবর্ষ পরে
কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি
কৌতূহলভরে-
আজি হতে শতবর্ষ পরে।
আজি নববসন্তের প্রভাতের আনন্দের
লেশমাত্র ভাগ-
আজিকার কোনো ফুল, বিহঙ্গের কোনো গান,
আজিকার কোনো রক্তরাগ
অনুরাগে সিক্ত করি পারিব না পাঠাইতে
তোমাদের করে
আজি হতে শতবর্ষ পরে।

আমি যখন মাই ডিভাইন জার্নির এই পর্ব লিখছি ততক্ষণে ফকির লালন সাঁইজির দেহত্যাগের ১৩০ বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। পার হতে চলেছে পাঁচ ঘর। অর্থাৎ লালন সাঁই ফকিরের ফকিরি ধারার পঞ্চম সিঁড়ি পার হয়ে ষষ্ঠ সিড়িতে গিয়ে পৌঁছেছে। কারো কারো ক্ষেত্রে তা ষষ্ঠ বা সপ্তমও হতে পারে।

অন্যান্য মতাদর্শের মতো লালন মতেও কেনো এতো ভেদ-প্রভেদ হচ্ছে? কেনো সাধুগুরুরা এক হতে পারছেন না?? কেনো তারা একে অন্যকে প্রকৃত সাধক বলেও মানছেন না অনেকক্ষেত্রে! তবে কি কোথাও একটা গোল তৈরি হয়েছে??

আমরা কি গোলে পরে আছি?? নাকি আমরা গোলে পরতে যাচ্ছি??? নাকি আমাদেরকে পরিকল্পিভাবেই গোলে ফেলা হচ্ছে!!!

চারপাশে একমুখোভাবে এই যে লালন চর্চা হচ্ছে, তা দেখে বারবারই প্রশ্নটা চাগাড় দিয়ে উঠে- কানারহাট বাজারে কি আমি মুক্তি খুঁজছি? নাকি মুক্তার হাটে আমিই কানা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি!! আপাতদৃষ্টিতে আমিই কানা সেটাই সাব্যস্ত হবে তাতে সন্দেহ নেই।

আর সেটি যদি সত্যি হয় তাহলে আমার মতো খুশি আর কে হবে ধারীত্রীতে? যদি নিশ্চিত হওয়া যায়- যা বলা হচ্ছে, যা প্রচার হচ্ছে, যা প্রসার হচ্ছে তাই এক মাত্র পথ। কোনো গোল নেই এতে। তাহলে তা মেনে নিতে বা মনে নিতে দোষ কি?

কিন্তু চারপাশের এতো ভ্রান্তি দেখে তাও তো নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তাই তো প্রশ্ন জাগে। যার উত্তর জানা নেই। সেই উত্তরের জন্যই তো এই যাত্রা। এই অন্তহীন পথ চলা। আর এই যাত্রার অন্তহীনতা নিয়ে ফকির লালন সাঁইজি বলেছেন-

কে দেখেছে গৌরাঙ্গ চাঁদে রে।
সে চাঁদ গোপীনাথ মন্দিরে গেল
আর তো এলো না ফিরে।।

যাঁর জন্যে কুলমান গেল
সে আমারে ফাঁকি দিলো,
কলঙ্ক জগত রটিল
লোকে বলবে কি আমারে।।

দরশনে দুঃখ হরে
পরশিলে পরশ করে,
হেন চন্দ্র গৌর আমার
লুকালো কোন শহরে।।

যে গৌর সেই গৌরাঙ্গ
হৃদ মাঝারে আছে গৌরাঙ্গ,
লালন বলে হেন সঙ্গ
হলো না কর্মের ফ্যারে।।

আবার কে ভালো বলবে, কে মন্দ বলবে সেই ভাবনায় গিয়ে সকলকে সন্তুষ্ট করে কথা বলতে হবে সেই ভাবেও এখন আর নেই আমি। সাত্তার ফকিরের গুণধামে বসে বসে এমন সব ভাবনাই মাথায় আসছিল। চারপাশে যারা কোথাও অবস্থান নিতে পারে নি আমাদের মতোই।

তারা সকলে একত্রিত হয়েছে ফকিরের বাসায়। বাসা আখড়া ছাড়িয়ে কয়েক কদম দূরে হক নূরুল্লাহর দরবারের আঙ্গিনায় আম বাগানে মিলেছে পাগলের মেলা। সেখানে শামিয়ানা টানিয়ে ত্রিপল পেতে ব্যবস্থা করে দিয়েছে ফকির। ছেলেপিলে সেখানে সাঁইজির গানের আসর বসিয়েছে।

দোতারা, মন্দিরা, ঢোল, হারমোনিয়াম, বাঁশি, একতারা, বায়া বাজিয়ে চলছে সাঁইজির পদ। একপাশে বিশাল তাবু ফেলা হয়েছে। অন্যপাশে পাগলপারা। এরই মাঝে আমরা কয়জন ঘুরে বেড়াচ্ছি। কোথাও ঠিক মন স্থির হচ্ছে না। মনের মাঝে যে দহন শুরু হয়েছে তার তাপ কমার বদলে ক্রমশই যেন বাড়ছে।

যে আগুন লেগেছিল মনে-মস্তিষ্কে; সে আগুন ছড়িয়ে পরছে সর্বাঙ্গে। সাঁইজির ধাম বন্ধ থাকবে? তাকে ভক্তি দেয়া যাবে না। সেখানে সাধুসঙ্গ হবে না! তা নিয়ে সাধুগুরুরা টু শব্দটি পর্যন্ত করবেন না। কেনো? কেনো?? কেনো???

এসব যখন ভাবছিলাম তখন মনে হলো ঠিকই তো এবার তো খোঁজ নেয়া প্রয়োজন। যাতে শিল্পকলা লালন সাঁইজির ঘরের গুরু বলে সম্মান দিয়েছেনব তিনি কি বললেন তাও তো জানা প্রয়োজন। অনলাইনে ঢুকে আর দেখবার ইচ্ছে হলো না। পরিচিত জনদের ফোন দিলাম।

আচ্ছা শিল্পকলায় যে সাধুগুরুরা একত্রিত হয়েছেন, তারা বা তিনি কি বলতে পারবেন সকলের সামনে?? শুধু এই কথাটুকু বলতে পারবেন, ‘আজ দেশের শিল্পকলাতে সাঁইজির নামে গানের অনুষ্ঠান হচ্ছে। অনলাইনে সাঁইজির গানের অনুষ্ঠান হচ্ছে। সেসব ভালো। বেশ ভালো।

কিন্তু যেই লালন সাঁইজিকে ঘিরে এতো আয়োজন। এতো কর্মযজ্ঞ তাঁর রওজায় আজ নিবেদন করা যায় নি। তাঁর আখড়ায় আজ সাধুসঙ্গ হয়নি। করোনা পরিস্থিতিতে যদি সব বন্ধ থাকে তাহলে ধাম বন্ধ থাকবে। নিয়ম মেনে তা হবে। কিন্তু সাধুগুরুভক্তদের সাথে যে অসৌজন্য মূলক আচরণ করা হচ্ছে তা সঠিক হচ্ছে না।

সাঁইজিকে সম্মান করতে হলে তাঁকে যারা ভালোবাসে তাদেরও ভালোবাসতে হবে। তাদেরকেও মর্যাদা দিতে হবে। সাধুগুরুপাগল বলে অবহেলা করা যথাযথ না। তাঁর সম্মানে শহুরে পরিবেশে বিনোদন মেলার এই আয়োজন হবে কিন্তু তাকে তাঁর ভক্তরা ভক্তি দিতে পারবে না সেটি কেমন কথা?

রাষ্ট্র যদি শিল্পকলায় যথাযথ ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে সকল কিছু পরিচালনা করতে পারে। তবে কেনো লালন আখড়ায় পারবে না?”

এসব যখন ভাবছিলাম তখন মনে হলো ঠিকই তো এবার তো খোঁজ নেয়া প্রয়োজন। যাতে শিল্পকলা লালন সাঁইজির ঘরের গুরু বলে সম্মান দিয়েছেনব তিনি কি বললেন তাও তো জানা প্রয়োজন। অনলাইনে ঢুকে আর দেখবার ইচ্ছে হলো না। পরিচিত জনদের ফোন দিলাম।

ফোনে জানলাম, নাহ্ কেউ কিছু বলেন নি। গান গেয়ে চলে এসেছেন। যিনি এই তথ্যটি দিয়েছিলেন তিনি অঝরে কাঁদছিলেন। তার কান্না শুনে ভরসা পেলাম। প্রশ্নটা কেবল আমার নয় অনেকের মনেই বাসা বেধেছে।

পরে আরো অনেকের সাথে কথা বলেই বুঝেছি, প্রশ্নগুলো জেগেছে সকলের মনেই কিন্তু কেউ মুখ খুলতে রাজি নয়। পাছে শ্রীগুরু চটে যান।

সত্যি বললাম তখন আর কিছুই বলবার ছিল না। কিছুই করবার ছিল না। তখন বারবারই মনে হচ্ছিল আমরা কি এমন সাধক চেয়েছিলাম লালন ঘরে? নাকি এসবই অবান্তর প্রশ্ন! আসলে সবাই ঠিকই আছে। মুখে কুলুপ এঁটে থাকাই আসলে কর্তব্য? আমার মনেই কি তাহলে গড়ল-

আপন মনে যার গরল মাখা থাকে।
যেখানে যায় সুধার আশায়
তথায় গরলই দেখে।।

কীর্তিকর্মার কীর্তি অথৈ
যে যা ভাবে তাই দেখতে পায়,
গরল বলে কারে দোষাই
ঠিক পড়ে না ঠিকে।।

মনের গরল যাবে যখন
সুধাময় সব দেখবে তখন,
পরশিলে এড়াবি শমন
নইলে পড়বি পাকে।।

রামদাস মুচির মন সরলে
চামকেটোয়ায় গঙ্গা মেলে,
সিরাজ সাঁই লালন কে বলে
আর কি বলবো তোকে।।

কিন্তু কি করা প্রশ্ন আসলে তা তো করতেই হবে। তাই না? তা হজম করে যাওয়া তো কাম্য হতে পারে না। কিছু প্রশ্ন থাকে অনন্তের। যার জন্য অপেক্ষা করতে হয় সময়কাল ধরে। আর কিছু কিছু প্রশ্ন কাল নিজেই সম্মুখে উপস্থিত করায়। সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হলে তার প্রশ্নের উত্তর তো সময় কালেই করে নিতে হয়।

নইলে তো তার আর কোনো মানেই থাকে না। আমার জ্ঞানে তাই বলে। ভুল হতেই পারে বৃহৎ বিবেচনায়। কিন্তু আমি তো আমার গণ্ডির বাইরে ভাবতে পারি না। ভাবতে পারার কথাও না। কেহই তা পারে না। আমি তো উভয়ের সাধনাই করতে চাই। সেই চরণের প্রত্যাশাও করি। আবার প্রশ্ন জাগলে তার কাছে প্রশ্নও করি।

আমি তো এসব তাঁর কাছ থেকেই শিখি। যিনি বলেছেন-

কেলে সোনা জানা গেল
উপরে কালো ভিতরে কালো,
লালন বলে উভয় ভালো
করি উভয়ের বন্দনা।।”

দিন দিন লালন অনুরাগী-অনুসারি বাড়ছেই। কিন্তু তা কেবল সংখ্যাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে। লালনকে নিয়ে আদতে তেমন কোন কাজ কি আসলে হচ্ছে? কিছু বই লেখা, কিছু ডকুমেন্টারি, দুই একটা চলচ্চিত্র ছাড়া শেষ বিচারে লালনকে নিয়ে আমরা আসলেই কি কিছু করতে পেরেছি??

সত্য সুপথ কি আমরা চিনেছি? নাকি চে গুয়েভারার গেঞ্জি পড়ে বিপ্লবি ভাবার মতো। লালন গানের দুই একটা পদ জেনে নিজেদেরকে লালন অনুসারি ভাবতে শুরু করেছি?

কাজী নজরুল ইসলাম তার কোনো এক রচনায় লিখেছিলেন, “পশুর মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে আমাদের লাভ কী, যদি আমাদের গৌরব করার মতো কিছু না-ই থাকে।”

আসলেই তো তাই সংখ্যা বাড়লে আনন্দের কি আছে? সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষ যে সিদ্ধান্ত নেয় তা কি আদতেই সকলের মনের কথা? সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যে পথে চলে তাই কি আসলেই সেই কাঙ্ক্ষিত পথ?? যে পথ সাধক খোঁজে??

যদি তাই হতো তাহলে মান, সম্মান, জাত, পাত সকল কিছু বিসর্জন দিয়ে মানুষ কেনো একলা চলতে শুরু করে! তবে কেনো মানুষ নতুন পথ খোঁজে?? কেনো মানুষ খ্যাতি-বর্ণ ছেড়ে ফকির সাজে??? অবশ্য সাঁইজি তো বলেছেনই-

গৌর প্রেম করবি যদি ও নাগরী
কূলের গৌরব আর কোরনা,
কূলের লোভে মান বাড়াবি
কূল হারাবি গৌর চাঁদ দেখা দেবেনা।।

ফুল ছিটাও বনে বনে- মনে মনে
বনমালীর ভাব জানোনা,
চৌদ্দ বছর বনে বনে- রামের সনে
সীতা, লক্ষণ এই তিন জনা।।

যত সব টাকা কড়ি- এ ঘর বাড়ি
কিছুই তো সঙ্গে যাবেনা,
মরলে পাস কড়াকড়ি- তুলসী, দড়ি
কাঠ খরি আর চট বিছানা।।

গৌরের সঙ্গে যাবি- দাসী হবি
এটাই মনে কর বাসনা,
লালন কয়, মনে প্রাণে-এতই টানে
ঐ পিরিতের খেদ মেটেনা।।

আসলে আজ আমার মনে যে প্রশ্নগুলোর উদয় হয়েছে সারাদিন জুড়ে তা যে কেবল আমার একার মনে উদয় হয়ে তা কিন্তু নয়। এই প্রশ্নের উদয় হয়েছে হাজার-লক্ষ-কোটি লালন ভক্তের মনে। কিন্তু নানা অপারগতায় তারা তা প্রকাশ করছেন না।

হয়তো করবেনও না কোনো কালে। কিন্তু আমি প্রকাশ না করে পারলাম না। তাই আমাকে দিয়েই সাঁই প্রকাশ করালেন। হয়তো এই লেখা বেশি মানুষের কাছে কখনোই যাবে না। এই প্রশ্নগুলো যে ব্যক্ত হয়েছে তাও হয়তো অনেক প্রাণের মানুষ জানবে না। যাক কি আর করা। যার যা কর্ম তাকে তো তা করতেই হবে।

মাঝ রাত্রিতে প্রশ্নটা ঘুড়িয়ে যখন ভাবছিলাম, আচ্ছা যদি সত্যিই এমন হয় যে, লালন সাঁইজি স্বয়ং তাঁর দরজা বন্ধ করে দেন তাহলে কি হবে? সেই প্রশ্নটা ভাববার পর একই সাথে মনটা যেমন শান্ত হলো তেমন উদ্বেগও বাড়লো। নতুন এক পথের যেন দিশা পাওয়া গেলো।

আসলেই তো আমি আর কি প্রশ্ন করবো। প্রশ্ন তো ফকিরকুলের শিরোমণি স্বয়ং লালন সাঁইজিই আজ প্রকাশ করেছেন? তিনি নিজেই তার দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি নতুন করে একটা সুযোগ তৈরি বার্তা কি আমাদের দিচ্ছেন? বলছেন, ‘এসব যেভাবে চলছে তা ঠিক ঠাক হচ্ছে না।’

নতুন করে ভাবো, নতুন করে দেখো। নতুন করে বোঝ। তারপর মজো। নইলে এই গড্ডালিকায় আমি আর নেই তোমাদের জন্য উজার করে দরজা খুলে। এইবার তোমরা তোমাদের পথ দেখো। ফিরে আসতে চাইলে পরিশুদ্ধ হও। দগ্ধ হও। বিদগ্ধ হও।

এই করোনা কালে প্রকৃতি যেমন মানুষকে নতুন করে ভাববার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। নতুন করে গুছিয়ে নেয়ার সময় করে দিয়েছিল। তেমনি ফকির লালন সাঁইজিও এমনই এক সুযোগ দিয়েছেন আমাদের প্রত্যেককে। যদিও করোনা কাল থেকে পৃথিবীর বেশিভাগ মানুষই তেমন কিছু শিখে নাই।

বেশিভাগ মানুষই ছুটি কাটিয়ে আগের রূপে ফিরে এসেছি। তবে কিছু মানুষ কিন্তু নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। বিগত ভুলগুলোকে শুধরে প্রকৃতি বিমুখতা থেকে জীবনকে ফেরানোর তীব্র লড়াইটা শুরু করেছে। প্রকৃতিকে অস্বীকার করে যে সুস্থ্য-সুন্দর করে বাঁচা যাবে না তা বুঝতে শিখেছে।

প্রথমে পণ্ডিত সংগীতজ্ঞ তর্ক করতে গেলেও পরে কি ভেবে আর এগুলেন না। থেমে গেলেন। গোঁসাই আবার বললেন- বাপ একটা কথা বোঝা প্রয়োজন। তা হইলো। যেখানে যে কথা বলার, সেখানে সেই কথা বলতে হয়। অজায়গায় ভেদের কথা বলতে নাই।

কিন্তু সাঁইজির দেয়া এই সুযোগও আমরা কি আদৌ কাজে লাগাতে শুরু করেছি? আমরা কি বাছবিচার করে চলছি? খুঁজে বের করার চেষ্টায় রত হয়েছি নিজেদের অসঙ্গতিগুলো?? নাকি সেসব কিছুই হয়নি ভেবে পূর্বের মতোই জীবন চালিয়ে যাচ্ছি??

এখনো গুরু আশ্রিত হইনি বলেই হয়তো এতোগুলো কথা বলতে পারলাম প্রাণ খুলে। নয়তো হয়তো মনে মনেই থেকে যেত। বলা হতো না অনেকের মতোই। নিরবে নিভৃতে থেকে যেত অব্যক্ত সকল কথা।

একবার বাউল গানের এক আসরে একজন স্বনামধন্য পণ্ডিত সংগীতজ্ঞ চলে আসলেন। কিছু সময় শোনার পরই তিনি হাত উঠিয়ে গান থামিয়ে দিয়ে সংগীতের রাগ নিয়ে বিশাল আলোচনা শুরু করে দিলেন।

সম্মানিত লোক তাকে কিছু বলাও যাচ্ছে না। এদিকে উপস্থিত সকলে উসখুস করছে গান শোনার জন্য-গাইবার জন্য। কিন্তু তিনি কিছুতেই থামতে চান না।

শেষে উপায়ান্তর না দেখে গোঁসাই বলেই উঠলেন- দাদাগো বাউলের এত রাগ বুঝবার ক্ষ্যামতা নাই। বাউলের রাগ দুইটাই- একটা হইলো ‘রাগ’ আরেকটা হইলো ‘অনুরাগ’।

আমি অবশ্য অতশত বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু একসময় যন্ত্রীরা এক এক করে তার হাতের ইশারায় আর মুখের বিরক্তিতে থেমে যাওয়ায় বিষয়টা অল্পবিস্তর আঁচ করতে পারছিলাম। কিছু একটা ঘটছে। সবাইকে থামিয়ে তিনি তার সুরেলা কণ্ঠে একাই রাগ-রাগিনী গেয়ে চললেন।

প্রথমে পণ্ডিত সংগীতজ্ঞ তর্ক করতে গেলেও পরে কি ভেবে আর এগুলেন না। থেমে গেলেন। গোঁসাই আবার বললেন- বাপ একটা কথা বোঝা প্রয়োজন। তা হইলো। যেখানে যে কথা বলার, সেখানে সেই কথা বলতে হয়। অজায়গায় ভেদের কথা বলতে নাই।

আপনি অনেক জানেন সে কথা তো মিথ্যা না। কিন্তু আমরা মূর্খ মানুষ। আমরা কি আর আপনার কথার কদর করতে পারবো? তারচেয়ে একটা গান ধরেন, পরান জুড়ায়া দেন।

সেই পণ্ডিত ব্যক্তি হয়তো মনে মনে রাগ তখনো পুষেই রেখেছিলেন। তিনি এমন এক উচ্চমার্গের গান ধরলেন। যা সাধারণ মানুষের মাথার উপর দিয়ে যাবে। এমন রাগে গান ধরলেন যাতে তার গানের সাথে তাল মিলিয়ে সেই সাধারণ গ্রাম্য যন্ত্রীরা যন্ত্র না বাজাতে পারেন।

আমি অবশ্য অতশত বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু একসময় যন্ত্রীরা এক এক করে তার হাতের ইশারায় আর মুখের বিরক্তিতে থেমে যাওয়ায় বিষয়টা অল্পবিস্তর আঁচ করতে পারছিলাম। কিছু একটা ঘটছে। সবাইকে থামিয়ে তিনি তার সুরেলা কণ্ঠে একাই রাগ-রাগিনী গেয়ে চললেন।

একসময় তিনি যখন থামলেন তখন সকলে নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছে। আসলেই উনি বড় মাপের শিল্পী। নইলে এমন ভাবে ভাব ঢুকিয়ে দিতে পারে?

তিনি থামার পর যখন সকলের কাছ থেকে বাহাবা পাওয়ার আশা করে জ্বলজ্বলে চোখে সকলের দিকে তাকাচ্ছিল। সকলে কি বলবে যখন ভেবে পাচ্ছিল না। তখন গোঁসাই হাত বাড়িয়ে একতারাটা নিয়ে ধরলেন-

বিষয় বিষে চঞ্চলা মন দিবারজনী।
মনকে বোঝালে বুঝ মানে না
ধর্মকাহিনী।।

বিষয় ছাড়িয়ে কবে
মন আমার শান্ত হবে,
আমি কবে সে চরণ করিব শরণ
যাতে শীতল হবে তাপিত পরানী।।

কোনদিন শ্মশানবাসী হবো
কী ধন সঙ্গে লয়ে যাবো,
কী করি কী কই, ভুতের বোঝা বই
একদিনও ভাবলাম না গুরুর বাণী।।

অনিত্য দেহেতে বাসা
তাইতে এতো আসার আসা,
অধীন লালন বলে, দেহ নিত্য হলে
আর কতো কী করতাম না জানি।।

পণ্ডিত শিল্পী এই পদ শোনার পর কোনো বোধদয় হয়েছিল কিনা তাও আমার জানা নেই। তারপর তার সাথে আর কোনোদিন দেখাও হয় নি। সেই রাতেও আর সাক্ষাৎ হয়নি। তিনি আখড়া ঘর ছেয়ে সেই যে গেলেন আর ফিরেন নি রাতে।

আমরা সকলেই অনেক সময় ধরে চুপচাপ বসে ছিলাম। হয়তো গোঁসাই চোখ বন্ধ করে স্থির বসে ছিলেন বলেই সকলে চুপ ছিল। বা এমনো হতে পারে সকলেই সাঁইজির পদের ভাবের গভীরে প্রবেশ করেছিলাম। আমি পদের কথা মনে রাখতে পারি না।

তারপরও মাথার ভেতর বারবার যেন প্রতিধ্বনি হয়েই চলছিল- “বিষয় ছাড়িয়ে কবে/মন আমার শান্ত হবে।” আসলেই বিষয়ের যে বিষ মন-মস্তিষ্কে নিয়ে আমরা ঘুরে বেড়াই। এর থেকে মু্ক্তি না পেলে মন কি শান্ত হবে??

সাঁইজি তার খেলা এখনো খেলেই যাচ্ছেন। খেলা বন্ধ হয়নি। তিনি এখনো খুলে দেন নি তাঁর দ্বার অবারিত করে। এখনো কঠিন নিয়মের আড়ালে বন্দি আছে লালন আখড়া। বেলা করে খোলা হয় ধাম। আবার সন্ধ্যা ছয়টা বাজতে না বাজতেই গেটে লেগে যায় তালা। যেখানে সারাদেশের সকল দরবার। ধাম খোলা।

সাঁইজির দরজা বন্ধ হওয়ার মৌজেজা বুঝতে হলে আরো অনেকটা সময় দিতে হবে। কোথায় ভুল হচ্ছে আমাদের সেটা স্পষ্ট হবেই হবে। কেনো সাঁইজি মুখি ফিরিয়ে নিয়েছেন। সাঁইজির ঝলক সাঁইজি দিয়েছেন। এখন সময় আমাদের। আমাদের নিজেদের সংশোধন করে নেয়ার।

সেটা যথাযথ সময় যর্থাথতার সাথে নিতে পারলে তবে যদি ক্ষমা পাওয়া যায়। তবে যদি চরণ পাওয়া যায়। যদি একটি বার প্রাণ খুলে চিৎকার করে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে বলা যায়-

দাসের পানে একবার চাও হে দয়াময়
বড় সঙ্কটে পড়িয়া এবার,
বারে বারে ডাকি তোমায়
ক্ষমো ক্ষমো অপরাধ।।”

কবে আমার দয়াল চাঁদের দয়া হবে। কবে আমায় তিনি চরণে ঠাই দিবেন। কবে হয়ে মন শান্ত। কিন্তু মনে একই শঙ্কা- “এবার যদি না পাই চরণ, আবার কি পরি ফেরে।”

যারা শেষ পর্যন্ত কথা বললেন না। যারা নিজেদের বাঁচাতে অকেজো কিছু যুক্তি তৈরি করে রাখলেন আমাদের বলবেন বলে। তাদের প্রতি সেই ভক্তি কি আমি রাখতে পারবো? তারাই বা আমাকে কি সেই স্নেহে গ্রহণ করবেন??

আজ না হয় কাল। কথা হবেই। আমাকেও প্রশ্ন তুলতে হবে। তাদেরকেও উত্তর দিতে হবে। কেবল মিঠে মিঠে কথায় জীবন তো চলবে না। জীবন কখনো কখনো তো মুখোমুখি করেই নিজেকে নিজের। তাই না?

একটা সময় ছিল যখন বই মেলায় যাওয়ার আগে সারাবছর ধরে করা তালিকা নিয়ে যেতাম। এক এক করে খুঁজে খুঁজে বই কিনতাম। সাথে যুক্ত হতো নতুন প্রকাশিত বই। ২১ তারিখের পর বই কেনা শুরু হতো। সেসময় বই কেনায় মিলতো নানান ছাড়।

তেমনি এক তালিকা নিয়ে একবার হন্তদন্ত হয়ে ছুঁটছি বই মেলার দিকে। দোয়েল চত্বর পার হতেই এক পরিচিত বড় ভাইয়ের সাথে দেখা। তিনি ধরে নিয়ে গেলেন চায়ের দোকানে। শুরু করে দিলেন গল্প।

কিছুতেই ছাড়েন না। আমার মন পড়ে আছে মেলায়। কিনতে হবে বই তালিকা ধরে। কিন্তু বড় ভাই কিছুতেই কিছু শোনে না। বহুদিন পর দেখা তাই নাকি বিস্তর গল্প জমেছে সেগুলো সব শুনতেই হবে। এবং সেই দিনই শুনতে হবে।

অগত্যা কি আর করা তাকে বুঝিয়ে বললাম। বই মেলা শেষের দিকে চলে এসেছে বইগুলো আজই কিনতে হবে। পরে আর আসার সময় নাও পেতে পারি।

তিনি কিঞ্চিৎ হাসি দিয়ে বললেন- কি কি বই কিনবি লিস্ট এনেছিস? আমি স্বস্তির হাসি দিয়ে সম্মতি সূচক মাথা নাড়তেই। তিনি হাত বাড়িয়ে তালিকাখানা দেখতে চাইলেন। ভাবলাম বিশাল তালিকা দেখে নিশ্চয়ই ছেড়ে দিবেন।

আমি আর সেসব শুনছিলাম না। ব্যাগ খুলে চকচকে নতুন বইগুলো বের করে দেখতে লাগলাম। কিন্তু এ কি? তালিকার কয়েকটা বই সেখানে থাকলেও বেশিভাগই তালিকা বর্হিভূত বই। আর যে পরিমাণ বইয়ের তালিকা করেছি তার কয়েকগুণ বই।

কিন্তু তেমনটি ঘটলো না। চশমা গলিয়ে তালিকা দেখতে দেখতে ফোন করে কাকে যেন দ্রুত আসতে বললেন। মিনিট কয়েক পরেই ছিপছিপে গড়নের অত্যন্ত সুদর্শন এক যুবক এসে উপস্থিত।

তার হাতে বড় ভাই তালিকাখানা ধরিয়ে দিয়ে বললো। যা বই গুলো নিয়ে আস্ তো। আমরা এখানে বসেই গল্প করছি। তাড়াতাড়ি আয়।

আমি মাথা নাড়তে শুরু করলাম। নিজে নেড়েচেড়ে বই কিনতে না পারলে কি আর মন ভরে? কিন্তু কে শোনে কার কথা।

আমি মেজাজ গরম করে বড় ভাইয়ের নানান মজাদার সব গালগল্প শুনতে লাগলাম নিরুপায় হয়ে। করবার তো আর কিছু নাই। বড় ভাই বলে কথা। কিন্তু উসপিস উসপিস ভাবটা অবজ্ঞা করতে পারছিলাম না কিছুতেই।

যাক বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। সেই ছেলে হাসি হাসি মুখে দুই হাত ভর্তি করে বেশ কয়েকটা ব্যাগে অনেক অনেক বই নিয়ে উপস্থিত। সে নতজানু হয়ে বড় ভাইয়ের কানে কানে কি বলে ব্যাগ দিয়ে চলে গেলো।

বড় ভাই বেশ ভাব নিয়ে ব্যাগগুলো আমার দিকে ঠেলে দিয়ে বললো, দেখ তালিকা থেকে বেশিই আছে। এইবার অস্থিরতাটা একটু কমা। পাত্তা তো দিতে চাস না। দেখছিস এক ফোনে সব হয়ে গেলো।

আর শোন এই ছেলেন নাম্বারটা নিয়ে রাখবি। যা বই লাগে শুধু ফোন দিয়ে আমার কথা বলবি। দেখবি তৎক্ষণাৎ হাজির।

আমি আর সেসব শুনছিলাম না। ব্যাগ খুলে চকচকে নতুন বইগুলো বের করে দেখতে লাগলাম। কিন্তু এ কি? তালিকার কয়েকটা বই সেখানে থাকলেও বেশিভাগই তালিকা বর্হিভূত বই। আর যে পরিমাণ বইয়ের তালিকা করেছি তার কয়েকগুণ বই।

মনে মনে ভাবছি এসব বই কি এখন টাকা দিয়ে নিতে হবে??

বড়ভাই সে কথা বুঝে বললো। শোন টাকা পয়সা লাগবে না। সব তুই নিয়ে যা। তোর তালিকা থেকে বেশিই আছে। ওর হাতে সময় কম তো তাই তোর তালিকা ধরে সব খুঁজে বের করতে পারে নাই। তবে তালিকাটা রাখছে পেলে আমাকে ফোন দিবে। তখন তুই নিয়ে যাস।

আমি তো খুশিতে আটখানা। বিনে টাকায় এতোগুলো বই?? তারমানে টাকার হিসেবে যেসব বই তালিকায় ঠাই দিতে পারি নাই সেগুলোও সেই টাকায় কেনা যাবে। বড় ভাইকে বললাম, বই এনে দিলো টাকা নেবে না? উনি কি রাজনৈতিক নেতা নাকি?? নাকি টাকা আপনি দিবেন??

বড় ভাই হা হা করে হেসে বললো, শোন এতো বই কিনে তোকে দিতে যাব কেনো? আমার কি খেয়ে দেয়ে কাজ নাই। চা-সিগারেট পর্যন্ত ঠিক আছে। তাই বলে হাজার হাজার টাকা বই দিবো নাকি তোকে।

আমি নিচু বললাম- তাহলে আপনি কি তাকে টাকা দেবেন না?? উনাকে ফোন দিনে আনেন। যে বইগুলোর তালিকার বাইরে সেগুলো ফেরতে নিয়ে যাক। আর যেগুলো আমার তালিকায় ছিল তার দাম আমি দিয়ে দিচ্ছি।

এই বিদ্যা-বুদ্ধিহীন ভাব নিয়ে কি করে যে ভাবি বা ভাববার চেষ্টা করি। সেই যাতনা আমার মতো বিদ্যাশূন্য হীন মানুষরাই কেবল টের পাবে। বাকিদের বোঝাবার সাধ্য নেই। সেই চেষ্টাও নেই। আমি কেবল বুঝি যে লালন ফকির বেদ বিধি মানেন না।

বড় ভাই বললো- শোন বেশি পাকনামি করিস না। যা দিয়েছি নিয়ে সোজা বাসায় চলে যাবি, আমার গল্প শেষ হলে। চুরির বই কি আর ফেরত দেয়া যায় নাকি গাধা।

আমি অবাক হয়ে বললাম, উনি চোর?? এতো দ্রুত এতোগুলো বই চুরি করে আনলেন??

বড় ভাই বললো- ওদের একটা গ্রুপ আছে। সব কয়টা স্মার্ট ছেলেমেয়ে। মুহূর্তে বই নিয়ে চম্পট। আমাকে বিশেষ ভক্তি করে। আমি কোনো বই চাইলে টাকা পয়সা নেয় না। আমার ছোটভাই বলে তোর কাছ থেকেও নিলো না।

সবশেষে সাধুগুরুপাগলভক্ত সর্বচরণে পাপীর মস্তক দণ্ডপাত। ভুল-ত্রুটি ক্ষমা ভিক্ষা করে একটাই আবেদন। সাধুগুরু আপনাদের বিচ্ছিন্নতাই ওরা শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এই সুযোগ দেয়ার কোনো মানে থাকতে পারে না। অন্ত্যত পরমগুরুর ভক্তিতে একত্ব হওয়ার ভিন্ন কোনো পথ আর উন্মুক্ত নেই।

তবে এটা তোর জন্য প্রথমবার বলে ফ্রি। পরে আবার ফ্রি’র ধান্দা করিস না। তাইলে কিন্তু মাইরা তক্তা বানায়া দিবো আমি। হাজার হলেও এটা ওদের পেশা।

চুরি করা বই নিতে একটু সঙ্কোচ হচ্ছিল বটে। কিন্তু এতোগুলো বই ফিরিয়ে দিতে তারচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছিল। আবার এতোগুলো বই পেয়ে আনন্দের মাত্রাও ছিল চরমে।

বই এমন একটা জিনিস যা চুরি করে নিতেও আপত্তি থাকে না। বেচে যাওয়া টাকা দিয়ে আরো অনেকগুলো বই কেনা যাবে এই খুশিতে এক গাদা অখাদ্য বই সহ কাঙ্খিত বই নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

এই গল্প শুনে কৈশরের প্রেমিকা বলেছিল, চুরি করা বই দিয়ে বিদ্যা হয় না।

ঘটনা হয়তো তাই। তাই আমার আর বিদ্যা-বুদ্ধি হলো না। তাই সকলের মতো ভাবতে পারি না। শিক্ষিত মানুষরা যেখাবে ভাবে সেই ভাবনাগুলো ঠিকঠাক মতো ধরতে পারি না। ভোগী মানুষের ভাব-ভাবনা কিছুই বুঝি না।

এই বিদ্যা-বুদ্ধিহীন ভাব নিয়ে কি করে যে ভাবি বা ভাববার চেষ্টা করি। সেই যাতনা আমার মতো বিদ্যাশূন্য হীন মানুষরাই কেবল টের পাবে। বাকিদের বোঝাবার সাধ্য নেই। সেই চেষ্টাও নেই। আমি কেবল বুঝি যে লালন ফকির বেদ বিধি মানেন না।

তিনি শোকেসে সাজানো অবতার হতে ধরায় আসেন নি। তিনি ধরায় এসেছেন মানবকুলকে বিনয় শেখাতে, অহঙ্কার নির্বাসনে দেয়ার পথ দেখাতে, ক্রোধীকে-কামীকে প্রেমিক বানাতে, লোভী-মোহীকে সমর্পন ভাব শেখাতে। সেই লালন কেন তার দরজা বন্ধ করেছেন ভক্তকুলের জন্য??

ভাবতে হবে বৈকি! ভাববার সময় বয়ে চলেছে। আমাদের বিচ্ছিন্নতাকে দূর করতে হবে। ভাবনাকে সামগ্রিক করতে হবে। একসাথে চিৎকার করে বলতে হবে। লালন কুক্ষিগত করে রাখবার চেষ্টা সফল হবে না। লালনকে দমন করার ভাবনাও কার্যকর হবে না।

সবশেষে সাধুগুরুপাগলভক্ত সর্বচরণে পাপীর মস্তক দণ্ডপাত। ভুল-ত্রুটি ক্ষমা ভিক্ষা করে একটাই আবেদন। সাধুগুরু আপনাদের বিচ্ছিন্নতাই ওরা শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এই সুযোগ দেয়ার কোনো মানে থাকতে পারে না। অন্ত্যত পরমগুরুর ভক্তিতে একত্ব হওয়ার ভিন্ন কোনো পথ আর উন্মুক্ত নেই।

একত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে এ হার কেবল আমার বা আমার মতো ভাবনার মানুষদের নয়। এই হার হবে সকলের। আর এর জন্য ভুগতেও হবে সকলকে। আমাদের বিচ্ছিন্নতায় যেন উগ্র-মৌলবাদীদের অট্টহাসি শুনতে না হয়। আমাদের কৃপা করুন। জয়গুরু।।

সাঁইজির এই পদটাই মনে পরছে এই বেলায়-

নবী এ কি আইন করিলেন জারি।
পিছে মারা যায় আইন তাই ভেবে মরি।।

শরিয়ত আর মারেফত আদায়
নবীর হুকুম এই দুই সদাই,
শরা শরিয়ত মারেফত নবুয়ত
বেলায়েত জানতে হয় গভীরই।।

নবুয়ত অদেখা ধ্যান বেলায়েত রূপের নিশান
নজর একদিক আর একদিক আঁধার হয়
দুই রূপে কোন রূপ ঠিক ধরি।।

শরাকে সরপোষ লেখা যায়
বস্তু মারেফত ঢাকা আছে তায়,
সরপোষ থুই কি তুলে দিই ফেলে
লালন তেমনই বস্তু ভিখারি।।

(চলবে…)

…………………………..
আরো পড়ুন:
মাই ডিভাইন জার্নি : এক :: মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার
মাই ডিভাইন জার্নি : দুই :: কবে সাধুর চরণ ধুলি মোর লাগবে গায়
মাই ডিভাইন জার্নি : তিন :: কোন মানুষের বাস কোন দলে
মাই ডিভাইন জার্নি : চার :: গুরু পদে মতি আমার কৈ হল
মাই ডিভাইন জার্নি : পাঁচ :: পাপীর ভাগ্যে এমন দিন কি আর হবে রে
মাই ডিভাইন জার্নি : ছয় :: সোনার মানুষ ভাসছে রসে
মাই ডিভাইন জার্নি : সাত :: ডুবে দেখ দেখি মন কীরূপ লীলাময়
মাই ডিভাইন জার্নি : আট :: আর কি হবে এমন জনম বসবো সাধুর মেলে
মাই ডিভাইন জার্নি : নয় :: কেন ডুবলি না মন গুরুর চরণে
মাই ডিভাইন জার্নি : দশ :: যে নাম স্মরণে যাবে জঠর যন্ত্রণা
মাই ডিভাইন জার্নি : এগারো :: ত্বরাও গুরু নিজগুণে
মাই ডিভাইন জার্নি : বারো :: তোমার দয়া বিনে চরণ সাধবো কি মতে
মাই ডিভাইন জার্নি : তেরো :: দাসের যোগ্য নই চরণে
মাই ডিভাইন জার্নি :চৌদ্দ :: ভক্তি দাও হে যেন চরণ পাই

মাই ডিভাইন জার্নি: পনের:: ভক্তের দ্বারে বাঁধা আছেন সাঁই
মাই ডিভাইন জার্নি : ষোল:: ধর মানুষ রূপ নেহারে
মাই ডিভাইন জার্নি : সতের:: গুরুপদে ভক্তিহীন হয়ে
মাই ডিভাইন জার্নি : আঠার:: রাখিলেন সাঁই কূপজল করে
মাই ডিভাইন জার্নি :উনিশ :: আমি দাসের দাস যোগ্য নই

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!