সতী মাতা রামশরণ কর্তভজা

রামশরণ ও সতীমার দীক্ষা গ্রহণ

রামশরণ পাল ১৭২৪/২৫ খ্রীষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৭৮৩ খ্রীষ্টাব্দে পরলােক গমন করেন। রামশরণ বাল্যকাল হতেই ছিলেন নম্র বিনয়ী, সৎচরিত্রবান ও ধর্ম পরায়ণ, তারপর সিদ্ধ মহাপুরুষ ফকির ঠাকুরের দর্শন পেয়ে সংসারের শত কাজের মাঝেও তিনি অধিকাংশ সময় ঠাকুরের সাথে ধর্মীয় আলাপ আলােচনা করে সময় কাটাতেন।

রামশরণের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালাে ছিল না। তারপর ফকির ঠাকুরের সঙ্গ পেয়ে সংসারের কাজকর্মে ঠিকমত মনযােগ না দেওয়ায় সংসারে অভাব অনটন দেখা দিল। এমতাবস্থায় একদিন রামশরণ ফকির ঠাকুরের সঙ্গে বসে কথােপকথন করছেন এমন সময় সরস্বতী (সতীমা) সেখানে উপস্থিত হয়ে বললেন ঠাকুর এমনিতেই সংসারে অভাব অনটন, তার পরেও যদি- ঠিকমত সংসারের কাজকর্ম না করা হয় তা হলে সংসার চলবে কি করে।

ফকির ঠাকুর সরস্বতীর কথা শুনে বললেন, রামশরণের আমার কাছে আসতে হয়তাে ভাল লাগে, এ জন্য তুই ওকে কিছু বলিসনে মা। সতীমা পুনরায় সংসারের অসচ্ছলতার কথা বললে ফকির ঠাকুর নিকটবর্তী একটা গাছ দেখিয়ে বললেন ঐ গাছের গােড়ায় কতকগুলি পাতা সরিয়ে দেখ ওখানে সংসারের প্রয়াজন মেটানাের মত কিছু অর্থ আছে ওগুলাে নিয়ে যা, সংসারের অভাব ঘুঁচে যাবে।

সরস্বতী বললেন সে তাে ঠাকুরের কৃপা মাত্র, ঠাকুরের কৃপা হলে সব-ই সম্ভব। সরস্বতীর অটল বিশ্বাস ও ঐকান্তিক ভক্তি দেখে ঠাকুর ভাবলেন আমি সংসারাবদ্ধ জীবের জন্য যে সত্যরত্ন এনেছি এবং এই সত্যরত্ন দেওয়ার জন্য যে গ্রাহক খুঁজে বেড়াচ্ছি, এতদিনে বুঝি সেই গ্রাহক পেয়েছি।

ফকির ঠাকুরের কথামত সতীমা সেই গাছের গােড়ায় গিয়ে কিছু পাতা সরিয়ে দেখতে পেলেন সােনা রূপাসহ বহু অর্থ, যে অর্থ দিয়ে সারা জীবন নিশ্চিন্তায় সংসার চলবে, সরস্বতী ঠাকুরের অলৌকিক ক্ষমতায় হতবাক হয়ে গেলেন, তারপর কাপড়ের আঁচলে যথাসাধ্য সােনা-রূপা, অর্থ নিয়ে গৃহের দিকে রওনা হলেন।

কিছুদূর যাওয়ার পর সরস্বতীর মনে হল এত অর্থ ফকির ঠাকুর কোথায় পেলেন? এটা তাে তাঁর রােজগার করা নয়, নিশ্চয় এটা ঠাকুরের ঐশ্বরিক ক্ষমতা, যে ক্ষমতায় পায়ে হেটে গঙ্গানদী পার হওয়া যায়, সদানন্দের দুরারােগ্য ব্যাধি মুহূর্তের মধ্যে-ই ভাল হয়, এই কথা চিন্তা করতে করতে সরস্বতীর মনে এক ভাবাবেশ সৃষ্টি হল এবং ফিরে গিয়ে ফকির ঠাকুরের চরণে ঐ সােনা-রূপা, অর্থ সম্পদ ফেলে দিয়ে বললেন এই অর্থ সম্পদ, রত্নালঙ্কার দিয়ে এ অধমকে ভুলালে হবে না।

যে ধন পেয়ে এই রত্নালঙ্কার ত্যাগ করেছ, আমাকে সেই ধনরত্ন দাও, আমি এই রত্নালঙ্কার চাই না ঠাকুর, আমাকে ক্ষমা কর ঠাকুর, আমাকে দয়া কর ঠাকুর, এই বলতে বলতে সরস্বতী ফকির ঠাকুরের চরণ ধরে কাঁদতে লাগলেন। ফকির ঠাকুর বললেন এই রত্ন নিতে হলে ঐ রত্নালঙ্কার অর্থ সম্পদের মােহ যে ত্যাগ করতে হবে ‘মা’ কারণ আলাে-আঁধার, দিন-রাত তাে এক সাথে পাওয়া যায় না ‘মা’।

সরস্বতী তৎক্ষনাৎ ঐ সােনা-রূপা, রত্নালঙ্কার কুড়িয়ে নিয়ে দূরে নিক্ষেপ করে বললেন ওগাে ঠাকুর যে রত্ন পেলে মানব জীবন এর উদ্দেশ্য সফল হয় আমাকে সেই রত্ন দাও ঠাকুর। ফকির ঠাকুর বললেন এই সত্যরত্ন গ্রহণ করতে হলে এর নীতি-আদর্শ, বিধি-নিষেধ পালনের জন্য বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে তা পারবি তাে মা?

সরস্বতী বললেন সে তাে ঠাকুরের কৃপা মাত্র, ঠাকুরের কৃপা হলে সব-ই সম্ভব। সরস্বতীর অটল বিশ্বাস ও ঐকান্তিক ভক্তি দেখে ঠাকুর ভাবলেন আমি সংসারাবদ্ধ জীবের জন্য যে সত্যরত্ন এনেছি এবং এই সত্যরত্ন দেওয়ার জন্য যে গ্রাহক খুঁজে বেড়াচ্ছি, এতদিনে বুঝি সেই গ্রাহক পেয়েছি।

ঠাকুর যখন সরস্বতীকে দীক্ষাদেন তখন সরস্বতী দেখলেন এ ফকির ঠাকুর তাে সাধারণ মানুষ নন, এ যেন জ্যোতির্ময়ী এক মহাপুরুষ, সেই জ্যোতির্ময়ের জ্যোতিতে তার সর্ব শরীর শিহরিত হতে লাগল এবং মন এক গভীর ভাবাবেশে আর্বিভূত হয়ে অপলক নেত্রে ঐ জ্যোতির্ময় মহাপুরুষের অপরূপ রুপ দর্শন করতে লাগলেন আর দৈববাণীর ন্যায় মধুর শব্দ সরস্বতীর কর্ণে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল- সত্যনাম (জয় গুরু সত্য, জয় গুরু সত্য)।

ব্রাহ্মণ্যবাদের আধিপত্য, জাতিভেদের অভিশাপ, বৈদিক ও পৌরাণিক আচার অনুষ্ঠানের বেড়াজালে মানুষ আবদ্ধ। ব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্যের কারণে- ধর্ম-কর্ম, মুষ্ঠিমেয় কিছু উচ্চবর্ণের হিন্দু ও বৈদিক আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

সামাজিক ও পারমার্থিক মুক্তির পথ রূদ্ধ, তাই প্রচলিত কুসংস্কারের বেড়াজাল ভেদ করে মানুষ মানুষের জন্য, সকল মানুষের মধ্যে একই পরমাত্মা বিরাজমান, ধর্ম-কর্মে নারী পুরুষের সমান অধিকার এবং মালিকের নিকট স্তুব-স্তুতি ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে ঈশ্বরের কৃপা লাভ করা যায় এই সহজ তত্ত্ব প্রচারের জন্যই তাে ঠাকুর আউলচাঁদ মহাপ্রভুর আবির্ভাব। তিনি দেখলেন এই উদ্দেশ্য ও আদর্শকে ধারণ করার মত গুণ-ক্ষমতা সরস্বতীর (সতীমা) মধ্যেই বিদ্যমান।

তাই ঠাকুর ভাবলেন এই সত্যরত্ন সরস্বতীকে দান করব। ঠাকুর বললেন মা তাের মনে যে ভাবের উদয় হয়েছে আমার বিশ্বাস তুই পারবি গুরুবাক্য রক্ষা করতে, তবে আবেগের বশবর্তী হয়ে কিছু করিসনে, আজকের মত গৃহে ফিরে যা, মনে যদি সত্যিই পারমার্থিক জগতের মহাভাবের উদয় হয় তাহলে আগামীকাল প্রত্যুষে তােরা স্বামী-স্ত্রী দুজনে একাত্ম মনে শারীরিক ও মানষিক ভাবে পবিত্র হয়ে আমার কাছে আসবি।

আমি তােদের সেই সত্যরত্ন দান করব, যে ধন পেলে ইহ জগতে পাবি শান্তি আর পর জগতে পাবি পারমার্থিক মুক্তি, মালিকের চরণ কমলে ঠাই। অতপর রামশরণ ও সরস্বতী গৃহে ফিরে গেলেন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বাক্য বিনিময়ের মাধ্যমে সরস্বতী ও রামশরণের ভক্তি-বিশ্বাস আরও অটুট হল।

পরদিন প্রত্যুষে স্নানাদি করতঃ পবিত্র হয়ে পিতার অনুমতিক্রমে সত্যরত্ন গ্রহণের জন্য ফকির ঠাকুরের নিকট উপস্থিত হলেন। ফকির ঠাকুর প্রথমে সরস্বতীকে (সতীমা) তারপর রামশরণকে কর্তাভজা ধর্মের বিধিমত ‘সত্যনামে’ দীক্ষা দান করলেন।

ঠাকুর যখন সরস্বতীকে দীক্ষাদেন তখন সরস্বতী দেখলেন এ ফকির ঠাকুর তাে সাধারণ মানুষ নন, এ যেন জ্যোতির্ময়ী এক মহাপুরুষ, সেই জ্যোতির্ময়ের জ্যোতিতে তার সর্ব শরীর শিহরিত হতে লাগল এবং মন এক গভীর ভাবাবেশে আর্বিভূত হয়ে অপলক নেত্রে ঐ জ্যোতির্ময় মহাপুরুষের অপরূপ রুপ দর্শন করতে লাগলেন আর দৈববাণীর ন্যায় মধুর শব্দ সরস্বতীর কর্ণে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল- সত্যনাম (জয় গুরু সত্য, জয় গুরু সত্য)।

এক সত্য কর সার, ভব নদী হবে পার
একটা শব্দ শুনে জবানে শূন্যে শূন্যেতে,
কি হলাে সেই ধ্বণিটি ভালাে লাগলাে কানেতে।।
(ভাবেরগীত, গীত নং- ৮৬, কলি-১)

সরস্বতী ভাবাবেশে তন্ময় হয়ে দেখলেন এ যেন সেই অনাদির আদি, তিনি-ই তাঁর সম্মুখে উদয় হয়েছেন এবং সেই জ্যোতির্ময়ের জ্যোতিতে সরস্বতীর মায়মােহ রূপ অজ্ঞান অন্ধকার লয় প্রাপ্ত হয়ে দিব্য জ্ঞানের আলাে পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় তাঁর হৃদয়ে প্রতিভাত হচ্ছে।

এই নাম স্মরণ করতে করতে এই সত্যনামেই সকল পূর্ণ হবে, নামরস পরশ হলে সমস্ত পৃথিবী তাের বশীভূত হবে, ঘরে বসেই আগম নিগম জানতে পারবে, সদা সর্বক্ষণ এই সত্যনাম স্মরণ, মনন, নিরীক্ষণ করলে সর্বাঙ্গীন মঙ্গল হবে, ধন-সম্পদ-ঐশ্বর্য্য সব কিছুই আপনা আপনিই আসবে, তবে সাবধান-মনে রাখবি ভােগে দুঃখ, ত্যাগে শান্তি।

তাই সরস্বতী ফকির ঠাকুর কে বলেছিলেন পরম গুরু ঠাকুর আ-উ-ল-চাঁদ মহাপ্রভু। ভক্তের মনে অটল বিশ্বাস ও দৃঢ় ভক্তির উদয় না হলে যেমন গুরুর কৃপা হয় না, তেমনি গুরুর কৃপা না হলে ভক্তের মায়ামােহ রূপ অজ্ঞান অন্ধকার দূর হয় না, ভক্তের ভক্তি, বিশ্বাস ও গুরুর কুপা একই সাথে উপস্থিত হলে তখনই ঘটে অলৌকিক ঘটনা, সরস্বতীর জীবনে সেই ঘটনায় ঘটেছিল।

পরম গুরু ঠাকুর আউলচাঁদের কৃপা ও সরস্বতীর অটল ভক্তি বিশ্বাসে সহজ সরল গ্রাম্য গৃহবধু সরস্বতী-ই পরবর্তীকালে হয়েছিলেন বাকসিদ্ধা, দিব্যজ্ঞানী, ঐশ্বরিক ক্ষমতা ও অতিমানবীয় গুণাবলীর অধিকারিণী পরম পূঁজনীয় সতীমা।

ঠাকুর আউলচাঁদ মহাপ্রভু সতীমা ও রামশরণকে সত্যনামে দীক্ষা দেওয়ার পর বললেন, এই ‘সত্যনাম’ মহামন্ত্র সদাসর্বদা স্মরণ রাখবি এবং প্রত্যহ ব্রহ্মমুহূর্ত, মধ্যাহ্ন, স্বায়ং ও মধ্যরাত্রি এই চারবার নিয়মিত শুদ্ধাসনে, শুদ্ধমনে, সংযত চিত্তে, পবিত্রভাবে নাম স্মরণ করবি।

এই নাম স্মরণ করতে করতে এই সত্যনামেই সকল পূর্ণ হবে, নামরস পরশ হলে সমস্ত পৃথিবী তাের বশীভূত হবে, ঘরে বসেই আগম নিগম জানতে পারবে, সদা সর্বক্ষণ এই সত্যনাম স্মরণ, মনন, নিরীক্ষণ করলে সর্বাঙ্গীন মঙ্গল হবে, ধন-সম্পদ-ঐশ্বর্য্য সব কিছুই আপনা আপনিই আসবে, তবে সাবধান-মনে রাখবি ভােগে দুঃখ, ত্যাগে শান্তি।

সদাসর্বদা আমিত্ব ভাব বর্জন করে চলবি মনে বিন্দুমাত্র অহংকার না আসে, দেহ-মন ও বাক্য সর্বদা অহংকার হতে দূরে রাখবি কারণ অহংকার পতনের মূল, কোন অবস্থাতেই কর্তা সাজবি না, মনে রাখবি-গােলামীর কোন হিসাব নেই।

ঠাকুর আউলচাঁদ তার ভক্তদের বহু মূল্যবান উপদেশ দিয়েছিলেন, এ গুলােকে বলা হয় ট্যাকশালী, তবে এই ট্যাকশালী সম্পূর্ণ বাজারের জন্য নয় অর্থাৎ সাধারণের জন্য নয়, যারা সাধন মার্গ অবলম্বন করবে শুধু তাদের জন্য।

ঠাকুর আউলচাঁদ সতীমা ও রামশরণকে আরও বললেন এই সত্যরত্ন ‘সত্যনাম’ সযত্নে লালন করলে অসাধ্য সাধন হবে, তবে এজন্য কয়েকটি বিধি-নিষেধ অবশ্যই পালন করতে হবে, এ গুলাে কর্তাভজা ধর্মের- মূলনীতি।

কর্তাভজা সম্প্রদায়ের দশ আজ্ঞা>>

……………..
‘সতীমা ও সত্যদর্শন’ বই থেকে সংগৃহীত

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

……………..
আরও পড়ুন-
কর্তাভজা ধর্মের ইতিহাস
ঠাকুর আউলচাঁদের আবির্ভাব
গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ভুক্ত ভক্তদের বিশ্বাস
রামশরণ ও সতীমার দীক্ষা গ্রহণ
কর্তাভজা সম্প্রদায়ের দশ আজ্ঞা
সতীমা কে?
শূদ্র কারা?
ঘোষপাড়ার ডালিম তলা ও হিমসাগরের মাহাত্ম্য
কর্তাভজার বাইশ ফকির
আউলচাঁদের তিরােধান
দুলালচাঁদ
সতীমায়ের উপদেশ বাণী
ঘোষপাড়ার রথযাত্রা উৎসব
সতীমার তিরােধান
কর্তাভজা ধর্মের মূলস্তম্ভ

ত্রিশ ধারা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!