সালমান আল-ফারেসী: চার

সালমান আল-ফারেসী: চার

-নূর মোহাম্মদ মিলু

তারপর আমি নবীজী নির্দেশে গর্ত খুড়লাম। তিনি নিজেই একদিন আমার সাথে সেখানে গেলেন। আমি তাঁর হাতে একটি করে চারা তুলে দিলাম, আর তিনি সেটা রোপন করলেন। আল্লাহর কসম, তাঁর একটি চারাও মারা যায়নি।

(ঐতিহাসিকরা বলছেন, সালামান রা. একটি মাত্র চারা রোপন করেছিলেন, আর সেটাই মারা যায়। বাকী সবগুলোই রাসূলসা. রোপন করেছিলেন এবং সবগুলোই বেঁচে যায়।)

এভাবে আমি আমার চুক্তির একাংশ পূরণ করলাম, বাকী থাকলো অর্থ।

একদিন নবীজী আমাকে ডেকে মুরগীর ডিমের মত দেখতে স্বর্ণজাতীয় কিছু পদার্থ আমার হাতে দিয়ে বললেন, যাও, তোমার চুক্তি মোতাবেক পরিশোধ কর। আমি বললাম, এতে কি তা পরিশোধ হবে? তিনি বরলেন- ‘ধর, আল্লাহ এতেই পরিশোধ করবেন।’ আল্লাহর কসম, আমরা ওজন করে দেখলাম তাতে চল্লিশ উকিয়াই আছে।

এভাবে সালমান তার চুক্তি পূরণ করে মুক্তিলাভ করেন। গোলামী থেকে মুক্ত হয়ে মুসলমানদের সাথে বসবাস করতে থাকেন। তখন তাঁর কোন ঘর-বাড়ি ছিল না। নবীজী অন্যান্য মুহাজিরদের মত প্রখ্যাত আনসারী সাহাবী আবু দারদার রা. সাথে তাঁর মুওয়াখাত বা ভ্রাতু-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন।

গোলামীর কারণে হজরত সালমান বদর ও উহুদ যুদ্ধে শরীক হতে পারেন নি। গোলামী থেকে মুক্ত হওয়ার পর খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয। এ যুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে পূর্ববর্তী দু’টি যুদ্ধে অনুপস্থিতির ক্ষতি পুষিয়ে নেন।

সারা আরবের বিভিন্ন গোত্র কুরাইশদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মদীনা আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। খবর পেয়ে নবীজী সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করেন। অনেকে অনেক রকম পরামর্শ দেন। সালমান বলেন, পারস্যে পরিখা খনন করে নগরের রক্ষা করা হয়। মদীনার অরক্ষিত দিকে পরিখা খনন করে নগরীর হিফাজত করা সমীচীন।

এ পরামর্শ নবীজী মনঃপূত হয়। মদীনার পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে সুদীর্ঘ পরিখা খনন করে বিশাল কুরাইশ বাহিনীর আক্রমণ সহজে প্রতিরোধ করা হয়। নবীজী নিজেও এই পরিখা বা খন্দক খননের কাজে অংশগ্রহণ করেন।

কুরাইশ বাহিনী মদীনার উপকণ্ঠে এসে এ অপূর্ব রণ-কৌশল দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায়। ২১/২২ দিন মদীনা অবরোধ করে বসে থাকার পর শেষে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। খন্দকের পর যত যুদ্ধ হয়েছে তার প্রত্যেকটিতে সালমান অংগ্রহণ করেছেন।

নবীজীর ওফাতের পর সালমান বেশ কিছুদিন মদীনায় অবস্থান করেন। সম্ভবতঃ হজরত আবু বকরের খিলাফতের শেষে অথবা হজরত ’উমারের খিলাফতের প্রথম দিকে তিনি ইরাকে এবং তাঁর দ্বীনী ভাই আবু দারদা সিরিয়ায় বসতি স্থাপন করেন।

তিনি হজরত ওমরের যুগে ইরান বিজয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। মুসিলম মুজাহিদদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধ করেন। জালুলু বিজয়েও তিনি অংশগ্রহণ করেন। হজরত ওমর তাকে মাদায়েনের ওয়ালী নিযুক্ত করেন। হজরত উসমানের খিলাফতাকলে তিনি মারা যান।

ইসলম গ্রহণের পর হজরত সালমানের জীবনের বেশির ভাগ সময় অতিবাহিত হয় নবীজী সুহবতে। এ কারণে তিনি ইলম ও মা’রেফাতে বিশেষ পারদর্শিতা লাভ করেন। হজরত আলীকে তাঁর ইল্‌ম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে বলেন- ‘সালমান ইলম ও হিকমতের ক্ষেত্রে লুকমান হাকীমের সমতুল্য।’

অন্য একটি বর্ণনা মতে তিনি বলেন- ‘ইলমে আউয়াল ও ইলমে আখের সকল ইলমের আলিম ছিলেন তিনি।’

ইলমে আখের অর্থ কোরানের ইলম। আরবে তার কোন আত্মীয় ও খান্দান ছিল না, তাই নবীজী তাঁকে আহলে বাইতের সদস্য বলে ঘোষণা করেন। হজরত মুয়াজ বিন জাবাল, যিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট আলিম ও মুজতাহিদ সাহাবী, বলেন- চার ব্যক্তি থেকে ইলম হাসিল করবে। সেই চারজনের একজন সালমান।

হজরত সালমান থেকে ষাটটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তার মধ্যে তিনটি মুত্তাফাক আলাইহি, একটি মুসলিম ও তিনটি বুখারী এককভাবে বর্ণনা করেছেন। আবু সাঈদ খুদরী, আবুত তুফাইল, ইবন আব্বাস, আউস বিন মালিক ও ইবন আজযা রা. প্রমুখ বিশিষ্ট সাহাবী তাঁর ছাত্র ছিলেন।

হজরত সালমান সেইসব বিশিষ্ট সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত যাঁরা নবীজী বিশেষ নৈকট্য লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেন। হজরত আয়েশা রা. বলেন- ‘নবীজী যেদিন রাতে সালমানের সাথে নিভৃতে আলোচনা করতে বসতেন, আমরা তাঁর স্ত্রীরা ধারণা করতাম সালমান হযতো আজ আমাদের রাতের সান্নিধ্যটুকু কেড়ে নেবে।’

যুহুদ ও তাকওয়ার তিনি ছিলেন বাস্তব নমুনা। ক্ষণিকের মুসাফির হিসেবে তিনি জীবন যাপন করেছেন। জীবনে কোন বাড়ি তৈরি করেন নি। কোথাও কোন প্রাচীর বা গাছের ছায়া পেলে সেখানেই শুয়ে যেতেন। এক ব্যক্তি তাঁর কাছে ইজাযত চাইলো, তাঁকে একটি ঘর বানিয়ে দেওয়ার। তিনি নিষেধ করলেন।

বার বার পীড়াপীড়িতে শেষে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কেমন ঘর বানাবে? লোকটি বললো- এত ছোট যে, দাঁড়ালে মাথায় চাল বেঁধে যাবে এবং শুয়ে পড়লে দেয়ালে পা ঠেকে যাবে। এ কথায় তিনি রাজী হলেন। তাঁর জন্য একটি ঝুপড়ি ঘর তৈরি করা হয়।

হজরত হাসান রা. বলেন- ‘সালমান যখন পাঁচ হাজার দিরহাম ভাতা পেতেন, তিরিশ হাজার লোকের উপর প্রভুত্ব করতেন তখনও তাঁর একটি মাত্র ‘আবা’ ছিল। তার মধ্যে ভরে তিনি কাঠ সংগ্রহ করতেন। ঘুমানোর সময় আবাটির এক পাশ গায়ে দিতেন এবং অন্য পাশ বিছাতেন।’

হজরত সালমান যখন অন্তিম রোগ শয্যায়, হজরত সা’দ বিন আবী ওয়াক্‌কাস রা. তাঁকে দেখতে যান। সালমান কাঁদতে শুরু করলেন। সা’দ বললেন- আবু আবদিল্লাহ, কাঁদছেন কেন? নবীজী তো আপনার প্রতি সন্তুষ্ট অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। হাউজে কাওসারের নিকট তাঁর সাথে আপনি মিলিত হবেন।

বললেন- আমি মরণ ভয়ে কাদঁছিনে। কান্নার কারণ হচ্ছে, নবীজী আমাদের নিকট থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, আমাদের সাজ-সরঞ্জাম যেন একজন মুসাফিরের সাজ-সরঞ্জাম থেকে বেশি না হয়। অথচ আমার কাছে এতগুলো জিনিসপত্র জমা হয়ে গেছে। সা’দ বলেন- সেই জিনিসগুলো একটি বড় পিয়ালা, তামার একটি থালা ও একটি পনির পাত্র ছাড়া আর কিছুই নই।

(সমাপ্ত)

……………………………….
আরো পড়ুন:
সালমান আল-ফারেসী: এক
সালমান আল-ফারেসী: দুই

সালমান আল-ফারেসী: তিন
সালমান আল-ফারেসী: চার

……………………………….
স্থিরচিত্র: সংগ্রহ

** সালমান আল-ফারেসীর কোনো ছবি পাওয়া যায় না। লেখায় ব্যবহৃত ছবির সাথে ফারেসীর কোনো সম্পর্ক নেই।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!