তথাগত গৌতম বুদ্ধ বৌদ্ধ ভগবান

স্বামীজী বুদ্ধকে কি চক্ষে দেখিতেন : দ্বিতীয় কিস্তি

-ভগিনী নিবেদিতা

এক সময়ে সেটা ছিল, কিন্তু এখন গত। হে মানব, জেনো যে, তুমি সাগরস্বরূপ!” তিনি আরও বলিলেন, “মহর্ষি কপিলও এই দর্শনই প্রচার করেন; কিন্তু তার মহানুভব শিষ্যের (বুদ্ধের) অদ্ভুত হৃদয় সেই দর্শনকে জীবন্ত করে তোলে।”

তারপর সেই পুরুষশ্রেষ্ঠের কথাগুলি অন্তরে ধ্বনিত হওয়ায় তিনি ক্ষণকালের জন্য নীরব রহিলেন। পরে ধম্মপদ হইতে মানবাত্মার প্রতি তাহার অমর আদেশবাণী আবৃত্তি করিলেন, “কোন নির্দিষ্ট পথের দিকে লক্ষ্য না রেখে ক্রমাগত এগিয়ে যাও! নির্ভীক অন্তরে, সমস্ত তুচ্ছ করে একাকী গণ্ডারবৎ বিচরণ কর।”

“সিংহ যেমন কোন শব্দে ভীত হয় না, বায়ু যেমন জালে বদ্ধ হয় না, পদ্মপত্র যেমন জলে লিপ্ত হয় না, তুমিও তেমনি একাকী গণ্ডারবৎ বিচরণ কর।”

একদিন স্বামীজী বৌদ্ধদের প্রথম সভা এবং তাহাদের সভাপতি নির্বাচন সম্পর্কে বিবাদ- এই প্রসঙ্গ বর্ণনা করিতে গিয়া বলিলেন, “তাদের তেজ কিরূপ ছিল, তোমরা কি তা কল্পনা করতে পার? একজন বললেন, ‘আনন্দই সভাপতি হবে, কারণ সেই তাকে সর্বাপেক্ষা ভালবাসত।’

কিন্তু আর একজন অগ্রসর হয়ে বললেন, ‘তা হবে না। কারণ আনন্দ তার মৃত্যুশয্যায় ক্রন্দন করার অপরাধে অপরাধী। সুতরাং তাকে বাদ দিয়ে অন্য ব্যক্তিকে নির্বাচন করা হলো।”

তিনি বলিতে লাগিলেন, “কিন্তু বুদ্ধ মারাত্মক ভুল করেছিলেন এই ভেবে যে, সমগ্র জগৎকে উপনিষদের উচ্চ আদর্শে উন্নীত করা যেতে পারে। ফলে স্বার্থপরতা সমস্ত নষ্ট করে দিল। শ্রীকৃষ্ণ বুদ্ধের চেয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন, কারণ তিনি দেশকাল-পাত্র বুঝে কাজ করবার কৌশল জানতেন কিন্তু বুদ্ধের কাছে কোন আপস ছিল না।

জগতের ইতিহাসে ইতিপূর্বেই দেখা গেছে যে, আপস করবার জন্য অবতারপুরুষও বিনাশপ্রাপ্ত হয়েছেন, বুঝতে না পেরে তাকে যন্ত্রণা দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। বুদ্ধ যদি মুহূর্তের জন্যও আপস করতেন, তবে তার জীবিতকালেই তিনি সমগ্র এশিয়ায় ঈশ্বররূপে পূজিত হতেন।

কিন্তু তার উত্তর ছিল, ‘বুদ্ধত্ব এক উচ্চ অবস্থাপ্রাপ্তি, কোন ব্যক্তি বিশেষ নয়। সত্যই, জগতে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সম্পূর্ণ প্রকৃতিস্থ ছিলেন- জগতে যত লোক জন্মগ্রহণ করেছে, তাদের মধ্যে তিনিই একমাত্র স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি।”

“কুটিরের ভেতর গোপ জানালার মধ্য দিয়ে চকিতের ন্যায় একখানি মুখ দেখতে পেল। মনে মনে সে বললে, “বেশ, বেশ! গেরুয়াধারী! থাকো ওখানে, তোমার পক্ষে ঐ যথেষ্ট। তারপর সে গান আরম্ভ করে দিল, আমার গরুবাছুর নিরাপদে ঘরে উঠেছে, আগুনও খুব জ্বলছে, আমার স্ত্রী নিরাপদ, ছেলেমেয়েরাও সুখে নিদ্রা যাচ্ছে! সুতরাং মেঘেরা, আজ রাত্রে তোমরা স্বচ্ছন্দে বর্ষণ করতে পার!

খ্রীস্টান আমরা যে যন্ত্রণাভোগকে পূজা করিতে ভালবাসি, তাহার প্রতি স্বামীজীর ঘৃণা ছিল। উহা দ্বারা ভারতের স্বচ্ছ চিন্তাশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। পাশ্চাত্যে অনেকে তাহাকে বলেন যে, বুদ্ধ ক্রুশবিদ্ধ হইয়া প্রাণত্যাগ করিলে তাহার মহত্ত্ব অধিকতব হৃদয়গ্রাহী হইত!

ইহাকে তিনি ‘রোমক বর্বরতা বলিয়া তীব্রভাবে নিন্দা করিতে বিন্দুমাত্র ইতস্ততঃ করেন নাই। তিনি দেখাইয়া দেন, “সর্বাপেক্ষা নীচ ও পাশবপ্রকৃতির লোকেরাই কোন একটা অসাধারণ ব্যাপারের পক্ষপাতী। অতএব জগৎ চিরকাল বীরত্বের কাহিনী বা মহাকাব্য ভালবাসবে।

কিন্তু ভারতের সৌভাগ্য যে, সে কখনো হেঁট মুণ্ডে গভীর অতলস্পর্শ গহুরে নিক্ষেপ করলেন (Hurled headlong down the steep abyss)’, এই রকম রচনার স্রষ্টা মিল্টনের মতো কবি প্রসব করেনি। ঐ কাব্যের সবটার বদলে ব্রাউনিঙ-এর দুই-এক ছত্র কবিতা পাওয়া গেলেও লাভ!”

তাহার মতে খ্রীস্টজীবনের কাহিনীগুলির মধ্যে এই মহাকাব্যোচিত শক্তি বা তেজই রোমকদের হৃদয় স্পর্শ করিয়াছিল। ঐ ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাই রোমীয় জগতের সর্বত্র খ্রীস্টধর্ম প্রসারিত হওয়ার কারণ। তিনি পুনরায় বলিলেন, “একথা অস্বীকার করা যায় না যে, পাশ্চাত্যবাসী তোমরা বড় বড় কাজ দেখতে চাও!

জীবনের প্রত্যেক সাধারণ ক্ষুদ্র ঘটনার মধ্যে যে কবিত্ব নিহিত থাকে, তা তোমরা এখনো অনুভব করতে পার না। মৃতপুত্র ক্রোড়ে তরুণী মাতার বুদ্ধের নিকট আসা- এ কাহিনীর মতো আর কোন্ কাহিনীর মাধ্য বেশি? অথবা, ছাগশিশুদের জীবনরক্ষার গল্পটি?

তোমরা জান যে, মহাভিনিষ্ক্রমণ ব্যাপারটি ভারতে কিছু নূতন নয়। গৌতম ছিলেন এক সামান্য রাজার পুত্র। তার পূর্বে অনেকে ঐরূপ ঐশ্বর্য ত্যাগ করে চলে গেছে। কিন্তু নির্বাণের পর, আহা! দেখ কি কবিত্ব।

“এক বিরামহীন বর্ষণের রাত্রি। তিনি এক গোপের কুটিরে এসে ছাঁচের নিচে দেওয়াল ঘেঁসে দাঁড়ালেন। ছাঁচ থেকে বৃষ্টির জল ঝরছে। প্রবল বৃষ্টি পড়ছে, এবং বাতাসের বেগ বাড়ছে।

“কুটিরের ভেতর গোপ জানালার মধ্য দিয়ে চকিতের ন্যায় একখানি মুখ দেখতে পেল। মনে মনে সে বললে, “বেশ, বেশ! গেরুয়াধারী! থাকো ওখানে, তোমার পক্ষে ঐ যথেষ্ট। তারপর সে গান আরম্ভ করে দিল, আমার গরুবাছুর নিরাপদে ঘরে উঠেছে, আগুনও খুব জ্বলছে, আমার স্ত্রী নিরাপদ, ছেলেমেয়েরাও সুখে নিদ্রা যাচ্ছে! সুতরাং মেঘেরা, আজ রাত্রে তোমরা স্বচ্ছন্দে বর্ষণ করতে পার!

স্বামীজী এই সম্পর্কে এক চিত্তাকর্ষক ঐতিহাসিক তথ্য বর্ণনা করিয়া বলেন যে, ঐ দেশে ভারতীয় মহাপুরুষগণ বৌদ্ধধর্মের অঙ্গরূপে পরিগৃহীত হইবার পর স্থানীয় নাগগণ (অর্থাৎ কুণ্ডের অভ্যন্তরস্থ যে-সকল অদ্ভুত ক্ষমতশালী সর্পের অস্তিত্ব কল্পনা করা হইত) স্বভাবতঃ দেবত্বপদবী হইতে বিচ্যুত হয়।

“বুদ্ধ বাইরে থেকে উত্তর দিলেন, ‘আমার মন সংযত, ইন্দ্রিয় প্রত্যাহৃত; আমার হৃদয় দৃঢ়। অতএব মেঘেরা, আজ রাত্রে তোমরা স্বচ্ছন্দে বর্ষণ করতে পার?’

“তারপর গোপ আবার গাইল, ‘ক্ষেতে ফসলকাটা শেষ, খড়গুলিও খামারে ভাল করে রাখা আছে; নদী পরিপূর্ণ, আলগুলি বেশ দৃঢ়। সুতরাং মেঘেরা, ইচ্ছা হলে তোমরা আজ রাত্রে বর্ষণ করতে পার।’

“এইভাবে কিছুক্ষণ অতিবাহিত হবার পর, অবশেষে বিস্মিত ও অনুতপ্ত হয়ে গোপ তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করল।(৭)

“অথবা নাপিত উপালির[৮] আখ্যান অপেক্ষা সুন্দরতর আর কিছু হতে পারে কি?–

“ভগবান আমার বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন; আমি একজন সামান্য নাপিত আমারও বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন! আমি দৌড়ে গেলাম। কিন্তু তিনি নিজেই ফিরলেন এবং আমার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।

“আমি এক নগণ্য নাপিত, আমার জন্য অপেক্ষা করলেন!

আমি বললাম, প্রভু, আপনার সঙ্গে আমি কথা বলতে পারি কি?

তিনি বললেন, হাঁ।

আমি নাপিত, আমাকেও ‘হাঁ’ বললেন!

আমি বললাম, নির্বাণ কি আমাদের মতো লোকদের জন্যও?

তিনি বললেন, নিশ্চয়!

আমি নাপিত, আমার জন্যও।

তারপর আমি বললাম, প্রভু, আমি কি আপনার অনুসরণ করতে পারি?

উত্তরে তিনি বললেন, নিশ্চয় পার।

আমি যে নাপিত, সেই আমাকেও অনুমতি দিলেন!

আমি আবার বললাম, প্রভু, আমি আপনার নিকট থাকতে পারি?

তিনি বললেন, তুমি আমার কাছে থাকতে পার।

আমি এক দরিদ্র নাপিত, আমাকেও তিনি তার কাছে থাকবার অনুমতি দিলেন!”

একদিন স্বামীজী বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস সংক্ষেপে এইরূপ বলেন যে, বৌদ্ধধর্মের তিনটি যুগের মধ্যে পাচশত বৎসর বুদ্ধোত্ত বিধিসমূহের যুগ, পঁচশত বৎসর প্রতিমা পূজার এবং পাচশত বৎসর তন্ত্রের যুগ। সহসা ঐ প্রসঙ্গ পরিত্যাগ করিয়া তিনি বলিলেন,

“কখনো ভেবো না যে, ভারতে কোনকালে বৌদ্ধধর্ম বলে কোন পৃথক ধর্ম ছিল, আর তার নিজস্ব মন্দির ও পুরোহিত প্রভৃতি ছিল! একেবারেই নয়। বৌদ্ধধর্ম চিরকাল ছিল হিন্দুধর্মের অন্তর্ভুক্ত। কেবল একসময়ে বুদ্ধের প্রভাব অত্যধিক হয়ে উঠে, এবং তার ফলে সমগ্র জাতি সন্ন্যাসপথ অবলম্বন করে।”

আমার বিশ্বাস, বহু সময় ও অধ্যয়নের দ্বারাই কেবল এই মতবাদের সত্যতা পণ্ডিতগণের নিকট ক্রমে ক্রমে প্রতিপন্ন হইতে পারে। এই মতানুসারে প্রচারক প্রেরণের দ্বারা বিজিত দেশগুলিতেই বৌদ্ধধর্ম সম্পূর্ণভাবে নিজস্ব মন্দিরাদি স্থাপন করিয়াছিল। কাশ্মীর ঐসকল দেশের অন্যতম।

স্বামীজী এই সম্পর্কে এক চিত্তাকর্ষক ঐতিহাসিক তথ্য বর্ণনা করিয়া বলেন যে, ঐ দেশে ভারতীয় মহাপুরুষগণ বৌদ্ধধর্মের অঙ্গরূপে পরিগৃহীত হইবার পর স্থানীয় নাগগণ (অর্থাৎ কুণ্ডের অভ্যন্তরস্থ যে-সকল অদ্ভুত ক্ষমতশালী সর্পের অস্তিত্ব কল্পনা করা হইত) স্বভাবতঃ দেবত্বপদবী হইতে বিচ্যুত হয়।

ব্যক্তিগতভাবে তাহার নিকট উহা এক বিজ্ঞানসম্মত অনুবাদ মাত্র, তবে উহাতে বিশেষভাবে সন্দেহের নিরসন ঘটে। ইন্দ্রিয়জ অনুভূতি হইতে সকল জ্ঞানের উৎপত্তি, আমাদের পাশ্চাত্য দেশে শিক্ষা-সম্বন্ধে এই মতের প্রতিকূলে স্বামীজী সর্বদাই জন্মান্তরবাদের প্রসঙ্গ উত্থাপনপূর্বক নিজ পক্ষ সমর্থন করিবার জন্য দেখাইয়া দিতেন যে, পাশ্চাত্য-কথিত এই জ্ঞানোন্মেষ প্রায়ই নির্দিষ্ট ব্যক্তির সুদূর অতীত জীবনে ঘটিয়া থাকে বলিয়া উহাকে আর লক্ষ্য করা যায় না।

আশ্চর্যের বিষয়, তাহাদের ঐ ক্ষমতাচ্যুতির পরেই প্রচণ্ড শীত পড়ে, এবং ভীত জনসাধারণ কর্তৃক পুরাতন কুসংস্কার ও নূতন সত্য- এই উভয়ের মধ্যে দ্রুত একটা আপসবিধান হয়। ফলে নূতন ধর্মের মহাপুরুষ অথবা গৌণ দেবতারূপে নাগগণের পুনঃ প্রতিষ্ঠা ঘটে- মানব স্বভাবের এই প্রকার কার্যের দৃষ্টান্ত অন্যত্রও বিরল নহে।

বৌদ্ধধর্ম ও তাহার জননীস্বরূপ হিন্দুধর্মের মধ্যে অন্যতম প্রধান পার্থক্য এই যে, হিন্দুরা একই আত্মার পুনঃ পুনঃ জন্মান্তর পরিগ্রহের দ্বারা কর্মসঞ্চয়ে বিশ্বাস করেন, কিন্তু বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা হইল, এই আপাত-প্রতীয়মান একত্ব মায়ামাত্র এবং ক্ষণিক।

বৌদ্ধমতে প্রকৃতপক্ষে আমরা এ-জীবনে যে কর্ম সঞ্চিত রাখিয়া যাই, অপর এক আত্মায় উহা বর্তায় এবং আমাদের ঐ অভিজ্ঞতাসহ সে নূতন কর্মবীজবপনে অগ্রসর হয়। এই প্রতিদ্বন্দ্বী মতদ্বযের অন্তর্নিহিত গুণাবলী সম্পর্কে স্বামীজী প্রায়ই চিন্তা করিতে বসিনে।

তাহার মতো যাহাদের নিকট অতীন্দ্রিয় অনুভূতির দ্বার উদঘাটিত হইয়াছে তাহাদেব, এবং উহার ছায়ায় যাহারা বাস করিয়াছেন- কতক পরিমাণে তাহাদের নিকটেও আত্মার শরীরে অবস্থিতি এক চিরযন্ত্রণাকর বন্ধন। পিঞ্জরাবদ্ধ আত্মা শরীররূপ কারাগারের গারদে বিদ্রোহীর ন্যায় অবিরত আঘাত হানিতেছে; কারণ, শবীররূপ কারাগারের বাহিরে সেই শুদ্ধ, চৈতন্যময়, ভাবঘন, সদানন্দ পরম জ্যোতির্ময় ধাম সে দেখিতে পায়- উহাই তাহার আদর্শ ও লক্ষ্য।

এই সকল ব্যক্তির নিকট শরীর পরস্পরের সহিত সম্পর্ক স্থাপনের সহায় হওযাব পরিবর্তে একটা আবরণ, মহা প্রতিবন্ধক! সুখ-দুঃখ সেই আদি চৈতন্যই- কেবল ব্যষ্টিচৈতন্যের পরকলাব মধ্য দিয়া প্রতিভাত। সকলেই একমাত্র আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত- এই উভয়ের পারে যাইয়া সেই শুদ্ধ, অখণ্ড জ্যোতিস্বরূপকে প্রত্যক্ষ করা।

প্রচলিত ধারণা সম্পর্কে স্বামীজীর অসহিষ্ণু উক্তিগুলির মধ্যে প্রায়ই উপরিউক্ত চিন্তা-পরম্পরা প্রকাশ পাইত। যেমন, একদিন সহসা তিনি বলিয়া উঠিলেন, “কি আশ্চর্য! এক জন্ম শরীর ধারণই মনে হয়, লক্ষ লক্ষ বৎসর কারাগারের তুল্য; লোকে আবার পূর্ব পূর্ব জন্মের স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে চায়।

প্রতিদিনের ভাবনা-দুশ্চিন্তাই প্রতিদিনের পক্ষে যথেষ্ট, আর অন্য দিনের ভাবনায় কাজ নেই!” তথাপি অভিজ্ঞতার এক দীর্ঘ শৃঙ্খলে আবদ্ধ বিভিন্ন ব্যক্তিগণের পরস্পরের মধ্যে সম্পর্কের প্রশ্নটি তাহার নিকট সকল সময়ে চিত্তাকর্ষক বোধ হইত। পুনর্জন্মবাদকে তিনি কদাপি অবিসংবাদী সত্য বলিয়া জ্ঞান করিতেন না।

ব্যক্তিগতভাবে তাহার নিকট উহা এক বিজ্ঞানসম্মত অনুবাদ মাত্র, তবে উহাতে বিশেষভাবে সন্দেহের নিরসন ঘটে। ইন্দ্রিয়জ অনুভূতি হইতে সকল জ্ঞানের উৎপত্তি, আমাদের পাশ্চাত্য দেশে শিক্ষা-সম্বন্ধে এই মতের প্রতিকূলে স্বামীজী সর্বদাই জন্মান্তরবাদের প্রসঙ্গ উত্থাপনপূর্বক নিজ পক্ষ সমর্থন করিবার জন্য দেখাইয়া দিতেন যে, পাশ্চাত্য-কথিত এই জ্ঞানোন্মেষ প্রায়ই নির্দিষ্ট ব্যক্তির সুদূর অতীত জীবনে ঘটিয়া থাকে বলিয়া উহাকে আর লক্ষ্য করা যায় না।

ধীরভাবে স্বামীজী উত্তর দিলেন, “তা জানি, কিন্তু আমাদের পরিচিতা মহিলা যদি কথাটি ঐভাবে বলতেন, তবে তার নিজের মতটি আরও যুক্তিযুক্ত হতো। ধর, তিনি ঐভাবেই প্রশ্নটি করেছেন- অর্থাৎ অপরের উদ্দেশ্যে উপকার করে আমরা বঞ্চিত হয়ে থাকি, কারণ ঐ উপকার তাদের কাছে পৌঁছায় না। দেখছ না, ওর একটিমাত্র উত্তর আছে, তা হলো অদ্বৈতবাদ! কারণ, আমরা সকলেই এক!”

তথাপি উভয় পক্ষের সব বক্তব্য শেষ হইবার পরেও বৌদ্ধধর্ম অবশেষে দার্শনিক তথ্য হিসাবে যথার্থ প্রতিপন্ন হইতে পারে কিনা এ প্রশ্ন থাকিয়াই যায়।

পুনঃ পুনঃ জন্মপরিগ্রহের মধ্যে একই আত্মার অনুবর্তন ও অপরিবর্তনীয়তা- এই সম্পর্কে আমাদের সমগ্র ধারণা কি ভ্রান্তিমূলক নহে, যেহেতু পরিশেষে একই সৎ, বহু অসৎ’- এই অনুভূতির নিকট উহার পরাভব ঘটে? দীর্ঘকাল নীরবে চিন্তার পর একদিন স্বামীজী বলিয়া উঠিয়াছিলেন,

“ঠিক, বৌদ্ধধর্ম নিশ্চয় যথার্থ বলছে! পুনর্জন্ম মরীচিকামাত্র! কিন্তু এই অনুভূতিলাভ কেবল অদ্বৈতমার্গেই সম্ভব।”

সম্ভবতঃ বুদ্ধ ও শঙ্করাচার্যের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধাইয়া দিয়া অবশেষে বৌদ্ধধর্মের অপূর্ণতা দূর করিবার উদ্দেশ্যে অদ্বৈতবাদের অবতারণা করিয়া স্বামীজী কৌতুক অনুভব করিতেন। হয়তো ইহা দ্বারা ইতিহাসের দুই বিভিন্ন যুগের সম্মিলন সাধিত হয় বলিয়াই তিনি এত আনন্দিত হইতেন, যেহেতু ইহা দ্বারা প্রতিপন্ন হয় যে, উক্ত মদ্বয়ের মধ্যে একটি অপরটির সাহায্য ব্যতীত অসম্পূর্ণ থাকিয়া যায়।

মনুষ্যত্বের চরম বিকাশের সংজ্ঞা নির্দেশ করিতে গিয়া তিনি সর্বদাই বলিতেন, ”বুদ্ধের হৃদয় এবং শঙ্করাচার্যের মনীষা।” বৌদ্ধ কর্মবাদেব বিরুদ্ধে জনৈকা পাশ্চাত্য মহিলার যুক্তিসমূহ তিনি ঐভাবেই শ্রবণ করেন। ঐ মত গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে যে একটা অসাধারণ সামাজিক দায়িত্ববোধ জড়িত থাকে[৯] সে কথা মহিলা ধরিতে পারেন নাই। তিনি বলিলেন,

“যেখানে আমার সৎকর্মের ফল আমি ভোগ করতে পারব না, অপরে করবে, সেখানে আমি আদৌ সৎকর্ম করতে যাব কেন, তার কারণ আমি খুঁজে পাই না।”

স্বামীজী নিজে ঐ ভাবে চিন্তা করিতে একান্ত অশক্ত হইলেও উক্ত মন্তব্যে তিনি বিশেষ আকৃষ্ট বোধ করেন; এবং দুই-একদিন পরে নিকটস্থ এক ব্যক্তিকে বলেন, “সেদিন যে কথাটি উঠেছিল, তা বড় চমৎকার- অর্থাৎ পরের উপকার করবার কোন কারণই থাকে না, যদি যাদের উদ্দেশ্যে করা হয়, তারা তার ফলভোগ না করে অপরে করে।”

স্বামীজী যাহাকে কথাগুলি বলেন, তিনি অশিষ্টের মতো উত্তর দেন,”কিন্তু তা নিয়ে তো তর্ক হয়নি! কথা ছিল এই যে, আমি ছাড়া অপর কেহ আমার কর্মের ফল ভোগ করবে।”

ধীরভাবে স্বামীজী উত্তর দিলেন, “তা জানি, কিন্তু আমাদের পরিচিতা মহিলা যদি কথাটি ঐভাবে বলতেন, তবে তার নিজের মতটি আরও যুক্তিযুক্ত হতো। ধর, তিনি ঐভাবেই প্রশ্নটি করেছেন- অর্থাৎ অপরের উদ্দেশ্যে উপকার করে আমরা বঞ্চিত হয়ে থাকি, কারণ ঐ উপকার তাদের কাছে পৌঁছায় না। দেখছ না, ওর একটিমাত্র উত্তর আছে, তা হলো অদ্বৈতবাদ! কারণ, আমরা সকলেই এক!”

বৌদ্ধধর্মের আদেশ কেবল সন্ন্যাসের দ্বারাই পালন করা চলে; হিন্দুধর্মের আদেশ জীবনের সকল অবস্থায় পালন করা যায়। হিন্দুধর্মমতে সকল মতই সেই অদ্বিতীয় সত্যে উপনীত হবার এক একটি পথ। হিন্দুধর্মের অন্যতম উচ্চ ও শ্রেষ্ঠ উপদেশ এক ব্যাধের মুখ দিয়ে বিবৃত হয়েছে এক পতিব্রতা নারীর নির্দেশে কোন সন্ন্যাসীর নিকট তিনি ঐ উপদেশ প্রদান করেন (ব্যাধগীতা)।

তিনি কি হৃদয়ঙ্গম করেন যে, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের হিন্দুমনের মধ্যে ঠিক এই পার্থক্যই বিদ্যমান যে, ভারতের আধুনিক ধারণায় বৌদ্ধধর্ম ও বুদ্ধের স্থান সর্বদাই থাকিবে? তিনি কি ভাবিয়াছিলেন যে, গুপ্তযুগ হইতে যে রামায়ণ ও মহাভারত ভারতীয় শিক্ষার উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করিয়া আসিয়াছে, অতঃপর সাধারণ লোক তাহার সহিত অশোক ও তাহার পূর্ববর্তী যুগের ইতিহাসও সংযুক্ত করিয়া দিবে?

এশিয়ার পক্ষে এরূপ একটি সমন্বয়সাধনের উৎপর্য কত ব্যাপক, বৌদ্ধদেশসমূহের ধমনীতে হিন্দুধর্ম হইতে কি নূতন প্রাণ সঞ্চার হইবে, আবার জননীস্বরূপ হিন্দুধর্মও আত্মস্থ হইয়া কন্যাস্থানীয় বৌদ্ধজাতিগুলিকে জ্ঞানামৃত পান করাইলে স্বয়ং ভারতও কত শক্তি বীর্য লাভ করিবে- এ-সকল কথা কি স্বামীজী ভাবিয়াছিলেন?

তিনি কি ভাবিয়াছিলেন জানি না, কিন্তু আমাদের বিস্মৃত হইলে চলিবে না যে, হিন্দুধর্মের মধ্যেই তিনি এই দুই ধর্মের দৃঢ় সম্মিলনভূমি দেখিতে পাইয়াছিলেন। তিনি বুঝিয়াছিলেন যে, জননী হিন্দুধর্মই সকল ধর্মমতকে নিজের মধ্যে গ্রহণ করিতে সমর্থ; কন্যা বৌদ্ধধর্ম নয়।

যেহেতু তিনি মহীয়সী ও প্রেমময়ী জননী, তাই তাহার ক্রোড়ে অবতারগণের মধ্যে সর্বপ্রথম ও সর্বাপেক্ষা বিশাল-হৃদয় সেই মহামহিম বুদ্ধাবতারের স্থান চিরকালের জন্য আছে। বুদ্ধ প্রবর্তিত সম্প্রদায়গুলিকে তিনি আশ্রয় দিয়াছেন, তৎ-প্রচারিত শিক্ষার মর্ম তিনি অনুধাবন করিয়া শ্রদ্ধা করেন, তাহার আশ্রিত ভক্তগণের প্রতি মাতার ন্যায় স্নেহশীলা, এবং তাহার নিকট আনীত সকল নবজাতক সন্তানের (বৌদ্ধধর্ম বা বুদ্ধের জন্য সহানুভূতি বা সাদর সম্ভাষণও রহিয়াছে।

কিন্তু সত্যকে বুদ্ধ যে আকারে প্রচার করিয়াছেন, সত্য তাহাতেই বদ্ধ, তাহার বাহিরে নাই, কেবল সন্ন্যাসমার্গ অবল নেই। মুক্তিলাভ সম্ভব, অথবা চরম পূর্ণতালাভের একটিই পথ বিদ্যমান-এ-সব কথা হিন্দুধর্ম কখনও বলিবে না। বৌদ্ধধর্ম সম্বন্ধে সম্ভবতঃ স্বামীজীর শ্রেষ্ঠ উক্তি হইলঃ

বৌদ্ধধর্ম ও হিন্দুধর্মের মধ্যে প্রধান পার্থক্য এই যে, বৌদ্ধধর্ম বলেন, যা কিছু দেখছ, তা সবই মায়া বলে জেনো! আর হিন্দুধর্ম বলেন, জেনো যে, মায়ার অন্তরালে রয়েছেন সেই সত্যবস্তু। এই অনুভূতি কি উপায়ে লাভ হবে, সে সম্বন্ধে হিন্দুধর্ম কোন বাধাধরা নিয়ম করে দেননি।

বৌদ্ধধর্মের আদেশ কেবল সন্ন্যাসের দ্বারাই পালন করা চলে; হিন্দুধর্মের আদেশ জীবনের সকল অবস্থায় পালন করা যায়। হিন্দুধর্মমতে সকল মতই সেই অদ্বিতীয় সত্যে উপনীত হবার এক একটি পথ। হিন্দুধর্মের অন্যতম উচ্চ ও শ্রেষ্ঠ উপদেশ এক ব্যাধের মুখ দিয়ে বিবৃত হয়েছে এক পতিব্রতা নারীর নির্দেশে কোন সন্ন্যাসীর নিকট তিনি ঐ উপদেশ প্রদান করেন (ব্যাধগীতা)।

এইরূপে বৌদ্ধধর্ম এক সন্ন্যাসিসঙ্রে ধর্মে পরিণত হয়, হিন্দুধর্ম কিন্তু সন্ন্যাস-আশ্রমকে উচ্চ স্থান প্রদান করলেও চিরকাল নিষ্ঠার সহিত প্রতিদিনের কর্তব্য-পালনকে- তা যেমনই হোক, ঈশ্বরলাভের পথ বলে নির্দেশ দিয়ে আসছে।”

(সমাপ্ত)

<<স্বামীজী বুদ্ধকে কি চক্ষে দেখিতেন : প্রথম কিস্তি

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

………………
১. উক্ত বৃহৎ মন্দিরের চারিদিকে খননকার্য ১৮৭৪ খ্রীস্টাব্দে ব্ৰহ্মদেশীয় সকার কর্তৃক প্রথম আরম্ভ হয়। ১৮৭৯ খ্রীস্টাব্দে ব্রিটিশ সবকাব উহাব ভার গ্রহণ করেন, এবং ১৮৮৪ খ্রীস্টাব্দে উহা শেষ।
২. যাহা বুদ্ধিবৃত্তির পারে অতীন্দ্রীয় রাজ্যে লইয়া যায়।
৩. এই দুইখানি পুস্তক তখন ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্রের দক্ষ সম্পাদকতায় এশিয়াটিক সোসাইটি ইতে প্রকাশিত হইতেছিল। সাধারণ পাঠকের সুবিধার জন্য গ্রন্থের মূল পালির পরিবর্তে সংস্কৃত অক্ষরে ছিল’- স্বামী সারদানন্দ
৪. তথাগত শব্দের আক্ষরিক অর্থ- যিনি লব্ধসত্য, অর্থাৎ তত্ত্ব সাক্ষাৎকার করিয়াছেন। স্বামীজী বুঝাইয়া বলিলেন, “এই শব্দ অনেকটা তোমাদের ত্রাণকর্তা(Messiah) শব্দের মতো।”
৫. শ্রীরামকৃষ্ণ ১৮৮৬ খ্রীস্টাব্দের ১৬ আগস্ট শ্ৰীযুক্ত কৃষ্ণগোপাল ঘোষের কাশীপুরস্থ উদ্যানবাটীতে মহাসমাধিলাভ করেন।
৬. বিনয় পিটক–প্রথমভাগ দ্রষ্টব্য।
৭. স্বামীজী এখানে সূত্তনিপাতের অন্তর্গত ধনিয়া সূত্তের Rhys Davids-কৃত পদ্যের অনুবাদের ভাবার্থ তাহার স্মৃতি হইতে আবৃত্তি করিতেছিলেন; Rhys Davids-এর আমেরিকার বক্তৃতাগুলি দ্রষ্টব্য।
৮. ‘উপালি পৃচ্ছা’ নামক গল্পটি প্রধান বৌদ্ধগ্রন্থে যে আকারে প্রকাশিত হয়, অধুনা তাহা লুপ্ত। কিন্তু ঐরূপ একটি রচনার অস্তিত্ব ‘বিনয় পিটক’ প্রভৃতি অন্যান্য বৌদ্ধগ্রন্থে উহার উল্লেখ দ্বারা জ্ঞাত হওয়া যায়।
৯. যদি আমরা ভাবি যে আমাদের দুষ্কৃতিসমূহের ফলভোগ আমাদের পরিবর্তে অপরে করিবে, তাহা হইলে আমাদের সৎকর্ম করিবার প্রবৃত্তি আরও দৃঢ় হয়! অপরের সম্পত্তি বা সন্তান-সন্ততি রক্ষার জন্য আমাদের যে দায়িত্ববোধ, তাহাও এই জাতীয়।

…………………..
অশেষ কৃতজ্ঞতা
স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়াছি – ভগিনী নিবেদিতা। অনুবাদক-স্বামী মাধবানন্দ

……………………
আরও পড়ুন-
বুদ্ধদেব
ভগবান্ বুদ্ধ
বুদ্ধদেব প্রসঙ্গ
ব্রহ্মবিহার
বুদ্ধের জীবন থেকে
স্বামীজী বুদ্ধকে কি চক্ষে দেখিতেন : প্রথম কিস্তি
স্বামীজী বুদ্ধকে কি চক্ষে দেখিতেন : দ্বিতীয় কিস্তি

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!