স্বামী বিবেকানন্দ

স্বামীজী-প্রচারিত মতসমূহের সমষ্টিভাবে আলোচনা : দুই

-ভগিনী নিবেদিতা

শোনা যায়, তাহার কোন এক মধ্যাহ্নকালীন প্রশ্নোত্তর-ক্লাসে জনৈক শ্রোতা জিজ্ঞাসা করেন, ইহা সত্য হইলে, পূর্ববর্তী আচার্যগণের কেহ এ বিষয়ে কখনও উল্লেখ করেন নাই কেন?

উপস্থিত পণ্ডিতগণের মধ্যে যাহারা ইংরেজী জানিতেন না, তাহাদের সুবিধার জন্য ক্লাসে নিয়ম ছিল, ঐ সকল প্রশ্নের উওর প্রথমে ইংরেজীতে এবং পরে সংস্কৃতে দেওয়া হইবে। বর্তমান ক্ষেত্রে সেই বৃহৎ সভায় উপস্থিত সকলেই তাহার উত্তর শুনিয়া চমকিত হইলেন, “যেহেতু ঐজন্যই আমার জন্ম, এবং ঐ কাজ আমারই জন্য নির্দিষ্ট ছিল।”

ভারতবর্ষে হিন্দুধর্মের অসংখ্য শাখা-প্রশাখার কোন একটিকেও তাহার গণ্ডির বাহিরে রাখিবার কোনপ্রকার চেষ্টা স্বামীজী আদৌ সহ্য করিতে পারিতেন না। দৃষ্টান্তস্বরূপ উল্লেখ করা যাইতে পারে, ব্রাহ্ম অথবা আর্যসমাজভুক্ত হওয়ার জন্য কোন ব্যক্তি তাহার নিকট অহিন্দু বলিয়া গণ্য হইতেন না।

তাহার মতে শিখদের বিখ্যাত খালসা সৈন্যদলের ন্যায় অতি সুন্দর, সুগঠিত সঙঘ হিন্দুধর্মেরই সৃষ্টি, এবং উহা হিন্দুধর্মেরই অপূর্ব বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। গুরুগোবিন্দ সিংহ ধর্মের জন্য তাহার শিষ্যদের প্রাণ উৎসর্গের যে আহ্বান করিতেন- সেই দৃশ্যটি তিনি কী আবেগের সহিত বারংবার আমাদের নিকট অঙ্কিত করিতেন!

তাহার মতে, হিন্দু ধর্মের তিনটি পৃথক স্তরের অস্তিত্ব স্বীকার করা প্রয়োজন। তাহার মধ্যে প্রথম হইল- প্রাচীন, ঐতিহাসিক ধর্ম যাহা শাস্ত্রানুবর্তী। দ্বিতীয় মুসলমান রাজত্বকালে ধর্মসংস্কারকগণ কর্তৃক প্রবর্তিত সম্প্রদায়সমূহ। তৃতীয় বর্তমানকালের সংস্কারপ্রয়াসী বিভিন্ন সম্প্রদায়।

কিন্তু সকল সম্প্রদায়ই সমভাবে হিন্দুধর্মভুক্ত। স্বদেশ ও নিজের ধর্মের সমস্যাগুলি বিস্তৃতভাবে অনুধাবন করিবার জন্য তাহার ঐকান্তিক আগ্রহ যে যৌবনে ব্রাহ্মসমাজের সদস্য থাকাকালে প্রথম পূর্ণতার পথে অগ্রসর হয়, একথা তিনি কদাপি বিস্মৃত হন নাই।

ঐ সদস্যপদের কথা অস্বীকার করা দূরে থাকুক, বরং একদিন আগ্রহের সহিত তিনি বলিয়া ওঠেন- “তারাই বলুন, আমি তাদেরই একজন কিনা! আমার নাম যদি তারা কেটে না দিয়ে থাকেন, তাহলে তা এখনো তাদের খাতায় আছে!”

এইরূপে, কোন ব্যক্তি নিজেকে আর্য, ব্রাহ্ম বা সনাতনপন্থী-ইত্যাদি যে বিশেষণেই অভিহিত করুক, স্বামীজীর মতে সে প্রকৃতপক্ষে হিন্দুই। জৈনদের হিন্দুধর্মের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দাবি তো অতি সহজেই সামাজিক আচার-ব্যবহার ও ইতিহাসের সাহায্যে প্রমাণ করা যায়।

নীচবংশে যাহারা জন্মগ্রহণ করিয়াছে, তাহাদের কেবল উচ্চ সামাজিক অধিকারপ্রদানপূর্বক উন্নত করা নহে, পরন্তু এই অতি শান্তজাতির মধ্যে সঙ্ঘবদ্ধভাবে আত্মরক্ষার জন্য উদ্যম এবং বাধাপ্রদানের প্রচেষ্টা এই উভয় আদর্শের সংরক্ষণ ও উন্নয়ন দ্বারা তাহারা যে উপকার সাধন করিয়াছেন, তাহাও স্বামীজীর নিকট উপেক্ষণীয় ছিল না।

পশ্চিম ভারতের জৈনরা আজ পর্যন্ত উত্তেজিত হইয়া উঠিবেন, যদি তাহারা যথার্থ হিন্দুধর্মের অন্তর্ভুক্ত কিনা এ বিষয়ে কোন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। এখনও পর্যন্ত তাহারা বিবাহকালে সমান শ্রেণীর হিন্দুদের নিকট কন্যা আদান-প্রদান করিয়া থাকেন, এবং আজ পর্যন্ত তাহাদের মন্দিরে সময়ে সময়ে পৌরোহিত্য করেন সাধারণ ব্রাহ্মণগণ।

সকল ধর্মের মধ্যেই স্বামীজীর শিষ্য ছিল- এমনকি, মুসলমানদের মধ্যেও, এবং তাহার কয়েকজন জৈন বন্ধুর সহায়তায় তিনি এমন কতকগুলি জৈন ধর্মগ্রন্থ পড়িতে পারিয়াছিলেন, যাহা অপর সম্প্রদায়ের লোকেদের সাধারণতঃ দেওয়া হয় না।

এই অধ্যয়নের ফলে জৈনদের ধর্মমত ও বংশপরম্পরা ভাবধারার প্রাধান্য সম্পর্কে এবং হিন্দুধর্মের ক্রমবিকাশলাভে জৈনধর্মের বিশেষ অবদান সম্পর্কে স্বামীজী গভীরভাবে প্রভাবিত হন। হিন্দুধর্মের প্রবল আদর্শগুলির অন্যতম মুখ্য উদ্দেশ্য হইল, মূক পশুগণের ভিতরেও সেই বিভু বর্তমান বলিয়া তাহাদের প্রতি সদয় ব্যবহার, এবং সাধুজীবনে ত্যাগ-তপস্যার আদর্শের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

এই দুই বৈশিষ্ট্য জৈনগণ কর্তৃক পৃথকভাবে অনুষ্ঠিত ও বিশেষভাবে প্রচারিত হইয়াছে। আবার জীবাণুঘটিত তত্ত্ব সম্পর্কে তাহাদের সুস্পষ্ট অভিমত হইতে এই ধর্মের প্রতিষ্ঠাতাগণের বৌদ্ধিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়- বিশেষতঃ উহা আধুনিক বিজ্ঞান-গবেষণার পরীক্ষা-নিরীক্ষাদ্বারা সমর্থিত।

স্বামীজী বলিতেন, “জৈনরা যে বলে থাকেন, তাদের মতগুলি প্রথমে ঋষিদের দ্বারা প্রচারিত হয়েছিল- এ অতি সত্য, এবং সহজেই বোঝা যায়।”

বর্তমানে ভারতের যে-সব জাতি খ্রীস্টধর্ম গ্রহণ করিয়াছে, তাহাদের সম্পর্কে স্বামীজী আশা করিতেন, রাজনীতিক্ষেত্রে প্রভুত্বপ্রাপ্ত জাতির ধর্মগ্রহণ করিয়া তাহারা সামাজিক পদমর্যাদায় উন্নীত হইবে, এবং ভাবী যুগে লোকে খ্রীস্টধর্ম বিস্মৃত হইয়া গেলেও তাহারা ঐ উন্নতি বজায় রাখিতে সমর্থ হইবে।

এইরূপে, আমরা আশা করিতে পারি যে, ভবিষ্যতে ঊনবিংশ শতাব্দীকে বিভেদসৃষ্টিকর শক্তি বলিয়া লোকে আর মনে রাখিবে না, এবং এই শতাব্দী তখন ভারতের সকল বিষয়ে স্থায়ী উন্নতিরূপ সুফল প্রসব করিবে। এইরূপ উন্নতির সম্ভাবনার দৃষ্টান্তস্বরূপ উত্তরভারতে চৈতন্যদেবের কার্যের উল্লেখ করা যাইতে পারে। তিনি কি তাহার অনুবর্তীদের একটি বিলক্ষণ খ্যাতি-প্রতিপত্তিশালী সমাজে পরিণত করিয়া যাইতে সমর্থ হন নাই?

খ্রীস্টধর্মের বর্তমান কার্যাবলীর জন্য তাহাকে ক্ষমা করা কঠিন। হিন্দুধর্মের অপর প্রতিযোগী ধর্ম, অর্থাৎ মুসলমান ধর্ম কিন্তু সেরূপ নহে। ঐ ধর্মের নাম শ্রবণমাত্র আমাদের আচার্যদেবের মনে সর্বদাই এক আগ্রহপূর্ণ ভ্ৰাতৃভাবের চিত্র উদয় হইত–যে ধর্ম সাধারণ ব্যক্তিগণকে সর্ববিধ স্বাধীনতা প্রদানে এবং উচ্চপদস্থগণকে সর্বসাধারণের পর্যায়ে রাখিতে তৎপর।

স্বামীজী মুহূর্তের জন্যও বিস্মৃত হইতে পারিতেন না যে, মুসলমানগণ এদেশে অনধিকার প্রবেশ করিলেও বর্তমান ভারতের ক্রমোন্নতির মূলে যে সকল উপাদান বর্তমান, তাহাদের অন্যতম হইল, মুসলমান কর্তৃক প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা ও রাজ্যশাসন পদ্ধতি গ্রহণ।

নীচবংশে যাহারা জন্মগ্রহণ করিয়াছে, তাহাদের কেবল উচ্চ সামাজিক অধিকারপ্রদানপূর্বক উন্নত করা নহে, পরন্তু এই অতি শান্তজাতির মধ্যে সঙ্ঘবদ্ধভাবে আত্মরক্ষার জন্য উদ্যম এবং বাধাপ্রদানের প্রচেষ্টা এই উভয় আদর্শের সংরক্ষণ ও উন্নয়ন দ্বারা তাহারা যে উপকার সাধন করিয়াছেন, তাহাও স্বামীজীর নিকট উপেক্ষণীয় ছিল না।

নারীজাতি ও নিম্নশ্রেণীর ব্যক্তিগণ- এই উভয়ের জন্য তাহার অভিমত ছিল যে, তাহাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য সমাজের বর্তমান ব্যবস্থাগুলির পরিবর্তনসাধন নহে, পরন্তু তাহাদের জন্য শিক্ষার দ্বারা এমন অবস্থার সৃষ্টি করা, যাহাতে তাহারা নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করিয়া লইতে পারে।

তিনি সর্বদা দেখাইয়া দিতেন, মুসলমানদের মধ্যে সৈয়দ, পাঠান, মোগল ও শেখ- এই চারিটি শ্রেণী আছে, এবং ইহাদের মধ্যে ভারতের মাটি ও অতীত-স্মৃতিতে শেখদের উত্তরাধিকারস্বত্ব রহিয়াছে। ঐ স্বত্ব হিন্দুদের মতোই প্রাচীন এবং ঐ সম্পর্কে কোন বিতর্কের স্থান নাই।

অবিবেচনাপূর্বক লিখিত একটি শব্দ প্রসঙ্গে তিনি জনৈক শিষ্যকে বলিয়াছিলেন, “সাজাহান নিজেকে ‘বিদেশী’ নামে অভিহিত হতে শুনলে কবরের ভিতর থেকে ফিরে দেখবেন, কে তাকে ঐ রকম বলছে।” সর্বোপরি, মাতৃভূমির কল্যাণকল্পে স্বামীজীর শ্রেষ্ঠ প্রার্থনা ছিল- ভারত যেন ‘ইসলামীয় দেহ ও বৈদান্তিক হৃদয়’ এই দ্বিবিধ আদর্শকে প্রকাশ করিতে পারে।

এইরূপে, এই সকল ঘটনার রাজনীতিক গুরুত্বের সহিত তাহার কোন সম্পর্ক না থাকিলেও সমগ্র ভারতবর্ষ ছিল তাহার নিকট এক, অখণ্ড এবং গভীরভাবে তলাইয়া দেখিলে উপলব্ধি হইবে যে, ঐ একতা মনের দিক দিয়া নহে, ঐ একতা হৃদয়ের। তিনি বুঝিতে পারিয়াছিলেন, জগতে তাহার কার্য তাঁহার গুরুদেবের বার্তা আচণ্ডালে বিতরণ করা।

কিন্তু তাহার ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা ও আকাঙক্ষা স্বদেশের কল্যাণসাধনের অদম্য কামনার সহিত বিশেষভাবে জড়িত ছিল। তিনি নিজে কখনও নিছক জাতীয়তা প্রচার করেন নাই; কিন্তু তিনি স্বয়ং ছিলেন জাতীয়তাশব্দে যাহা বুঝায়, তাহার জীবন্ত প্রতিমূর্তিস্বরূপ। ভারতের জাতীয় আদর্শ যে পরস্পরের মধ্যে প্রগাঢ় প্রীতি, আমাদের গুরুদেব নিজের জীবনেই তাহা প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন।

মনে রাখিতে হইবে, ভারতের অতীতের কেবল পুনরুজ্জীবন অথবা পুনঃসংস্থাপন স্বামীজীর একেবারেই অভিপ্রেত ছিল না। যাহারা ঐরূপকরিতে প্রয়াস পাইতেন, তাহাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলিতেন-

“মিশর দেশের পুরাতত্ত্ব আলোচনায় রত ব্যক্তিগণের যেমন ঐ দেশের প্রতি একটা স্বার্থজড়িত অনুবাগ থাকে, তেমনি ভারতের প্রতি এদের অনুরাগও সম্পূর্ণ স্বার্থজড়িত।এঁদের পড়া বইগুলিতে, চর্চায় এবং কল্পনারাজ্যে যে ভারতের চিত্র মনের মধ্যে রয়েছে, সেই অতীত যুগের ভারতকেই আবার দেখবার জন্য এরা লালায়িত।”

তিনি নিজে চাহিতেন, ভারতের প্রাচীন শক্তির নূতন প্রয়োগ, এই নূতন যুগে তাহার কল্পনাতীত বিকাশ। তিনি ‘ডাইনামিক রিলিজন অর্থাৎ প্রচণ্ড শক্তিশালী এক ধর্ম দেখিবার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করিতেন। ধর্মের মধ্যে যতপ্রকার নীচতা, অধঃপতিত অবস্থা, এবং উন্নতির পরিপন্থী অংশ বিদ্যমান, কেবল সেগুলিকেই বাছিয়া লইয়া লোকে তাহাদের প্রাচীনপন্থী বা ‘গোড়া’ আখ্যায় অভিহিত করিবে কেন?

প্রাচীনপন্থী’ শব্দ এত মহান, এত শক্তিশালী, প্রাণপ্রদ যে কিছুতেই উহার ঐভাবে প্রয়োগ চলে না। যে পরিবারে সকল পুরুষই পাণ্ডব বীরগণের তুল্য, সকল নারীই সীতার ন্যায় মহীয়সী, বা সাবিত্রীর ন্যায় নির্ভীক, সেই পরিবার সম্পর্কেই কেবল ঐ শব্দের যথার্থ প্রয়োগ হইতে পারে। রক্ষণশীল অথবা সংস্কারমূলক সকলপ্রকার বিশেষ সমস্যা হইতেই তিনি দূরে অবস্থান করিতেন।

তাহার কারণ ইহা নহে যে, একদল অপেক্ষা অন্যদলের প্রতি তিনি অধিকতর সহানুভূতিসম্পন্ন ছিলেন; প্রকৃত কারণ, তিনি স্পষ্ট দেখিতে পাইতেন যে, উভয়ের পক্ষেই প্রকৃত প্রশ্ন হইল আদর্শটিকে ঠিক ঠিক ধরিতে পারা, এবং ভারতের সহিত উহার একাত্মতা সাধন।

নারীজাতি ও নিম্নশ্রেণীর ব্যক্তিগণ- এই উভয়ের জন্য তাহার অভিমত ছিল যে, তাহাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য সমাজের বর্তমান ব্যবস্থাগুলির পরিবর্তনসাধন নহে, পরন্তু তাহাদের জন্য শিক্ষার দ্বারা এমন অবস্থার সৃষ্টি করা, যাহাতে তাহারা নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করিয়া লইতে পারে।

অতীতে ভারতীয় ঋষিগণ ভারতবাসীর নিকট যে ধর্ম প্রচার করিয়াছিলেন, উদারহৃদয় স্বামীজী পাশ্চাত্যগণের নিকট সেই ধর্মই প্রচার করেন, উহা হইল, মানবের অন্তর্নিহিত দেবত্ব, এবং যে কোন আকারের নিষ্ঠাপূর্ণ সেবার মাধ্যমে উহার উপলব্ধি- ইহাই তাহার প্রচারিত ধর্মের মর্মকথা।

অজ্ঞতার প্রতি তাহার যেমন বিদ্বেষ ছিল, জগতে অলৌকিক রহস্য নামে পরিচিত বস্তুর সহিত ভারতের অভিন্নতাবোধও তাহার নিকট ছিল তেমনই উৎকট ভীতিস্বরূপ। এ বিষয়ে শিক্ষিত ব্যক্তিগণের যে স্বাভাবিক ঔৎসুক্য ও কৌতূহল, তাহা তাঁহারও ছিল, এবং জলের উপর দিয়া হাঁটিয়া যাওয়া, আগুনে হাত দেওয়া প্রভৃতি শুনিলে উহা পরীক্ষা করিয়া দেখিবার জন্য অসুবিধা স্বীকার করিতেও তিনি সর্বদা প্রস্তুত ছিলেন।

কিন্তু আমরা সকলেই অবগত আছি যে, বিশেষ অনুসন্ধান করিলে এইসকল ব্যাপার শেষে প্রায়ই অত্যন্ত অবিশ্বাস্য শোনা কথায় পর্যবসিত হয়। যাহা হউক, এইরূপ কোন ক্ষেত্রে ঐ-সকল ঘটনা কেবল ইহাই নির্দেশ করে যে, আমাদের ইন্দ্রিয়গোচর বস্তুগুলির বর্তমান শ্রেণীবিভাগ অসম্পূর্ণ, এবং উহার সংশোধন অবশ্যই করা উচিত, যাহাতে সচরাচর দৃষ্টিতে পড়ে না, অথচ সম্ভবপর, এরূপ ব্যাপারগুলি উহার অন্তর্ভুক্ত হইতে পারে।

উহারা আমাদের এই সরল উপদেশটুকু দেয়, ইহা ব্যতীত উহাদের আর কোন তাৎপর্য তাহার নিকট ছিল না। তাঁহার নিকট ঐ-সকল ঘটনা কোনক্রমেই অলৌকিক বলিয়া বিবেচিত হইত না। ঐরূপ অতিপ্রাকৃত কার্যের জন্য ভগবান বুদ্ধ কোন ভিক্ষুর সন্ন্যাসের পরিচ্ছদ কাড়িয়া লইয়াছিলেন এবং এই গল্পটি তাহার নিকট বুদ্ধজীবনের অপরাপর ঘটনার মধ্যে সর্বাপেক্ষা মর্মস্পর্শী বোধ হইত।

খ্রীস্টান বাইবেলে যে মহাপুরুষের লীলাসমূহ বর্ণিত হইয়াছে, তাহার সম্বন্ধে তিনি বলিতেন, কতকগুলি অদ্ভুত কর্মের দ্বারা লোকের বিশ্বাস উৎপাদনের চেষ্টা না করিলে, ঐ চরিত্র তাহার নিকট অধিকতর সর্বাঙ্গসুন্দর বলিয়া বোধ হইত। এই বিষয়ে পরবর্তী কালে স্বামী সদানন্দ আমাকে যাহা দেখাইয়া দেন, সম্ভবতঃ তাহাই সত্য- অর্থাৎ পূর্ব ও পশ্চিমে এশিয়ার মধ্যে বৌদ্ধিক পার্থক্যের ন্যায় একটা মানসিক ধাতুগত পার্থক্যও আছে।

পশ্চিম এশিয়া চিরকাল শক্তি অথবা সিদ্ধাই-এর একটা নিদর্শন চায়, কিন্তু পূর্ব এশিয়া উহা বরাবর ঘৃণা করে। স্বামী সদানন্দের মতে, এই বিষয়ে মোঙ্গলীয় ও সেমিটিকদিগের ধারণা বিশেষরূপে পরস্পরবিরোধী; আর আর্যগণ এই উভয়ের মধ্যস্থলে অবস্থান করিয়া উহার ঔচিত্য সম্পর্কে বিচার করিয়া থাকেন।

যাহা হউক, আমাদের অনেকেই স্বীকার করিবেন যে, তথাকথিত অলৌকিক ব্যাপারে আধুনিক কালের আগ্রহই অনেক পরিমাণে এই অনিষ্টকর ধারণার সৃষ্টি করিয়াছে যে, প্রাচ্য মানব এক দুর্বোধ্য প্রকৃতির জীব, মানবজাতির সাধারণ ইচ্ছা অনিচ্ছার সহিত তার যেন কোন সম্পর্ক নাই এবং তাহাদের শরীর যেন অলৌকিক শক্তির গুপ্ত বৈদ্যুতিক আধার।

স্বামীজীর নিকট এ-সকল ছিল ঘৃণার বস্তু। তাঁহার আকাঙক্ষা ছিল, সকলে বুঝুক যেভারতবর্ষ মানুষের দ্বারাই অধুষিত; ভারতবাসীদের চরিত্র প্রকৃতই গভীরভাবে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ; এবং তাহাদের সংস্কৃতি স্বাতন্ত্র-সূচক, কিন্তু সকল মানুষের ন্যায় তাহারাও সর্বতোভাবেই মানুষ, এবং সাধারণ মানুষের ন্যায় সকল কর্তব্য, অধিকার বোধ ও সুখদুঃখ তাহাদেরও আছে।

অতীতে ভারতীয় ঋষিগণ ভারতবাসীর নিকট যে ধর্ম প্রচার করিয়াছিলেন, উদারহৃদয় স্বামীজী পাশ্চাত্যগণের নিকট সেই ধর্মই প্রচার করেন, উহা হইল, মানবের অন্তর্নিহিত দেবত্ব, এবং যে কোন আকারের নিষ্ঠাপূর্ণ সেবার মাধ্যমে উহার উপলব্ধি- ইহাই তাহার প্রচারিত ধর্মের মর্মকথা।

সুতরাং তাহার সঙ্কল্পিত সংযুক্ত জগৎ গঠনের প্রাথমিক ধাপগুলি সম্পন্ন করিতেই স্বভাবতঃ এত দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন ছিল যে, বিশ্বাস ও শক্তির যে প্রথম আবেগ ঐ কার্যের সূত্রপাত করে, ইতিমধ্যে তাহার হয়তো বিলোপ ঘটিবে।

বাহ্য জগতের যে জীবনে ইন্দ্রিয়জ অনুভূতিকে সার জ্ঞান করিয়া তাহাতেই নিবিষ্টচিত্ত হওয়া- স্বামীজীর মতে উহা কেবল সম্মোহন বা স্বপ্নমাত্র; কোনক্রমেই মহৎ ভাবযুক্ত নহে। প্রাচ্যবাসীর ন্যায় পাশ্চাত্যবাসীরও আত্মার আকাঙক্ষা- এই স্বপ্ন ভাঙিয়া ফেলা, এক গভীরতর এবং অধিকতর শক্তিশালী বাস্তব সত্তায় জাগ্রত হওয়া। সকল মানবের ভিতরেই প্রচ্ছন্ন রহিয়াছে সেই অনন্ত শক্তি-

তাহার এই বিশ্বাস তিনি ক্রমাগত নূতন নূতন ভাবে প্রকাশ করিতে চাহিতেন। একবার তিনি বলেন, “সত্য বটে, আমার নিজের জীবন এক মহাপুরুষের প্রতি প্রগাঢ় ভাবাবেগের অনুপ্রেরণায় পরিচালিত, কিন্তু তাতে কি? অতীন্দ্রিয় তত্ত্বগুলি শুধু এক ব্যক্তির মধ্য দিয়েই প্রচারিত হয় না!”

তিনি আবার বলেন, “সত্য বটে, আমি বিশ্বাস করি যে, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস ছিলেন একজন আপুরুষ- ঐশীশক্তি দ্বারা অনুপ্রাণিত। কিন্তু, আমিও ঐশীশক্তি দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং তুমিও ঐরূপ অনুপ্রাণিত। আর তোমার শিষ্যেরাও ঐরূপ হবে, তারপরে তাদের শিষ্যেরাও-এইভাবে অনন্তকাল ধরে চলতে থাকবে!”

পরীক্ষা দ্বারা যাহারা উপযুক্ত প্রমাণিত হইবে, তাহাদেরই কেবল সত্যের উপদেশ প্রদান করা হইবে- প্রাচীনকালে আচার্যদের এই নিয়ম সম্পর্কে এক ব্যক্তি তাহাকে প্রশ্ন করিলে স্বামীজী অসহিষ্ণুভাবে বলিয়া ওঠেন, “দেখতে পাচ্ছ না, রহস্যব্যাখ্যার নাম করে সত্যকে জনকয়েক লোকের মধ্যে আটকে রাখবার যুগ চলে গেছে? ভালোর জন্যই হোক, অথবা মন্দের জন্যই হোক, সেদিন বিলীন হয়ে গেছে, আর কখনো ফিরবে না। ভবিষ্যতে সত্যের দ্বার সকলের নিকট উদঘাটিত থাকবে!”

ইউরোপীয়দের প্রবর্তিত ধর্মভাব ও সম্প্রদায়সমূহের দ্বারা ভারতবর্ষকে প্লাবিত করিবার প্রচেষ্টা সম্পর্কে স্বামীজী অপূর্ব কৌতুক সহকারে বলিতেন যে, উহা এক জাতির কল্যাণকল্পে অপর এক জাতির উচ্ছেদসাধন বা শোষণের এক সুদীর্ঘ উদ্যমের চরম পরিণতিমাত্র। কিন্তু ধর্মের ব্যাপারে ঐরূপ ইউরোপীয় নেতৃত্বকে তিনি কদাপি গুরুত্ব প্রদান করিতেন না।

সর্বোপরি, খ্রীস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে অশোক কর্তৃক দেশবিদেশে প্রেরিত ধর্মপ্রচারকগণের প্রতি মহান ভার অর্পণের ন্যায় তাঁহার স্বজাতির ইতিহাসের আর কোন ঘটনাই তিনি বারংবার উল্লেখ করিতেন না। যাহারা বিভিন্ন দেশে বুদ্ধের ধর্ম বহন করিয়া লইয়া যাইবেন, তাহাদের প্রতি সেই পরাক্রমশালী সম্রাট বলিয়াছিলেন, “মনে রাখবেন, সকল স্থানেই ধর্ম ও সদাচারের কিছু বীজ আপনারা দেখতে পাবেন। দেখবেন, আপনারা যেন ঐ-সকল পোষণ করেন এবং কখনো নষ্ট না করেন।”

এইরূপে অশোক স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন যে, সমগ্র জগৎ একদিন বিভিন্ন ভাবরাশির দ্বারা একসূত্রে গ্রথিত হইবে- যে-সকল ভাব সর্বদাই চরম সত্যলাভ ও আদর্শ চরিত্রের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের প্রচেষ্টায় পরিচালিত ও অনুপ্রাণিত। কিন্তু অশোকের ঐ স্বপ্ন সফল হইবার পথে অন্তরায় ছিল, যাহাদের পরস্পরের মধ্যে বিরাট ব্যবধান এইরূপ অজানিত বিশাল বিভিন্ন দেশ ও জাতিগুলির সহিত যোগাযোগ স্থাপন ও গমনাগমনের জন্য প্রাচীনকালের পথ ও যানবাহনের অসুবিধা।

সুতরাং তাহার সঙ্কল্পিত সংযুক্ত জগৎ গঠনের প্রাথমিক ধাপগুলি সম্পন্ন করিতেই স্বভাবতঃ এত দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন ছিল যে, বিশ্বাস ও শক্তির যে প্রথম আবেগ ঐ কার্যের সূত্রপাত করে, ইতিমধ্যে তাহার হয়তো বিলোপ ঘটিবে। সম্ভবতঃ এই সকল বিষয়ের আলোচনা করিয়াই আমরা যখন কাঠগুদাম পার হইয়া উপরে অবস্থিত গিরিবর্গে প্রবেশ করিলাম, তখন একদিন দীর্ঘকাল গভীর চিন্তার পরে সহসা উর্ধ্বে তাকাইয়া স্বামীজী বলিয়া উঠিলেন-

“বৌদ্ধদের যে কল্পনা ছিল আধুনিক জগৎই কেবল তার উপযুক্ত হয়েছে। আমাদের পূর্বে আর কেহই ঐ কল্পনাকে প্রত্যক্ষ করবার সুযোগ পায়নি।”

<<স্বামীজী-প্রচারিত মতসমূহের সমষ্টিভাবে আলোচনা : এক

……………….
স্বামীজীকে যেরূপ দেখিয়াছি – ভগিনী নিবেদিতা।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

…………………
আরও পড়ুন-
স্বামীজী-প্রচারিত মতসমূহের সমষ্টিভাবে আলোচনা : এক
স্বামীজী-প্রচারিত মতসমূহের সমষ্টিভাবে আলোচনা : দুই

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!