স্বামী বিবেকানন্দ

-শংকর

শেষ পর্বের শুরু এবার। আশঙ্কিত হৃদয় নিয়ে আমরা চলেছি ৪ জুলাই ১৯০২-এর দিকে। কিন্তু এ দেশের সনাতন চিন্তাধারায় স্মরণীয় মানুষদের তিরোধান দিবস সম্পর্কে আমাদের বিশেষ উৎসাহ নেই।

“আবির্ভাব নিয়েই আমাদের আনন্দোৎসব, মৃত্যু সে তো বাসাংসি জীর্ণানি, পুরনো বস্ত্র ছেড়ে নতুনে চলে যাওয়া”, আমাকে বলেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের নামাঙ্কিত মঠ ও মিশনের এক প্রবীণ শ্রদ্ধেয় সন্ন্যাসী। এর অর্থ, ৪ জুলাই ২০০২ যে বীরসন্ন্যাসী বিবেকানন্দর তিরোধান দিবস নিয়ে তেমন ব্যস্ততা নেই তাদের মধ্যে, যাঁরা শতবর্ষের বেশি সময় ধরে এই মহাপুরুষের বাণীকে বাস্তবে রূপান্তরিত করার বিরামহীন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তবু এদেশের সংখ্যাহীন মানুষের মনে ৪ জুলাই নাড়া দিয়ে যায়, আজও মনে প্রশ্ন ওঠে, যে অলৌকিক শরীরের তিরোধান ঘটেছিল ১৯০২ সালে, সেই শরীর যদি ৩৯ বছর ৫ মাস ২৪ দিনের বেশি স্থায়ী হত, তা হলে এদেশের ভাগ্যাকাশে আরও কী কী পরিবর্তন লক্ষ্য করা যেত? আমরা জগৎবাসীরা আরও কী কী উপহার পেতে পারতাম সেই অমৃতপুত্রের কাছ থেকে?

একথাও সত্য যে এই পৃথিবীতে ঈশ্বরপুত্ররা প্রায়ই দীর্ঘজীবী হননি খ্রিস্ট ও শঙ্করাচার্যের সংক্ষিপ্ত জীবনের কথা তো আমাদের অজানা নয়। কিন্তু সেই সঙ্গে ভগবান বুদ্ধও তো আছেন। একজন বিদেশিনী তো সস্নেহে বিদগ্ধ বিবেকানন্দকেও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, বুদ্ধ তো চল্লিশ বছর থেকে আশি বছর পর্যন্ত বিশ্বসংসারকে কম সেবা করেননি।

স্মরণীয় দিনে মৃত্যুকে এই যে উপেক্ষা, বিশেষ করে মহামানবদের তিরোধান, তারই পিছনে সত্যিই কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে কিনা তার প্রারম্ভিক অনুসন্ধান করতে গিয়েই এই অধ্যায়ের সূচনা।

কিন্তু সেই সঙ্গে অন্য কিছু প্রসঙ্গও এসে পড়ে, আর স্মরণে আসে–যাঁকে নিয়ে এই অনুসন্ধান তিনি নিজেই একবার বলেছিলেন- “চিন্তা করো, উপাদান সংগ্রহ করো, সমস্ত অলৌকিকত্ব বাদ দিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের একটা জীবনী রচনা করো।”

অর্থাৎ অলৌকিকত্ব থাকলেও তা নিয়ে বিভোর হওয়ার প্রয়োজন নেই। তিনি ইচ্ছে করেই এসেছিলেন অতি অল্পদিনের জন্য এবং ইচ্ছা করেই বিবেকানন্দ অতি অল্প সময়ের মধ্যে চলে গিয়েছেন, এসব সত্য হলেও, পৃথিবীর অন্য মহাপুরুষদের প্রদর্শিত পথেই করতে হবে তাঁর অনুধ্যান।

বিবেকানন্দ বিষয়ের চলমান বিশ্বকোষ শঙ্করীপ্রসাদ বসু মহাশয় আমাকে উৎসাহ দিলেন। ৪ জুলাই ১৯০২ সম্বন্ধে তিনি ইতিমধ্যেই কিছু হৃদয়গ্রাহী ছবি এঁকেছেন, বিদেশিনী ভক্তিমতীরাও নিরন্তর অনুসন্ধানের পরে উপহার দিয়েছে নানা অমূল্য তথ্য, তবু লোভ হয়–আজি হতে শতবর্ষ পরে কে তুমি বসি পড়িছ আমার শেষদিনের কথা?

ব্যস্ত জীবনযাত্রার স্রোতে ভেসে যেতে যেতে শতবর্ষ পরের মানুষ জানুক, যাকে আমরা আজ প্রায় দেবতার সিংহাসনে বসিয়ে পূজা করছি, কত কঠিন ছিল তার জীবনসংগ্রাম। খ্যাতির হিমালয়শিখরে আরোহণ করেও কেন শেষ হয়নি তার প্রতিদিনের সংগ্রাম?

কেন স্বামীজি বলেছিলেন, সতত প্রতিকূল অবস্থামালার বিরুদ্ধে আত্মপ্রকাশ ও আত্মবিকাশের নামই জীবন? এবং সেই সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কৌতূহল, সনাতন ভারতবর্ষ জন্মদিবস অপেক্ষা মৃত্যুদিবসকে কেন এতো কম গুরুত্ব দিয়েছে?

আরও বলা যাক। স্বামীজির পিতৃদেব বিশ্বনাথ দত্ত বাহান্ন বছর পেরোননি। মৃত্যুর মাসখানেক আগে তার হার্টের রোগ হয়েছিল। বহু বছর পরে ৫ জুলাই ভোরবেলায় যখন উত্তর কলকাতার বাড়িতে স্বামীজির দেহরক্ষার সংবাদ এল তখন শোকবিহ্বলা জননী জিজ্ঞেস করলেন, হঠাৎ কী হল? তখন কনিষ্ঠ পুত্র বললেন, “বাবার যা হয়েছিল।” পিতার মৃত্যুও রাত ন’টা নাগাদ, খাবার পরে বাঁ হাতে তামাক খাচ্ছিলেন, বমি করলেন, তারপরেই হৃদযন্ত্র বন্ধ।

শেষ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গিয়েছে এবং সেই উত্তর এই লেখার পরিসমাপ্তিতে উল্লিখিত হবে। কিন্তু তার আগে আমার অতি সংক্ষিপ্ত অনুসন্ধানের একটা ছোট্ট ছবি তাড়াতাড়ি এঁকে ফেলা যাক।

নানা প্রশ্ন অবশ্যই জড়ো হয়ে আছে। কেন এবং কীভাবে বিবেকানন্দ এত কম বয়সে চলে গেলেন? মহামানুষদের জীবনপথ নিরন্তর কণ্টকিত করতে সমকাল কেন দ্বিধা করে না? এবং কেমন করে তিলেতিলে অতিপরিশ্রমে নিজেকে ক্ষয় করে ক্ষণজন্মা পুরুষরা এই বিশ্বসংসারকে চিরঋণে আবদ্ধ করে যান?

আর সেই সঙ্গে একজন জার্মান দার্শনিকের সেই বিখ্যাত উক্তি–যদি কোনও মহাপুরুষকে সত্যিই শ্রদ্ধা করে থাক তবে তার তিরোধানে ক্রন্দন করো না, বরং তার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্যে লেগে পড়।

আমাদের প্রথম কৌতূহল, প্রথম যুগের বিবেকানন্দকে আমরা তো প্রবল প্রতাপান্বিত শরীরের অধীশ্বর হিসেবেই দেখেছি। তার শরীর হঠাৎ এমনভাবে ভেঙে পড়ল কেন? একালের মানুষের শরীর তো এইভাবে জীর্ণ হয় না। পূর্বসূরীদের নির্দেশিত পথেই আমার এই অনুসন্ধান, তেমন কোনও অপ্রকাশিত তথ্য আমার হাতে নেই, কিন্তু বিভিন্ন সূত্র থেকে কুড়িয়ে নিয়ে একটা মালা গাঁথার চেষ্টা চালানো গেল।

অসীম শারীরিক শক্তি নিয়েই নরেন্দ্রনাথ সন্ন্যাসের দুর্গম পথে যাত্রা করেছিলেন। আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি, অনেকেরই ধারণা স্বামীজির অনেক অসুখবিসুখই শ্রীরামকৃষ্ণের দেহত্যাগের পর বরানগরের কঠিন দারিদ্র্য ও পরিব্রাজক জীবনে ভিক্ষান্নে ভোজনং যত্রতত্র এবং শয়নং হট্টমন্দির থেকে উদ্ভূত।

এ-বিষয়ে অবশ্যই আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন থেকে গেল। কিন্তু সেই সঙ্গে সিমুলিয়ার দত্তদের পারিবারিক অসুখবিসুখগুলোর দিকে নজর দেওয়াটাও প্রয়োজন।

আমরা বিবেকানন্দর ছোটভাই ভূপেন্দ্রনাথের লেখা থেকে জানতে পারি, পিতৃদেব বিশ্বনাথ দত্ত অল্পবয়সেই ডায়াবিটিসের রোগী হন। এই রোগ পরবর্তী সময়ে শুধু নরেন্দ্রনাথকে নয়, তার অন্য দুই ভাই মহেন্দ্রনাথ ও ভূপেন্দ্রনাথকেও আক্রমণ করে।

মহেন্দ্র ও ভূপেন্দ্র অবশ্য দীর্ঘজীবী হয়েছিলেন। কিন্তু এঁদের অন্তরঙ্গ শ্রী রঞ্জিত সাহার কাছে শুনেছি, ভূপেনবাবু মিষ্টি এড়িয়ে চলতেন। দু’জনেরই হাইপারটেনশন ছিল, যা নরেন্দ্রনাথের মধ্যেও অল্পবয়স থেকে থাকতে পারে। কারণ কম বয়সেও মাথার যন্ত্রণার উল্লেখ রয়েছে পারিবারিক স্মৃতিতে।

আরও বলা যাক। স্বামীজির পিতৃদেব বিশ্বনাথ দত্ত বাহান্ন বছর পেরোননি। মৃত্যুর মাসখানেক আগে তার হার্টের রোগ হয়েছিল। বহু বছর পরে ৫ জুলাই ভোরবেলায় যখন উত্তর কলকাতার বাড়িতে স্বামীজির দেহরক্ষার সংবাদ এল তখন শোকবিহ্বলা জননী জিজ্ঞেস করলেন, হঠাৎ কী হল? তখন কনিষ্ঠ পুত্র বললেন, “বাবার যা হয়েছিল।” পিতার মৃত্যুও রাত ন’টা নাগাদ, খাবার পরে বাঁ হাতে তামাক খাচ্ছিলেন, বমি করলেন, তারপরেই হৃদযন্ত্র বন্ধ।

এই পর্বেই কিন্তু বড় আকারের দুঃসংবাদের ইঙ্গিত। লন্ডনেই আমরা প্রথম স্বামীজির হার্ট অ্যাটাকের খবর পেয়েছি। লন্ডনে একদিন মধ্যাহ্ন ভোজনের পর স্বামীজি বসে ভাবছিলেন। সামনে আমেরিকান অনুরাগী জন পিয়ার ফক্স ও মহেন্দ্রনাথ।

কৌপীনধারী অবস্থায় ভিক্ষান্নে জীবন অতিবাহিত করে নরেন্দ্রনাথের শরীরে বেশ কয়েকটি রোগের আবির্ভাব বা সূত্রপাত হয়েছিল একথা আমরা আগেই জেনেছি।

সন্ন্যাসজীবনে পেটের অসুখ নিত্যসাথী হওয়ায় সদা চলমান সন্ন্যাসীর খুবই অসুবিধা হয়েছিল। বারবার টয়লেটে ছোটার তাগিদে, ট্রেনের নিচু ক্লাসে ভ্রমণ প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। ছাত্রাবস্থায় আমাদের ইস্কুলে বারবার শুনেছি, পরিব্রাজক সন্ন্যাসীকে দয়াপরবশ হয়ে কেউ কেউ ট্রেনের টিকিট কেটে দিতে চাইলে, নরেন্দ্রনাথ তাকে তখনকার উচ্চশ্রেণীর (সেকেন্ড ক্লাস) টিকিট দিতে অনুরোধ করতেন।

এই পেটের গোলমালের জন্য একবার এদেশের মহা উপকার হয়েছিল। এমন দাবিও অন্যায় হবে না! প্রথমবার আমেরিকা যাবার সময় কম খরচে ডেকের যাত্রী হওয়া তার পক্ষে অসম্ভব ছিল। খেতড়ির মহারাজা তাঁকে জাহাজের ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কিনে না দিলে সে যাত্রায় তাঁর সঙ্গে টাটা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জামশেদজী টাটার পরিচয় হত না।

টাটা দেশলাই আমদানির জন্য জাপানে গিয়েছিলেন। ধনপতি ব্যবসায়ীকে কাছে পেয়ে স্বামীজি তাঁকে স্বদেশে শিল্প স্থাপন করার অনুপ্রেরণা দেন এবং সেই সঙ্গে স্বদেশে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। জামশেদজী পরবর্তীকালে টাটা স্টিল ও ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স প্রতিষ্ঠার জন্য এগিয়ে আসেন। টাটা-বিবেকানন্দ পত্রাবলীর পুনর্সন্ধান করে সাম্প্রতিক গবেষকরা এদেশের মানুষের কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন।

মার্কিন দেশের সংগ্রাম ও রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠা বিবেকানন্দের শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ মার্কিন গবেষকদের দয়ায় আমাদের হাতের গোড়ায় রয়েছে। সেখানে তাঁর অসুখবিসুখ এবং খাওয়াদাওয়া সম্পর্কেও যথেষ্ট খবরাখবর রয়েছে।

আমরা দেখেছি তার স্মোকিং বেড়েছে; নতুন আকর্ষণ নবাবিষ্কৃত আমেরিকান আইসক্রিম। আধুনিক চিকিৎসা এবং আজব চিকিৎসা দুটোর কাছেই তিনি আত্মসমর্পণ করেন, তবে অমানুষিক পরিশ্রমের মতন শরীর তখনও তার রয়েছে।

বহুদিন পরে জীবনের শেষ পর্বে অসুস্থ স্বামীজিকে একজন অনুরাগী জিজ্ঞেস করেছিলেন, “স্বামীজি, আপনার শরীর এতো তাড়াতাড়ি ভেঙে গেল, আগে যত্ন নেননি কেন?” স্বামীজি উত্তর দিয়েছিলেন, “আমেরিকায় আমার শরীরবোধই ছিল না।”

তা হলে প্রথম বড় অসুখের ইঙ্গিত আমরা কোথায় পেলাম? বিশ্বাসযোগ্য উপাদান রয়েছে ভ্রাতা মহেন্দ্রনাথ দত্তর লেখায়। ১৮৯৬ সালে আমেরিকা থেকে দ্বিতীয়বার ইংলন্ডে এসেছেন বিবেকানন্দ।

এই পর্বেই কিন্তু বড় আকারের দুঃসংবাদের ইঙ্গিত। লন্ডনেই আমরা প্রথম স্বামীজির হার্ট অ্যাটাকের খবর পেয়েছি। লন্ডনে একদিন মধ্যাহ্ন ভোজনের পর স্বামীজি বসে ভাবছিলেন। সামনে আমেরিকান অনুরাগী জন পিয়ার ফক্স ও মহেন্দ্রনাথ।

প্রায় একই সময় স্নেহের ক্রিশ্চিনকে স্বামীজি লিখেছেন নিউইয়র্ক থেকে, “কিডনির অসুখের ভয়টা কেটে গেছে, এখন দুশ্চিন্তাই আমার প্রধান অসুখ, এই রোগটাও আমি দ্রুত জয় করার চেষ্টা চালাচ্ছি।” কিন্তু দু’মাস পরেই আগস্ট মাসে মার্কিন অনুরাগী জন ফক্সকে স্বামীজি জানাচ্ছেন, “আমার শরীর দ্রুত ভেঙে যাচ্ছে। মহিমকে (ভাই) মাকে এবং সংসারকে দেখার ভার নেবার জন্যে তৈরি হতে হবে। আমি যে কোনও সময়ে চলে যেতে পারি।

মহেন্দ্রনাথের বর্ণনা অনুযায়ী “হঠাৎ যেন তাঁহার মুখে বড় কষ্টের ভাব দেখা গেল। খানিকক্ষণ পরে তিনি নিশ্বাস ফেলিয়া ফক্সকে বলিলেন, দেখ ফক্স, আমার প্রায় হার্ট ফেল করছিল। আমার বাবা এই রোগে মারা গেছেন, বুকটায় বড় যন্ত্রণা হচ্ছিল, এইটা আমাদের বংশের রোগ।” অর্থাৎ তেত্রিশ বছর বয়সেই অকাল দেহাবসানের সুনিশ্চিত ইঙ্গিত।

এখন প্রশ্ন, পরবর্তী সময়ে স্বামীজির হার্টের অবস্থা কেমন ছিল? ১৮৯৮ সালে অমরনাথ তীর্থ দর্শনের সময় আবার একটা অস্বস্তিকর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। পাহাড়-ভাঙার অবর্ণনীয় ধকলের পরে ডাক্তার বলছেন, ওঁর হৃদয়যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারত।

চিকিৎসকের সাবধানবাণী, স্বামীজির হার্টের আকার বিপজ্জনকভাবে বড় হয়ে গিয়েছে। বেলুড়ে ফেরার কয়েকদিন পরে স্বামী-শিষ্য সংবাদের স্মরণীয় লেখক শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তীর সঙ্গে যখন স্বামীজির দেখা, তখন তাঁর বাঁ চোখের ভিতরটা লাল হয়ে রয়েছে।

আর ডাক্তারদের সাবধানবাণী- ওই চোখে ব্লাড ক্লট হয়েছে। শেষপর্বে আমরা দেখছি, তার ডান চোখটিও নষ্ট হয়ে গেছে, অর্থাৎ জীবন দীর্ঘতর হলে সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন হওয়ার প্রবল আশঙ্কা ছিল। মানুষটি কিন্তু এমনই রসিক যে নিজেকে একচক্ষু শুক্রাচার্যের সঙ্গে তুলনা করেও আনন্দ পাচ্ছেন!

কিন্তু ধারাবাহিকতায় ফেরা যাক এবার। আমাদের স্বামীজিকে নিয়ে ইতালীয় জাহাজ রুবাত্তিনোবোম্বাই বন্দরে পৌঁছে গিয়েছে।

রুবাত্তিনো হয় ৬ অথবা ৭ ডিসেম্বর ১৯০০ বোম্বাই বন্দরে ফিরেছিল আমাদের স্বামীজিকে নিয়ে। শেষ হলো তার বিদেশ ভ্রমণপর্ব। হাওড়াগামী ট্রেনের জন্য স্বামীজিকে স্টেশনে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

ট্রেনে দৈবক্রমে পূর্বপরিচিত বন্ধু মন্মথনাথ ভট্টাচার্যর সঙ্গে স্বামীজির দেখা হয়ে গিয়েছিল। বিদেশি পোশাকে সজ্জিত স্বামীজিকে তিনি প্রথমে চিনতেই পারেননি, পরে দু’জনে খুব আমোদ-আহ্লাদ হয়েছিল।

বম্বে-হাওড়া এক্সপ্রেসে স্বামীজি একা হাওড়া স্টেশনে নামলেন, ওখান থেকে সন্ধ্যায় গাড়িভাড়া করে আচমকা বেলুড়ে আগমন। সে এক মধুর প্রত্যাবর্তন–আমরা জানি ডিনারের ঘণ্টা শুনে, গেটের তালা খোলার জন্যে অপেক্ষা না করে সায়েবী সাজসজ্জায় যে মানুষটি মালপত্তর সমেত দেওয়াল টপকে ভোজনের আসরে সানন্দে বসে পড়ে প্রাণভরে প্রিয় খিচুড়ি খেয়েছিলেন রবিবার ৯ ডিসেম্বর ১৯০০র সন্ধ্যায়, সে মানুষটির মধ্যে গুরুভাইরা গুরুতর অসুস্থতার কোনও ইঙ্গিত লক্ষ্য করেননি।

স্বয়ং বিবেকানন্দও তখন প্রবলভাবে সহাস্য। বেলুড়ের সবাইকে তিনি বলছেন, “তোদের খাবার ঘণ্টা শুনেই ভাবলুম, এই যাঃ, এখনি না গেলে হয়তো সব সাবাড় হয়ে যাবে, তাই দেরি করলাম না।”

কিন্তু পত্রাবলীর আলোকে এতদিন পরে পরিস্থিতি খুঁটিয়ে দেখলে শরীর সম্পর্কে কিছু কিছু অস্বস্তিকর ইঙ্গিত ছ’মাস আগে থেকেই পাওয়া যাচ্ছে। জুন মাসে বিবেকানন্দ তাঁর চিঠিতে বদহজম ও ডিসপেপসিয়া নিয়ে রসিকতা করছে।

প্রায় একই সময় স্নেহের ক্রিশ্চিনকে স্বামীজি লিখেছেন নিউইয়র্ক থেকে, “কিডনির অসুখের ভয়টা কেটে গেছে, এখন দুশ্চিন্তাই আমার প্রধান অসুখ, এই রোগটাও আমি দ্রুত জয় করার চেষ্টা চালাচ্ছি।” কিন্তু দু’মাস পরেই আগস্ট মাসে মার্কিন অনুরাগী জন ফক্সকে স্বামীজি জানাচ্ছেন, “আমার শরীর দ্রুত ভেঙে যাচ্ছে। মহিমকে (ভাই) মাকে এবং সংসারকে দেখার ভার নেবার জন্যে তৈরি হতে হবে। আমি যে কোনও সময়ে চলে যেতে পারি।”

স্বদেশে আচমকা ফিরে এসে, বেলুড় মঠের সন্ন্যাসী ভাইদের সঙ্গে হৈহৈ করে খিচুড়ি খাওয়ার আনন্দে বিভোর বিবেকানন্দ তার প্রিয় খেতড়ির নরেশকে লিখছেন- “আমার হার্ট খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছে।…আমার মনে হচ্ছে, এজীবনে যা করার ছিল তা শেষ হয়েছে।

কিন্তু বেলুড় মঠে ফিরতেই স্বামীজির রোগের প্রকোপ কমে গেল। এই সময়কার চিঠিতে বাংলার পাহাড়ের মৃদু নিন্দা করেছেন আমাদের পরমপ্রিয় সন্ন্যাসী। জোসেফিন ম্যাকলাউডকে স্বামীজি লিখছেন, “আমাদের পার্বত্যস্বাস্থ্যনিবাস শিলং-এ আমার জ্বর, হাঁপানি ও অ্যালবুমেন বেড়েছিল এবং শরীর দ্বিগুণ ফুলে গিয়েছিল। যাহোক, মঠে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে রোগের লক্ষণগুলি হ্রাস পেয়েছে।”

এর আগে প্যারিস থেকে (আগস্ট ১৯০০) প্রিয় হরিভাইকে (স্বামী তুরীয়ানন্দ) স্বামীজি লিখছেন, “আমার কাজ আমি করে দিয়েছি বস্। গুরু মহারাজের কাছে ঋণী ছিলাম–প্রাণ বার করে আমি শোধ দিয়েছি। সে কথা তোমায় কি বলব?..দলিল করে পাঠিয়েছি সর্বেসর্বা কত্তাত্তির। কত্তাত্তি ছাড়া বাকী সব সই করে দিয়েছি।”

জীবন নাটকের যবনিকাপাতের সত্যিই আর দেরি নেই, আর মাত্র আঠারো মাস। কিন্তু পায়ের তলায় সরষে নিয়ে যাঁদের জন্ম তারা ভগ্নশরীরেও ঘুরে বেড়াতে চান চরকির মতন।

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমরা দেখছি বিবেকানন্দকে মায়াবতী আলমোড়ার পথে। কাঠগোদামে স্বামীজির জ্বর জ্বর ভাব। সেখানে একদিন বিশ্রাম করলেন। মায়াবতীতে পৌঁছে শিষ্য বিরজানন্দকে বলছেন, “শরীরটাকে বেজায় কষ্ট দিয়েছি, তার ফল হয়েছে কি?না জীবনের যেটা সবচেয়ে ভাল সময় সেখানটায় শরীর গেল ভেঙে। আর আজ পর্যন্ত তার ঠেলা সামলাচ্ছি।”

১৯০১ জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে বেলুড়ে ফিরে মিসেস ওলি বুলকে পরমানন্দে স্বামীজি জানাচ্ছেন, “বাংলাদেশে, বিশেষত মঠে যে মুহূর্তে পদার্পণ করি, তখনি আমার হাঁপানির কষ্টটা ফিরে আসে, এস্থান ছাড়লেই আবার সুস্থ। আগামী সপ্তাহে আমার মাকে নিয়ে তীর্থে যাচ্ছি…তীর্থদর্শন হলো হিন্দু বিধবার প্রাণের সাধ; সারাজীবন সব আত্মীয়স্বজনদের কেবল দুঃখ দিয়েছি। তাদের এই একটি ইচ্ছা অন্তত পূর্ণ করতে চেষ্টা করছি।”

এর আগে মায়াবতী থেকে ধীরামাতা মিসেস বুলকে (৬ জানুয়ারি ১৯০১) স্বামীজি লিখেছেন, “কলকাতায় প্রথম দিনের ছোঁয়াতেই আমার হাঁপানি আবার দেখা দিয়েছিল। সেখানে যে দু-সপ্তাহ ছিলাম প্রতি রাত্রেই রোগের আক্রমণ হত।”

মার্চের শেষে অসুস্থতার তোয়াক্কা না করে ঢাকা চললেন স্বামী বিবেকানন্দ। সেখান থেকে চট্টগ্রাম, কামরূপ, কামাখ্যা এবং শিলং।

হাঁপানিও যে স্বামীজির সঙ্গের সাথী তার প্রমাণ অনেক রয়েছে। ঢাকায় এক বারাঙ্গনা করুণভাবে তার কাছে নিবেদন করল, সে হাঁপানিতে ভুগছে, স্বামীজির কাছে সে ওষুধ ভিক্ষা চাইছে। অসহায় স্বামীজি সস্নেহে বললেন, “এই দেখ, মা! আমি নিজেই হাঁপানির যন্ত্রণায় অস্থির, কিছুই করতে পারছি না। যদি আরোগ্য করবার ক্ষমতা থাকতো, তা হলে কি আর এই দশা হয়!”

ঢাকাতে স্বামীজির ডায়াবিটিসও বেড়েছিল। গৌহাটিতে হাঁপানি বাড়ে, আর শিলং-এ তো খুব খারাপ অবস্থা। যখন হাঁপানির টান বাড়ত তখন কতকগুলো বালিশ একত্র করে বুকের ওপর ঠেসে ধরতেন এবং সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করতেন। শিলং-এ অ্যালবুমেন। বেড়েছিল এবং শরীর দ্বিগুণ ফুলে গিয়েছিল।

কিন্তু বেলুড় মঠে ফিরতেই স্বামীজির রোগের প্রকোপ কমে গেল। এই সময়কার চিঠিতে বাংলার পাহাড়ের মৃদু নিন্দা করেছেন আমাদের পরমপ্রিয় সন্ন্যাসী। জোসেফিন ম্যাকলাউডকে স্বামীজি লিখছেন, “আমাদের পার্বত্যস্বাস্থ্যনিবাস শিলং-এ আমার জ্বর, হাঁপানি ও অ্যালবুমেন বেড়েছিল এবং শরীর দ্বিগুণ ফুলে গিয়েছিল। যাহোক, মঠে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে রোগের লক্ষণগুলি হ্রাস পেয়েছে।” শিলং-এ চিফ কমিশনার স্যর হেনরি কটন স্থানীয় সিভিল সার্জনকে তার চিকিৎসার ভার নিতে বলেছিলেন এবং দু’বেলা নিজে খবর নিতেন।

নভেম্বরের শেষে পরপর দুটি খারাপ খবর “ডান চোখটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।” (মনে হয় ডায়াবিটিসের ফল।) বিবেকানন্দ বুঝেছিলেন কিনা জানি না, তবে লোকে তাকে বলছে কলকাতায় গিয়ে চোখের ডাক্তার দেখাও। স্বামীজি অবশ্যই যাবেন, কিন্তু এই মুহূর্তে সর্দিতে তিনি বিছানাবন্দী। স্বামীজির পরের চিঠিতে সর্দিকাশির সঙ্গে হাঁপানির পুনরাবির্ভাব ঘোষণা।

পরের বছরে (১৯০২) জানুয়ারির শেষে আবার পথের ডাক। এবার জাপানিদের সঙ্গে বোধগয়ায়, সেখান থেকে পরের মাসে ট্রেনে বারাণসী। চলার শেষ টানতে রাজি নন সন্ন্যাসী, শরীর অশক্ত হলেও কী আসে যায়? মন তো আছে।

অনুসন্ধিৎসুরা এইসব ভ্রমণ বৃত্তান্তর বিবরণ যথাস্থানে পড়ে নিতে এখন আমাদের সময় নেই, আমাদের সামনে সেই দুঃখময় শুক্রবার ৪ জুলাই। মোদ্দা কথা, পাখি তার শেষ আশ্রয় বেলুড় মঠে ফিরে এসেছে–হয় ৭ মার্চ ১৯০২ অথবা পরের দিন,দু’জন শ্রদ্ধেয় মানুষ দু’রকম তারিখ লিখে রেখে গিয়েছেন। পণ্ডিতরা বিবাদ করুন লয়ে তারিখ সাল, আমরা বরং খোঁজ করি স্বামীজির শরীর স্বাস্থ্যের।

শেষ পর্বে নিজের শরীরের কথা কর্তা স্বয়ং প্রায় নিয়মিতভাবেই লিখে গিয়েছেন তার প্রিয় শিষ্যা ক্রিশ্চিনকে। এই চিঠিগুলি সম্প্রতি প্রকাশিত ইংরিজি রচনাবলির নবম খণ্ডে স্থান করে দিয়েছেন পরম নিষ্ঠাবান ও সাবধানী প্রকাশক অদ্বৈত আশ্রম।

এইসব চিঠিতে আমাদের প্রিয় বিবেকানন্দ নিরন্তর আশা-নিরাশার দোলায় দুলছেন। কখনও লিখছেন, খুব ভাল ঘুম হচ্ছে, জেনারেল হেথ মোটেই খারাপ নয়। আবার কখনও লিখছেন, বঙ্গজননী আমাকে মাঝে মাঝে হাঁপানি উপহার দেন, কিন্তু হাঁপানি এবার পোষ মানছে। তবে সর্বনাশা রোগ ডায়াবিটিস ও ব্রাইটস ডিজিজ একেবারেই উধাও।

দ্বিতীয় অসুখটি কিডনি সংক্রান্ত, ডায়াবিটিস অনেক সময় একে সঙ্গে নিয়ে আসে, সাধারণ ভাষায় বোধ হয় নেফ্রাইটিস। শুকনো জায়গায় গেলে হাঁপানি যে ঠিক হয়ে যাবে, সে বিষয়ে মহানায়ক বিবেকানন্দ সুনিশ্চিত। কিন্তু রোগের ধাক্কা যখন আসে তখন শরীর আধখানা করে দিয়ে যায়। “তবে আবার শরীরে একটু মেদ জড়ো করতে আমার সময় লাগে না,” আশ্বস্ত করছেন বিবেকানন্দ তাঁর এক মানসকন্যাকে।

আরও একটি চিঠিতে দারুণ গরমে ঘামাচির বিরুদ্ধে সরস মন্তব্য করেছেন স্বামীজি। শরীরের নানা অংশে দগদগে ঘামাচি–আর সেই সঙ্গে তিক্ত মেজাজ। নার্ভ উত্যক্ত, বুঝছেন বিবেকানন্দ, স্বীকার করছেন মাঝে মাঝে ধৈর্যচ্যুত হয়ে এতই রাগারাগি করছেন যে একজনকেও কাছাকাছি দেখতে পাচ্ছেন না যে ধৈর্যময় হয়ে তাকে সহ্য করবে। কিন্তু এবার তিনি রাগ কমিয়ে ফেলতে কৃতসংকল্প, “দেখো, এবার আমি ভেড়ার মতন শান্ত হয়ে উঠবো।”

অক্টোবরের চিঠিতে গরমের বিরুদ্ধে স্বামীজির প্রবল অভিযোগ– আমার গায়ের রঙ এখন কালা আদমিদের থেকেও কালো! স্বামীজির শারীরিক লক্ষণ বিচার করে, খ্যাতনামা চিকিৎসক ডাক্তার সুব্রত সেন আমাকে বললেন, “ব্যাপারটা সুবিধের নয়, কারণ ওটা রেনাল ফেলিওরের লক্ষণও হতে পারে।”

ঐতিহাসিক পুরুষদের শরীর স্বাস্থ্য সম্পর্কে নতুন বৈজ্ঞানিক আলোকপাতের চেষ্টা ইদানীং দেশে দেশে চালু হয়েছে, আমরা অবশ্য একেবারেই পিছিয়ে আছি।

নভেম্বরে সিস্টার নিবেদিতাকে স্বামীজি লিখছেন, দুর্গাপূজার সময় থেকে শরীরটা মোটেই ভাল নয়। একই দিনে সিস্টার ক্রিশ্চিনকে আর একখানা চিঠি– কয়েকদিনের মধ্যেই কলকাতা এবং বাংলা ছাড়তেই হবে বর্ষার পরেই ম্যালেরিয়ার প্রকোপ ভীষণ বেড়ে যায়। এরপর তিনি বর্ণনা করেছেন, বেলুড়ে পোষা জন্তু জানোয়ার পাখিদের সঙ্গে তার শিশুসুলভ আনন্দময় জীবনের কথা। মজার মন্তব্য আছে, “আমার চিড়িয়াখানায় মুরগি নেই, ওই জীব এখানে নিষিদ্ধ!”

নভেম্বরের শেষে পরপর দুটি খারাপ খবর “ডান চোখটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।” (মনে হয় ডায়াবিটিসের ফল।) বিবেকানন্দ বুঝেছিলেন কিনা জানি না, তবে লোকে তাকে বলছে কলকাতায় গিয়ে চোখের ডাক্তার দেখাও। স্বামীজি অবশ্যই যাবেন, কিন্তু এই মুহূর্তে সর্দিতে তিনি বিছানাবন্দী। স্বামীজির পরের চিঠিতে সর্দিকাশির সঙ্গে হাঁপানির পুনরাবির্ভাব ঘোষণা।

…………………….
অচেনা অজানা বিবেকানন্দ- শংকর।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

…………………..
আরও পড়ুন-
উনচল্লিশ বছর, পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন : এক
উনচল্লিশ বছর, পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন : দুই
উনচল্লিশ বছর, পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন : তিন
উনচল্লিশ বছর, পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন : চার

……………….
আরও পড়ুন-
সন্ন্যাসীর শরীর : কিস্তি এক
সন্ন্যাসীর শরীর : কিস্তি দুই
সন্ন্যাসীর শরীর : কিস্তি তিন
সন্ন্যাসীর শরীর : কিস্তি চার

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!