ভবঘুরেকথা
স্বামী বিবেকানন্দ

উনচল্লিশ বছর, পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন : দুই

-শংকর

দুসপ্তাহ পরে বিবেকানন্দ নিজেই শরীর সম্বন্ধে আরও খারাপ খবর দিচ্ছেন শিষ্যা ক্রিশ্চিনকে তিন বছর ধরে তিনি অ্যালবুমিন-ইউরিয়ায় জর্জরিত। মাঝে মাঝে প্রবল ধাক্কা আসে, আবার চলে যায়–তবে কিডনি বোধহয় সুস্থ আছে।

বিবেকানন্দ নিজেই ব্যাখ্যা করছেন, ডায়াবিটিস থেকেও খারাপ এই অ্যালবুমিন, রক্ত বিষাক্ত হয়, হার্ট আক্রমণ করে এবং আরও নানারকম বিপদ ঘটায়। সর্দি হলে এর প্রকোপ বেড়ে যায়। এবার আমার ডান চোখটায় ব্লাড ভেসেল ফাটিয়ে দিয়েছে, ফলে আমি প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।…

ডাক্তাররা একসময় আমাদের বিবেকানন্দকে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছেন। মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ, হাঁটাচলা এমনকি দাঁড়িয়ে থাকাও বারণ। এখানে আয়ুর্বেদ চিকিৎসার ইঙ্গিত আছে, কবিরাজরা টন টন সোনাচাদি এবং মুক্তা গিলতে বাধ্য করছেন রোগীকে।

এই সময় গুরুভাই রামকৃষ্ণানন্দ মাদ্রাজ থেকে স্বামীজির সঙ্গে দেখা করতে এসে, অবাক কাণ্ড করলেন। তার সারাজীবনের ব্যক্তিগত সঞ্চয় ৪০০ টাকা জোর করে তার প্রিয় গুরুভাইকে দিয়ে গেলেন। বিবেকানন্দ বিমোহিত–এমন ভালবাসা কে কোথায় দেখেছে? সেই টাকা গ্রহণ করলেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিবেদিতাকে লিখলেন, ওই টাকা আমি মঠে রেখে দিয়েছি। যদি হঠাৎ আমার দেহাবসান হয় তা হলে অবশ্যই দেখো ওই টাকা যার সে যেন ফেরত পায়।

এইভাবে জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহ এসে গেল। আশানিরাশার দোলায় দুলছে পত্রলেখক বিবেকানন্দ। কখনও বলছেন, ঘুম হচ্ছে, কোনো অসুবিধা নেই, একটু বিশ্রাম নিলেই দুরাত্মা ডায়াবিটিস ও অ্যালবুমিন দূর হয়ে যাবে। কখনও লিখছেন, সম্ভব হলে ভাল আমলকী পাঠাও, কলকাতার আমলকী সুবিধের নয়। ক্রিশ্চিনকে লেখা স্বামীজির শেষ চিঠি- আমার সম্বন্ধে একটুও উদ্বিগ্ন হয়ো না। সেই সঙ্গে সুখবর, শরীর ইদানীং এতই ভাল যে শীর্ণতা কাটিয়ে মধ্যপ্রদেশে একটু ভুঁড়ির ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে!

কিন্তু দুঃসময় তো সুদূর নয়। বিভিন্ন সূত্র থেকে আমরা দেখছি, বারাণসীতেও তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তিনজন সেবক পালা করে সারারাত বিনিদ্র বিবেকানন্দকে হাত পাখার হাওয়া করছেন।

স্বামীজি বারাণসী থেকেই নিবেদিতাকে লিখছেন- বসতে পর্যন্ত পারছি না। সবসময় ঘুসঘুসে জ্বর, সেই সঙ্গে শ্বাসকষ্ট। কয়েকদিন পরে পা এমন ফুলে ওঠে যে হাঁটতে পারছেন না।

জীবনের শেষ কয়েক মাস স্বামীজির রোগজীর্ণ শরীরকে কেন্দ্র করে অনেক ডাক্তারি হয়েছে।

অন্যতম চিন্তার কারণ শোথ বা ড্রপসি। কবিরাজ মহানন্দ সেনগুপ্ত এলেন। তার নির্দেশ, কয়েক সপ্তাহ জল ও নুন একেবারেই খাওয়া চলবে না। প্রতিজ্ঞা করলেন বিবেকানন্দ, তাই হবে। কী অসীম মনোবল থেকে এই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা যায়, তা আমাদের মতন মানুষের চিন্তার বাইরে।

তরল পদার্থের মধ্যে একটু দুধ। এমন দুর্জয় মনোবল যে মুখে জল দিয়ে মুখ কুলকুচি করছেন কিন্তু এক বিন্দু তৃষ্ণার জল গলা দিয়ে শরীরে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না। শুধু কবিরাজী নয়, প্রিয় গুরুভাইরা বড় বড় অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তারের কাছেও ছুটছে। একজনের নাম পাওয়া যাচ্ছে–ডাক্তার সন্ডার্স।

মহাসমাধির কয়েকদিন আগে হাওয়া বদলাতে স্বামীজি কলকাতার কাছে বড় জাগুলিয়া গিয়েছিলেন প্রথমে ট্রেনে, পরে গোরুর গাড়িতে সাত মাইল। আনন্দিত বিবেকানন্দ তার চিঠিতে লিখলেন, এমন ধকলের পরেও ড্রপসি ফিরে এল না, পা ফুলল না।

এরই মধ্যে নানা চিন্তায় বিপন্ন এবং বিব্রত আমাদের বিবেকানন্দ। অর্থাভাব। নিবেদিতার কাছে চিঠি, ইউরোপ থেকে সামান্য যে অর্থ নিয়ে এসেছিলাম তা মায়ের অন্নসংস্থান ও দেনা শোধে খরচ হয়ে গিয়েছে। সামান্য যা পড়ে আছে তা আমি স্পর্শ করতে পারব না, কারণ আত্মীয়দের সঙ্গে পৈত্রিক বাড়ির মামলায় খরচ যোগাতে হবে।

এই সময় গুরুভাই রামকৃষ্ণানন্দ মাদ্রাজ থেকে স্বামীজির সঙ্গে দেখা করতে এসে, অবাক কাণ্ড করলেন। তার সারাজীবনের ব্যক্তিগত সঞ্চয় ৪০০ টাকা জোর করে তার প্রিয় গুরুভাইকে দিয়ে গেলেন। বিবেকানন্দ বিমোহিত–এমন ভালবাসা কে কোথায় দেখেছে? সেই টাকা গ্রহণ করলেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিবেদিতাকে লিখলেন, ওই টাকা আমি মঠে রেখে দিয়েছি। যদি হঠাৎ আমার দেহাবসান হয় তা হলে অবশ্যই দেখো ওই টাকা যার সে যেন ফেরত পায়।

প্রায় এক বছর রাত্রে স্বামীজির চোখে ঘুম নেই। বিনিদ্র বিবেকানন্দর শরীর তখন এমন যে অসাবধানে স্পর্শ করলেও প্রবল যন্ত্রণা হয়। প্রিয় শিষ্যকে স্বামীজি বললেন, “আর কেন শরীর সম্পর্কে প্রশ্ন? প্রতিদিন দেহটা আরও বিকল হয়ে যাচ্ছে। বাংলায় জন্মে, এই শরীরটা কোনও দিনই অসুখ থেকে মুক্ত ছিল না। স্বাস্থ্যের পক্ষে এই প্রদেশটা মোটেই ভাল নয়। একটু বেশি পরিশ্রম করতে চাইলেই, চাপ সহ্য করতে না পেরে দেহটা ভেঙে পড়ে।”

স্বামীজিকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে স্বামী অখণ্ডান মন্তব্য করেছেন, স্বামীজি কখনও রাগতেন না, তবে বকাবকি করতেন খুব। পান থেকে চুন খসবার উপায় ছিল না। যার উপর তার যত বিশ্বাস, যে যত আপনজন সে তত বেশি বকুনি খেত তাঁর কাছ থেকে। অন্তলীলা পর্বে এই বকুনির পরিমাণ বেশ বেড়ে গিয়েছিল, কারণ তিনি চাইছিলেন এমন এক মঠজীবন তৈরি করে যাবেন যার কোনও তুলনা থাকবে না।

কাজ করতে করতে চলে যেতে চান কর্মযোগী বিবেকানন্দ। কুঁড়েমি করে বসে থাকার জন্যে তো এই মানব শরীরের সৃষ্টি হয়নি।

শেষ পর্বে স্বামীজির রোগের তালিকায় নতুন সংযোজন উদরী, অর্থাৎ পেটে জল হওয়া। তিরোধানের কিছু আগে রোগাক্রান্ত, বিনিদ্র, ধৈর্যচ্যুত, তিতিবিরক্ত যে বিবেকানন্দকে আমরা দেখতে পাই, তিনি প্রায়ই প্রিয়জনদের এমন বকাবকি করেন যে তাদের চোখে জল পড়ে।

আমরা আগেই দেখেছি, স্বামীজির অন্যতম সমস্যা ছিল বিনিদ্রা। ঈশ্বর এই মানুষটির চোখে ঘুম দিতে চাইতেন না, ফলে প্রায়ই সারারাত ধরে চলত নিদ্রাদেবীর চরণে হৃদয়বিদারী সাধাসাধি।

স্বামী অখণ্ডানন্দ লিখেছেন, “বেলুড়ে তখনও রাত আছে, উঠে পড়েছি, উঠেই স্বামীজিকে দেখতে ইচ্ছে হল। স্বামীজির ঘরে গিয়ে আস্তে আস্তে টোকা দিচ্ছি, ভেবেছি স্বামীজি ঘুমোচ্ছেন, উত্তর না আসলে আর জাগাবো না। স্বামীজি কিন্তু জেগে আছেন–ঐটুকু টোকাতেই উত্তর আসছে গানের সুরেনকিং নকিং হু ইজ দেয়ার? ওয়েটিং ওয়েটিং ও ব্রাদার ডিয়ার।”

মঠে এমন দিনও গিয়েছে যে আলোচনা করতে গিয়ে রাত দুটো বেজে গিয়েছে, স্বামীজি বিছানায় শোননি, চেয়ারে বসেই রাতটা কাটিয়েছেন। একবার নীলাম্বর মুখুজ্যের বাগানে নানাবিষয়ে রাত দুটো পর্যন্ত সন্ন্যাসীদের প্রাণবন্ত আলোচনা চললো। চারটে না বাজতেই অখণ্ডানন্দকে স্বামীজি সবাইকে তুলে দিতে বললেন–”লাগা ঘণ্টা, সব উঠুক, শুয়ে থাকা আর দেখতে পারছি না।”

অখণ্ডানন্দ বললেন, “এই দুটোর সময় শুয়েছে, ঘুমোক না একটু।”

স্বামীজি- “কি দুটোর সময় শুয়েছে বলে ছ’টার সময় উঠতে হবে নাকি? দাও আমাকে, আমি ঘণ্টা দিচ্ছি–আমি থাকতেই এই! ঘুমোবার জন্য মঠ হল না কি?”

বিনিদ্র বিবেকানন্দ সম্বন্ধে এত কথা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে যে তা ধৈর্য ধরে সংগ্রহ করতে পারলে বোঝা যাবে মানুষটা জীবনের প্রতি মুহূর্তে কত কষ্ট সহ্য করেছেন, কিন্তু কিছুতেই পরাজয় মেনে নিতে চাননি। যে ৪ জুলাই (১৯০২) তার মহাসমাধি হলো, সেদিনও তিনি দিবানিদ্রার নিন্দা করলেন। সাধুদের বলেন, বললেন, “তোরা ঘুমোবি বলে মঠ হল নাকি?”

স্বামীজিকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে স্বামী অখণ্ডান মন্তব্য করেছেন, স্বামীজি কখনও রাগতেন না, তবে বকাবকি করতেন খুব। পান থেকে চুন খসবার উপায় ছিল না। যার উপর তার যত বিশ্বাস, যে যত আপনজন সে তত বেশি বকুনি খেত তাঁর কাছ থেকে। অন্তলীলা পর্বে এই বকুনির পরিমাণ বেশ বেড়ে গিয়েছিল, কারণ তিনি চাইছিলেন এমন এক মঠজীবন তৈরি করে যাবেন যার কোনও তুলনা থাকবে না।

রামকৃষ্ণ মঠের প্রথম অধ্যক্ষ রাজা মহারাজ (ব্রহ্মানন্দ) একবার বলেছিলেন, “স্বামীজিকে কে বুঝেছে, কে বুঝতে পারত? তাঁর বই পড়ে, তাকে বোঝা, আর তার কাছে থেকে তাকে বোঝা এক জিনিস নয়। তার কাছে থাকা, তাকে সহ্য করা যে কত কঠিন ছিল তা এরা জানে না।

শুধু অধ্যাত্মজীবন ও শাস্ত্ৰপঠন নয়, মঠের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও হবে ত্রুটিহীন। তাই বিশ্ববিজয় করে বেলুড়ে ফিরে এসেও তিনি মঠের বড় বড় হান্ডা মেজেছিলেন–এক ইঞ্চি পুরু ময়লা।

শুনুন স্বামী অখানন্দের মুখে- “তিনি মঠের খাটা পায়খানা পরিষ্কার করেছেন–তা জানো? একদিন গিয়ে দেখেন খুব দুর্গন্ধ। বুঝতে আর বাকি কিছু রইল না। স্বামীজি গামছাটা একটু মুখে বেঁধে দু’হাতে দুটো বালতি নিয়ে যাচ্ছেন! তখন সবাই দেখতে পেয়ে ছুটে আসছে, বলছে, স্বামীজি আপনিস্বামীজির হাসি হাসি মুখ, বলছেন, এতক্ষণে স্বামীজি আপনি।”

এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল, স্থানীয় বালি মিউনিসিপ্যালিটি বেলুড় মঠকে বিদেশপ্রত্যাগত নরেন্দ্রনাথ দত্তের আমোদ-উদ্যান বলে নির্ধারিত করে মোটা ট্যাক্সো বসিয়ে দেন এবং এ নিয়ে শেষপর্যন্ত স্বামীজিকে আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়। এই পর্বে মঠের পায়খানা পরিষ্কার বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সমকালের কোনও অবিচার, অবজ্ঞা ও অপমান কিন্তু বিবেকানন্দকে স্পর্শ করতে, স্তব্ধ করতে, অথবা বিরক্ত করতে পারেনি। তার যত কিছু মান-অভিমান ও বকাবকি সব তার প্রিয় গুরুভাই ও শিষ্যদের প্রতি। শেষপর্বে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা সামলেছেন তার চিরবিশ্বস্ত সখা স্বামী ব্রহ্মানন্দ। যাঁর ডাকনাম রাখাল।

স্বামীজি ছিলেন রাখালের থেকে নয়দিনের বড়। বিশ্বসংসারের সমস্ত আঘাত, আর সেইসঙ্গে রোগজর্জর শরীরের সমস্ত যন্ত্রণা নিঃশব্দে সহ্য করে, স্বামীজি বকতেন তার অতি প্রিয়জনদের, তাদের কাছে আশা করতেন পান থেকে চুন খসবে না, সবকিছু হয়ে উঠবে সর্বাঙ্গসুন্দর।

হরিমহারাজের স্মৃতি থেকে (স্বামী তুরীয়ানন্দ) আমরা জানতে পারি, স্বামীজি একদিন মঠ থেকে রেগে বেরিয়ে গেলেন। বললেন, “তোরা সব ছোটলোক, তোদের সঙ্গে থাকতে আছে! তোরা সব আলু-পটল শাক পাতা নিয়ে ঝগড়া করবি।”

বলাবাহুল্য রাগতেও যত সময় ঠাণ্ডা জল হয়ে যেতে তার থেকেও কম সময় নিতেন স্বামীজি। কিন্তু সন্ন্যাসীদের কাছে তার প্রত্যাশা ছিল সীমাহীন। “তোরা সব বুদ্ধিমান ছেলে, হেথায় এতদিন আসছিস। কী করলি বল দিকি? পরার্থে একটা জন্ম দিতে পারলি না? আবার জন্মে এসে বেদান্ত-ফেদান্ত পড়বি। এখন পরসেবায় দেহটা দিয়ে যা, তবে জানব আমার কাছে আসা সার্থক হয়েছে।”

রামকৃষ্ণ মঠের প্রথম অধ্যক্ষ রাজা মহারাজ (ব্রহ্মানন্দ) একবার বলেছিলেন, “স্বামীজিকে কে বুঝেছে, কে বুঝতে পারত? তাঁর বই পড়ে, তাকে বোঝা, আর তার কাছে থেকে তাকে বোঝা এক জিনিস নয়। তার কাছে থাকা, তাকে সহ্য করা যে কত কঠিন ছিল তা এরা জানে না।

স্বামী অখণ্ডানন্দ বলেছেন, “বরং গোখরো সাপ পোষ মানে, তবে মানুষ বসে আসে না। স্বামীজিও শেষ দিকটায় মানুষের উপর বিরক্ত হয়ে, শরীর ছাড়বার আগে মায়ার বন্ধন কাটাতে মানুষের সংস্রব একরকম ছেড়ে দিয়েছিলেন।”

তার বকুনি সহ্য করতে না পেরে আমারই কতবার মনে হয়েছে মঠ ছেড়ে চলে যাই। একদিন বকুনি খেয়ে দুঃখে অভিমানে দরজা বন্ধ করে কাঁদছি, কিছুক্ষণ পরেই স্বামীজি দরজায় টোকা মারছেন, দরজা খুল্লম। চোখে জল দেখে তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,

‘রাজা, ঠাকুর তোমাকে কত আদর করতেন, ভালবাসতেন, সেই তোমাকেই আমি বকি, কত কটু কথা বলি, আমি আর তোমাদের কাছে থাকবার যোগ্য নই।

বলতে বলতে স্বামীজির চোখে জল ঝরছে, আমি তখন তার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে দিতে বললাম, তুমি ভালবাস বলেই বকো, বুঝতে পারি না বলে অনেক সময় কান্না পায়।

স্বামীজি বলতে লাগলেন, আমি কী করব, আমার শরীরটা চব্বিশ ঘণ্টাই জ্বলছে, মাথার ঠিক থাকে না। আমি বেঁচে থাকলে তোমাদের হয়ত বৃথা কষ্ট দেব। দেখ রাজা, একটা কাজ করতে পারো? ওদের রেসিং হর্স যখন অকেজো হয়ে পড়ে তখন কী করে জানো?

তাকে বন্দুকের গুলিতে মেরে ফেলে। আমি তোমাকে একটা রিভলবার জোগাড় করে দেব, তুমি আমাকে গুলি করে মারতে পারবে? আমাকে মারলে কোনও ক্ষতি হবে না, আমার কাজ ফুরিয়ে গেছে।”

এই রাজা মহারাজ বেলুড়ে পাঁচটি চারা বাতাবি লেবু গাছ। লাগিয়েছিলেন, কারণ ডাক্তাররা বিবেকানন্দকে বাতাবি লেবু খেতে বলেছিলেন।

স্বামীজির শরীর থাকতে থাকতে কেবল গাছগুলিতে ফুল দেখা দিয়েছিল বলে পরবর্তী সময়ে স্বামী ব্রহ্মানন্দ খুব দুঃখ করতেন। শোনা যায়, রাজা মহারাজকে স্বামীজি শেষের দিকে একবার বলেছিলেন, “এবার যা হয় একটা এপার ওপার করব, হয় শরীরটা ধ্যান, জপ করে সারিয়ে কাজে ভাল করে লাগব, না হয় তো এ ভাঙা শরীর ছেড়ে দেব।”

রোগজর্জরিত সিংহের আর এক মর্মস্পর্শী ছবি পাওয়া যায় স্বামী গম্ভীরানন্দর বর্ণনায়। “স্বাস্থ্য ভাল না থাকায় তিনি সবসময় নিচে নামিতে পারিতেন না–তখন শয্যাতেই শায়িত থাকিতেন–অসুখ কম থাকিলে তিনি নিচে নামিয়া ভ্রমণে বাহির হইতেন…কখনও কেবলমাত্র কৌপীনপরিহিত হইয়া মঠের চতুর্দিকে ভ্রমণ করিতেন, অথবা একটা সুদীর্ঘ আলখাল্লায় দেহ আবৃত করিয়া পল্লীর নিভৃত পথে একাকী বিচরণ করিতেন।

…অনেক সময় রন্ধনশালায় গিয়া রন্ধনাদি পর্যবেক্ষণ করিতেন, অথবা স্বয়ং শখ করিয়া দুই-একটি উৎকৃষ্ট দ্রব্য প্রস্তুত করিতেন।”

এই পর্বে তিনি যে সামাজিক আদব-কায়দার ধার ধারতেন না তা এখন আমাদের অজানা নয়।

যেমন ইচ্ছা তেমন ঘুরে বেড়াতেন–”কখনও চটিপায়ে, কখনও খালি গায়ে, কখনও গেরুয়া পরিয়া, কখনও বা খালি কৌপীন আঁটিয়া, অনেক সময় হাতে থাকিত হুঁকা বা লাঠি।…তিনি থাকিতেন আপন নির্জন মানসভূমিতে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বচ্ছন্দ।”

একাধিক স্মৃতিকথায় দেখা যাচ্ছে, শেষ দিকটায় স্বামীজি মানুষের সংস্রব একরকম ছেড়ে দিয়েছিলেন।

স্বামী অখণ্ডানন্দ বলেছেন, “বরং গোখরো সাপ পোষ মানে, তবে মানুষ বসে আসে না। স্বামীজিও শেষ দিকটায় মানুষের উপর বিরক্ত হয়ে, শরীর ছাড়বার আগে মায়ার বন্ধন কাটাতে মানুষের সংস্রব একরকম ছেড়ে দিয়েছিলেন।”

১৯০২ সালে স্বামীজি স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য কাশী গিয়েছিলেন, কিন্তু তখন তার শরীরের অবস্থা খুব খারাপ। ডায়াবিটিসের দাপটে একটি চোখ প্রায় নষ্ট। তখনও কিন্তু তিনি চিঠিতে বেলুড়ে ব্রহ্মানন্দকে অনুরোধ করছেন, “ছাগলটাকে একটু দেখো।”

অন্য এক দৃষ্টিকোণ থেকে–মানুষের উপর বিশ্বাস মোটেই টলেনি, কিন্তু বাল্যের কিছু অভ্যাস ফিরে আসতে চাইছিল তার মধ্যে। যেমন পশুপক্ষীর প্রতি প্রবল আগ্রহ।

পায়রার শখটা স্বামীজি পেয়েছিলেন তার মামাহীন মামার বাড়ির দিক থেকে। জননী ভুবনেশ্বরীও পায়রা ভালবাসতেন বলে বাড়িতে বরাবর পায়রা থাকতো। ছোটবেলায় স্বামীজির খেয়াল হল ময়ূর, ছাগল, বাঁদর ইত্যাদি পুষবেন। তিনি নিজের হাতে এদের খাওয়াতেন। ময়ূরটিকে পাড়ার লোকরা ঢিল মেরে মেরে শেষ করল। বাঁদরটি এমন উৎপাত করত যে তাকে বিদায় করার পথ রইল না। মেজভাই মহেন্দ্রনাথ লিখেছেন, ছাগলটি গৌরমোহন স্ট্রিটের ঠাকুরদালানের নিচে কিছুদিন ছিল।

স্বামীজির বেশ কিছু বাল্যস্বভাব দুর্জয়ভাবে ফিরে এল মহাসমাধির কিছু আগে। স্বামীজি নিজে দাঁড়িয়ে সব জানোয়ারকে খাবার খাওয়াতেন। “কতকগুলো চিনেহাঁস, রাজহাঁস, পাতিহাঁস একদিকে, ছাগল-ভেড়া একদিকে, পায়রা একদিকে এবং গরু একদিকে।”

স্বামীজি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এদের খাওয়া দেখতেন। বেলুড়ের চিড়িয়াখানায় আরও সভ্য ছিল–যেমন কুকুর, সারস, বেড়াল, গাভী, ভেড়া ও হরিণ। এদের সঙ্গে তিনি শুধু কথা বলতেন তা নয়, এদের সুন্দর সুন্দর নাম দিয়েছিলেন। যেমন চিনা হাঁসের নাম যশোবতী, রাজহাঁসের নাম বম্বেটে, ছাগলের নাম হংসী, ছাগলছানার নাম মটরু। প্রিয় কুকুরের নাম বাঘা, আর দুটি কুকুরের নাম মেরি ও টাইগার।

মটরুর গলায় তিনি ঘুঙুর পরিয়ে দিয়েছিলেন। সে স্বামীজির পায়ে পায়ে ঘুরত, স্বামীজিও ছোট ছেলের মতো তার সঙ্গে দৌড়াদৌড়ি করতেন।

মটরু মরে গেলে স্বামীজি দুঃখ করেছিলেন, “কী আশ্চর্য, আমি যেটাকে একটু আদর করতে যাই, সেটাই যায় মরে।” আর একদিন বলেছিলেন, “মটরু নিশ্চয় আর জন্মে আমার কেউ হত!”

মাঝে মাঝে ছাগলী হংসীর কাছে গিয়ে তিনি চায়ের দুধের জন্য এমনভাবে অনুনয়-বিনয় করতেন, যেন দুধ দেওয়া না-দেওয়া হংসীর ইচ্ছাধীন।

স্বামীজির এই সময়কার চিঠিপত্রে তাঁর প্রিয় পশুপাখিদের অনেক খবর পাওয়া যাচ্ছে। স্বামী গম্ভীরানন্দ তাঁর বইতে নিবেদিতাকে লেখা স্বামীজির চিঠির উল্লেখ করেছেন। “আমার সেই বিশালাকায় সারসটি এবং হংস হংসীগুলি খুবই স্ফুর্তিতে আছে।

আমার পোষ কৃষ্ণসারটি মঠ থেকে পালিয়েছিল এবং তাকে খুঁজে বার করতে আমাদের দিনকয়েক বেশ উদ্বেগে কাটাতে হয়েছে। আমার একটি হংসীদুর্ভাগ্যক্রমে কাল মারা গেছে। প্রায় এক সপ্তাহ যাবৎ তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল।…একটি রাজহংসীর পালক খসে যাচ্ছিল।

আর কোন প্রতিকার জানা না থাকায় একটা টবে খানিকটা জলের সঙ্গে একটু কার্বলিক এসিড মিশিয়ে তাতেই কয়েক মিনিটের জন্য তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।…তা হংসীটি এখন ভাল আছে।”

১৯০২ সালে স্বামীজি স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য কাশী গিয়েছিলেন, কিন্তু তখন তার শরীরের অবস্থা খুব খারাপ। ডায়াবিটিসের দাপটে একটি চোখ প্রায় নষ্ট। তখনও কিন্তু তিনি চিঠিতে বেলুড়ে ব্রহ্মানন্দকে অনুরোধ করছেন, “ছাগলটাকে একটু দেখো।”

সারাদিন অতীব দুঃখে কাটাইয়া সে সন্ধ্যাকালে এক ফন্দি আঁটিল এবং খেয়া নৌকায় উঠিয়া বসিল। নৌকার মাঝি ও আরোহীরা তাহাকে তাড়াইতে চেষ্টা করিলেও সেনামিলনা,বরং দন্ত বাহির করিয়া ও গর্জন করিয়া ভয় দেখাইতে লাগিল।…এপারে আসিয়া সে রাত্রিটা এদিক-ওদিক লুকাইয়া কাটাইল।

সিস্টার ক্রিশ্চিনকে বেলুড় মঠ থেকে স্বামীজি এক চিঠিতে (২৭ মে ১৯০২) জানাচ্ছেন, “দুটি ছাগলছানা ও তিনটি ভেড়া সদ্য আমার ফ্যামিলির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আরও একটি ছাগলছানা ছিল, কিন্তু সে হলদে রঙের মাছের চৌবাচ্চায় ডুবে মরেছে।”

ডাক্তারের নির্দেশনা মেনে পরিবারের নতুন সদস্যদের দেখতে বেরোবার আগে বিবেকানন্দ লিখছেন, “একটা রাজহাঁস একেবারে বোকা এবং ভীতু সবসময় হতাশ আর কাতর। সে একলা থাকতে চায়, বেচারা বড্ড দুঃখী।”

পশুপালন সম্পর্কে জুন ১৯০১ সালের শেষদিকে বেলুড় মঠ থেকে স্বামীজি তাঁর স্নেহের শিষ্যা ক্রিশ্চিনকে আর একটি চিঠি লেখেন। “আমার এখানে কয়েকটি ছাগল ভেড়া গোরু কুকুর এবং সারস রয়েছে। সারাদিন ধরে আমি তাদের দেখাশোনা করছি। আমার সুখের জন্যে এই চেষ্টা নয়–তার প্রয়োজন কী? আমরা অসুখীও বা হব না কেন? দুটোরই কোন মানে হয় না। আমি স্রেফ সময় কাটাবার চেষ্টা চালাচ্ছি।”

কয়েকমাস পরে ক্রিশ্চিনের কাছে লেখা চিঠিতে জানা যাচ্ছে, নবজাত দুটি শাবককে বাঁচাবার জন্য তাদের গোরুর দুধ খাওয়াচ্ছেন স্বামীজি, কিন্তু রাতের অন্ধকারে তারা মারা গেল।

“আমার দুটি হাঁস তাদের ডিমে তা দিচ্ছে। যেহেতু এ দুটি তাদের প্রথম সন্তান এবং যেহেতু পুরুষ হাঁসের কাছ থেকে কোনওরকম সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে না, সেহেতু আমি নিজেই খাইয়ে-দাইয়ে তাদের শক্তি অটুট রাখার চেষ্টা চালাচ্ছি। এখানে চিকেন প্রতিপালন হয় না–এই বস্তুটি এখানে নিষিদ্ধ।”

স্বামী অখণ্ডানন্দ কিন্তু নিজের মত পরিবর্তনে রাজি নন। তিনি বলে যাচ্ছেন- “স্বামীজি শেষটায় মানুষের সঙ্গে ব্যবহারে হতাশ হয়ে জীবজন্তু নিয়ে থাকতেন।…দস্তুরমতো একটা চিড়িয়াখানা তৈরি করেছিলেন। নিজের সেবার টাকা থেকে তাদের জন্য ১০০ টাকা খরচ করতেন।”

স্বামী ব্রহ্মানন্দের উপর ছিল বাগানের ভার এবং পশুদের হাত থেকে বাগানের ফসল রক্ষার জন্য যে বেড়া দেওয়া হচ্ছে তাও বিদেশিনী ভক্তরা স্বামীজির চিঠি থেকে নিয়মিত জানতে পারছেন। দুই গুরুভাই প্রায়ই বাগান ও গোচারণভূমির সীমা-বিভাগ নিয়ে মধুর কলহে প্রবৃত্ত হতেন এবং তাতে মঠবাসীরা খুব আমোদ উপভোগ করতেন।

স্বামীজির অতিপ্রিয় সারমেয় বাঘা নিতান্ত সাধারণ কুকুর নয়, সে মঠের জনসংযোগ অধিকর্তার দায়িত্ব পালন করত, বিশিষ্ট অতিথিদের মঠের গেট থেকে কর্তৃপক্ষের কাছে এনে দিত। এ-বিষয়ে শঙ্করীপ্রসাদ বসু যে বিবরণ সংগ্রহ করে দিয়েছেন তা পাঠকদের আনন্দ দেবে।

স্বামীজির শেষদিনগুলিতে বুঝতে গেলে বাঘাকেও জানা দরকার। “একবার অত্যধিক দুষ্টুমির জন্য তাহাকে গঙ্গার পরপারে নির্বাসনে যাইতে হয়। কিন্তু বাঘা এই ব্যবস্থা মানিয়া লইতে সম্মত ছিল না–সে মঠকে ভালবাসিত, বিশেষত স্বামীজিকে ছাড়িয়া থাকিতে পারিত না।

সারাদিন অতীব দুঃখে কাটাইয়া সে সন্ধ্যাকালে এক ফন্দি আঁটিল এবং খেয়া নৌকায় উঠিয়া বসিল। নৌকার মাঝি ও আরোহীরা তাহাকে তাড়াইতে চেষ্টা করিলেও সেনামিলনা,বরং দন্ত বাহির করিয়া ও গর্জন করিয়া ভয় দেখাইতে লাগিল।…এপারে আসিয়া সে রাত্রিটা এদিক-ওদিক লুকাইয়া কাটাইল।

ভোর চারিটায় স্বামীজি স্নানাগারে যাইতেছেন, এমন সময় পায়ে কী একটা ঠেকায় তিনি চমকিয়া উঠিলেন ও চাহিয়া দেখিলেন বাঘা! বাঘা তাহার পায়ে লুটাইয়া মিনতিপূর্ণ কণ্ঠে ক্ষমাভিক্ষা ও পুনঃপ্রবেশাধিকার ভিক্ষা করিতে লাগিল।

উনচল্লিশ বছর, পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন : তিন>>

…………………….
অচেনা অজানা বিবেকানন্দ- শংকর।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

…………………..
আরও পড়ুন-
উনচল্লিশ বছর, পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন : এক
উনচল্লিশ বছর, পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন : দুই
উনচল্লিশ বছর, পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন : তিন
উনচল্লিশ বছর, পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন : চার

……………….
আরও পড়ুন-
সন্ন্যাসীর শরীর : কিস্তি এক
সন্ন্যাসীর শরীর : কিস্তি দুই
সন্ন্যাসীর শরীর : কিস্তি তিন
সন্ন্যাসীর শরীর : কিস্তি চার

…………………
আরও পড়ুন-
স্বামীজী-প্রচারিত মতসমূহের সমষ্টিভাবে আলোচনা : এক
স্বামীজী-প্রচারিত মতসমূহের সমষ্টিভাবে আলোচনা : দুই
মহাপুরুষদর্শন-প্রসঙ্গে
ঐতিহাসিক খ্রীস্টধর্ম সম্বন্ধে স্বামীজী
হিন্দুধর্ম
মহাপুরুষদর্শন-প্রসঙ্গে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!