স্বামী বিবেকানন্দ

উনচল্লিশ বছর, পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন : তিন

-শংকর

…স্বামীজি তাহার পিঠ চাপড়াইয়া আদর করিলেন ও আশ্বাস দিলেন, অধিকন্তু সকলকে বলিয়া দিলেন, বাঘা যাহাই করুক, আর তাহাকে তাড়ানো চলিবে না।”

স্বামী অখণ্ডানন্দর স্মৃতি থেকে আমরা স্বামীজির দেহাবসানের পরে পশুশালার শেষ পরিণতির কিছু দুঃখজনক খবরও পাই। অন্য কোথাও এই বিবরণ আমার চোখে পড়েনি। স্বামী অখণ্ডানন্দ লিখেছেন, “আশ্চর্যের বিষয়, স্বামীজির দেহরক্ষার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভক্ত পশুপাখী সব মরে যায়। তিনি যাকে যা দিয়ে গিয়েছিলেন, তার একটিও বেশিদিন বাঁচেনি। ভক্তেরা বলেন, তারা সব উদ্ধার হয়ে গেল।”

স্বামীজির দেহাবসানের পর খোকা মহারাজ (স্বামী সুবোধানন্দ) কয়েকটি পশুপক্ষী স্বামী অখণ্ডানন্দকে দিয়েছিলেন। শুনুন তাদের শেষ পরিণতির কথা। “একটি বেড়াল স্বামীজির পায়রাটিকে লুকিয়ে লুকিয়ে খায়। অমূল্য মহারাজ (স্বামী শঙ্করানন্দ) সেইসময় আশ্রমে ছিলেন। তিনি বিড়ালটিকে এমন ঘুষি মেরেছিলেন যে তাঁর হাত থেতলে গিয়েছিল।”

একমাত্র প্রিয় বাঘাই অপেক্ষাকৃত দীর্ঘজীবী হয়েছিল। স্বামীজির লীলাসংবরণের অনেককাল পরে বাঘার মৃত্যু হইলে তাহার দেহ গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হইল। জোয়ারের সময় সে শরীর ভাসিয়া চলিয়া গেলেও ভাটার সময় সকলে সবিস্ময়ে দেখিলেন, উহা মঠের সীমানার মধ্যেই গঙ্গার পলিমাটির উপর পড়িয়া আছে।’

এই সময়ের বিবেকানন্দর আর একটা ছবি- “কখনও কখনও তিনি কেবলমাত্র কৌপীন পরিহিত হয়ে মঠের চতুর্দিকে ভ্রমণ করতেন। অথবা একটা সুদীর্ঘ আলখাল্লায় দেহ আবৃত করে পল্লীর নিভৃতপথে একাকী বিচরণ করতেন।”..আবার কখনও বইয়ের পাতা উল্টোতেন বা ছবি দেখতেন।

ইহাতে মঠের প্রতি বাঘার প্রাণের টানের পরিচয় পাইয়া মঠবাসী একজন ব্রহ্মচারী অপরদের অনুমতিক্রমে ওই দেহ ওই স্থানেই সমাধিস্থ করিলেন।”

ডায়াবিটিস ধরা পড়ার সামান্য কিছুদিনের মধ্যে স্বামীজির শরীর কীভাবে ভেঙে পড়ে তার নানা ইঙ্গিত ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন চিঠিপত্রে এবং নানা স্মৃতিকথায়। মহাসমাধির কিছুদিন আগে কলকাতার বলরাম বসুর বাড়িতে সেকালের একজন প্রখ্যাত চিকিৎসককে ডাকা হয়েছিল স্বামীজিকে দেখতে।

বিভিন্ন চিকিৎসায় স্বামীজি তখন যে কতখানি ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে পড়েছিলেন তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে বড় ডাক্তার সম্পর্কে তার মন্তব্যে। তিনি বলেন, “কী ছাই জানে! দু’চারখানা বই পড়ে ভাবে–আমরা সব মেরে দিয়েছি। আমরা সব জানি। আমরা সব বুঝি।”

দেহত্যাগের এক সপ্তাহ আগে উত্তর কলকাতার বাগবাজারে শিষ্য অসীম বসুর সঙ্গে স্বামীজির দেখা হলো। শিষ্যের বাড়ির সামনে দিয়েই যাচ্ছিলেন স্বামীজি। অসীম বসু জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন আছেন?” স্বামীজি বললেন, “আরে তুমিও যেমন। ডাক্তার বদ্যিতে তো অনেক কথাই বলে। কিন্তু আমার মৃত্যুরোগ। তারা কী করবে?”

এই সময়ের বিবেকানন্দর আর একটা ছবি- “কখনও কখনও তিনি কেবলমাত্র কৌপীন পরিহিত হয়ে মঠের চতুর্দিকে ভ্রমণ করতেন। অথবা একটা সুদীর্ঘ আলখাল্লায় দেহ আবৃত করে পল্লীর নিভৃতপথে একাকী বিচরণ করতেন।”..আবার কখনও বইয়ের পাতা উল্টোতেন বা ছবি দেখতেন।

তারই একটি নিতান্ত সংক্ষিপ্তসার এইখানে দেবার চেষ্টা করা যাক ব্যস্ত পাঠক-পাঠিকাদের একনজরে অবগতির জন্যে। স্বামী প্রেমানন্দর এক চিঠি থেকে- “কিছুদিন হতে বৈরাগ্যের ভাব খুব প্রবল দেখতাম…জিজ্ঞেস করতেন, হারে ঠাকুর কোন দুটি গান শেষে শুনতে ভালবাসতেন বলে ‘ভুবন ভুলাইলি মা ভবমোহিনী’ ও ‘কবে সমাধি হব শ্যামাচরণে এই গানগুলি গাইতেন..শেষের দিনেও বেদ সংক্রান্ত পুস্তক আনাইবার জন্য পুণা ও বোম্বাই নগরে তিনখানি চিঠি লেখা হয়।

আর এক বিবেকানন্দকে তাঁর প্রিয় শিষ্য শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী একবার দেখেছিলেন নদীর অপর পারে আহিরীটোলা ঘাটে। স্বামীজির বাঁহাতে শালপাতার ঠোঙায় চানাচুর ভাজা, বালকের মতন খেতে খেতে ঘাটের দিকে চলেছেন। শিষ্যকে তিনি বললেন, “চল, তুই মঠে যাবি? চারটি চানাচুর ভাজা খা না, বেশ নুন-ঝাল আছে।”

সন্ন্যাসী বিবেকানন্দের শেষ দিনটিকে তার শ্রদ্ধেয় জীবনীকাররা মহামুক্তির দিন বলে বর্ণনা করেছেন। তার কয়েকদিন আগেও কিছু অবিস্মরণীয় এবং কিছু কৌতুকময় ঘটনা ঘটেছে যার বিস্তারিত বিবরণ অবশ্যপাঠ্য। সিস্টার নিবেদিতার এই কয়েকদিনের বর্ণনা রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ সাহিত্যের মহামূল্যবান সম্পদ।

এই পর্বে স্বামীজি তার পৈত্রিক বাড়ি নিয়ে সমস্যার একটা সমাধান করতে পেরে নিজেকে দায়মুক্ত মনে করেছিলেন। নিবেদিতাকে একাদশীর দিনে পরম যত্নে খাইয়ে তার হাতে জল ঢেলে দিয়েছিলেন। একই সময়ে চলছিল প্রবল উৎসাহে মঠে পাঁউরুটি তৈরির পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

মৃত্যুর আগের দিন স্বামীজি দূত মারফত নিবেদিতার বাগবাজারের বাড়িতে নিজের তৈরি করা ব্রাউন ব্রেড পাঠিয়েছিলেন।

এর আগে ৭ এপ্রিল মহানন্দ কবিরাজ রোগী দেখে মাছ, তেল ও নুন খেতে অনুমতি দিলেন। এরপর জুন মাসের শেষের দিকে কবিরাজী চিকিৎসার ওপর পূর্ণ নির্ভর না করে বরানগরের ডাঃ মহেন্দ্রনাথ মজুমদারকে ডাকা হয়।

ইতিমধ্যে এপ্রিলের একদিনে সবার আড়ালে অনুরাগিনী জোসেফিন ম্যাকলাউডকে স্বামীজি বললেন, “জগতে আমার কিছুই নেই; নিজের বলতে আমার এক কানাকড়িও নেই। আমাকে যখন যা কেউ দিয়েছে তা সবই আমি বিলিয়ে দিয়েছি।”

শুক্রবার, ৪ জুলাই ১৯০২। শেষের সেই দিনের হৃদয়গ্রাহী ছবি কয়েকটি বইতেই অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে অবিস্মরণীয়ভাবে আঁকা হয়েছে।

এই প্রচেষ্টার শুরুতে স্বয়ং নিবেদিতা, তারপর রামকৃষ্ণে নিবেদিতপ্রাণ সন্ন্যাসীলেখকবৃন্দ।

তারই একটি নিতান্ত সংক্ষিপ্তসার এইখানে দেবার চেষ্টা করা যাক ব্যস্ত পাঠক-পাঠিকাদের একনজরে অবগতির জন্যে। স্বামী প্রেমানন্দর এক চিঠি থেকে- “কিছুদিন হতে বৈরাগ্যের ভাব খুব প্রবল দেখতাম…জিজ্ঞেস করতেন, হারে ঠাকুর কোন দুটি গান শেষে শুনতে ভালবাসতেন বলে ‘ভুবন ভুলাইলি মা ভবমোহিনী’ ও ‘কবে সমাধি হব শ্যামাচরণে এই গানগুলি গাইতেন..শেষের দিনেও বেদ সংক্রান্ত পুস্তক আনাইবার জন্য পুণা ও বোম্বাই নগরে তিনখানি চিঠি লেখা হয়।”

• খুব সকালে- ঘুম থেকে উঠে, স্বামীজি মন্দিরে গেলেন উপাসনার জন্য। তার মধ্যে অসুস্থতার কোনও লক্ষণ নেই।

• ব্রেকফাস্টের সময়- সকলের সঙ্গে বেশ হাসি ঠাট্টা হল। যেমন গরম দুধ, ফলাদি খান সেইরূপ খেলেন ও স্বামী প্রেমানন্দকে খাওয়াবার জন্যে কত আগ্রহ করলেন। চা কফি যেরকম খেয়ে থাকেন তাই খেলেন। গঙ্গার একটি ইলিশ মাছ এ বছর প্রথম কেনা হল, তার দাম নিয়ে স্বামী প্রেমানন্দের সঙ্গে কত রহস্য হল! একজন বাঙালকে বললেন, তোরা নতুন ইলিশ পেলে নাকি পুজো করিস? কী দিয়ে পুজো করতে হয় কর।

• প্রভাতী ভ্রমণ- বেড়াতে বেড়াতে স্বামী প্রেমানন্দকে বললেন, আমায় কেন নকল করবি? ঠাকুর নকল কত্তে বারণ করতেন। আমার মতন উড়নচড়ে হবি নে।

• সকাল ৮.৩০- প্রেমানন্দকে বললেন, “আমার আসন ঠাকুরের শয়নঘরে করে চারিদিকের দরজা বন্ধ করে দে।” ঠাকুরঘরে স্বামীজির ধ্যান শুরু।

• সকাল ১১টা- ধ্যানভঙ্গ। স্বামীজি গুন গুন করে গাইছেন–মা কি আমার কালো, কালোরূপা এলোকেশী, হৃদিপদ্ম করে আলো। ধ্যানান্তে স্বামীজি নিজের হাতে ঠাকুরের বিছানা ঝেড়ে দিলেন।

• সকাল ১১.৩০- নিজের ঘরে একলা না খেয়ে সকলের সঙ্গে একত্র মধ্যাহ্নভোজন–ইলিশ মাছের ঝোল, ভাজা, অম্বল ইত্যাদি দিয়ে ভাত খেলেন। “একাদশী করে খিদেটা খুব বেড়েছে, ঘটিবাটিগুলো ছেড়েছি কষ্টে!”

• দুপুর ১২.৩০- ১৫/২০ মিনিট ঘুমিয়ে নিলেন স্বামীজি। স্বামী প্রেমানন্দকে বললেন, “চল পড়িগে। সন্ন্যাসী হয়ে দিবানিদ্রা পাপ।”

“আমার আজ ঘুম হলো না। একটু ধ্যান করে মাথাটা খুব ধরেছে–ব্রেন উইক হয়েছে দেখছি।”

• অপরাহু ১-৪- অন্যদিনের তুলনায় ঘণ্টা দেড়েক আগে লাইব্রেরি ঘরে সাধু-ব্রহ্মচারীদের ক্লাস নিলেন স্বামীজি। তার পড়ানোর বিষয়- পাণিনী ব্যাকরণ। ক্লাস নেওয়ার পরে স্বামীজি একটু ক্লান্ত হয়ে পড়লেন।

• বিকাল ৪টা- এক কাপ গরম দুধ খেয়ে বেড়াতে বেরোলেন। স্বামী প্রেমানন্দকে সঙ্গী করে বেলুড় বাজার পর্যন্ত গেলেন। প্রায় দু’মাইল ভ্রমণ ইদানীং এতটা যেতেন না।

• বিকাল ৫- স্বামীজি মঠে ফিরলেন। আমগাছের তলায় বেঞ্চে বসে বললেন, আজ শরীর যেমন সুস্থ, এমন অনেকদিন বোধ করি না। তামাক খেয়ে পায়খানা থেকে এসে বললেন, আমার শরীর আজ খুব ভাল আছে। স্বামী রামকৃষ্ণানন্দের পিতৃদেব শ্রী ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তীর সঙ্গে কিছু কথা বললেন।

• সন্ধ্যা ৬.৩০- কয়েকজন সন্ন্যাসী চা খাচ্ছিলেন, স্বামীজি নিজে এককাপ চা চাইলেন।

• সন্ধ্যা ৭.০০- সন্ধ্যারতির ঘণ্টা বাজতেই স্বামীজি নিজের ঘরে চলে গেলেন। সঙ্গে বাঙাল ব্রজেন্দ্র। “আমাকে দু’ছড়া মালা দে, যা, বাইরে গিয়ে জপধ্যান কর। না ডাকলে আসবি না।” স্বামীজি জপে বসলেন দক্ষিণেশ্বরের দিকে মুখ করে।

• সন্ধ্যা ৭.৪৫- স্বামীজি ব্রজেন্দ্রকে বললেন, “গরম বোধ হচ্ছে। জানলা খুলে দাও।” মেঝের বিছানায় বিবেকানন্দ শুয়ে পড়লেন, হাতে জপমালা। একটু পরে বললেন, “আর বাতাস করতে হবে না। একটু পা টিপে দে।”

• রাত ৯.০০- এতক্ষণ স্বামীজি চিৎ হয়েছিলেন, এবার বাঁপাশে ফিরলেন। কয়েক সেকেন্ডের জন্যে তার ডান হাত একটু কাপল। স্বামীজির কপালে ঘামের ফেঁটা। এবার শিশুর মতন কান্না।

• রাত ৯.০২ থেকে ৯.১০: গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। মিনিট দুই স্থির, আবার গভীর দীর্ঘশ্বাস। মাথা নড়ে উঠল, মাথা বালিশ থেকে পড়ে গেল। চোখ স্থির, মুখে অপূর্ব জ্যোতি ও হাসি।

• রাত ৯.৩০- সবাই ছুটে এলেন, ভাবলেন সমাধি হয়েছে। স্বামী বোধানন্দ নাড়ি ধরে কিছুক্ষণ দেখে, দাঁড়িয়ে উঠে কেঁদে ফেললেন। একজন বললেন, “যাও ছুটে যাও মহেন্দ্র ডাক্তারকে ডেকে আনো।” ডাক্তার মজুমদার থাকেন নদীর ওপারে বরাহনগরে। প্রেমানন্দ ও নিশ্চয়ানন্দ সমাধি ভাঙাবার জন্য কানে রামকৃষ্ণ নাম শোনাতে লাগলেন।

• রাত ১০.৩০- ডাক্তার মজুমদার, স্বামী ব্রহ্মানন্দ ও সারদানন্দ প্রায় এক সঙ্গে বেলুড়ে উপস্থিত হলেন। এলেন বৈকুণ্ঠ সান্যাল।

ডাক্তার মজুমদার দেখলেন, হৃদযন্ত্র বন্ধ। স্বামীজির দু’হাত অর্ধচন্দ্রাকারে সামনে-পিছনে ঘোরাতে বললেন। কৃত্রিম উপায়ে হার্ট সচল করবার সবরকম চেষ্টা চললো।

•১২.০০- ডাক্তার জানালেন, না, স্বামীজি আর ইহলোকে নেই। হঠাৎ হার্ট বন্ধ হওয়াই দেহাবসানের কারণ।

বিবেকানন্দ ইহলোক ত্যাগ করেছেন ৩৯ বছর ৫ মাস ২৪ দিন বয়সে। তিনি কথা রেখেছেন, বলেছিলেন, আমি ৪০ দেখবো না।

দেহত্যাগের কিছুদিন আগে (২৮ মার্চ ১৯০২) নিবেদিতাকে স্বামীজি বলেছিলেন, “আমার যা দেবার ছিল তা দিয়ে ফেলেছি, এখন আমাকে যেতেই হবে।”

মহাপ্রস্থানের দুদিন আগে তিনি বলেছিলেন, “এই বেলুড়ে যে আধ্যাত্মিক শক্তির ক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা দেড় হাজার বছর ধরে চলবে–তা একটা বিরাট বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ নেবে।”

ছ’টার সময় হঠাৎ কে যেন আমার জামার হাতায় টান দিল। চোখ নামিয়ে দেখি–অগ্নি ও অঙ্গার থেকে অনেক দূরে আমার পায়ের কাছে উড়ে এসেছে ঠিক সেই দুই-তিন ইঞ্চি বস্ত্রখণ্ড–আমার প্রার্থিত। সমাধির ওপর পার থেকে সে যেন তার পত্র, তোমার জন্য।”

১লা জুলাই মঠের মাঠে ভ্রমণ করতে করতে গঙ্গার ধারে একটা জায়গা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে স্বামীজি গম্ভীরভাবে বলেছিলেন, “আমার দেহ গেলে ঐখানে সৎকার করবি।”

পরের দিন সকাল- ৫ জুলাই- দেখা গেল চোখ দুটি জবাফুলের মতন রক্তবর্ণ, নাকমুখ দিয়ে অল্প রক্ত বেরুবার চিহ্ন রয়েছে। একজন ডাক্তার (ডাক্তার বিপিন ঘোষ) বললেন, সন্ন্যাস রোগে দেহত্যাগ হয়েছে। মহেন্দ্র ডাক্তার বলে গিয়েছিলেন, হৃৎক্রিয়া বন্ধ হওয়াই মহাপ্রয়াণের কারণ। অন্য ডাক্তাররা ভিন্ন মত প্রকাশ করলেন। “মাথার ভেতর কোনও শিরা ছিঁড়ে গিয়েছে।”

নিবেদিতা এলেন সকাল সাতটায়, দুপুর একটা পর্যন্ত একটানা পাখার হাওয়া করলেন। গর্ভধারিণী ভুবনেশ্বরী দেবী খবর পেলেন সকালবেলায়। ভগ্নীপতিকে নিয়ে ছোটভাই ভূপেন্দ্রনাথ বেলুড় মঠে এলেন, কিছুক্ষণ পরে বিলাপ করতে করতে দৌহিত্র ব্রজমোহন ঘোষকে নিয়ে জননী ভুবনেশ্বরী বেলুড়ে এলেন।

সাধুরা অনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে মাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। চিতায় যখন আগুন দেওয়া হল তখন এলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ। স্বামী নিরঞ্জনানন্দ বললেন, “নরেন চলে গেল।” গিরিশ বললেন, “চলে যাননি, দেহত্যাগ করলেন। এবার একটি সাদা রুমালে স্বামীজির লাল পদচিহ্ন তুলে নেওয়া হল।

নিবেদিতা একসময় গিরিশচন্দ্রকে জিজ্ঞেস করলেন, মাকে ওরা বাড়ি পাঠিয়ে দিল কেন? ভূপেন্দ্রনাথ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, “তাঁকে বিষয়টি বুঝিয়ে দেওয়া হল।”

মঠভূমিতে পদচারণ করতে করতে বেলতলার নিকট দাঁড়িয়ে স্বামীজি একদিন বলেছিলেন, ঐ দেখ শরৎ, সামনেই ঠাকুরের চিতাস্মৃতি শ্মশান। আমার মনে হয় সমস্ত মঠভূমির মধ্যে এই স্থানটি সর্বোৎকৃষ্ট। সেই কথা মনে পড়ায় স্বামী সারদানন্দ দেহ সৎকারের জন্য ঐ জায়গাটি মননানীত করে স্থানীয় পৌরপ্রতিষ্ঠানের কর্তার নিকট চিঠি পাঠালেন এবং দু-তিনবার পত্রবিনিময়ের পর তার অনুমতি সংগ্রহ করতে পারলেন।

দাহকার্য সম্পন্ন হল সন্ধ্যা ছ’টার সময়। শেষ মুহূর্তেও কিছু বিস্ময়। নিবেদিতার পত্রাবলীতে যার উল্লেখ রয়েছে। শঙ্করীপ্রসাদ বসুর অনুবাদ ব্যবহার করলাম। মিস ম্যাকলাউডকে লেখা নিবেদিতার চিঠি- “দুটোর সময়ে আমরা সকলে দাঁড়িয়ে আছি বিছানার উপর পাতা একটি বস্ত্রখণ্ডের দিকে তাকিয়ে আমি সারদানন্দকে জিজ্ঞেস করলাম– “ওটাও কি পোড়ানো হবে?

ওটাই যে শেষবার আচার্যদেবকে আমি পরতে দেখেছি। সারদানন্দ সেই কাপড়টি আমাকে দিতে চাইলেন। আমি নিতে পারলাম না; শুধু বললাম, যদি মিস ম্যাকলাউডের জন্য পাড়ের কাছে। কোণের একটুকু কেটে নিতে পারি। কিন্তু ছুরি বা কাচি কিছুই ছিল না আমার কাছে। তাছাড়া কাজটা দেখতেও ভাল হত কিনা সন্দেহ। সুতরাং কিছু করলাম না।

ছ’টার সময় হঠাৎ কে যেন আমার জামার হাতায় টান দিল। চোখ নামিয়ে দেখি–অগ্নি ও অঙ্গার থেকে অনেক দূরে আমার পায়ের কাছে উড়ে এসেছে ঠিক সেই দুই-তিন ইঞ্চি বস্ত্রখণ্ড–আমার প্রার্থিত। সমাধির ওপর পার থেকে সে যেন তার পত্র, তোমার জন্য।”

শেষ হল স্বামীজির মহাপ্রয়াণপর্বের অতি সংক্ষিপ্ত কথাসংগ্রহ।

শতাব্দীর দূরত্বকে সমীহ করেও কয়েকটি প্রশ্ন মনের মধ্য থেকে মুছে ফেলতে এখনও কষ্ট হয়।

• স্থানীয় মিউনিসিপ্যালিটি কেন মঠপ্রাঙ্গণে স্বামীজির শেষকৃত্যের অনুমতি দিতে প্রাথমিক ভাবে বিলম্ব করেছিলেন? এল। দুজনেই নিন্দন হাইকোর্ট জজকে

• শ্রীরামকৃষ্ণের ডেথ সার্টিফিকেট অনেকেই দেখেছেন, কিন্তু বিবেকানন্দের ডেথ সার্টিফিকেট কেউ দেখেছেন কি?

• বিশ্ববন্দিত পুরুষ–সন্ধ্যায় দেহাবসান হল, কিন্তু পরের দিনের কলকাতার সংবাদপত্রে খবরটা ছাপা হল না কেন?

• তিরোধানের পরে বিবেকানন্দ স্মরণসভার দু’জন হাইকোর্ট জজকে সভাপতিত্বের অনুরোধ করা হয়েছিল। দু’জনেই নিন্দাসূচক মন্তব্য করে সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। একজন তো বলেছিলেন, হিন্দু রাজা দেশ শাসন করলে বিবেকানন্দকে ফাঁসি দেওয়া হত। ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত তার স্মৃতিকথায় এব্যাপারে চাপা দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

• স্বামীজির সমাধিস্থলে ছোট্ট একটি মন্দির তৈরির জন্য অতি সামান্য অর্থ সংগ্রহ করাও সহজ হয়নি কেন? জেনে রাখা ভাল, সামান্য এই কাজটির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে মঠ কর্তৃপক্ষের সময় লেগেছিল পুরো বাইশ বছর। মন্দিরের কাজ শুরু হয় জানুয়ারি ১৯০৭, প্রতিষ্ঠাকার্য সম্পন্ন হয় ২ জানুয়ারি ১৯২৪।

একটা কঠিন সত্য এইসব প্রশ্নর ভিতর থেকে আজও উঁকি দেয়। এক সময় বিশ্বজোড়া আলোড়ন তুললেও স্বামী বিবেকানন্দকে সম্পূর্ণ গ্রহণ করতে আমরা যথেষ্ট সময় নিয়েছি। যুগনায়ক বিবেকানন্দকে ভারতবন্দিত করে তোলার পিছনে সব চেয়ে বড় অবদান বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের। সন্ন্যাসী-সন্তানরা এই প্রতিষ্ঠানকে একশ বছর ধরে প্রাণবন্ত না রাখলে, স্বামী বিবেকানন্দ আজও এইভাবে স্মরণীয় থাকতেন কিনা সন্দেহ হয়।

স্বামীজির দেহাবসানের পরের দিনের বিবরণের জন্য আমরা মূলত নির্ভরশীল নিবেদিতার কয়েকটি চিঠি ও ছোটভাই ভূপেন্দ্রনাথের স্মৃতিকথার ওপর। মেজভাই মহেন্দ্রনাথ তখনও কলকাতায় ফিরে আসেননি।

আরও একজনের মূল্যবান অথচ বিষাদময় স্মৃতিচারণ সম্প্রতি ভক্তজনের নজরে এসেছে। প্রত্যক্ষদর্শীর নাম শ্রীচন্দ্রশেখর চট্টোপাধ্যায়। স্বামীজির দেহাবসানের প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে বিশ্ববাণী পত্রিকায় (ভাদ্র ১৩৫৪) তিনি একটি স্মৃতিকথা লেখেন। তার সামান্য অংশ এখানে উদ্ধৃত করলে একালের পাঠকের কৌতূহল কিছুটা নিবৃত্ত হতে পারে।

“…আমাদের আহিরীটোলার বাটীতে স্বামীজির শিষ্য কানাই মহারাজ (স্বামী নির্ভয়ানন্দ) আসিয়া শোকসংবাদটি জানাইয়া গেলেন। তখন আমি কোনও দেবমন্দিরে ঠাকুরের সেবাপূজাদি কার্যে নিযুক্ত ছিলাম। ৯টার পূর্বে বাড়িতে ফিরিয়া দেখিলাম আমার জননী শোকবিহ্বল চিত্তে উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করিতেছেন।

কারণ জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলেন- “বাবা! তোদের সর্বনাশ হয়েছে–মঠের স্বামীজি আর নেই, দেহ রেখেছেন, আমাকে একবার তাঁকে দেখালি নি!” আমি বলিলাম- “মঠের সকল সাধুই ‘স্বামী, তুমি কোন্ স্বামীজির কথা বলছো? তুমি বোধ হয় ভুল শুনেছো”-”ওরে, কানাই ভোরে এসে খবর দিয়ে গেছে–বড় স্বামীজি কাল রাত ৯টায় শরীর ছেড়ে চলে গেছে। কানাই তোদের মঠে যেতে বলেছে।”

তখন বন্ধু নিবারণচন্দ্র সুমধুর স্বরে কয়েকখানি গান প্রাণ খুলিয়া গাহিতে লাগিলেন- যতনে হৃদয়ে রেখো আদরিণী শ্যামা মাকে’, ‘গয়াগঙ্গাপ্রভাসাদি কাশী কাঞ্চী কেবা চায়’, ‘কে বলে শ্যামা আমার কালো, মা যদি কালো তবে কেন আমার হৃদয় করে আলো’, ‘মজলো আমার মন ভ্রমরা, শ্যামাপদ নীলকমলে’, ‘মন আমার কালী কালী বলনা, কালী কালী বললে পরে, কালের ভয় আর রবে না ইত্যাদি।

রোরুদ্যমান জননীকে আশ্বস্ত করিয়া বলিলাম- “সাধুর দেহত্যাগে শোক করতে নেই।” ঠিক সেই সময়ে বন্ধু নিবারণচন্দ্র (শ্রীশ্রীমার শিষ্য) উপস্থিত হওয়াতে সেদিন (৫ জুলাই শনিবার) আপিসে না যাইয়া স্বামীজিকে শেষ দর্শন করিবার জন্য আমি ভক্ত নিবারণকে এবং আমার কনিষ্ঠ সহোদর শ্রীমান দুলালশশীকে সঙ্গে লইয়া আহিরীটোলার ঘাটে নৌকায় গঙ্গা পার হইয়া সালিখা ঘুসুড়ির পথে পদব্রজে তিনজনে বেলা দশটায় বেলুড় মঠে গিয়া পঁহুছিলাম।

তখন সামান্য বৃষ্টিপাত হইতেছিল। দেখিলাম পশ্চিম দিকে নীচেকার ছোট দালানে (বারান্দায়) পূজ্যপাদ শ্রীরাখাল মহারাজ (স্বামী ব্রহ্মানন্দ) প্রমুখ কয়েক জন সন্ন্যাসী একখানি সুন্দর খাটে পুষ্পশয্যা রচনায় রত। আমাদের দেখিয়া শ্রীরাখাল মহারাজ কাঁদিয়া ফেলিলেন, তাহার বাক্যস্ফূর্তি হইল না–সিঁড়ির দিক দেখাইয়া উপরে যাইতে ইঙ্গিত করিলেন।

স্বামীজির ঘরে যাইয়া দেখিলাম–একখানি সুন্দর গালিচার উপর শয়ান তাঁহার দিব্যভাবদীপ্ত দেহ বিভূতি-বিভূষিত, মস্তক পুষ্প-কিরীট ভূষণে এবং সর্বাঙ্গ নবরঞ্জিত গৈরিকবসনে সুসজ্জিত; প্রসারিত দক্ষিণ হস্তের অঙ্গুলিতে রুদ্রাক্ষের জপমালাটি জড়িত এবং ধ্যানমগ্ন মহাদেবের ন্যায় অক্ষিতারা অন্তর্মুখী ও অর্ধনিমীলিত–দুই পার্শ্বে ধূপদানি হইতে ধূপের মধুর সৌরভে তাহার ঘরটি আমোদিত।

স্বামীজির বামদিকে ভগিনী নিবেদিতা অপূর্ণনেত্রে বসিয়া হাত-পাখার দ্বারা স্বামীজির মাথায় অনবরত বাতাস করিতেছেন আর অজস্র অশ্রুধারা তাঁহার গণ্ডদেশ বহিয়া ঝরিতেছে। স্বামীজির মস্তকটি পশ্চিমদিকে এবং দুখানি পা পূর্বদিকে গঙ্গাভিমুখে স্থাপিত।

তাঁহার পদপ্রান্তে নন্দলাল ব্রহ্মচারী বিষাদ মৌনমুখে নীরবে বসিয়া রহিয়াছেন। আমরা তিনজনে মস্তক অবনত করিয়া স্বামীজির পাদপদ্ম স্পর্শ ও প্রণাম করিয়া সেখানে বসিলাম। স্পর্শ করিয়া অনুভব করিলাম স্বামীজির দেহবরফের মতনই ঠাণ্ডা হইয়া গিয়াছে।

স্বামীজির দক্ষিণকরের অঙ্গুলিতে রুদ্রাক্ষের মালার দানাগুলিতে আমি গুরুদত্ত মন্ত্র জপ করিয়া লইলাম। ইতিমধ্যে কলিকাতা এবং অন্যান্য স্থান হইতে সমাগত বহু ভদ্রলোক এবং ভক্ত উপরের ঘরে আসিয়া স্বামীজিকে শেষ দর্শন এবং প্রণামাদি করিয়া একে একে চলিয়া গেলেন–রহিলাম কেবল আমরা তিনজন, ব্রহ্মচারী নন্দদুলাল এবং ভগিনী নিবেদিতা।

আমার জপ সাঙ্গ হইলে, ভগিনী নিবেদিতা আমাকে ডাকিয়া চুপি চুপি বলিলেন- “Can you sing, my friend? Would you mind singing those songs which our Thakur used to sing?” ওই বিষয়ে আমার। অক্ষমতা জানাইলে, ভগিনী পুনরায় অনুরোধ করেন- “will you please request your friend on my behalf?”

তখন বন্ধু নিবারণচন্দ্র সুমধুর স্বরে কয়েকখানি গান প্রাণ খুলিয়া গাহিতে লাগিলেন- যতনে হৃদয়ে রেখো আদরিণী শ্যামা মাকে’, ‘গয়াগঙ্গাপ্রভাসাদি কাশী কাঞ্চী কেবা চায়’, ‘কে বলে শ্যামা আমার কালো, মা যদি কালো তবে কেন আমার হৃদয় করে আলো’, ‘মজলো আমার মন ভ্রমরা, শ্যামাপদ নীলকমলে’, ‘মন আমার কালী কালী বলনা, কালী কালী বললে পরে, কালের ভয় আর রবে না ইত্যাদি।…

বেলা প্রায় একটার সময় শ্রীশরৎ মহারাজ (স্বামী সারদানন্দ) দোতলায় স্বামীজির ঘরে আসিয়া আমাদের তিনজনকে এবং ব্রহ্মচারীকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন- “বাবা! স্বামীজি চলে যাওয়াতে আমরা ভেঙে পড়েছি তামাদের বল টুটে গেছে। তোরা সকলে ধরাধরি করে স্বামীজির দেহখানি নীচে নামিয়ে আনতে পারবি?”

…………………….
অচেনা অজানা বিবেকানন্দ- শংকর।

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

…………………..
আরও পড়ুন-
উনচল্লিশ বছর, পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন : এক
উনচল্লিশ বছর, পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন : দুই
উনচল্লিশ বছর, পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন : তিন
উনচল্লিশ বছর, পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন : চার

……………….
আরও পড়ুন-
সন্ন্যাসীর শরীর : কিস্তি এক
সন্ন্যাসীর শরীর : কিস্তি দুই
সন্ন্যাসীর শরীর : কিস্তি তিন
সন্ন্যাসীর শরীর : কিস্তি চার

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!