শাহ মখদুম রূপোশ: এক

শাহ মখদুম রূপোশ: এক

-মূর্শেদূল মেরাজ

বাংলার সুফি সাধক ও ধর্ম-প্রচারকদের মধ্যে অন্যতম শাহ মখদুম রূপোশ। তিনি বাগদাদ থেকে দিল্লি হয়ে বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলে আগমন করেন। মূলত তার হাত ধরেই বরেন্দ্র ও গৌড় অঞ্চলে ইসলাম প্রসার লাভ করে।

ড. এনামুল হক ‘সুফিইজম ইন বেঙ্গল’ গ্রন্থের লিখেছেন- ‘মখদুম সাহেবের নাম শাহ রূপোশ। তার অন্য নাম কি ছিল তা আমি জানি না।’ বাংলাদেশে ইসলাম গ্রন্থে আবদুল মান্নান তালিব বলেছেন, ‘অবশ্যি রূপোশও কোনো নাম বা নামের অংশ হতে পারে না। এটিও উপাধি বিশেষ। রূপোশ ফারসি শব্দ, এর অর্থ হচ্ছে অবগুণ্ঠনাবৃত মুখ। কাজেই শাহ মখদুমের আসল নাম জানা অসম্ভব।’

শাহ মখদুমের প্রকৃত নাম ছিল আব্দুল কুদ্দুছ জালালুদ্দীন। কীর্তিত্বর জন্য বিভিন্ন সময়ে তার নামে ‘শাহ’, ‘মখদুম’, ‘রূপোশ’ ইত্যাদি উপাধি যুক্ত হয়। ‘মখদুম’ অর্থ ধর্মীয় নেতা এবং ‘রূপোশ’ অর্থ আচ্ছাদিত। তিনি শাহ মখদুম রূপোশ নামেই সমাধিক পরিচিত।

আমাদের সুফিয়ায়ে কিরাম গ্রন্থে আলমগীর জলিল লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের রাজশাহী জেলা অঞ্চলে যেসব পীর দরবেশ ও সুফি সাধক ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠাকল্পে নিজেদের উৎসর্গ করেন তাদের মধ্যে পীর শাহ মখদুম জালালউদ্দীন রূপোশের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়।’

শাহ মখদুমের জন্মসন, জন্মাস্থান ও বাংলাদেশে আগমনের দিনক্ষণ নিয়ে মতভেদ আছে। বলা হয়, তিনি ১২১৬ (২ রজব ৬১৫ হিজরি) সালে বাগদাদের এক সুফি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার দাদা কাদেরিয়া তরিকার প্রবর্তক বড়পীড় আব্দুল কাদির জিলানীর মৃত্যুর ৫৪ বছর পর শাহ মখদুমের জন্ম হয়। তার পিতার নাম সায়্যিদ আযাল্লাহ শাহ, তিনিও সুফি সাধক ছিলেন বলে জানা যায়।

শাহ মখদুম মাতাপিতা উভয় সূত্রেই সায়্যিদ বংশীয়। তার পিতার বংশসূত্র উর্ধ্বতন পর্যায়ে মহানবীর দৌহিত্র হাসান (রা)-এর সঙ্গে মিলিত হয়েছে, অপরদিকে মাতার বংশক্রমও উর্ধ্বতন পর্যায়ে মিলিত হয়েছে হুসাইন (রা)-এর সঙ্গে। এজন্য তিনি ‘আল হাসানী এবং আল হুসাইনী’ উভয়বিধ উপাধিতেও ভূষিত।

শাহ মখদুমের বংশ তালিকা-

  • হজরত আলী।
  • আব্দুল্লাহ আলা মাহাজ।
  • সায়্যিদ মূসা আল জওন।
  • সায়্যিদ আব্দুল্লাহ সানী।
  • সায়্যিদ দাউদ।
  • সায়্যিদ মোহাম্মাদ।
  • সায়্যিদ ইয়াহিয়া আল জায়েদ।
  • সায়্যিদ আবি আব্দুল্লাহ।
  • সায়্যিদ আবু সালেহ মূসা জঙ্গী।
  • সায়্যিদ আব্দুল কাদের জিলানী।
  • সায়্যিদ আযাল্লাহ শাহ।
  • সায়্যিদ আব্দুল কুদ্দুস শাহ মখদুম রূপোশ।

পিতামহ বড়পীর আবদুল কাদের জিলানীর ২৭ পুত্রের মধ্যে আযাল্লাহ শাহ ছিলেন একজন। আযাল্লাহ শাহর দ্বিতীয় পুত্র হলেন শাহ মখদুম। সম্ভবত তার বাল্যকাল কাটে বাগদাদ নগরে। পড়াশোনার প্রাথমিক পাঠ শুরু হয় তার পিতা আযাল্লাহ শাহের মাধ্যমে।

আযাল্লাহ শাহ পুত্র শাহ মখদুমকে বেশ অল্প বয়সেই বড়পীরের হাতে প্রতিষ্ঠিত নিজের কাদেরিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেন। অল্প বয়সেই শাহ মখদুম কোরান, হাদিস, ফিকহ, আরবী ভাষা ও ব্যাকরণ, সুফিতত্ত্ব বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেন।

এসময় তার পিতা বাগদাদের শাসকদের রোষানলে পড়লে মাদ্রাসার কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। তার কিছুদিন পরই ১২৫৮ সালে তাতারীদের হাতে বাগদাদ ধ্বংস হওয়ার আগেই, আযাল্লাহ শাহ নিজ পরিবার নিয়ে বাগদাদ ত্যাগ করে ভারতের দিকে রওনা হন।

ভারতে এসে আযাল্লাহ শাহ পরিবারসহ দিল্লীতে বসবাস শুরু করেন। শাহ মখদুমকে পাঠানো হয় সিন্ধু প্রদেশে। সেখানে শাহ মখদুম সুফি জালালউদ্দীন শাহ সুরের মাদ্রাসায় তিনি ভর্তি হয়ে ইসলামের উচ্চতর বিষয়ে পড়াশোনা করেন।

কাদেরিয়া তরিকার অসামান্য জ্ঞান অর্জন করায় তাকে ‘মখদুম’ খেতাব দিয়ে ভূষিত করা হয়। পড়াশোনা শেষ করে তার পিতার কাছে দিল্লী ফিরে যান।

(চলবে…)

……………….
আরো পড়ুন:
শাহ মখদুম রূপোশ: এক
শাহ মখদুম রূপোশ: দুই

………………….
তথ্যসূত্র:
উইকিপিডিয়াসমূহ
শাহ মখদুম (রহ)-এর বিস্ময়কর জীবন ও কর্ম: মুহাম্মাদ জোহুরুল ইসলাম।
আমাদের সুফিয়ায়ে কিরাম: আলমগীর জলিল।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!