আত্তারের সাধনার সপ্ত স্তর সী-মোরগ ভাববাদ

আত্তারের সাধনার সপ্ত স্তর: দুই

-মূর্শেদূল মেরাজ

সেই কাঙ্খিত সী-মোরগ থাকে ‘কুহে কাফে’। সেখানে যেতে হলে দেশ-বেশ সবই ছাড়তে হবে। জাগতিক ধ্যান-জ্ঞান-বেশভূষা থাকা অবস্থায় সেখানে যাওয়া অসম্ভব। আর সেখানে যেতে না পারলে সী-মোরগের দরশনও সম্ভব নয়।

সুলাইমান (আ) এর দূত হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা আছে। আমি তোমাদের নিয়ে যেতে পারি সেই সী-মোরগের দেশে। তবে সেজন্য তোমাদের চরম দুর্ভোগ সহ্য করে পাড় হতে হবে এক এক করে সাত সাতটি প্রান্তর। এই সাতটি উপত্যকা বা প্রান্তর পার হলে তবেই সী-মোরগের দেশ। এই সাত প্রান্তর হলো-

১. তলব (অন্বেষা)।
২. ইশক (প্রেম)।
৩. মারফত (তত্ত্বজ্ঞান)।
৪. এস্তেগনা (অমুখাপেক্ষিতা)।
৫. তাওহীদ (একত্ব)।
৬. হায়বত (বিহবলতা)।
৭. ফানা (বিলিন)।

দুর্গম সাত প্রান্তর পাড়ি দেয়ার কথা শুনে অনেক পাখিই না যাওয়ার নানান বাহানা দেখাতে লাগল। হুদহুদ সবাইকে বুঝিয়ে বললো, এই অরাজকতা পূর্ণ পৃথিবীর কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র পথই এ দুর্গম অভিযানে জীবনপণ করে যাত্রা করা।

আত্মত্যাগ ও সংগ্রামই তার দরশন লাভের একমাত্র উপায়। আর এর জন্য সপ্ত প্রান্তর পাড়ি দিতেই হবে। তবেই চিরন্তন শান্তিময় জীবন পাওয়া যাবে। হবে সী-মোরগের দরশন লাভ।

অবশেষে হুদহুদের নেতৃত্বে হাজার হাজার পাখি রওয়ানা দিলো কুহে কাফের দিকে। পরিত্রাতা সম্রাটের খোঁজে সী-মোরগের দেশে। এই অভিযাত্রায় ভয়াবহ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অগনতি পাখির মৃত্যু ঘটলো পথেই। অনেক পাখিই পথ হারিয়ে ফেললো। অনেক পাখি আবার নানা আকর্ষণের ফাঁদে আটকে পরলো।

সকলের পাড়ি দেয়া হলো না সপ্ত প্রান্তর। নানা চড়াই উৎড়াই অতিক্রম করে দীর্ঘ কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত সেই অভীষ্ট লক্ষ্য কুহে কাফে পৌঁছাতে পৌঁছাতে টিকে থাকলো মাত্র ত্রিশটি পাখি। ত্রিশটি পাখি যখন কুহে কাফে পৌঁছাল তখন তাদের অবস্থা কাহিল, প্রাণ যায় যায়। সকলেই ক্লান্ত শ্রান্ত। তারা দেখতে পেলো তাদের সামনে বিশাল এক স্বচ্ছ হ্রদ।

স্বচ্ছ হ্রদের জলের দিকে তাকিয়ে পাখিরা তো বিস্ময়ে হতবাক। হ্রদের স্বচ্ছ জলের প্রতিচ্ছবিতে তাদের প্রত্যেকের চেহারা দেখতে অবিকল সী-মোরগের মতোই দেখাচ্ছে। দেহের দিকে তাকিয়ে সকলেই দেখতে লাগলো তারাই এখন সী-মোরগ! যে সী-মোরগের সন্ধানে এ অভিযান, এতো কষ্ট-যন্ত্রণা ভোগ। সেই সী-মোরগ এখন তারাই?

যার অনুপ্রেরণায় শুধু ফারসিতে নয় সারাবিশ্বে বহু গ্রন্থ যেমন রচিত হয়েছে। তেমনি বহু সাধক খুঁজে পেয়েছে স্রষ্টার সন্ধানের পথ। সে পথ সহজ নয় সত্য কিন্তু দুর্গম পথ পাড়ি দিতে পারলে তা অসম্ভবও নয়। আর এ পথ প্রত্যেক সাধককে নিজের ধৈর্য-ভক্তি-শ্রদ্ধা-বিনয়ের সাথে নিজেকেই পাড়ি দিতে হয়।

অবাক বিস্ময়ে ত্রিশটি পাখি নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করতে লাগলো সী-মোরগ বেশে। সেই কাঙ্খিত ‘সী-মোরগ’। যার জন্য তারা হুদহুদের দেখানো পথে পাড়ি দিয়েছে এক এক করে সপ্ত প্রান্তর। তারা বুঝতে শুরু করলো সী-মোরগ আসলে কি – সী-মোরগ আসলে কে!

অল্পকথায় এই হলো আত্তারের ‘পাখিদের সমাবেশ’। শরিয়ত বা প্রকাশ্যের শেষ এখানেই। আর এখান থেকেই শুরু তাসাউফ বা মারফতের; যা অব্যক্ত। রূপক রূপে যা আড়াল হয়ে আছে এই কাব্যের প্রতিটি শব্দের অর্ন্তরালে।

‘পাখি সমাবেশ’ রূপক সাহিত্যের অন্তর্নিহিত অর্থ অনেক গভীর ও ব্যাপক। যা সুফি দর্শনের মূল ভাব। শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তার এখানে মানবাত্মাকে পাখির সাথে তুলনা করে এক আধ্যাত্মিক অভিযাত্রার বর্ণনা করে গেছেন পাখিদের সংলাপের মধ্য দিয়ে।

এই অনবদ্য রচনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ চরিত্র যেমন হুদহুদ পাখি ; তেমনি সেই ত্রিশ পাখি। ফারসিতে ত্রিশকে বলা হয় ‘সী’। আর পাখিকে ‘মোরগ’। অর্থাৎ ত্রিশ পাখি মানেই সী-মোরগ! যে ত্রিশটি পাখি শেষ পর্যন্ত পাড়ি দিতে পারলো তারাই পেল স্বরূপের দর্শন।

অর্থাৎ যারা সাধনার সপ্ত স্তর ভেদ করতে পারবে তারাই পাবে স্বরূপের দর্শন। অর্থাৎ নিজেকে চিনতে পারবে প্রকৃত রূপে। সফল হবে নিজকে চেনার-নিজকে জানার এই যাত্রা।

তেমনি তাৎপর্যপূর্ণ অন্তর্নিহিত ভেদের কথা হলো সপ্ত প্রান্তর। এই সপ্ত বা সাত প্রান্তর মূলত সাধনার সাত স্তর বা ধাপ। সাধককে এই সাত ধাপ অতিক্রম করেই মুক্তির দেশে যেতে হয়। লীন হতে হয় অনন্তের সাথে-পরমের সাথে।

মানুষ যে পরমের কাছ থেকে বিচ্যুত হয়ে ধারিত্রীতে এসেছে তাকে পুনরায় তার কাছেই ফিরে যেতে হবে। সেটাই সাধনা। আর এই ফিরে যাওয়া মানে নিজেকে জানা-নিজেকে আবিষ্কার অর্থাৎ স্বরূপ দর্শন। আর সাধক সপ্ত স্তর পার করতে পারলে তবেই আবিষ্কার করে সৃষ্টি আর স্রষ্টার মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোনো বিভেদ নেই।

অর্থাৎ সাধনার সপ্ত স্তর পার করতে পারলে সাধক স্বয়ং স্রষ্টারূপে আবির্ভূত হয়। এটাই সুফি বা আধ্যাত্মবাদ বা ভাববাদের সাধন। আর এই সাধনার নিগূঢ় তত্ত্ব আত্তার তার কাব্যগ্রন্থে সুনিপুণ ভাবে তুলে ধরেছেন। যা সুফি সাহিত্যের সূচনাকালের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।

যার অনুপ্রেরণায় শুধু ফারসিতে নয় সারাবিশ্বে বহু গ্রন্থ যেমন রচিত হয়েছে। তেমনি বহু সাধক খুঁজে পেয়েছে স্রষ্টার সন্ধানের পথ। সে পথ সহজ নয় সত্য কিন্তু দুর্গম পথ পাড়ি দিতে পারলে তা অসম্ভবও নয়। আর এ পথ প্রত্যেক সাধককে নিজের ধৈর্য-ভক্তি-শ্রদ্ধা-বিনয়ের সাথে নিজেকেই পাড়ি দিতে হয়।

তারপরের স্তর হলো প্রেম। অর্থাৎ বিনয়-ভক্তি-শ্রদ্ধা-নিবেদন ভাব না জাগলে সাধনায় প্রবেশ করলেও এগিয়ে যাওয়া যায় না। তাই বৈরাগ্যের পরেই প্রেমময় হতে হয় সাধককে। তবে প্রেমের প্রেমিক হওয়া সহজ নয়। বৈরাগ্যের ভাব প্রবল হলেই প্রেমের উদয় হয়। সাধকের মনে যখন বৈরাগ্যভাব প্রবল হয় তখনই জানবার জন্য নিবেদন ভাব প্রকাশ পায়। আর নিবেদিত হলেই প্রেমের বিকাশ ঘটে।

অন্যের কাছ থেকে শুনে বা বুঝে সেই রূপ দর্শন লাভ হয় না। প্রত্যেকের সাধনা প্রত্যেককেই স্বয়ং করতে হয়। আর তার জন্য চাই একজন পথপ্রদর্শক। যা এই রূপক সাহিত্যে এসেছে হুদহুদ চরিত্রে। এই পথপ্রদর্শক বা হুদহুদ অর্থ হলো গুরু বা মুর্শিদ।

আর উপযুক্ত গুরু বা মুর্শিদের চরণে নিজের সমর্পন করতে পারলে আর তার মনোনীত পথে জীবনপণ করে এগিয়ে গেলেই সেই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়। তবে তার জন্য পাড়ি দিতে হয় কংকটময় দীর্ঘ পথ। যারা সাধন শুরু করেও অর্থাৎ এই অভিযাত্রায় রওনা দিয়েও নানা ব্যাকুলতায় পথ পরিক্রমা সম্পূর্ণ করতে পারে না তারা ঝরে পরে। তাদের স্বরূপ দর্শন হয় না।

কিন্তু অনন্ত কষ্ট-দু:খ সহ্য করেও যারা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে তাদেরই দীদার হয় পরম জ্ঞানের সাথে। এমন কি সে স্বয়ং হয়ে উঠে পরম জ্ঞান। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে দো-জাহানের সম্রাটের সন্ধানে মানুষ জীবনভর ঘুরে মরে, সে জানতেই পারে না সে নিজেই সেই জন।

উপযুক্ত গুরুই সাধককে সেই পথ দেখাতে পারে। আর গুরুর দেখানো পথে যে সাধক এগিয়ে যায় সেই তার সন্ধান পায়। আর সেই জন-সেই সম্রাট হয়ে উঠার জন্য করতে হয় কঠিন জপ-তপ, সাধন-ভজন। আত্তার বলছেন, সেই জন্য সাধককে গুরুর দেখানো পথ ধরে পাড়ি দিতে হয় সাধনার সপ্ত স্তর।

আত্তার তার ‘পাখিদের সমাবেশ’ কাব্যগ্রন্থে রূপকের মধ্য দিয়ে এই অভিযাত্রার সকল খুঁটিনাটী তুলে ধরেছেন। প্রতিটা স্তরের বাঁধা বিপত্তি, তা থেকে উত্তরণের পথ, প্রাপ্যতা সবই ব্যক্ত করেছেন বিভিন্ন আকার ইংগিতের মধ্য দিয়ে। আর এই সপ্ত স্তরের প্রথম স্তরের নাম আত্তার উল্লেখ করেছেন ‘তলব’ বলে।

সাধনায় প্রথমে প্রয়োজন হয় ‘তলব’ বা অন্বেষণের তৃষ্ণা। অর্থাৎ সাধনায় প্রবেশের আকুতি জাগা। আরো সহজ শব্দে বললে বৈরাগ্যভাব। বৈরাগ্য না জাগলে সাধনায় আত্ম নিবেদিত হওয়া যায় না। বৈরাগ্যই হলো সাধনার প্রবেশপথ। এতেই শুরু হয় সাধনের যাত্রা।

তারপরের স্তর হলো প্রেম। অর্থাৎ বিনয়-ভক্তি-শ্রদ্ধা-নিবেদন ভাব না জাগলে সাধনায় প্রবেশ করলেও এগিয়ে যাওয়া যায় না। তাই বৈরাগ্যের পরেই প্রেমময় হতে হয় সাধককে। তবে প্রেমের প্রেমিক হওয়া সহজ নয়। বৈরাগ্যের ভাব প্রবল হলেই প্রেমের উদয় হয়। সাধকের মনে যখন বৈরাগ্যভাব প্রবল হয় তখনই জানবার জন্য নিবেদন ভাব প্রকাশ পায়। আর নিবেদিত হলেই প্রেমের বিকাশ ঘটে।

শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তারের ‘পাখিদের সমাবেশ’ এভাবেই সাধনার সপ্ত স্তরের ভেদের কথা বলে। সুধিজনের কাছেই ধরা দেয় সেই ভেদ। সেই গূঢ়তত্ত্ব। সেই জ্ঞান… সেই ভাব… সেই আধ্যাত্ম…। নয়তো তা হয়ে থাকে কেবল এক দীর্ঘ কবিতা।

এরপরের স্তর হলো মারফত বা তত্ত্বজ্ঞান। সাধক যত প্রেমে ডুবতে পারে ততই সে সহজ হয়। আর সহজ মানুষ হলেই মনে তত্ত্বজ্ঞানের বিকাশ হয়।সাধারণ অর্থে জানা মানে তথ্য সংগ্রহ করা কিন্তু জ্ঞান মানে উপলব্ধি। যে জানতে শুরু করে নিগূঢ় কথা।

এরপর হলো এস্তেগনা অর্থাৎ অমুখাপেক্ষিতা। উপলব্ধকৃত জ্ঞানে স্থির হওয়া অর্থাৎ প্রজ্ঞায় পৌঁছানো। প্রজ্ঞায় পৌঁছালে সাধকের আর কার মুখাপেক্ষি হতে হয় না। সিন্ধান্ত নিতে পারে উপলব্ধির মধ্য দিয়েই। এই স্তরই হলো এস্তেগানা। সোজা কথা যা বুদ্ধির বাইরে।

এরপর হলো তৌহিদ বা ‘একত্ব’। একের সাথে মিশে যাওয়া। সাধনার চার স্তর পাড়ি দিয়ে তবেই সাধক এই একত্বে অনুভূতি করতে পারে। অন্বেষণের তৃষ্ণা যখন সাধককে প্রেমময় করে তখনই তার কাছে ধরা দেয় তত্ত্বজ্ঞান। আর তত্ত্বজ্ঞান পর্যন্ত প্রজ্ঞায় পৌঁছায় তখন সাধক একের সাথে মিশে যাওয়ার জন্য নিজকে প্রস্তুত করতে পারে।

এরপর হলো ‘হায়রত’ অর্থাৎ বিহবলতা। এ স্তরে অনন্তের সৌন্দর্যে সাধক বিমোহিত হয়। সাধক এ স্তরে নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করে। ভাবনায় থাকে কেবল পরমের পবিত্রতা। পরমের প্রেমে সাধক আচ্ছন্ন হয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলে।

আর সাধনার সপ্তম ও শেষ স্তর হচ্ছে ‘ফানা’ বা লীন হওয়া। এ স্তরে এসে চূড়ান্ত পর্বে সাধক বুঝতে পারে সে আসলে কিছুই জানে না। সে নিজেকেই চিনে না। নিজের অস্তিত্বের ঊর্দ্ধে উঠে সাধক পরমে বিলীন হয়ে বুঝতে পারে, সে যাকে খুঁজছিল তা স্বয়ং সে নিজে। এ স্তরে সাধকের নবজন্ম হয়। সাধক চিনতে পারে নিজকে। হয় স্বরূপের দর্শন।

শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তারের ‘পাখিদের সমাবেশ’ এভাবেই সাধনার সপ্ত স্তরের ভেদের কথা বলে। সুধিজনের কাছেই ধরা দেয় সেই ভেদ। সেই গূঢ়তত্ত্ব। সেই জ্ঞান… সেই ভাব… সেই আধ্যাত্ম…। নয়তো তা হয়ে থাকে কেবল এক দীর্ঘ কবিতা।

পারস্য কবি জামি বলেন, আত্তারের কবিতায় যেমন তৌহিদের মহাত্ম্য এবং মারিফতের গুপ্ত রহস্য পাওয়া যায়, তেমন আর কোনো সুফির কবিতায় দৃষ্টিগোচর হয় না।

(সমাপ্ত)

<<আত্তারের সাধনার সপ্ত স্তর : এক

……………………………………..
আরো পড়ুন:
আত্তারের সাধনার সপ্ত স্তর : এক
আত্তারের সাধনার সপ্ত স্তর : দুই

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!