শ্রীযুতের জীবনী দুলাল চাঁদ সতীমা কর্তাভজা

সতীমার তিরােধান

ঠাকুর দুলালচাঁদের তিরোধানের পর সতীমা পুনরায় কর্তাভজা সম্প্রদায়ের হাল ধরেন এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার স্ব-ধর্ম পালনে অবিচল থেকে অগণিত দীন-দুঃখী, পাপী-তাপী, অবহেলিত মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়ােজিত রেখেছিলেন, দুলালচাঁদ তিরোধানের পর সতীমা আট বছর এই ধরাধামে ছিলেন।

ঐতিহাসিকভাবে সতীমাই একমাত্র প্রথম নারী যিনি তৎকালীন সময়ে ব্রাহ্মণ-সমাজপতি, রাজা-জমিদার কর্তৃক শাসিত, কঠোর জাতিভেদ প্রথা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সমাজ ব্যবস্থা ও প্রচলিত ধর্মানুশাসনের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে এক দুঃসাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন।

একথা বলার অপেক্ষা থাকে না যে আজ থেকে প্রায় তিনশত বছর পূর্বে জাতিভেদ প্রথা যে কি অসহনীয় পর্যায়ে ছিল, আর তার বিরুদ্ধ অবস্থান নেওয়া যে কি অসাধ্য কাজ ছিল একটু দুরদৃষ্টি সম্পন্ন ও মননশীল ব্যক্তি তা সহজেই অনুমান করতে পারেন।

বর্তমানকালে কিছুটা হলেও তাে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বলে একটা শব্দ আছে কিন্তু তৎকালীন সময়ে গণতন্ত্র-মানবাধিকারের কোন প্রশ্ন-ই ছিল না, স্বাধীনভাবে কথা বলার কোন সংবাদ মাধ্যম ছিল না, সাধারণ জ্ঞান বিজ্ঞান বা বিদ্যাশিক্ষার জন্য কোন সরকারী বিদ্যালয় ছিল না, উচ্চবর্ণ হিন্দু কর্তৃক নিম্নবর্ণের হিন্দুরা নির্যাতিত হলেও ন্যায় বিচার পাওয়ার মত কোন বিচার ব্যবস্থা ছিল না।

আজ গণতন্ত্র ও বিজ্ঞানের যুগ কিন্তু বর্তমান কালেও প্রচলিত ধর্ম ও সমাজ ব্যবস্থার বিপরীতে অবস্থান করার কারণে কত মানুষকে অকালে জীবন দিতে হচ্ছে বা জীবনের ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে, তা ছাড়া লাঞ্ছিত হওয়ার ভয়ে উদার মনােভাবাপন্ন মানুষও স্বাধীন ভাবে, মুক্ত মনে নিজের ভাব প্রকাশ করতে সাহস পাচ্ছে না।

যা ছিল তা আবার ঐ রাজা-জমিদারদের কাছারী, যে কাছারীর সম্মুখ হতে মাথায় ছাতা দিয়ে সাধারণ মানুষের হেটে যাওয়ার অধিকার ছিল না, সমাজপতি-রাজা-জমিদারদের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস ছিল না।

রাজতন্ত্র শাসন ব্যবস্থায় প্রচলিত ধর্ম ও সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তার পরিণাম কি ভয়াবহ হয় ইতিহাস তার সাক্ষ্যবহন করছে। প্রচলিত ধর্ম ও সামজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে বিশ্ব বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিসকে প্রহসনমূলক বিচারের রায়ে বিষপান করে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল। খ্রীষ্টধর্ম প্রচারক যীশুকে ক্রশবিদ্ধ হয়ে মুত্যু বরণ করতে হয়েছিল।

এরূপ কত মহান ব্যক্তি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অকালে জীবন দিয়েগেছেন, ইতিহাসে তার বহু প্রমাণ আছে। কু-সংস্কার পূর্ণ জাতিভেদ প্রথা ও আধিপত্যবাদী সমাজপতিদের রােষানলে পড়ে লালন ফকিরের মত মহান ব্যক্তিকেও সমাজচ্যুত হতে হয়েছিল।

লালনের মত বহু সাধক ব্যক্তি এ সবের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। গীত রচনা করেছেন। কিন্তু তারা সবাই ছিল সংসার ত্যাগী বাউল ফকির। সমাজ জীবনে প্রতিফলন করার মত কোন ব্যবস্থা তাদের ছিল না। কিন্তু অজপাড়া গায়ের সহজ-সরল গ্রাম্য গৃহবধু হয়েও সতীদাহ প্রথার মত সেই বর্বতার যুগেও সতীমা যে অসাধ্য সাধন করেছিলেন।

বর্তমানকালে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, মানবাধিকার সংস্থা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও কু-সংস্কার মুক্ত বিজ্ঞানের যুগেও একজন মহিলা কেন, একজন শিক্ষিত পূরুষের পক্ষেও তা অসম্ভব। প্রচলিত ধর্ম ও সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মীয় উন্মাদনা ও রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া যে কত বিপদজ্জনক তা ভুক্তভােগী মাত্রই জানে।

আজ গণতন্ত্র ও বিজ্ঞানের যুগ কিন্তু বর্তমান কালেও প্রচলিত ধর্ম ও সমাজ ব্যবস্থার বিপরীতে অবস্থান করার কারণে কত মানুষকে অকালে জীবন দিতে হচ্ছে বা জীবনের ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে, তা ছাড়া লাঞ্ছিত হওয়ার ভয়ে উদার মনােভাবাপন্ন মানুষও স্বাধীন ভাবে, মুক্ত মনে নিজের ভাব প্রকাশ করতে সাহস পাচ্ছে না।

তবে কর্তাভজা সম্প্রদায়ভুক্ত ভক্তগণের কাছে তিনি পরম শ্রদ্ধেয়, পূঁজনীয় মহামানবী-দেবী সতীমা হয়েই চিরদিন পুঁজিত হবে এটাই স্বাভাবিক। তাই তাে সতীমার দেহান্তরের পর শতশত বছর অতিবাহিত হলেও আজও সকল স্তরের মানুষ বিপদে-আপদে মায়ের নাম স্মরণ করে আর অটল ভক্তি বিশ্বাসের মাধ্যমে বিপদে-আপদে মুক্তিলাভ করে সতীমায়ের জয়গান করে।

ঐতিহাসিকভাবে সতীমাই একমাত্র প্রথম মহিলা যিনি ধর্মীয় আধ্যাত্মিক জগতে সিদ্ধিলাত করে ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারিণী হয়েছিলেন। আর প্রচলিত ধর্ম ও সমাজব্যবস্থার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে তৎকালীন সময়ের নিন্দুক ব্রাহ্মণ সমাজপতি।

শাসক রাজা-জমিদারদের প্রবল বিরােধিতা সত্ত্বেও নিজের কর্তব্য কর্ম সাধনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদের আধিপত্য ভেঙে ধর্ম ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করে ঠাকুর আউলচাঁদ মহাপ্রভুর আদর্শ সমাজ জীবনে ছড়িয়ে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন এবং অবহেলিত নির্যাতিত মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারমার্থিক মুক্তির পথ দেখিয়ে অগণিত মানুষের হৃদয়ে শ্রদ্ধেয় ও পূঁজনীয় হয়েছিলেন।

সতীমার জীবনে এ সব সম্ভব হয়েছিল কিংবদন্তী মহামানব ফকির ঠাকুর আউলচাঁদের আশির্বাদ, দুলালচাঁদের মত সুযােগ্য পুত্র এবং সতীমার সত্যের উপর অটল বিশ্বাস, গুরুভক্তি, দৃঢ় চেতনাশক্তি, মানুষের প্রতি অগাধ ভালবাসা, অতুলনীয় মাতৃস্নেহ ও মালিকের উপর একান্ত নির্ভরশীলতা এসব মহৎগুণের কারণে।

সতীমার এসব মহৎগুণে মুগ্ধ হয়েই অগণিত মানব সন্তানগণ মনের অজান্তেই তার মাতৃস্নেহের প্রতিদান স্বরূপ সতীমা নামে আখ্যায়িত করে তাকে সতীমা বলে ডেকেছেন আর মায়ের জয়গানে চারিদিক মুখরিত করেছেন। সতীমা শুধুমাত্র প্রচলিত ধর্ম ও সমাজব্যবস্থার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিলেন তাই নয়, তিনি তার জীবনে অসংখ্য অলৌকিক মহিমা প্রদর্শন করেগেছেন।

যেকোন বিপদে-আপদে মানুষ মায়ের কাছে ছুটে এসেছেন, সতীমা তার মাতৃস্নেহ ভরা শান্তনা দিয়ে সকল প্রকার বিপদে- আপদে রক্ষা করেছেন, এ জন্যই তাে তিনি মহামানবী দেবীরূপে মানুষের কাছে পূঁজনীয়। সতীমার এই অলৌকিক মহিমা ও অপূর্ব কীর্তি যে যেমন মনের মানুষ সে সেই ভাবেই তার মূল্যায়ন করবে।

তবে কর্তাভজা সম্প্রদায়ভুক্ত ভক্তগণের কাছে তিনি পরম শ্রদ্ধেয়, পূঁজনীয় মহামানবী-দেবী সতীমা হয়েই চিরদিন পুঁজিত হবে এটাই স্বাভাবিক। তাই তাে সতীমার দেহান্তরের পর শতশত বছর অতিবাহিত হলেও আজও সকল স্তরের মানুষ বিপদে-আপদে মায়ের নাম স্মরণ করে আর অটল ভক্তি বিশ্বাসের মাধ্যমে বিপদে-আপদে মুক্তিলাভ করে সতীমায়ের জয়গান করে।

সতীমায়ের সমাধি নিত্যধাম ঘােষপাড়ায় আজও অক্ষত অবস্থায় বিদ্যমান আছে। অগণিত মানুষের শ্রদ্ধেয় পূঁজনীয় এই মহীয়সী নারী বাং ১২৪৭ সালের আশ্বিন মাসে দেবীপক্ষের প্রতিপদ তিথিতে একশত ছয় (১০৬) বছর বয়সে মানব লীলা সংবরণ করেন।

সতীমা ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা নন, কারণ- সৃষ্টিকর্তা কোনদিন সৃষ্টি হয় না। সতীমা হচ্ছে একজন মহামানবী, গার্হস্থ্য আশ্রম (সংসারধর্ম) পালনের মাধ্যমে সাধনায় সিদ্ধিলাভকারিণী, বাকসিদ্ধা ও জগৎকর্তার একনিষ্ঠ ভক্ত এবং অবহেলিত নির্যাতিত মানুষের মুক্তিপথ প্রদর্শক।

সতীমার জাগতিক লীলা সম্পন্ন হয়েছে তিনি এবার পরপারে চলে যাবেন, তাই নিত্যধাম ঘােষপাড়ার নিকটবর্তী সকল ভক্তবৃন্দকে ডেকে বললেন আমার চলে যাবার সময় হয়েছে আমি পরপারে চলে যাবাে।

তােরা আমার দেহত্যাগের পর অচৈতন্য দেহ আগুনে পােড়াবি না। ঐ ডালিমতলার অদূরে সমাধি দিয়ে রাখবি। আমি যেন চিরদিন আমার অবহেলিত, দীন-দুঃখী সন্তানদের মাঝেই থাকতে পারি। তােরা তােদের উপর অর্পিত কর্তব্য কর্মে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকবি।

মনে রাখবি- জপ-তপ, দান-ধ্যান, যাগ-যজ্ঞ, পূজা-অর্চনা, বেশ-ভূষা ধর্মীয় চিহ্ন ধারণ করা এসব ধর্মের বহিরঙ্গ বিষয় মাত্র, সত্য-ই পরম ধর্ম, শত প্রতিকুলতার মাঝেও সত্যে অটল থাকবি, সত্য রক্ষা হলে-ই ধর্ম রক্ষা হবে, আর সুখে-সম্পদে দুঃখে-বিপদে সব সময় মালিককে স্মরণ রাখবি তাহলেই পাবি পরমশান্তি।

একসত্য কর সার, ভবনদী হবে পার।

ভক্তগণ সকলে মিলে ছলছল নয়নের জলে মালিকের নাম গুণগান করতে লাগলেন আর সতীমা ভক্তদের মুখে মালিকের নাম গুণগান শুনতে শুনতে ইহলীলা সংবরণ করলেন। তারপর ভক্তগণ সতীমায়ের জয়গান করতে করতে মায়ের শেষ ইচ্ছামত ডালিমতলার অদুরে সতীমায়ের সমাধি দিলেন।

সতীমায়ের সমাধি নিত্যধাম ঘােষপাড়ায় আজও অক্ষত অবস্থায় বিদ্যমান আছে। অগণিত মানুষের শ্রদ্ধেয় পূঁজনীয় এই মহীয়সী নারী বাং ১২৪৭ সালের আশ্বিন মাসে দেবীপক্ষের প্রতিপদ তিথিতে একশত ছয় (১০৬) বছর বয়সে মানব লীলা সংবরণ করেন।

ভক্তের হৃদয়ে সতীমা ছিলেন,
সতীমা আছেন, সতীমা থাকবেন।
জয় গুরুসত্য। জয় গুরুসত্য। জয় গুরুসত্য।

সত্য কথা সত্যালাপ সত্য আচরণ।
সত্যধর্মে রত হয়ে সংসারে তারণ।।
অসত্য অনর্থ মূল মতি করে হীন।

হীন মতি মন্দ গতি পাপের অধীন।।
সকলি অনিত্য ভজ শ্রীগুরু চরণ।
অনায়াসে ভবরােগে হইবে মােচন।

কর্তাভজা ধর্মের মূলস্তম্ভ>>

……………..
‘সতীমা ও সত্যদর্শন’ বই থেকে সংগৃহীত

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

……………..
আরও পড়ুন-
কর্তাভজা ধর্মের ইতিহাস
ঠাকুর আউলচাঁদের আবির্ভাব
গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ভুক্ত ভক্তদের বিশ্বাস
রামশরণ ও সতীমার দীক্ষা গ্রহণ
কর্তাভজা সম্প্রদায়ের দশ আজ্ঞা
সতীমা কে?
শূদ্র কারা?
ঘোষপাড়ার ডালিম তলা ও হিমসাগরের মাহাত্ম্য
কর্তাভজার বাইশ ফকির
আউলচাঁদের তিরােধান
দুলালচাঁদ
সতীমায়ের উপদেশ বাণী
ঘোষপাড়ার রথযাত্রা উৎসব
সতীমার তিরােধান
কর্তাভজা ধর্মের মূলস্তম্ভ

ত্রিশ ধারা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!