শবে মেরাজ : ঊর্দ্ধোলোকের রহস্য যাত্রা

শবে মেরাজ : ঊর্দ্ধোলোকের রহস্য যাত্রা

-মূর্শেদূল মেরাজ

যে মত-পথ-দর্শন কেবল রাষ্ট্র বা নগর কেন্দ্রিক নয়। যে মত-পথ-দর্শনের সাথে যুক্ত প্রকৃতি তথা বিশ্বভ্রহ্মাণ্ড। যে দর্শন রাষ্ট্রগঠন থেকে জীবাত্মা-পরমাত্মার মিলনকে গুরুত্ব দিয়েছে তা বুঝতে গেলে ; তথাকথিত জ্ঞানের সীমা টপকে আরেকটু গভীরে প্রবেশ করতে হয় বলে সাধককুল বলে থাকেন।

এই অসীম জ্ঞানকে ধরতে হলে রাষ্ট্র-সমাজব্যবস্থার বাইরে বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডের জ্ঞানকে বুঝতে-জানতে-শিখতে হয়। তা তা মহাকাশ দেখার যন্ত্র দিয়ে নয়। নিজের ভেতর দিয়ে দেখার এই জ্ঞানকেই শব্দের জালে বন্দী করা হয়েছে আধ্যাত্মবাদ বা ভাববাদ নামে। সাধককুল বলেন, যা জ্ঞানে ধরে না তাই আধ্যাত্মিকতা-ভাববাদ। তবে যুক্তিবাদীর কাছে অবশ্য এ সবই অলীক ভাবনা মাত্র। নির্বোধ মস্তিষ্কের বাতুলতা।

তবে বিজ্ঞানও যেমন এক্স-ওয়াই-জেড ধরে ধরে এগুতে থাকে। আর ধাপে ধাপে তা প্রমাণ করার চেষ্টায় রত থাকে। সাধারণে বিশ্বাস করতে না চাইলেও আধ্যাত্মিকতা বা ভাববাদের পথও কিন্তু অনেকটা সেরূপই। সাধকরাও কিছু বিষয়কে ধরে নিয়ে বা কিছু সূত্রের আশ্রয় নিয়ে তার সাধনায় এগুতে থাকে।

তবে মৌলিক পার্থক্যটা হলো বিজ্ঞান যখন কোনো কিছুর সম্ভবনার কথা বলে তা অনেকের সামনে প্রমাণ করার একটা পথ বের করে। যাতে যা বলছে তা বোঝেতে পারে। কিন্তু আধ্যাত্মিকতায় সেই দায় থাকে না। বা আবার উল্টো করে বলতে গেল উপায় ও থাকে না। তবে ভাববাদ বা আধ্যাত্মিকতার পূর্ব শর্ত হলো শুদ্ধতা বা পবিত্রতা। এই পথে চালাকি বা চালবাজি করে এগিয়ে যাওয়ার কোনোরূপ সুযোগ নেই। ফকির লালন সাঁইজি বলেছেন-

শুদ্ধ প্রেমরসিক বিনে কে তারে পায়।
যার নাম আলেক মানুষ আলেকে রয়।।

রসিক রস অনুসারে
নিগূঢ় ভেদ জানতে পারে,
রতিতে মতি ঝরে
মূলখণ্ড হয়।।

নীরে নিরঞ্জন আমার
আদি লীলা করলেন প্রচার,
হলে আপন জন্মের বিচার
সব জানা যায়।।

আপনার জন্মলতা
খোঁজ গে তার মূলটি কোথায়,
লালন বলে হবে সেথা
সাঁইর পরিচয়।।

শুদ্ধতার কারণ হিসেবে সাধককুল বলেন, ভ্রহ্মাণ্ডের যে জ্ঞান বা পরমের যে স্বরূপ তা মূলত সত্য ও শুদ্ধতার প্রকাশ। তাই তাকে বুঝতে গেলে সত্য-শুদ্ধ-পবিত্র হতেই হয়। এর ব্যত্যয় ঘটলে সর্বনাশ। তবে এই নাদেখা বা অদেখা জগতকে নিজে অনুধাবনের আগে এর অস্বস্তি সাধারণে বুঝতে পারে না বলে অনেক চালবাজ একে উপার্জনের হাতিয়ার করে নেয়। তাই প্রত্যেকেই তার জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেচনার দ্বারা তার পথ অনুসন্ধান করতে হয়।

আধ্যাত্মিকতায় নিজের টা নিজেকেই প্রমাণ করে নিতে হয়। কেউ কারো টা করে দিতে পারে না। গুরুবাদী বিশ্বাসে গুরু শিষ্যকে এর কিছু ঝলকানী দেখাতে পারেন বলে বিশ্বাসীরা মানেন। তবে তা কাগজ কলমে প্রমাণ করা যায় না। সেটা করার উপায়ও নেই। আধ্যাত্মিকতা বা ভাবসাগরে ডুবে অনুভবের ভেতর দিয়ে উপলব্ধি করতে হয়।

সাধককুল বলেন, জ্ঞান অর্জনের উপায় মোটা দাগে দুটি। একটি সিনা অন্যটি সফিনা। এর একটা হচ্ছে পুঁথিগত জ্ঞান আর অন্যটি হচ্ছে আত্মোপোলব্ধির মধ্য দিয়ে অর্জিত ভ্রহ্মাণ্ডের জ্ঞান। পুঁথিগত বিদ্যা হলো ‘সীমার জ্ঞান’ অর্থাৎ যার সীমা থাকে। আর আত্মোপোলব্ধির জ্ঞান হলো ‘অসীমের জ্ঞান’ অর্থাৎ যে জ্ঞানের সীমা নির্ধারণ করা যায় না। ফকির লালন সাঁইজি বলেছেন-

সিনার ভেদ দিলাম সিনায়
সফিনার ভেদ সফিনায়,
যার যে পথে মন গেলো ভাই
সে-ই পথে সে দাঁড়িয়েছে
মুর্শিদের ঠাঁই নে নারে তাঁর ভেদ বুঝে।।

প্রত্যেকেই তার জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেচনার মধ্য দিয়ে বেছে নেয় তার জ্ঞান আহরণের পদ্ধতি বা উপায়। আর এই ভ্রহ্মাণ্ডের জ্ঞান যখন সাধক জানতে পারে তার সাধন-ভজনের মধ্য দিয়ে তখন সে পরমকে-পরমসত্তাকে উপলব্ধি করতে শেখে। পরমের সাথে লীন হতে পারে। জীবাত্মা আর পরমাত্মার মিলন ঘটে।

এই মিলনকেই সাধককুল বলে ‘আত্মোদর্শন’ বা ‘স্বরূপদর্শন’। জীবাত্মা আর পরমাত্মার মিলনে সাধক নিজকে চিনতে পারে-জানতে পারে-বুঝতে পারে। আর নিজেকে এই চেনা-জানা-বোঝার মাধ্যমেই ভ্রহ্মাণ্ডকে চেনে-পরমকে চেনে। এটাই আত্মোপলব্ধি।

এই আত্মোপোলব্ধির যে যাত্রায় মহানবী সপ্ত আকাশ ভেদ করে স্রষ্টার সাথে মিলিত হয়েছিলেন সেই মহিমান্বিত রজনীই লাইলাতুল মেরাজ বা শবে মেরাজ নামে প্রতিষ্ঠিত। সাধককুলের কাছে এই রাতের যে অন্তনির্হিত অর্থ তা সাধনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ।

ইসলামের এই বিশেষ রজনী নিয়ে নানা মতভেদ থাকলেও অধিক প্রচলিত তথ্য হলো, এই রজনী মহানবীর জীবনে আসে নবুয়াত প্রাপ্তির দশম থেকে ত্রয়োদশ বছরের মধ্যে কোনো এক রজনীতে। আল্লাহ তার প্রিয় বন্ধুকে বোরাক নামক বাহনে আরোহন করিয়ে প্রথমে কাবা ঘর থেকে বায়তুল মোকদ্দাস পর্যন্ত নৈশ ভ্রমণ করান। রাতের এই জাগতিক সফরকে ইসরা (রাতের সফর) নামে উল্লেখ করা আছে।

ইসরা সম্পর্কে পবিত্র কোরানে বলা হয়েছে, “তিনি পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রিতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত। যার চতুর্দিকে আমি বরকতময়তার বিস্তার করেছি। তাকে আমার নিদর্শন হতে প্রদর্শনের জন্য। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা।” [আল-ইসরা:১]

কয়েকটি সূত্রে বর্ণিত, এ সফরের আগে জিব্রাইল (আ) এসে মহানবীকে মসজিদুল হারামে নিয়ে যান। যেখানে তার বুক বিদীর্ণ করে জমজম কূপের পানি দিয়ে সীনা ধৌত করে নূর ও প্রজ্ঞায় পূর্ণ করা হয়। এ ঘটনাকে ‘শাক্কুস সদর’ বলে উল্লেখ আছে।

পবিত্র কোরানে মেরাজের বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘পুনরায় আর একবার সে তাকে সিদরাতুল মুনতাহার কাছে দেখেছে। যার সন্নিকটেই জান্নাতুল মা’ওয়া অবস্থিত। সে সময় সিদরাকে আচ্ছাদিত করছিলো এক আচ্ছাদনকারী জিনিস। দৃষ্টি ঝলসেও যায়নি কিংবা সীমা অতিক্রমও করেনি। সে তার রবের বড় বড় নিদর্শনসমূহ দেখেছে। [আন নাজম:১৩-১৮]

রজব মাসের ২৭ তারিখ (মতভেদ আছে) মহানবী এশার নামাজ পড়ে কিছুটা তন্দ্রা অনুভব করলেন এবং ঘুমিয়ে গেলেন। এমন সময় আল্লাহর বার্তাবাহক হযরত জিব্রাইল সেখানে উপস্থিত হয়ে মহানবীকে বলেন, হে আল্লাহর পিয়ারা হাবীব আপনি উঠে পড়ুন। আল্লাহর তরফ থেকে ঊর্দ্ধলোকে গমনের জন্য বজ্রের চেয়ে দ্রুতগামী আর অধিক শক্তিশালী বোরাক নিয়ে এসেছি।

আপনাকে অভ্যর্থনা ও সম্মান প্রদর্শনের জন্য সকল ফেরেস্তা ও পূর্ববর্তী সকল নবী পয়গম্বররা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। মহানবী জেগে উঠলেন। হাউজে কাউছারের পানি দিয়ে ওজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে বোরাকে আরোহন করেন।

ফেরেস্তা পরিবেষ্টিত হয়ে বোরাক উর্ধ্বলোকে ছুটে চললো। মহানবী বায়তুল মোকাদ্দাসে উপস্থিত হয়ে পূর্ববর্তী নবী পয়গম্বরদের উপস্থিতিতে দুই রাকাত নামাজের ইমামতি করেন। পুনরায় তিনি বোরাকে আরোহন করে ঊর্ধ্বলোকে আরহণ করতে থাকেন।

প্রথম আকাশে তাঁকে আদম (আ) সাদর অভ্যর্থনা জানান। ২য় আকাশে হযরত ঈসা নবী ও হযরত ইয়াহিয়া নবী এবং ৩য় আকাশে হযরত ইউসুফ নবী চতুর্থ আকাশে হযরত ইদ্রীস নবী পঞ্চম আকাশে হযরত হারুন নবী ষষ্ঠ আকাশে হযরত মুসা নবী এবং সপ্তম আকাশে হযরত ইব্রাহীম নবীর সাক্ষাৎ ঘটে।

এরপর বায়তুল মামুরে গিয়ে আসমানী পবিত্র কাবা ঘরে গিয়ে আসমানী ফেরেস্তাদের নিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন এবং সিদরাতুল মুনতাহায় অবতরণ করেন। জিব্রাইল জানালেন, “হে নবী! এ পর্যন্ত আমার সীমানা। এরপরে অগ্রসর হওয়ার সাধ্য আমার নাই।”

এখান থেকে নবীকে রফ রফ নামের আরেকটি বাহন আল্লাহর আরশের দিকে রওনা হয়। এখানে উপস্থিত হয়ে মহানবী বলেন, হে আল্লাহ! আমার ও আমার উম্মতদের ইবাদত উপহার স্বরূপ আপনার দরবারে বয়ে এনেছি। আমার উম্মতদের হেফাজতের ফরিয়াদ জানাচ্ছি।

আল্লাহ জানালেন, দুনিয়ায় আমার বান্দাদের ওপর ৫০ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের হুকুম দিলাম। নবী এই নির্দেশ শুনে আকুল হয়ে আল্লাহর কাছে পুনঃ পুনঃ সাক্ষাৎ করে পঞ্চাশ ওয়াক্ত কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করার আরজি পেশ করলেন।

আল্লাহ তার আরজি মঞ্জুর করে জীবন ধারনের আরো কিছু বিধিমালা মহানবীকে অবহিত করেন। নবী আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করেন। মহানবী এরপর বেহেস্তের সুশোভিত দৃশ্যাবলি এবং দোজখের দাউ দাউ করে জ্বলা আগুন দেখতে পান।

আল্লাহ জানালেন, অবিশ্বাসীরা দোজখে অনন্তকাল ধরে বাস করবে। আর বিশ্বাসীরা পরম শান্তিতে বেহেস্তের সুশোভিত পরিবেশে চিরদিন বাস করবে।

মহানবীর সহধর্মিণী উম্মে হানীর বর্ণনায়:
মেরাজের ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে মহানবীর সহধর্মিণী উম্মে হানী বলেন, ইসরার শুভরাত্রিতে তিনি আমার ঘরে, এশার নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়েন। সাথে আমরাও। ভোরে ফজরের কিছু আগে তিনি আমাদের জাগিয়ে তুলে নামাজ পড়েন। আমরাও তার সাথে নামাজ আদায় করি।

তিনি বলেন- উম্মি হানি! তুমি লক্ষ্য করেছ, এখানেই আমরা একসাথে এশার নামাজ পড়েছি, এরপর আমি বাইতুল মুকাদ্দাসে গিয়েছি, সেখান থেকে ফিরে এসে এইমাত্র তোমাদের সাথে ফজর নামাজ আদায় করলাম, যা লক্ষ্য করছ।

হাসান (রহ) এর বর্ণনায়:
হাসান (রহ) এর বর্ণনায় আছে, নবীজি বলেন, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। এমতাবস্থায় জিব্রাইল এসে আমাকে জাগিয়ে তোলে। আমি উঠে বসি, কিন্তু কাউকে না দেখে পুনরায় শুয়ে পড়ি। তৃতীয়বার সে আমার বাহু ধরে ডাকে, আমি তার সাথে দাঁড়িয়ে যাই।

আমাকে মসজিদের দরজার কাছে নিয়ে আসে। সেখানে লক্ষ্য করি, অদ্ভুত আকৃতির একটি প্রাণী। যাকে গাধাও বলা যায় না আবার তা ঘোড়ার মতও না। উরুতে বিশাল আকার দুটি পাখা। যার মাধ্যমে সে পায়ে আঘাত করে। চোখের দৃষ্টিসীমার প্রান্তে গিয়ে তার সম্মুখ পা দুটি মাটি স্পর্শ করে। এর নাম বোরাক।

জিব্রাইলের সাহচর্যে আমি আসমান-জমিনের বিচিত্র নিদর্শন দেখতে দেখতে বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছি। জিব্রাইল দরজার আংটার সাথে বোরাক বাঁধে। আমি লক্ষ্য করি, ইবরাহিম, মুসা ও ঈসাদের সাথে আরো অনেক নবী একত্রিত হয়েছেন।

মুসার আকৃতি শানুয়া বংশের পুরুষদের মত কোঁকড়ানো চুল, হালকা গড়ন, লম্বা শরীর। ঈসার আকৃতি মাঝারি গড়ন, ঝুলন্ত সোজা চুল, চেহারা সৌন্দর্য তিলকে ভর্তি। মনে হচ্ছিল তিনি গোসলখানা থেকে বের হয়েছেন, পানি টপকাচ্ছে মাথা থেকে। অথচ কোন পানি টপকাচ্ছিল না। ইব্রাহিমের আকৃতি আমার মত, আমিই তার সাথে সবচেয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ।

আমার সামনে দুটি পেয়ালা পেশ করা হলো যার একটি মদের অপরটি দুধের। আমি দুধের পেয়ালা হাতে নেই এবং পান করি। আমাকে বলা হয়, সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যদি আপনি মদের পেয়ালা থেকে পান করতেন তবে আপনার উম্মত গোমরাহ হয়ে যেত। অপর একটি বর্ণনায় তৃতীয় আরেকটি পেয়ালার উল্লেখও পাওয়া যায়। (ইবনে হিশাম, বোখারি, মুসলিম)

অতঃপর প্রথম আকাশে পৌঁছালে মহানবীর জন্য দরজা খুলতে বলা হয়, দরজা খুলে দেয়া হয়। সেখানে আদম (আ) মহানবীর সাক্ষাৎ লাভ করেন। দ্বিতীয় আকাশে পৌঁছালে সেখানে ইয়াহইয়া ও ঈসা নবীর সাথে সাক্ষাৎ হয়।

তৃতীয় আকাশে ইউসূফ নবী, চতুর্থ আকাশে ইদরিস নবী, পঞ্চম আকাশে মূসা নবী এবং ষষ্ঠ আকাশে মূসা নবীর সাথে সাক্ষাৎ হয়। মহানবী মুসা নবীর কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার পরে এমন একজনকে প্রেরণ করা হয়েছে, তার উম্মত আমার উম্মতের চে’ বেশি জান্নাতে প্রবেশ করবে।

সপ্তম আকাশে ইব্রাহিম নবীর সাথে সাক্ষাৎ হয়। অতঃপর সিদরাতুল মুন্তাহায় পৌঁছে মহানবী দেখেন, সেখানের ফল হাজার শহরের কলসির ন্যায়, পাতা হাতির কানের মত, যা স্বর্ণের পতঙ্গ, আলোকোজ্জ্বল, বিচিত্র রং বেষ্টিত। যে সৌন্দর্য বর্ণনা করার সাধ্য নেই।

এরপর বায়তুল মামুরে আরোহণ করে দেখেন সেখানে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে। যাদের কেউই কিয়ামতের পূর্বে পুনরায় প্রবেশ করার সুযোগ পাবে না। এরপর জান্নাতে প্রবেশ করেন, যার ভেতর স্বর্ণের রশি, কস্তুরীর মাটি প্রত্যক্ষ করেন।

আরো ঊর্দ্ধে উঠে আল্লাহর নিকটবর্তী হন। ধনুক বা তার চে’ কম দূরত্বের ব্যবধানে। অতঃপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। ফেরার পথে মূসা নবীর পরামর্শে পুনরায় আল্লাহর দরবারে পুনঃপুনঃ গিয়ে শেষে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়ে আসেন।

আবদুল্লাহ’রবর্ণনায়:
হযরত আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ আছে- মহানবী বলেছেন, মেরাজের রাতে আল্লাহর সান্নিধ্যে যাওয়ার পর আল্লাহ আমাকে তিনটি বিশেষ উপহার প্রদান করেন-

১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ।
২. সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত।
৩. যে মুসলিম আল্লাহর সাথে শরীক করবে না তার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে (সহীহ মুসলিম) বা তাওহীদবাদীদের সমস্ত পাপের ক্ষমা।

মহানবীর ২৩ বছরের নবুওয়তি জীবনের অন্যতম অলৌকিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো এই ‘মেরাজ’। মহানবী ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সর্বজনীন জীবনব্যবস্থা হিসেবে রূপ দেয়ার জন্য আল্লাহর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পেয়েছিলেন এই রজনীতে। সেই রাতে নবীদের ইমাম বানিয়ে আল্লাহ শুধু মহানবীকেই শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়নি, নবীর উম্মতদেরও শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়।

মহানবীর জীবনে সবচেয়ে দুর্যোগময় মুহূর্তে মেরাজ সংগঠিত হয়েছিল। সহধর্মিনী খাদিজা (রা) ও অন্যতম অভিভাবক চাচা আবু তালিবের মৃত্যু, কুরাইশদের দ্বারা মহানবী এবং তার অনুসারীদের সামাজিকভাবে বয়কট, তায়েফবাসীর লাঞ্ছনাসহ দুর্যোগ পিছু ছাড়ছিল না। এমনই সময় আল্লাহর কাছ থেকে মহানবীর জন্য আমন্ত্রণ আসে মেরাজের। এই পবিত্র রজনীতে আল্লাহতায়ালা তার প্রিয় বন্ধুকে একান্ত সান্নিধ্যে নিয়ে আসেন।

সাধককুল বলেন, সাধক যখন শত বিপর্যয়েও তার সাধন পথ থেকে বিচ্যুত না হয়ে স্রষ্টার সান্নিধ্যের জন্য সাধন-ভজনে রত থাকে তখন পরমেশ্বর তাকে দয়া করে। আর এই পরমের সান্নিধ্য বা দর্শনের আশায় জগৎ জুড়ে সাধককুল নানা মতপথ উপায় বাতলেছেন এবং তা মানব কল্যাণে বা মানবের মুক্তির জন্য তা তাদের শিষ্য-ভক্ত-উম্মতের মাঝে দিয়ে গেছেন। তার বেশিভাগই প্রকাশ্যে বলা হলেও ভাষার কারুকার্যে তা সাধারণের কাছে চিরকালই গুপ্ত।

ইসলাম ধর্মের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী লাইলাতুল মেরাজের পবিত্র রজনীতে এই জগতের পরম স্রষ্টা মহান আল্লাহর দর্শন লাভ করেন। নবীজি সশরীরে এই ঊর্দ্ধলোকে যাত্রা করেছিলেন নাকি দেহাতীত ভাবে স্রষ্টার সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন তা নিয়ে মতোভেদ থাকলেও মুসলমানরা ইবাদত বন্দেগীর মধ্য দিয়ে এই পবিত্র রজনী পালন করে থাকে।

স্রষ্টার দর্শনই সৃষ্টির অভিলাষ। যে স্রষ্টার কাছ থেকে সৃষ্টি ছড়িয়ে পরেছে পরম থেকে সৃষ্ট ব্রহ্মাণ্ডে সেই স্রষ্টার কাছে তাকে ফিরতেই হবে। আর যে তার দর্শন পাবে অর্থাৎ তাকে বুঝতে পারবে-জানতে পারবে সেই হবে মুক্ত। তাকে আর জন্মান্তরের ফেরে পরতে হবে না। জন্মান্তরে বিশ্বাসীরা তাই ব্যক্ত করেন।

যারা শব্দার্থের পরিবর্তে শব্দের ভেতরে লুকায়িত নিগূঢ় অর্থ নিয়ে ভাবতে পারে তাদের বিশ্বাস অবশ্য ভিন্ন। তারা শব্দের শাব্দিক অর্থের আড়ালে গুপ্তরূপে থাকা ‘ভাব’ নিয়ে চর্চা করেন। ফকির লালন বলেছেন-

আগে বোঝ পরে মজো
নৈলে দলিল মিথ্যা হয়,
রাসুল যিনি নয় গো তিনি আব্দুল্লার তনয়।।

ভাববাদী আত্মোনুসন্ধানীরা গোড়াতেই বিশ্বাস করেন- যা ঘটে বিশ্বভ্রহ্মাণ্ডে তা ঘটে দেহ ভাণ্ডে। এবং জগৎ সৃষ্টি পঞ্চতত্ত্বে- আগুন, বায়ু, আকাশ, মাটি ও জলে। এই জগতের সকল কিছুর মাঝেই রয়েছে এই পঞ্চতত্বের অস্তিত্ব।

আর পরম থেকে যেহেতু এই পঞ্চতত্ত্বের সৃষ্টি তাই এই পঞ্চতত্ত্বে রয়েছে পরমের অস্তিত্ব। আর যদি কোনরূপে এই পঞ্চতত্ত্বের প্রকৃত স্বরূপকে যদি বোঝা যায় তাহলে পরমকেও বোঝা যেতে পারে। আর এই পঞ্চতত্ত্বকে বোঝার জন্য সবচেয়ে মোক্ষম বস্তু হলো নিজ দেহ। কারণ এতেও আছে পঞ্চতত্ত্ব এবং তা নিজেকেই বয়ে নিয়ে চলতে হয় সর্বক্ষণ। মানে যতক্ষণ দেহে আত্মার উপস্থিতি থাকে।

আর নিজ দেহ নিয়েই ভাববাদী-আধ্যাত্মবাদীর সাধন-ভজন। তারই ভিত্তিতে তারা জগৎকে খুঁজে ফেরেন দেহের অভ্যন্তরে। সমস্ত কিছুর ব্যাখ্যাও তাই দেহে ভিত্তিতেই অনুধাবন করার প্রকৃয়া চালিয়ে যান। যেহেতু ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদে নিজেকেই নিজের সন্ধান করতে হয়; তাই এর করণ-কারণ ও ব্যাখ্যা সবই গুপ্ত রাখা হয়। নিজ নিজ গুরু তার শিষ্যদের শেখায় কি করে দেহকে জানতে হয়। তবে এ নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে সমাজে।

ভারতীয় প্রাচীন শাস্ত্রেও যোগের যে কথা বলা হয়েছে। তাতেও দেখা যায় জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলনের জন্য দেহের কুলুকুণ্ডলীনি জাগ্রহ করার কথা। সেখানেও দেহের সপ্তচক্রের কথা বলা হয়েছে। সেই সপ্তচক্র এক এক করে জাগ্রত করে তবেই সপ্ততলায় পৌঁছাতে হয়। আর সপ্ততলায় পৌঁছাতে পারলেই সাধক পরমের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পায়। লালন সাঁইজি এ প্রসঙ্গে বলেছেন-

সপ্ততলা ভেদ করিলে
হাওয়ার ঘরে যাওয়া যায়,
হাওয়ার ঘরে গেলে পরে
অধর মানুষ ধরা যায়।।

মহানবীকে আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ আরো যে জীবনব্যবস্থা দিলেন মেরাজে। সেই আলাপচারিতাকে আরো রহস্যে মুড়ে ফকিরকুলের শিরোমণি লালন সাঁইজি বলেছেন-

নবীজি মেরাজে গিয়ে
যে ভেদ তিনি এলেন পেয়ে,
চার জনা চার গোলে পল
লালন পলো বিষম ফেরে।।

মেরাজ প্রসঙ্গে লালন সাঁইজি অন্য পদে বলেছেন-

নিগূঢ় প্রেম কথাটি তাই আজ
আমি শুধাই কার কাছে,
কোন প্রেমেতে আল্লাহ নবী
মেরাজ করেছে।।

মেরাজ ভাবের ভূবন
গুপ্ত ব্যক্ত আলাপ হয়রে দুইজন,
কে পুরুষ আকার কি প্রকৃতি
তার শাস্ত্রে প্রমাণ কি রেখেছে।।

সাঁইজি আরো বলেছেন-

সালাতুল মেরাজুল মোমেনীনা
জানতে হয় নামাজের বেনা,
বিশ্বাসীদের দেখাশোনা
লালন কয় এই জীবনে।।

ইসলামে যে কয়টি রহস্যাবৃত রজনীর কথা উল্লেখ আছে তার মধ্য শবে বরাত, শবে কদরের মতো শবে মেরাজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব রাতের উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব রজনীগুলো কোন কোন রজনীতে তা সুনির্দিষ্ট করা বলা হয়নি। এতেও একটা রহস্য রেখে দেয়া হয়েছে। অনুসন্ধানীর দল বলে সাধক ভিন্ন তার রহস্য অন্যে খণ্ডাতে করতে পারে না।

এই ঊর্দ্ধোলোকের যাত্রায় যে বাহনে আরোহন করছিল মহানবী পরবর্তীতে সেই বোরাকের যে চিত্র শিল্পীরা আঁকেন তাতে ঘোড়ার মুখে কেনো নারীর ছবি আঁকা হয়েছে। কেনো মেরাজের ঘটনাকে রাহস্যাবৃত বলে উল্লেখ করেছেন সাধককুল।

কেনো পাঁচ পাঞ্জাতনের অর্থাৎ মহানবী, হযরত আলী, মা ফাতেমা, ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেনকে ঘিরে লিপিবদ্ধ হয়েছে অগণিত রচনা। কি আছে এর রহস্যের অতলে তার ভেদ জানতে গেলে ভাববাদের গূঢ় রহস্য না জানলে বোঝা বা বলা মুশকিল। তবে ইশারায় সবই বলা আছে; সাধককুলই তার মর্ম বুঝতে পারবে।

পবিত্র গ্রন্থ কোরানে উল্লেখ আছে, “ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য আল্লাহর নিদর্শন। এতে জ্ঞানীদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।” (৩০:২২)

আর এই নিদর্শনগুলো কি জাহিরি বা প্রকাশ্যের নিদর্শন নাকি বতেনি অর্থাৎ গুপ্ত নিদর্শন তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও। কোরআনে যে অনেক লুকায়িত জ্ঞান রয়েছে তাতে অনেকেই একমত।

তবে বিশ্বাসী, আত্মদর্শনবাদীর বাইরেও আরেকটা মত আছে। তা হলো অবিশ্বাসী। অবিশ্বাসী মতবাদীরা এসব কিছুই মানতে নারাজ। শাব্দিক অর্থ বা শব্দের ভেতরে লুকায়িত আত্মোপোলব্ধির ভাবার্থ কোনোটাই তারা বিশ্বাস করেন না।

তারা বিশ্বাস করেন, জগতে যা কিছু ঘটছে তা প্রকৃতির একটা নিয়ম মাত্র। কিন্তু প্রকৃতি কি তা তাদের কাছেও স্পষ্ট নয়। তবে অনেকে বলেন পরিবর্তনের ধারাবাহিকতাই প্রকৃতি। আর সে তার নিয়মে চলে। এর পেছনে কোনো চালিকা শক্তি নেই।

তবে যে যে বিশ্বাসেই বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী হোক না কেনো এই বিশ্বভ্রহ্মাণ্ড যে রহস্যময় তা সকলেই স্বীকার করে নেয়। আধুনিক বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির বিজ্ঞানও বলে থাকে সকল কিছুর সমাধান এখনো মানুষ করে উঠতে পারেনি। অবিশ্বাসীরা বিশ্বাস করে একদিন বিজ্ঞান সকল কিছুরই সমাধান করতে পারবে।

আর বিশ্বাসীরা শাস্ত্রকে চূড়ান্ত ধরে এগুতে চায়। অন্য দিকে ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ বিজ্ঞানের মতো করে এক্স-ওয়াই-জেড ধরে ধরে নিজেকে নিজে প্রমাণ করে তার বিশ্বাসের দিকে এগিয়ে যায়। যার মূল মন্ত্র ভক্তি-শ্রদ্ধা ও শুদ্ধতা। আর সাধনার জন্য নির্জন-অন্ধকার-একান্ত সময় সকলেই পছন্দের। আর এই তিনটি একত্রে মিলে যায় রজনীতেই।

রাত যে দিনের চেয়ে রহস্যময়। রাত যে কেবল রাত নয়। এর মাঝে যে অনন্ত গুপ্তবাদ লুকিয়ে আছে। তা বিশ্বাস থেকে-ভক্তি থেকে-শ্রদ্ধা থেকে না হলেও প্রায় প্রতিটা মানুষই রাতে নিজ নিজ সাধন-ভজন রাতেই করতে পছন্দ করে। আর জাগতিক কাজ করতে চায় দিনের আলোতে।

পৃথিবীতে প্রচলিত প্রায় প্রতিটা বিশ্বাসেই বিশেষ বিশেষ রাতের কথা উল্লেখ করেছে স্থান ও সময় ভেদে। সেই সব রাতে চলে আপন আপন সাধন-ভজন। করণ-কারণ বিধিমালায় পার্থক্য থাকলেও শেষ মেষ সকলেই আসলে পরমের সাথে লীন হওয়ার পরমের সাথে-স্রষ্টার সাথে আলাপচারিতার বাসনায় সাধনায় এগুতে থাকে। এটাকেই সহজ ভাষায় বলা যায় মেরাজ।

আর এই মেরাজের জন্যই মানবজাতির এতো সাধনা-এতো তপস্যা। ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসে তার নাম-অর্থ-বিধি পাল্টে গেলেও নিজেকে জানার এই সাধনা থেমে থাকে না। ইসলামে নবী মোহাম্মদের মেরাজে গমনের মধ্য দিয়ে, মূসা নবীর তুর পর্বতে আল্লার দর্শন বা গীতায় অর্জুনের ভগবান রূপে কৃষ্ণ দর্শন বা লালনের মনের মানুষের সাক্ষাৎ কোথাও যেয়ে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। লালন সাঁইজি স্বরূপ দর্শনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলছেন-

মিলন হবে কত দিনে
আমার মনের মানুষের সনে।।

চাতক প্রায় অহর্নিশি
চেয়ে আছি কালো শশী
হব বলে চরণ দাসী,
ও তা হয় না কপাল গুণে।।

মেঘের বিদ্যুৎ মেঘে যেমন
লুকালে না পায় অন্বেষণ,
কালারে হারায়ে তেমন
ঐ রূপ হেরি এ দর্পণে।।

যখন ও-রূপ স্মরণ হয়
থাকে না লোকলজ্জার ভয়,
লালন ফকির ভেবে বলে সদাই
ও প্রেম যে করে সেই জানে।।

……………………
আরো পড়ুন:
মেরাজতত্ত্ব
শবে মেরাজ : ঊর্দ্ধোলোকের রহস্য যাত্রা

মেরাজ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!