শ্রীমায়ের পঞ্চতপানুষ্ঠান

শ্রীমায়ের পঞ্চতপানুষ্ঠান

-স্বামী অপূর্বানন্দের লেখনী থেকে লিখেছেন জলি সাহা(ঠাকুর)

ভক্তদের আকুল আহ্বানে ১৩০০(১৮৯৩ খ্রি:) সনের আষাঢ় মাস নাগাদ পুনরায় কোলকাতায় এলেন। এবারো ভক্তগণ তাঁকে বেলুড়ে নীলাম্বরবাবুর ভাড়া বাড়িতে রেখেছিলেন। এখানে তাঁর অন্যতম সেবকরূপে স্বামী যোগানন্দ ও সারদা(স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ) থাকতেন। সারদা শ্রীমার প্রতি এতোটা ভক্তি ছিল যে তিনি প্রতি সন্ধ্যায় নিষ্ঠা সহকারে একখানি ধওয়া পরিষ্কার কাপড় শিউলি গাছের তলায় পেতে রাখতেন, যাতে শ্রীমায়ের পূজার ফুল মাটিতে না পরে।

ঐ সময়ের বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনা শ্রীমায়ের ‘পঞ্চতপানুষ্ঠান’। শ্রীঠাকুরের দেহত্যাগের পর মায়ের মনে তীব্র বৈরাগ্যের উদয় হয়। তাঁর কেবলই মনে হতো, ‘এমন সোনার ঠাকুরই চলে গেলেন, তখন তাঁর থাকার সার্থকতা কি? তিনিও শরীর ছেড়ে দেবেন সঙ্কল্প করলেন। ঐ সময় ঠাকুর দেখা দিয়ে বলেছিলেন, ‘না, তোমার এখন যাওয়া হবে না, এখনো অনেক কাজ বাকি আছে।’ শ্রীঠাকুরের আদেশে তাঁকে থাকতে হলো, কিন্তু তাঁর কিছুই ভাল লাগত না। কারো সঙ্গে মিশতে বা আলাপ করতেও প্রবৃত্তি হতো না। শ্রীমায়ের অন্তরের এই অবস্থা দূরীকরণার্থ ভক্তগণ তাঁকে তীর্থবাসের জন্য পাঠালেন। শ্রীমা যখন কাশীতে গিয়েছিলেন, তখন এক নেপালী সাধুনী যেন দৈবপ্রেরিত হয়ে তাঁর কাছে আসতেন। তিনি নানা ব্রতানুষ্ঠানাদিতে বিশেষ অভিজ্ঞ ছিলেন। শ্রীমায়ের মানসিক অশান্তির কথা জানতে পেরে ঐ সাধুনী তাঁকে পঞ্চতপানুষ্ঠানের উপদেশ দিলেন। বিশেষ করে তখন তাঁর মনে ঠাকুর যে বলেছিলেন সেই ‘তোমার যাওয়া হবে না-তোমায় থাকতে হবে’ কথাও উদিত হতে লাগলো। এমন সময় দুটি দৈব নির্দেশও তাঁর মনে বিশেষ অনুপ্রেরণা দিয়েছিল।

ইতোপূর্বে তিনি যখন কামারপুকুরে ছিলেন তখন তিনি সাদা চোখে দেখেছিলেন, এগার-বার বছরের একটি মেয়ে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কখনো সামনে কখনো পেছনে, তাঁর চুল রুক্ষ, পরনে গেরুয়া কাপড় আর গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, যেন শ্রীঠাকুরের আদর্শজনিত তাঁর অন্তরের বৈরাগ্য মূর্ত হয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। শ্রীঠাকুরের দেহত্যাগের কিছুকাল পরে তিনি আরেকটি দর্শন পেতেন। তিনি প্রায়ই দেখতেন, দাড়িওয়ালা এক সন্ন্যাসী-মূর্তি তাঁকে ‘পঞ্চতপা’ করবার জন্য বারংবার বলছেন। শ্রীমা প্রথমে ঐ সন্ন্যাসীর কথায় ততটা গা করেননি; কিন্তু সন্ন্যাসী বিশেষ আগ্রহ প্রাকাশ করে পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন। পরে বেলুড়ে নীলাম্বর মুখুজ্যের বাগানবাড়িতে থাকাকালীন পঞ্চতপা করার আগ্রহ শ্রীমার মনে প্রবলতর হতে লাগল, অথচ পঞ্চতপা কি, তা তিনি জানেন না। প্রসঙ্গক্রমে যোগীন-মাকে জিজ্ঞাসা করতে তিনি বললেন, ‘বেশ তো মা, আমিও করব।’


এইভাবে ক্রমাগত সাতদিন নূতন নূতন অগ্নিকুন্ডের মধ্যে বসে উদয়াস্ত জপ করেন। ফলে শরীর ঝলসে কয়লার মতো হয়ে গিয়েছিল কালো। এইভাবে শ্রীমায়ের মনের আগুন অনেকটা নিভলো এবং গৈরিক পরিহিতা কিশোরীও চিরতরে বিদায় নিলেন। এর পরে দাড়িওয়ালা সন্ন্যাসী-মূর্তিও আর দেখতে পেতেন না।

সঙ্গে সঙ্গে যোগীন-মায়ের তত্ত্বাবধানে দু’জনের জন্য পঞ্চতপার আয়োজন হলো। একতলার ছাদের উপর অনেকটা মাটি ফেলে তাঁর উপর পাঁচ হাত অন্তর প্রচুর ঘুঁটে দিয়ে খোলা ছাদে চারটি আগুন করা হলো। আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে, আকাশে সূর্য। সকালে গঙ্গাস্নান করে এসে সেই জলন্ত অগ্নিকুণ্ড দেখে শ্রীমা প্রথমটায় ভয় পেয়ে গেলেন, কি করে ঐ অগ্নিকুন্ডের মধ্যে ঢুকবেন? যোগীন-মা সাহস দিয়ে বললেন, ‘ভয় কি মা ঢুকে পড়।’ সঙ্গে সঙ্গে শ্রীঠাকুরকে স্মরণ করে তিনি সেই অগ্নিকুন্ডের ঠিক মাঝখানে গিয়ে নির্দিষ্ট আসনে বসলেন, যোগীন-মাও শ্রীমায়ের পাশে বসলেন। আগুনের মধ্যে প্রবেশ করে শ্রীমা দেখলেন, আগুনের কোনো তেজ নেই। এইভাবে সূর্যোদ্বয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সারাদিন অগ্নিকুন্ডের মধ্যে বসে জপ করে শ্রীমা সহচরীকে নিয়ে সন্ধ্যায় বেরিয়ে এলেন। এইভাবে ক্রমাগত সাতদিন নূতন নূতন অগ্নিকুন্ডের মধ্যে বসে উদয়াস্ত জপ করেন। ফলে শরীর ঝলসে কয়লার মতো হয়ে গিয়েছিল কালো। এইভাবে শ্রীমায়ের মনের আগুন অনেকটা নিভলো এবং গৈরিক পরিহিতা কিশোরীও চিরতরে বিদায় নিলেন। এর পরে দাড়িওয়ালা সন্ন্যাসী-মূর্তিও আর দেখতে পেতেন না।

তাঁর ‘পঞ্চতপা’ সম্বন্ধে শ্রীশ্রীমায়ের কথা থেকে জানা যাই। জনৈক ভক্ত প্রশ্ন করলেন, তপস্যার কি দরকার? মা বললেন, তপস্যার দরকার। …পার্বতী শিবের জন্য করেছিলেন। …এসব করা লোকের জন্য। নইলে লোকে বলবে, ‘কই, সাধারণের মতো খায় দায় আছে।’ আর পঞ্চতপা-টপা এসব মেয়েলী, যেমন ব্রত সব করে না? ঠাকুর সব সাধনা করেছেন, বলতেন ‘আমি ছাঁচ করে গেলুম, তোরা সব ছাঁচে ঢেলে তুলে নে।’ সন্তান প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার অতশত করবার দরকার কি? মা বললেন, ‘বাবা, তোমাদের জন্য। ছেলেরা কি এতো করতে পারবে? তাই করতে হয়।’

অন্যত্র পঞ্চতপার প্রসঙ্গে শ্রীমা বলেছিলেন, পঞ্চতপার জোগাড় হলো। তখন বেলুড়ে নীলাম্বরবাবুর ভাড়া বাড়িতে। চারিদিকে ঘুটের আগুন, উপরে সূর্যের প্রচন্ড তেজ। প্রাতে স্নান করে কাছে গিয়ে দেখি আগুন গনগন করে জ্বলছে। প্রাণে বড়ই ভয় হলো, কি করে ওর ভেতর যাবো আর সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানে বসে থাকব। পরে ঠাঁকুরের নাম করে দেখি, আগুনের কোনো তেজ নেই। এভাবে সাতদিন কাজ করি। কিন্তু বাবা, শরীরের বর্ণ যেন কালো ছাই হয়ে গিয়েছিল। এরপরে আর সন্ন্যাসীকে আর দেখিনি।’

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!