সোহরাওয়ার্দি

সোহরাওয়ার্দির জীবন ও কর্ম

-মূর্শেদূল মেরাজ

সোহরাওয়ার্দির জীবন ও কর্ম

সোহরাওয়ার্দির পুরো নাম শেইখ শাহাবুদ্দিন আবুল ফাতুহ ইয়াহইয়া বিন হাবাশ সোহরাওয়ার্দি। উপাধি শেইখুল আশরাক্ব। তিনি সুফিবাদের ইশরাকি বা ‘আলোকিত’ ধারার প্রবর্তক হিসেবে খ্যাত। তাকে শেইখে শহীদ বা নিহত শেইখও বলা হয়।

ইরানের যানজনের কাছে সোহরাওয়ার্দি গ্রামে আনুমানিক ৫৪৫-৫৫০ হিজরির কোনো এক সময় তার জন্ম। নামের মিল বশত অনেকেই তাকে সোহরাওয়ার্দি তরিকার প্রবর্তক ওমর সোহরাওয়ার্দির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন।

শেইখ শাহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দিকে অ্যারিস্টটলীয় দর্শনের দিকপাল ইবনে সিনা ও ইবনে রোশদের দুই যুগের মাঝামাঝি সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাকে ইসলামী দর্শনের ইস্ফাহানি ঘরানার পটভূমি সৃষ্টির রূপকারও বলা হয়।

ধারণা করা হয়, ইস্ফাহানি ঘরানার মির দমাদ ও মোল্লা সাদরার মত অনেকে প্রকৃত অর্থে সোহরাওয়ার্দির ইশরাকি দর্শনের দ্বারাই প্রভাবিত। দর্শন ভাবনায় সোহরাওয়ার্দি সৃষ্টিশীলতার পাশাপাশি অন্যান্য দার্শনিকদের ভাবনার সংযোজন, বিয়োজন এবং তত্ত্ব বিশ্লেষণেও ছিলেন অনন্য।

বলা হয়ে থাকে, সোহরাওয়ার্দি সপ্তাহে মাত্র একবার সামান্য পরিমাণ আহার গ্রহণ করতেন। তিনি সর্বক্ষণই প্রবৃত্তি বা নফসকে নিয়ন্ত্রণের কঠিন সাধনায় মশগুল থাকতেন।

সোহরাওয়ার্দির শিক্ষাকাল

তিনি নিজ গ্রামে শেইখ আবদুর রহমানের মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন। এরপর মারাগে শহরে দর্শন ও ইসলামী নীতি শাস্ত্রের শিক্ষক মাজদউদ্দিন জিলির কাছে ইসলামী দর্শন শিখতে যান। মনে করা হয়, এ সময়ই তিনি ‘ইসলামী আইন শাস্ত্রের মূল নীতিমালার পুনর্মূল্যায়ন’ বইটি লেখেন।

তিনি ৫৭৪ হিজরিতে ইস্ফাহানে যেয়ে জাহিরউদ্দিন ফারসির কাছে যুক্তিবিদ্যা সম্পর্কিত শিক্ষা নেন। এই সময় ইবনে সিনার মাশরেকি দর্শনের উপর তার অনুরাগ জন্মায়। তিনি ইবনে সিনার রিসালাহ আততাইয়ের ফারসি অনুবাদ করেন।

শিক্ষা অর্জনের পর তিনি আনাতোলিয়া, তুরস্ক, সিরিয়া, ইরান সহ মধ্যপ্রাচ্যের বহু শহর সফর করেন। এ সময় তিনি বহু খ্যাতমান ও জ্ঞানীগুণী জনের সান্নিধ্য লাভ করেন। এরপর তিনি দামেস্ক থেকে আলেপ্পোয় যান।

সোহরাওয়ার্দির মৃত্যু

আলেপ্পোয় সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর পুত্র মালেক জাহিরের অনুরোধে সোহরাওয়ার্দি তার দরবারে থেকে যান। তার আধ্যাত্মবাদী বক্তব্যের কারণে এখানে অনেকে তার শত্রুতে পরিণত করে। তারা তাকে কাফের ফতোয়া দিয়ে আলেপ্পোর শাসক মালেক জাহিরের কাছে নালিশ করলেও তিনি তাতে কর্ণপাত করায় তারা আরো কঠোর হয়।

তারা সোহরাওয়ার্দির মৃত্যুদণ্ড চেয়ে চিঠি পাঠায় সালাহউদ্দিন আইয়ুবির কাছে। সালাহউদ্দিন তাতে সম্মতি দিয়ে নিজ পুত্রকে তা বাস্তবায়নের হুকুম দেন। জাহির ক্ষমতাচ্যুতের ভয়ে সোহরাওয়ার্দিকে কারাবন্দি করেন। ৫৮৭ হিজরির জিলহজ মাসের কোনো এক শুক্রবারে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে সোহরাওয়ার্দি কারাগারেই মারা জান।

ধারণা করা হয়, এ সময় তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় জাহির খুবই অনুতপ্ত হন। যেসব আলেম সোহরাওয়ার্দির হত্যার ফতোয়া দিয়েছিলেন তাদেরকে নির্বাসনে পাঠানো এবং তাদের ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন।

সোহরাওয়ার্দিকে নিয়ে গবেষণা

সম্ভবত জার্মান দার্শনিকরাই প্রথম সোহরাওয়ার্দি সম্পর্কে গত শতকের শেষের দিকে গবেষণা শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গবেষণা শুরু করেন ফরাসি গবেষকরা। এরপর ব্রিটিশরা। ইরানি গবেষকদের মধ্যে সাইয়্যেদ হুসাইন নাসরের নাম উল্লেখযোগ্য। স্পেন ও ইতালিতেও তাকে নিয়ে লেখালেখি হয়েছে। গবেষণা হয়েছে ভারত উপমহাদেশেও।

পাশ্চাত্য দর্শনে সোহরাওয়ার্দিকে তুলে ধরা হয়েছে মূলত অ্যারিস্টটলীয় দর্শনের সমালোচক হিসেবে। ইলিয়াদের মত লেখকরা তাকে ইরানের ফারাবি ও ইবনে সিনার মত ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন।

(চলবে…)

………………………..
আরো পড়ুন:
সোহরাওয়ার্দি: জীবন ও কর্ম
সোহরাওয়ার্দি: ইশরাকি দর্শন
সোহরাওয়ার্দি: সাহিত্য
সোহরাওয়ার্দি: জিব্রাইলের পালকের শব্দ
সোহরাওয়ার্দি: উইপোকার আলাপচারিতা
সোহরাওয়ার্দি: প্রেমের বাস্তবতা
সোহরাওয়ার্দি: লাল বুদ্ধিবৃত্তি
সোহরাওয়ার্দি: সী-মোরগের দূত

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!