স্বামী পরমানন্দের বাণী: ছয়

স্বামী পরমানন্দের বাণী: ছয়

২২৬.
প্রেমের পূর্ণ অনুভূতি জীবনে এনে দেয় সন্তোষ, শান্তি ও পরমানন্দের প্রবাহ। আর কামুকতায় এনে দেয় দেহচিন্তা, দুখ, ঈর্ষা, দ্বেষ, অভিমান ও অলসতা। তাই প্রেম ও ধ্যান জীবন সাধনার পথে আত্মসাক্ষতকারের পথে অপরিহার্য।

২২৭.
ব্রহ্মচর্য ও চরিত্র গঠনের উপর মানবের সমস্ত কৃতিত্ব নির্ভর করে। ব্রহ্মচর্যের অভাবে শরীর পরিপুষ্ট হয় না- চিত্তে দৃঢ়তা আসে না, ধীশক্তি ও স্মৃতিশক্তি প্রকট হয় না। জীবনে নেমে আসে চরম অকৃতকার্যথা। জীবন যেন পশুত্বে পরিণত হয়।

২২৮.
নিন্দা বা সমালোচনা দ্বারা কোন ব্যক্তিকে দোষমুক্ত করা যায় না। বরং তার ভিথর যে গুণগুলি বিদ্যমান- সেগুলির উল্লেখ করে তাকে উৎসাহ ও প্রেরণা দ্বারা জাগ্রত করতে হবে। তাই প্রেম ও ভালোবাসাই দোষমুক্তির উৎকৃষ্টতম পন্থা।

২২৯.
নিজেকে জানতে পরমতত্ত্বে উপনীত হওয়ার লক্ষ্যে যে চলা- তাই স্প্রিচুয়ালিটি, যা মানুষকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়, অবশেষে পৌঁছে দেয় পূর্ণত্বে। এই চরম লক্ষ্য প্রাপ্ত হয়ে মানব মহামানবে রূপান্তরিত হয়, মানব মাধব হয়।

২৩০.
মানসিকভাবে যারা অসুস্থ অর্থাৎ যারা অবসাদগ্রস্ত, মানসিক দুশ্চিন্তার শিকার, বাতিকগ্রস্ত-তাদের স্থূলশরীরেও নানা ব্যাধি দেখা যায়। আর এইসব মানসিক অসুস্থতা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে ধীরে ধীরে সেটি মারাত্মক ব্যাধিতেরূপ নেয়।

২৩১.
ফুল ফুটলে যেমন তার সৌরভ চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে-তেমনি কোন মহাপুরুষ কোথাও শরীর গ্রহণ করলে বা কোথাও কার্য শুরু করলে অগণিত ভক্তবৃন্দ সেখানে হাজির হয় এবং তাদেরকে নিয়েই ওই মহাপুরুষ তার নির্দিষ্ট কাজ শুরু করে দেন।

২৩২.
তন্ত্রসাধনা খুবই বিজ্ঞানসম্মত এবং এর ক্রিয়া ঠিকমত করলে চাক্ষুষ ফল সাথে সাথেই পাওয়া যায়। কিন্তু বহু সাধকই উপযুক্ত গুরুর অভাবে বিভিন্ন ঋদ্ধি-সিদ্ধির চক্রে পড়ে যান আর আসল উদ্দেশ্য ভুলে ঐ সিদ্ধির মধ্যে হাবুডুবু খেতে থাকেন।

২৩৩.
যার সদগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা এবং সাধনার প্রতি নিষ্ঠা আছে, তার অতি শীঘ্রই সাধনায় সিদ্ধিলাভ হয়। কে কি বলছে বা বলল- কার কি হল- এইরূপ ভাবনায় বিচলিত না হয়ে ধৈর্যের সঙ্গে একাগ্রচিত্তে সাধনা কর। তাহলে শ্রীগুরু কৃপায় শীঘ্রই সিদ্ধ হবে।

২৩৪.
যুক্তিতে যেখানে থই পাওয়া যায় না, সেখানে নির্বোধ বা বোকাদের শেষ আশ্রয় বিদ্রূপ এবং ব্যঙ্গ। কোন বিষাক্ত কীট যেমন সূর্যকে আক্রমণ করতে পারে না, সেইরকম ঐ সমস্ত অপগণ্ডদের ধরা ছোয়ার বাইরে রয়েছে জীবনের মাধুর্য এবং ঈশ্বরের মহিমা।

২৩৫.
প্রতিটা ব্যক্তির মন্ত্রের যে ভাইব্রেশন এটি তার স্থূল শরীর সৃষ্টির যে মূল কারণ তার সাথে টিউনিং হবার জন্যই প্র্যাকটিস বা অভ্যাস যোগ। শ্বাসে-প্রশ্বাসে মন্ত্রজপ করতে পারলে ধীরে ধীরে মূলসুরের সাথে উদ্দীপক রূপ মন্ত্রের মিল ঘটে, এটাই মন্ত্রবিজ্ঞান।

২৩৬.
ভগবদ্ভাবে বিভোর হও। ভগবৎ প্রেমে উম্মাদ হয়ে নৃত্য কর। তোমার রোমে রোমে প্রেমভক্তির স্ফুরণ হতে থাকুক। তুমি অচিরেই রসরাজ পরমরসিক ভগবানকে উপলব্ধি করবে, এতে কোনো সংশয় নেই। আর যদি না হয় তার জন্য আমি দায়ী হব।

২৩৭.
যা মানবের অন্তর্নিহিত স্বভাবের সংস্কারগুলিকে মহত্বের আদর্শে অণুপ্রাণিত করে, তাই শিক্ষা। বাইরের শিক্ষাটা কেবল ভিতরের ঐ মহৎ ভাবগুলিকে বিকশিত করতে সাহায্য করে। দরকার এডুকেশন, কতকগুলো কোয়ালিফিকেশন বা ডিগ্রি নয়।

২৩৮.
জগন্মাতা মানুষকে বুদ্ধি দিয়েছেন, বিবেক দিয়েছেন- সে যদি বুদ্ধেকে শুভ দিকে চালনা করে, বিবেকের দ্বারা সুন্দরের চিন্তা করে তাহলে তার সঙ্গে যোগ হয়। আর সে যদি অশুভ বা বদ চিন্তা করে তাহলে সে বদ হয়। তাই সৎ চিন্তার অভ্যাস করতে হয়।

২৩৯.
সাধুসন্তরা ঈশ্বরের কাছের লোক। তাদের সঙ্গ করতে করতে যখন মনের কলঙ্ক যে সংস্কার আর বুদ্ধির কলঙ্ক যে অভিমান তা চলে যায়, তখন ঈশ্বরের জন্য ব্যাকুলতা দেখা দেয় এবং যে ঈশ্বর বাক্য-মনের অতীত তিনি ভক্তের কলঙ্কহীন শুদ্ধবুদ্ধির গোচর হন।

২৪০.
কাজ কর্মের ভিতরেই অবসর মতো সুযোগ পেলে জপ ধ্যান করবে। চিত্ত একাগ্র করে গভীর ধ্যানের নিমগ্নতায় মনকে বিলয় করবে। চিত্ত চঞ্চল হলে বিচলিত না হয়ে একাগ্রচিত্তে আকুল হয়ে ইষ্টমন্ত্র জপ করবে। ক্রমশ অভ্যাসে মন সহজেই বশে আসবে।

২৪১.
বর্তমান শুধু অতীতের ছায়ামাত্রই নয়, ভবিষ্যতেরও বীজ। আর সেকারণেই বর্তমানটি এত মূল্যবান। যেমন করবে, তেমন ফলবে। বর্তমানকে অবহেলা কোরো না, যথোচিত ব্যবহারে আন। বর্তশানের প্রতিটি পল সুন্দর হলে অনন্ত অবিষ্যতও সুন্দর হয়ে উঠবে।

২৪২.
যেখানে জ্ঞান ও শক্তি নেই, সেখানে প্রেম নেই। জ্ঞানবিহীন ব্যক্তির চিত্তে সংকীর্ণতা ও ক্ষুদ্রতা আসে। সেই সংকীর্ণ হৃদয়ে প্রেমের স্থান নাই। আর হৃদয়ে প্রেমানুভূতি জাগ্রত হলে সেবার ভাব বিকশিত হয়, তখন তার দ্বারা জগতের মঙ্গল ও কল্যাণ কর্ম হয়ে থাকে।

২৪৩.
যিনি প্রকৃতিকে জয় করেছেন তিনিই শক্তিমান। যিনি চিত্তকে সমাহিত করে ধ্যানের গভীরে ডুব দিয়ে রত্নরাজি আনতে পেরেছেন, তিনিই ধনী। স্ব-প্রকৃতিকে বশকরে বহি:প্রকৃতিকে বশীভূত করে যিনি জগতকে শিক্ষা দিচ্ছেন তিনিই যথার্থ সমাজনেতা ও সমাজশিক্ষক।

২৪৪.
যতদিন মানব-অন্তঃকরণে পূর্ণ আনন্দের স্ফুরণ না হইতেছে – যতদিন না সে অনাবিল ভূমানন্দ-সাগরে স্নান করিতেছে, ততদিন তাহার তৃপ্তি হইবে না। আর এই অতৃপ্ততার জন্যই তৃষ্ণার আবর্তনে বারংবার তাহাকে সংস্কার এবং ভাবানুযায়ী স্থূল শরীর ধারণ করিতে হইবে।

২৪৫.
অনুরাগের সঙ্গে বা আর্তি নিয়ে নাম জপ করতে করতেই চিত্ত কোমল হয়-তখনই চিত্ত দ্রবীভূত হয়। ভক্তির অঙ্কুর জন্মায়। আর গভীর ভক্তি বা প্রেমেতে অহংকার গলে যায়। ভক্ত সমাধিরূপ রাসে প্রবেশ করে। তাঁর প্রেমাস্বাদনে সমর্থ হয়। ভক্ত ও ভগবানের সমন্ধ হয় চিরস্থায়ী।

২৪৬.
ঈশ্বরের ওপর ভক্তিভাব আসে। ভক্তি প্রগাঢ় হলে প্রেম আসে। যেমন দুধকে জ্বাল দিয়ে ফোটালে ক্ষীর তৈরি হয়ে যায়, তেমনি ভক্তের প্রগাঢ় ভাব-ভক্তি থেকে জাত প্রেম দিয়েই ভগবানকে পাওয়া যায়। জ্ঞানী তো ভগবানকে কেবল জানতে পারে কিন্তু ভক্ত ভগবানকে আস্বাদন করে।

২৪৭.
ভগবান সামর্থ্য এবং শক্তিপ্রদান করেন শরণাগতভক্তকে। নিষ্ঠা এবং সমর্পণভাবে তাঁকে ডাকলে তাঁর সাড়া পাওয়া যায় এবং শ্রদ্ধা-ভক্তিযোগে তাঁকে প্রার্থনা করলে অন্তরে তাঁর স্পর্শ পাবে এবং যদি নিজেকে ভূলে একান্তভাবে তাঁকে প্রাণভরে ভালবাস তবে তাঁর দর্শন পাবে।

২৪৮.
মন্দিরে পুজো দেওয়া, মানত করা- এগুলোকে তপস্যা বলে। এখানে সংকল্প থাকছে। আর ভগবৎ আরাধনায় সংকল্প থাকে না। তোমার নিজস্ব কোন চাওয়া নেই, শুধু সেবা করছো সেবা-ভাব। সেবাকে আরাধনা বলে। সেবায় ঈশ্বর অধিক তুষ্ট হন।

২৪৯.
অসীম ধৈর্য, নিষ্ঠা ও একাগ্রতার দ্বারাই কি জাগতিক, কি আধ্যাত্মিক সকল ক্ষেত্রেই কৃতকার্য সম্ভব। অধৈর্যকারীদের জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে বহু দেরি হয়ে যায়। ধৈর্যটাই ভক্তদের কাছে সমর্পণ ও জ্ঞানীর ক্ষেত্রে ধীশক্তি। গভীর অর্ন্তমুখীনতাই হল সাধকের জীবনে চরম ব্যাকুলতা।

২৫০.
মানব অমৃতের সন্তান। মানবের জেগে ওঠাকে ঘিরেই ধর্ম, যা মানবের স্বভাবকে ধরে রাখে আর যাকে আশ্রয় করে মানব জেগে ওঠে মনুষ্যত্বের মহিমায়। মানবজীবনের সাধনা হল এই জীবনরূপ আধারকে সাধনার দ্বারা পরিশুদ্ধ ও স্বচ্ছ করে তোলা এবং সুপ্ত পরমেশ্বরবোধকে জাগ্রত করা।

২৫১.
প্রতিটি মানবের আপন প্রকৃতিগত সংস্কার বা স্বভাব বিদ্যমান। মানবের ঐ স্বভাবই হল মানবের বৈশিষ্ট্য। ঐ স্বভাব বা বৈশিষ্ট্য মানবের বৈশিষ্ট্য মানবের পূর্ব হতেই সহজতাক্রমে তার প্রকৃতিতে বিদ্যমান থাকে। স্বভাব-নির্দিষ্ট কর্মের দ্বারা ঐ বৈশিষ্ট্যকে রক্ষা করে তার বিকাশ হল সাধনা।

২৫২.
বৈচিত্র্য নাশ করে একত্ব আনা যাবে না। বৈচিত্র্যই প্রকৃতির প্ল্যান। তাঁর ইচ্ছাতেই এমন হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়েই তাঁর অনন্ত রূপ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ইচ্ছার বিরোধ করে যারা একত্ম আনতে চেয়েছে, তারা একদিকে যেমন সফলও হয়নি অন্যদিকে কল্যাণের বদলে সমাজের অকল্যাণই করেছে।

২৫৩.
(সব যুগেই হয়েছে অবতার পুরুষের নির্যাতন)
বাবা, একদঙ্গল কাকের মধ্যে একটা রাজহংস এলে ঠুকরে ঠুকরে তার দুর্দশা ঘটিয়ে দেয়। মানুষের মাঝে যখন অবতার আসেন তখন তাঁরও ঐরকম দুর্দশা ঘঠে। এখানে থাকা দায়। কেনই বা থাকা? -থাকা শুধু ভালোবাসার জন্য, টু লাভ এন্ড নট টু সিক লাভ।

২৫৪.
সমস্তরকম ভেদাভেদ-সংকীর্ণ গোঁড়ামি ও কুৎসিত কুসংস্কার ছুঁড়ে ফেলে দাও। সমস্ত দ্বন্দ্ব-বিবাদ, বাদ-বিতণ্ডা ভুলে এসো সাম্যের গান গাই। এসো সাম্যের গান গাই। এসো হাতে হাত ধরে ভালোবাসার গান গাই। এসো হাতের বাঁশকে বানিয়ে নিই বাঁশি। এসো জীবনের গান গাই- এসো মিলনের গান গাই।

২৫৫.
কারুর দীর্ঘ জটা বা প্রলম্বিত দাড়ির অন্তরালে হয়ত একটা রাবণ রয়েছে, আর সাধারণ বস্ত্র এবং পঙ্গু দেহে কারুর হৃদয়ে হয়ত শ্রীরাম রয়েছেন। অতএব চেহারা বা পোশাকে কিছু যায় আসে না। ভগবান মন দেখেন। দেখ একসময় ব্রিটিশ অফিসারদের যা ইউনিফর্ম ছিল তা এখন ব্যান্ডপার্টির পোশাক হয়েছে।

২৫৬.
মানব জীবনের সংকীর্ণতা বা ক্ষুদ্রতার গণ্ডি হতে বিকশিত হতে পূর্ণতা লাভ করবার একমাত্র উপায় হল ধর্মপথ। ধর্মাচরণ হল জীবনের পূর্ণতা লাভের একটি কলা। তাই ধর্ম জীবনকে বাদ দিয়ে নয় এবং জীবনকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন নয়, জীবনকে আলিঙ্গন করে জীবনের মধ্যে দিয়েই ধর্মের সাক্ষাৎকার সম্ভব।

২৫৭.
ইর্ষা থেকে আসে পরশ্রীকারতা, আর পরশ্রীকাতরতা থেকে আসে পরচর্চা বা পরনিন্দা। আমরা যখন কোন কিছু কটুক্তি করি বা নিন্দা করি- তার মূলে রয়েছে আমাদেরই দুর্বলতা বা অপূর্ণতা। কোন কিছুকে অশ্রদ্ধা করে বা কোন কিছুকে অশ্রদ্ধা করে বা কোন কিছুকে অবজ্ঞা করে বা সেটাকে না জেনে কিছু বলা-এটা বিকৃতি।

১৫৮.
অনন্তকাল ধরেও কেউ যদি যজ্ঞ, তপস্যা, সাধনা করে তাহলেও কিছু হবার নয়। যা চাই তা হোল প্রেম- প্রতিদান-প্রত্যাশারহিত প্রেম। দেখ, এই ধুপকাঠিটা সুগন্ধ ছড়িয়ে দিতে দিতে নিজে কেমন নি:শেষে জ্বলে গেছে। ও কি কিছু প্রত্যাশা করেছে? -না। ঠিক এমনি, প্রেম কখনো দেনা-পাওনার হিসাব কষে না। প্রেম দিব্য।

২৫৯.
যে সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে সে সর্বদাই আলো দেখে। ঠিক সেরকম যে ব্যক্তি সূর্য স্বরূপ ঈশ্বরের দিকে মুখ করে থাকে তার নিকট সবসময়ই আলোরূপ আনন্দই আনন্দ। যে সূর্যের দিকে পিছন ফিরে থাকে সে শুধু দেখতে পায় ছায়া বা দু:খ, তার দু:খই দু:খ। আর সূর্য যার মাথার উপরে থাকে তার ছায়া বা দু:খ দর্শন হয়ই না।

২৬০.
প্রেমের আবির্ভাব ঘটবে প্রেমময় পরমেশ্বরের উপাসনায়। প্রেমের প্রকাশ হলে অবিদ্যা ও অজ্ঞানতা দূর হয়ে দিব্য পরমতত্ত্ব বোধ হবে। মানবের অবিদ্যা নাশ হলে তত্ত্ববোধ আর প্রেমের আবির্ভাব ঘটলে অবিদ্যা নাশ হয়। প্রেমের আবির্ভাব ঘটাতে হলে হৃদয়ের বিশালতা চাই, তাই সংকীর্ণতা কাটিয়ে হৃদয়কে বিশালতার স্পর্শ পেতে হবে।

২৬১.
মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি হল ঈশ্বরলাভ তথা আত্মজ্ঞান প্রাপ্ত হওয়া। ইষ্ট বা ঈশ্বরকে ডাকতে ডাকতে যদি অন্তর কেঁদে ওঠে, তাঁর বিরহে অশ্রুপাত হতে থাকে, তাহলে ঈশ্বরের বা আন্তরের অন্তর্যামীর দরজায় নাড়া পড়বেই পড়বে। তাই অন্তর দিয়ে সাধনা করে যাও, প্রযত্ন করতে থাকো যাতে তাঁর অভাবে অন্ত:করণ আকুল ব্যাকুল হয়ে ওঠে।

২৬২.
তোমরা সংসারে অনেক জ্বালা যন্ত্রণা পেলেও অজ্ঞানতা বা সাংসারাসক্তিবশত সংসারেই ডুবে যাচ্ছ। পতঙ্গ যখন আগুনে ঝাঁপ দেয়, তখন সে বোঝে না যে, সেটা আগুন। ভাবে লোভনীয় কিছু জিনিস। তারপর ঝাঁপ দিতেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তাই সংসারের মানুষ অহং-এর বশে আসক্তি চরিতার্থে সংসারের বিষয়ানলকে না জেনে তাতে ঝাঁপ দেয়।

২৬৩.
ধ্যানে সচেতন মন শক্তিশালী হয়। অবচেতন মনে খারাপ কিছু (ভাবনা) আসলে সচেতন মন তাকে দমন করে দেয়। বারবার অবদমিত হয়ে অমন ভাবনা গুমরে গুমরে মরে যায়। অবচেতন মন স্বপ্নের মধ্যে অবদমিত ইচ্ছা চরিতার্থ করে নেয়। শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধের ভোগ যোগীদেরও হয়। ও ধরণের ইচ্ছাগুলি এর ফলে যায়। এতে দোষ হয় না। খ্রীস্টানদের শয়তান, বৌদ্ধদের মার, হিন্দুর অপ্সরারা প্রকৃতপক্ষে এই অবদমিত ইচ্ছার খেলা।

২৬৪.
মানবশরীর হচ্ছে পৃথিবীগ্রহের সবচেয়ে উন্নত শরীর। ফলে যে কোন পরিকাঠামো সেই অনুযায়ী হলে সমাজের মঙ্গল হবে বা তার উৎকর্ষতা হবে। মহাপ্রকৃতির নিয়মেও এটা রয়েছে। বর্তশানে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, এই মহাবিশ্বের সকল নক্ষত্রমণ্ডলী, নীহারিকাপুঞ্জকে কোন বিরাট চক্ষু দিয়ে দেখলে যেন মনে হয়, এক বিরাট পুরুষ শুয়ে রয়েছে। হয়তো পুরাণে বিষ্ণুর অনন্ত শয্যার শয়ন টোটেম, এছাড়া কালপুরুষের কল্পনাও হয়তো এখান থেকেই এসেছিল।

২৬৫.
স্বার্থভাবনা বিসর্জন দিয়ে সমষ্টির কল্যাণে আত্ম-নিয়োগ কর। কারণ প্রত্যেককে আপন আপন কর্মের জন্য দায়ী হতে হবে। একের দুষ্কর্ম বা অপরাধের ফল অন্য কেউ ভোগ করবে না বা অন্যে দায়ী হবে না। প্রত্যেকে আপন আপন কর্মানুসারে ফলভোগ করে থাকে। এই জন্য বিড়ম্বনা না করে এবং লোক দেখানো কর্ম না কর পরমেশ্বরে বুদ্ধি স্থির করে সৎকর্ম এবং ধম-সংগত কর্মে আত্মনিয়োগ কর। কারণ সকলের কল্যাণের সঙ্গে তোমাদের কল্যাণও নিহিত আছে।

২৬৬.
হরি কে? -যিনি চিত্ত হরণ করেন।
কৃষ্ণ কে? -যিনি চিত্ত কর্ষণ করেন।
রাম কে? -যিনি চেত্তে রমণ করেন।
ঊর্ণনাভ যেমন নিজের ভিতর থেকে লালা বের করে জাল বুনে তাতে রমণ করে আবার শেষে নিজের মধ্যেই হরণ করে নেয় তেমনি সৃষ্টি, স্থিতি, লয়।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!