শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেব

শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : চার

অশান্তির নিদান

পুপুন্ কী আশ্রমের পার্শ্ববর্ত্তী একটী পল্লীতে গ্রাম-

বাসিগণের মধ্যে ঘোরতর অনৈক্যের সম্ভাবনা দেখিয়া সকল বিরোধিতার অবসান কাটাইয়া শান্তি স্থাপনার্থে-শ্রীশ্রীবাবামণি সেই গ্রামে গিয়াছিলেন। বিরোধী পক্ষদ্বয়ের সম্পূর্ণ তুষ্টি বিধান করিয়া শ্রীশ্রীবাবামণি কলহ নিবাইয়া আশ্রমে বেলা দুই ঘটিকার সময়ে ফিরিয়াছেন।

আশ্রমের জনৈক ব্রহ্মচারী জিজ্ঞাসা করলেন,- কলহের কারণ কি?

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

কারণ কিছুই নূতন নয়। জগতে সকল দেশে সকল কালে যে কারণে মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে, দেশে দেশে কলহ হয়েছে, এক্ষেত্রেও তাই। জিহ্বা এবং উপস্থ, মানুষের দুর্নিবার লোভ এবং লালসা, এই হচ্ছে কলহের কারণ। যা’ খেলে আমার চলে, যা’ পেলে আমার পুষিয়ে যায়, তাই খেয়ে আর তাই পেয়ে আমি তুষ্ট নই, তাই অপরের প্রাপ্যের উপরে অবৈধ অধিকার স্থাপনের চেষ্টা করি,-এই থেকেই দুনিয়ার যত অশান্তির সৃষ্টি।

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

জগতে শান্তি যদি চাও, তা’ হ’লে লোভ আর লালসাকে দমন কর, নিজের সুখের দাবীর কালে পরের সুখের দাবীটাও চিন্তা কর, দশজনের সুখদুঃখের পানে তাকিয়ে নিজের সুখদুঃখের অনুভূতি কিছু কমাও,-জগতে এইটীই হচ্ছে সর্ব্বজনীন এবং চিরস্থায়ী শান্তির পথ।

অখণ্ড-সংহিতা ত্রয়োদশ খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ২০৭ – ২০৮)

পশুত্ব পরিহার করিতে হইবে

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-আমাদের বর্ত্তমান চরিত্র যদি পর্য্যালোচনা করি, তবে দেখতে পাব যে, আমরা মানুষ-রূপে ভূমণ্ডল জুড়ে অবাধে বিচরণ ক’রে বেড়ালেও স্বভাবে আমরা অনেকেই জন্তু-জানোয়ার। আমাদের অধিকাংশেরই রুচি-প্রকৃতি পশুর মতন।

আমরা স্বার্থপর, আমরা পরশ্রীকাতর, দুর্ব্বার ইন্দ্রিয়-তাড়নার আমরা ক্রীড়নক। ক্ষণিক সুখের লোভে আমরা শাশ্বত-সুখকে তুচ্ছ করতে সর্ব্বদা প্রস্তুত।

আমরা পর পীড়ক, হিংস্র এবং অপরিণাম-দর্শী। জন্মমাত্রই প্রতিটী মানুষ পশুবৎ থাকে, সমাজের কড়া শাসনের ফলে, লোকপ্রথার কল্যাণে কতকটা পশুভাব ঢেকে রেখে চলার অভ্যাস ক্রমশঃ আমাদের হ’য়ে যায়, কিন্তু যখন আমরা নির্জ্জনে একান্তে বাস করি, লোকচক্ষু যখন আমাদিগকে পাহারা দেয় না,

কোনো কিছু ক’রে বসলে কেউ টের পাবে না, এই আশ্বাস যখন পাই, তখন আমরা অবাধে যে-কোনো অসৎ কাজ করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হই না। এটা ত মনুষ্যত্বের ভাণ, প্রকৃত মনুষ্যত্ব নয়। যখন নির্জ্জনেও আমার বৈরাগ্য নষ্ট হবে না, যখন লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকেও আমি প্রলোভনে বিমূঢ় হব না, তখন বলা চলবে আমি মানুষ।

মানুষ হওয়ার মানেই হচ্ছে চরিত্রবান্ হওয়া। মানুষ হওয়ার মানেই হচ্ছে আত্মজয়ী হওয়া। যে নিজেকে নিয়ত পরমেশ্বরের ভিতরে দেখতে পায়, যে পরমেশ্বরকে নিয়ত নিজের ভিতরে দেখতে পায়, একমাত্র সে-ই এমন দুর্জ্জেয় মনুষ্যত্বের প্রমাণ দেখাতে পারে।

আমাদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ সাধ্যমত মনুষ্যত্বে প্রতিষ্ঠিত হ’তে হবে। আদিকাল থেকে মানুষ এই চেষ্টা ক’রে এসেছে এবং অনন্ত কাল পর্য্যন্ত মানুষ এই চেষ্টা ক’রে যাবে। আত্মোন্নতির অফুরন্ত চেষ্টা মনুষ্যত্বের বাহ্য রূপ। অনুক্ষণ ইশ্বরত্বে প্রতিষ্ঠিত থাকা মনুষ্যত্বের আভ্যন্তর রূপ।

ভিতরে ও বাইরে, প্রত্যক্ষে ও পরোক্ষে, মুখ্যতঃ ও গৌণতঃ আমরা পশুত্ব পরিহার ক’রে পূর্ণ মনুষ্যত্বে প্রতিষ্ঠিত হব, এটাই হোক আমাদের প্রতিজনের সাধনা।

অখণ্ড-সংহিতা ত্রয়োবিংশ খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ২৯৯ – ৩০০)

শান্তির পথ

হুগলী গোন্দলপাড়া-নিবাসী জনৈক পত্রলেখককে শ্রীশ্রীবাবামণি লিখিলেন,-

ভগবানের পরমপবিত্র নামে মনকে সুনিবিষ্ট রাখ। শত সহস্র কাজের ঝঞ্ঝাটের মধ্যেও ইহাই তোমার শ্রেষ্ঠ কর্ত্তব্য বলিয়া পরিগণিত হউক। নামের শক্তিতে জগতের সকল ক্লেশ সকল দুঃখ দূরীভূত হইবে। নামে নির্ভরই শান্তির পথ।

অখণ্ড-সংহিতা ত্রয়োদশ খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ২০৮)

ধর্ম্মই ভারতের জাতীয় প্রতিভা

অদ্যকার বক্তৃতায় শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-এক এক বাগানে এক এক রকমের ফুল ফোটে ভাল। পাথুরে-কাঁকুরে মাটিতে এক রকমের ফুল ভাল ফোটে, বেলে মাটিতে আর এক রকমের ফুল ভাল ফোটে, আঠালো মাটিতে আবার আর এক রকমের ফুল ভাল ফোটে।

যে বাগানের মাটিতে পাথর, কাঁকর, বালি, এঠেল মাটির অংশ সবই আছে, সে বাগানে সব রকমের ফুল ফোটে ভাল। ভারতবর্ষের অবস্থা ঠিক্ তাই। এদেশের মাটিতে সব দেশের সব ধর্ম্মমত সমান সৌন্দর্য্যে ফুটেছে, এটা একটা আশ্চর্য্য ব্যাপার।

এ ব্যাপার সম্ভব হ’ল কি ক’রে? এ ব্যাপার সম্ভব হ’ল এই জন্য যে, ভারতের ঋষিরা সুদূর অতীতে ধ্যানদৃষ্টিতে দেখেছিলেন, জেনেছিলেন, বুঝেছিলেন যে, সর্ব্বধর্ম্মই একস্থানে তোমাকে পৌছে দেবে, কোনো ধর্ম্মই কোনো ধর্ম্ম থেকে নিকৃষ্ট নয়, সকলের ধর্ম্মের নিরূপিত ঈশ্বরই প্রকৃত প্রস্তাবে একজন ঈশ্বর।

তাঁরা দেখেছিলেন যে, সর্ব্বভূতে ব্রহ্ম বিরাজমান। সুতরাং যে যেই প্রতীক নিয়ে, যে যেই প্রণালী নিয়ে উপাসনা করুক, ভগবানকেই শেষ পর্য্যন্ত পাবে, সুতরাং কারো সঙ্গে কারো বিরোধের প্রয়োজন নেই। মোজেসের ধর্ম্ম আবিষ্কারেরও আগে, বুদ্ধের ধর্ম্ম আবিষ্কারেরও আগে, মহম্মদের ধর্ম্ম আবিষ্কারেরও আগে তাঁরা জেনেছিলেন, সব নদী সমুদ্রে যায়, সব জীব একই ব্রহ্মে পৌছে।

এই জ্ঞানটুকু ভারতের মৃত্তিকাকে সহনশীল ও সহাবস্থানপরায়ণ ক’রে নিয়েছে। তাই ধর্ম্মকে ভারতের জাতীয় প্রতিভা ব’লে বর্ণনা করা চলে। ভারতের ধর্ম্মবোধ যাতে জগতের সকল সদ্ধর্ম্ম-সাধনা ও ধর্ম্মবোধের সঙ্গে মৈত্রীভাব পোষণ ক’রে ক্রমবর্দ্ধিত হ’তে পারে, তার তত্ত্বানুশীলনের জন্যই ভারতে লক্ষ লক্ষ দেবমন্দিরের স্থাপন, একথা আমরা যেন না ভুলি।

অখণ্ড-সংহিতা ত্রয়োবিংশ খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ২৯৪ – ২৯৫)

সাধনের ফলে সত্যোপলব্ধি

দুইটী যুবকের দীক্ষা হইল। দীক্ষান্তে শ্রীশ্রীবাবামণি তাহাদিগকে উপদেশ দিলেন,-নামকে জান্ বে শ্রীভগবানের ধ্বনিময়ী মূর্ত্তি। তাই নাম আর তিনি অভেদ। অবিরাম নাম কত্তে কত্তে নাম আর নামীর ভেদ-বোধ দূর হয়ে যায়, তখন নামকে ব্রহ্মময় ব’লে এবং ব্রহ্মকে নামময় ব’লে উপলব্ধি আসে। অনুক্ষণ সাধন কর, আর সাধনের ফলে সত্যকে উপলব্ধি ক’রে কৃতার্থ হও।

উচ্চারিত নাম নিগূঢ় নামের দূর প্রতিধ্বনি মাত্র

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

ভগবানের নিগূঢ় নাম এক অতি আশ্চর্য্য বস্তু। ভাষা এর প্রতিনিধিত্ব কত্তে পারে না। কিন্তু বস্তুর সূক্ষ্ম গুণাংশকে (intelligent part) যেমন স্থূলভাবে ধ’রে রোগীতে প্রয়োগ অসম্ভব ব’লে স্থূলগ্রাহ্য স্পিরিট দিয়ে অতিসূক্ষ্ম গুণাংশকে ধরা হয়, ঠিক তেমনি নামের নিগূঢ় সূক্ষ্ম নাদকে বীজমন্ত্রের স্পিরিট দিয়ে মানব-রসনায় উচ্চার্য্য করা হয়।

কিন্তু উচ্চারিত সে নাম আসল নামের ঠিক ঠিক প্রত্যক্ষ প্রতিধ্বনিও নয়! পরোক্ষ ও দূর প্রতিধ্বনি বললে বলা যেতে পারে। তাই, সেই আসল নামটী শুন্- বার জন্য এই উচ্চারিত নামটীই নিবিড় নিবিষ্টতা নিয়ে অবিরাম জপ কত্তে হয়। জপ কত্তে কত্তে সেই অনাহত নাদ আপনি শুন্ তে পাওয়া যায়।

স্বতঃ-উচ্চারিত সুনিগূঢ় নাম

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-সেই সুনিগূঢ় নাম জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে অবিরাম ধ্বনিত হচ্ছে। জড় কর্ণে তা শোনা যায় না। তাই প্রয়োজন, অন্তরের শ্রবণ-শক্তিকে প্রস্ফুটিত ক’রে তোলা। মুখোচ্চারিত নাম ভক্তিভরে শ্রদ্ধাভরে প্রেমভরে জ’পে যাও। ভিতরের কাণ খুলে যাবে।

সাধন কর, তারপরে কাণ পেতে শোন, প্রত্যেক অণুপরমাণুতে কেমন ক’রে ঐক্যতানে অমৃতময় নামের সুমধুর ঝঙ্কার উঠ্ ছে। কোটি কোটি গ্রহতারা অনন্ত গগনে বিচরণ ক’রে বেড়াচ্ছে প্রাণের আনন্দে নামের মূর্চ্ছনা তু’লে। পুত্র মোর, সেই নামে ডোব, সেই নামে মজ, জীবন সার্থক কর, আমাকে কৃতার্থ কর।

অখণ্ড-সংহিতা সপ্তম খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ২৫৬ – ২৫৭)

শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : পাঁচ>>

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

……………….
আরও পড়ুন-
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : এক
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : দুই
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : তিন
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : চার
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : পাঁচ
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : ছয়
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : সাত
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : আট
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : নয়
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : দশ
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : এগারো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : বারো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : তেরো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : চোদ্দ
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : পনেরো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : ষোল
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : সতেরো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : আঠারো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : উনিশ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!