শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেব

শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : আট

দীক্ষার পরেও সাধন চাই

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

দীক্ষা লইয়াই সকল কর্ত্তব্য শেষ হইয়া গেল বলিয়া কেহ মনে না করেন, দীক্ষা লাভের পরে সমগ্র জীবন যেন গভীর সাধনে নিমগ্ন থাকেন। এই প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীবাবামণি আরও বলিলেন,-তোমরা যারা দীক্ষা পেয়েছ, তারা ভাগ্যবান।

কেননা, এতদিন পথ-নির্দ্দেশহীন লক্ষ্যহীন পথিকের মত তালে বেতালে এদিক থেকে সেদিক আর সেদিক থেকে এদিক ঘু’রে বেড়াচ্ছিলে। কিন্তু আজ পথ পেয়েছ, তখন লক্ষ্য-হীনতার দুর্ভাগ্য তোমাদের পরিত্যাগ করল। কিন্তু নিজেরা দীক্ষা পাওয়ার পরে তোমাদের প্রথম এবং প্রধান কর্ত্তব্য হবে, দীক্ষানুযায়ী সাধন করা, দলে দলে লোককে ডেকে গুরু-ভ্রাতা বা গুরুভগ্নীতে পরিণত করা নয়।

তোমাদের দল আপনি বাড়বে, এজন্য কোনও ক্যানভ্যাসিং এর প্রয়োজন হবে না। দিকে দিকে লক্ষ লক্ষ নরনারীর প্রাণে অখণ্ড-সাধন গ্রহণ করার জন্য তীব্র ব্যাকুলতার সৃষ্টি হবে, তার জন্য তোমাদের বা আমার কোনও প্রচার-কার্য্যের আবশ্যকতা নেই।

এস নিজেরা নিজ নিজ ইষ্টনামে একান্তভাবে আত্মসমর্পণ করি। আমাদের আত্ম-সমর্পণের পূর্ণতাই পরিপূর্ণ জগৎকে আমাদের দিকে টেনে আনবে। ভগবদিচ্ছায় আমি কর্ম্মত্যাগী সন্ন্যাসী নই। অফুরন্ত বহিঃকর্ম্মের মধ্য দিয়ে আমার জীবন-যাপন, আমার তপঃসাধন।

তাই, আধ্যাত্মিকতাবাদী সজ্জনেরা অনেকে আমাকে বুঝ্ তেই পারেন না। অন্যে ত’ দূরের কথা, আমার কয়জন সঙ্গীই আমাকে বুঝ্ তে পেরেছে? কিন্তু একথা জেনো, অখণ্ড-মন্ত্রের প্রতি আমার যে কুণ্ঠাহীন আনুগত্য, তাই আমার নিকটে নিখিল জগৎকে টেনে আন্ বে। অন্য কোনও কৌশলের প্রয়োজন হবে না।

শান্তির বারতা দ্বিতীয় খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ৪৫ – ৪৭)

ভগবান্ স্ত্রীত্ব-পুংস্ত্ব-রহিত

অপরাহ্ণে শ্রীশ্রীবাবামণি কালীঘাটে গঙ্গাতীরে বাঁধান সোপান-শ্রেণীর উপরে উপবেশন করিয়া আছেন। কতিপয় জিজ্ঞাসু ব্যক্তি শ্রীশ্রীবাবামণির উপদেশ শ্রবণের জন্য বসিয়া আছেন।

একজনের প্রশ্নের উত্তরে শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

ভগবান্ স্ত্রীত্ব ও পুংস্ত্বের অতীত এক অনির্ব্বচনীয় সত্তা, তবে তোমরা যে কেউ তাঁকে মা ব’লে ডাকো, কেউ বা বাবা ব’লে ডাকো, তার কারণ এই যে, এই জগতের সাধারণ সম্বন্ধগুলির তুলনায় জীবাত্মা তাঁর সঙ্গে নিজের সম্বন্ধকে খুঁজে বে’র কত্তে চায়। দয়িত-ভাবে যে তাঁর উপাসনা, তাও এই অনর্থ জগতের কান্ত-কান্তা ভাবের তুলনাতেই।

এই জগতে কেউ যদি কারো পুত্র বা পিতা না থাক্ ত, কেউ যদি কারো মাতা বা কন্যা না থাক্ ত, কেউ যদি কারো কান্ত বা কান্তা না থাক্ ত, কেউ যদি কারো প্রভু বা সেবক না থাক্ ত, তাহ’লে ভগবানের সঙ্গে নিজের সম্বন্ধ অন্বেষণের কালে পিতা ব’লে প্রভু ব’লে বা হৃদয়নাথ ব’লে সম্বোধন কেউ কত্ত না।

এই জগৎ অনিত্য হ’লেও নিত্য জগতের ছায়া অবলম্বনেই রচিত। এই জন্যই ভগবানের সঙ্গে যে তোমার নিত্যসম্বন্ধ, সেই সম্বন্ধের ছায়া এসে এই জগতের সকল সম্বন্ধীর সাথে সম্বন্ধের বেলায় প্রতিফলিত হ’য়েছে। তবে, সাধারণ ছায়াতে তফাৎ এইটুকু যে, কায়াতেই স্ত্রীত্ব-পুংস্ত্ব প্রভৃতি থাকে,

ছায়াতে স্ত্রীত্ব-পুংস্ত্ব কিছুই থাকে না কিন্তু নিত্যকায়া পরমেশ্বরের অনিত্য ছায়া এই জগৎ-ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য এই যে, এ স্থলে কায়াতে স্ত্রীত্ব-পুংস্ত্ব কিছুই নেই, অথচ ছায়ায় দেখ কতজন স্ত্রী কত জন বা পুরুষ সেজে বিচরণ কচ্ছে।

জীবের স্ত্রীত্ব এবং পুংস্ত্বের উপরে এই পার্থিব জগতের সৃষ্টি-প্রসার নির্ভর কচ্ছে, এই জন্যই এখানে কেউ স্ত্রী হবেন, কেউ পুরুষ হবেন, এজন্যই এখানে স্ত্রীত্ব আর পুংস্ত্ব জীবের পক্ষে অপরিহার্য্য। কিন্তু পরমেশ্বর স্বকীয় সৃষ্টি-প্রসারের জন্য পুংস্ত্ব-স্ত্রীত্বের অপেক্ষা রাখেন না,

তাঁর ইচ্ছাই সৃষ্টির বিকাশ বা উপশমের পক্ষে যথেষ্ট, এইজন্য তিনি সর্ব্বদা সর্ব্বাবস্থায় লিঙ্গাতীত। তাঁকে তুমি মা ব’লে ডাক্ লেও তিনি স্ত্রীচিহ্নবিশিষ্ট নন, তাঁকে তুমি বাবা ব’লে ডাকলেও তিনি পুংচিহ্নবিশিষ্ট নন, এই একটা কথায় খেয়াল রেখে তাঁকে ভালবাসলে, ধর্ম্মের ভিতরে পঙ্কিলতা প্রবেশ কত্তে পারে না।

অখণ্ড-সংহিতা ত্রয়োদশ খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ১০৫ – ১০৬)

অবিশ্বাসীর সঙ্গ-ব‍র্জ্জন

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

কিন্তু অপরকে ভগবদ্-বিশ্বাসী কত্তে হ’লে নিজেরও ভগবদ্-বিশ্বাসী হ’তে হয়। যে নিজে অবিশ্বাসী,সে অপরের অন্তরে বিশ্বাস সঞ্চারিত কত্তে পারে না। কিন্তু তুমি নিজে যে ভগবদ্-বিশ্বাসী হবে, তার জন্য তোমাকে কিছু কাঠ-খড় পুড়াতে হবে।

অবিশ্বাসীর সঙ্গ তোমাকে বর্জ্জন কত্তে হবে। জগতে নিজের ক্ষতিজনক যত প্রকার কাজ আছে, তার মধ্যে অবিশ্বাসীর সঙ্গ করা, অবিশ্বাসীর সাথে ঘনিষ্ঠতা রক্ষা করা, অবিশ্বাসী ব্যক্তিকে নিজের সাথে বারংবার মিশ্ বার সুযোগ দেওয়া বোধ হয় সব চেয়ে মারাত্মক।

যাকে জেনেছ ভগবানে অবিশ্বাসী ব’লে, ইষ্টে অবিশ্বাসী ব’লে, বিষধর ভুজঙ্গ জ্ঞানে তার সংসর্গ বর্জ্জন কর। তার সঙ্গে বাক্যালাপে আয়ুঃক্ষয় হয়, তার সঙ্গে পত্রালাপ পাপ-সঞ্চয় হয়। তার মূর্ত্তি দেখ্ লে বা ছবি দেখ্ লেও অন্তরে মালিন্য আসে।

তাকে এইরূপ বিপজ্জনক জ্ঞান ক’রে তার সংসর্গ থেকে, তার প্রভাবের আওতা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চল্ বে। তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণের প্রয়োজন নাই, কিন্তু তার সর্ব্বপ্রকার সংসর্গ পরিহার কর্ব্বে। নিষ্ঠাবান্ হিন্দু পরিবারে দেখ্ বে, কোনো কুলবধূ বাজারের গণিকার সাথে কথা বলে না।

ঈশ্বরে বিশ্বাসী ব্যক্তি সতী নারীর ন্যায় অবিশ্বাসী ব্যক্তিদের সঙ্গে বাক্যালাপও অনভিপ্রেত জ্ঞান করেন। অবশ্য, তুমি বলতে পার যে, তোমার মনের নিষ্ঠা, মনের বিশ্বাস মনেই ত’ সঙ্গোপনে রক্ষিত আছে, বিরুদ্ধ-পন্থীর সঙ্গে বাক্যালাপে আর কি ক্ষতি হবে?

অনেকেই এইরূপ ভেবে থাকে এবং পরে ক্ষতিগ্রস্তও হয়। সাধন-পথে যারা চলে, বিন্দুমাত্র অবিশ্বাস তাদের হাজার বছরের সাধন-ফল নষ্ট ক’রে দেয়। এই কথার ভিতরে অতিশয়োক্তি নেই, একথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। শেষে তাদের আবার ফিরে গোড়া থেকে সাধন সুরু কত্তে হয়।

অখণ্ড-সংহিতা চতুর্দ্দশ খণ্ড

শিষ্য হইলে কি কি করিতে হয়

অপর এক প্রশ্নকর্ত্তা প্রশ্ন করিলেন,-স্বামীজী, আমি আপনার শিষ্য হ’তে চাই। শিষ্য হ’তে হ’লে আমাকে কি কি কত্তে হবে, তা’ বলে দিন।

শ্রীশ্রীবাবামণি হাসিয়া বলিলেন,- হ’তে চাইলেই কি কেউ আমার শিষ্য হ’তে পারে?

জিজ্ঞাসু বলিলেন,- আপনার কৃপা হ’লে কি হ’তে পারে না?

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,- কিছু করলে তবেই কিছু পাওয়া যায়। কৃ মানে করা, পা মানে পাওয়া। কিছুই তুমি কর্ব্বে না আর আন্দাজে আমার কৃপা এসে যাবে?

শ্রীশ্রীবাবামণি কতক্ষণ নানা রকমের হাস্যকৌতুকের কথা বলিয়া তৎপরে গম্ভীর হইয়া বলিলেন,-শোন। আমি নিয়ত তোমার সঙ্গে আছি, তোমাকে ছেড়ে কখনো আমি দূরে যাই না।

নিদ্রায়, জাগরণে, কর্ম্মে, বিশ্রামে, উণ্থানে, পতনে, সর্ব্বদা, সর্ব্বাবস্থায় আমি তোমার সঙ্গে আছি, এই বিশ্বাসটী যদি তোমার নিত্য জাগ্রত থাকে, তবেই তুমি আমার শিষ্য হওয়ার বা শিষ্য থাকার যোগ্য। আমাকে তোমার ভিতরে আর তোমাকে আমার ভিতরে দর্শনের প্রয়াস আমার শিষ্যত্বের একটী প্রধান লক্ষণ।

আমাকে বিশ্বের ভিতরে সর্ব্বত্র এবং বিশ্বকে আমার ভিতরে সর্ব্বতোভাবে দর্শনের প্রয়াস আমার শিষ্যত্বের দ্বিতীয় লক্ষণ। তোমাতে, আমাতে আর কোটি ব্রহ্মাণ্ডে একত্ববোধ আর একত্রীভূত এই সবকিছুর সঙ্গে ব্রহ্মাণ্ড-পতির অভিন্নত্ব স্থাপন আমার শিষ্যত্বের তৃতীয় লক্ষণ। পারবে এত বড় দারুণ তত্ত্বকে হজম কত্তে?

যদি পার, তবে ত’ চমৎকার। যদি না পার, তখন কি হবে? গোলেমালে হরিবল ব’লে চিৎকার ক’রে ব’লে বসবে তুমি আমার শিষ্য? আমার শিষ্য হওয়া শক্ত ব্যাপার। আমারই শিষ্য হওয়ার সঙ্কল্প ছেড়ে দিয়ে বরং এই পণ কর যে, শিষ্য তুমি এই জগতে যারই হও না কেন, সকল সম্প্রদায়ের লোককে আপনার জন ব’লে জান্ বে, সকল মত ও পথের প্রতি নির্ব্বিদ্বেষ ও অনিন্দক থাক্ বে এবং গুরুদত্ত সাধন প্রাণপণ যত্নে ক’রে যাবে।

শিষ্যবৃদ্ধির আমার প্রয়োজন নেই, আমার প্রয়োজন শুধু ঐ টুকুর।

অখণ্ড-সংহিতা ঊনবিংশ খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ২৫৫ – ২৫৭)

শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : নয়>>

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

……………….
আরও পড়ুন-
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : এক
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : দুই
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : তিন
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : চার
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : পাঁচ
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : ছয়
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : সাত
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : আট
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : নয়
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : দশ
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : এগারো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : বারো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : তেরো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : চোদ্দ
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : পনেরো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : ষোল
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : সতেরো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : আঠারো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : উনিশ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!