শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেব

শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : নয়

অখণ্ডদের মধ্যে ভেদাভেদবুদ্ধি

দীক্ষান্তিক উপদেশে শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-তোমরা অখণ্ড, অর্থাৎ তোমরা নিখিল ভুবনের প্রত্যেকটী ছোটবড় নরনারীর সঙ্গে প্রেমের অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। জগতের একটী প্রাণীও তোমাদের পর নয়। এইটীই তোমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সত্য।

কিন্তু নিখিল-ভুবন-ব্যাপী এই প্রেমকে সত্যরূপে স্বীকার করার জন্য সর্ব্বাগ্রে তোমাদের ভিতরে চাই পরস্পরের মধ্যে পরিপূর্ণ সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। এক অখণ্ড অপর অখণ্ডকে কোনও দিক্ দিয়েই নিজের চাইতে নিকৃষ্ট জ্ঞান কর্ বে না।

চামারের ছেলে যদি অখণ্ড হয়, তবে সে ব্রাহ্মণের ছেলে অখণ্ডের নিকট সমান সম্মান, সমান মর্য্যাদা ও সমব্যবহারের অধিকারী হবে। এ অধিকার তার মুখে মুখেই স্বীকার কর্ল্লে চল্ বে না। কার্য্যতঃ তার প্রমাণ দিতে হবে।

এই কথাটী তোমরা সর্ব্বদা মনে রাখ্ বে। অখণ্ডদের মধ্যে ভেদাভেদবুদ্ধি নেই, ভেদবুদ্ধির বিমর্দ্দক অখণ্ডনাম তাদের মধ্যে পূর্ণ সাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে।

শান্তির বারতা প্রথম খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ৮ – ৯)

নিখিল জগৎ প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হউক

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

সর্ব্বপ্রকার ভেদ-বুদ্ধি বিস্মৃত হ’য়ে এস আজ আমরা ইষ্টের চরণে আত্মবলি দিতে প্রস্তুত হই। ভেদবুদ্ধির প্রাচীর নির্ম্মান ক’রে আমরা ভগবানের সাথে নিজেদের ব্যবধান রচনা ক’রে নিজেদেরও সর্ব্বনাশ করেছি, দেশ, জাতি এবং সমাজের সর্ব্বনাশ সাধন কচ্ছি।

হৃদয় থেকে সকল অনর্থমূল নীচতা পরিহার ক’রে এস আজ আমরা প্রেমকে সত্য ব’লে স্বীকার করি, প্রেমকে অমোঘ আশ্রয় ব’লে গ্রহণ করি। জগৎ থেকে কাটাকাটি মারামারি দূরীভূত হউক, নিখিল জগৎ ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হউক।

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

জগতে প্রেমই একমাত্র সত্য। ভক্তে ভগবানে প্রেম, মানুষে মানুষে প্রেম, জীবে জীবে প্রেম,- যেই প্রেম স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা সকলে এক বিশ্বপিতারই ভিন্ন ভিন্ন নামে, ভিন্ন ভিন্ন গোত্রে, ভিন্ন ভিন্ন জাতিতে পরিচিত সন্তান মাত্র। নাম, গোত্র, জাতির পার্থক্যে স্বরূপের পার্থক্য হয় না।

আমরা সকলেই যে সেই একই প্রেমময় পরমপুরুষের এক কণা প্রেমের ভিখারী, এই সত্যই জগতের সেরা সত্য। এর সঙ্গে যে তত্ত্বের বিরোধ, সে অসত্য। এর সঙ্গে যে মতবাদের কলহ, তা মিথ্যা। ভগবৎ-প্রেমই জগতে পরিপূর্ণ সত্য এবং জগতের যত জনের প্রেম, সবই এই ভগবৎ-প্রেম থেকেই উদ্ভূত ব’লে তাও সত্য।

এস আজ প্রেম-ভাগীরথীর পবিত্র প্রবাহে পরস্পর পরস্পরের হাত ধ’রে ডুব দেবার জন্য নেমে যাই, এস আজ সহস্র যুগের পুঞ্জিত যাবতীয় চিত্ত-মালিন্য এবং বিদ্বেষের আবর্জ্জনা ঐ পবিত্র বারি-প্রবাহে ভাসিয়ে দেই, এস আজ মানুষ মাত্রকেই প্রাণের বন্ধু, প্রেমের ভাই ব’লে রোমাঞ্চিত কলেবরে আলিঙ্গন করি।

এস আজ সর্ব্ববিধ ভেদ-বিসম্বাদ বিদূরিত ক’রে দিয়ে এই দুঃখ-কোলাহলময় পৃথিবীতে, এই নিত্যদ্বন্দ্বপ্রপীড়িত ধরিত্রীর বুকে নিত্যশান্তি নিত্যসুখ প্রতিষ্ঠিত করি।

শান্তির বারতা দ্বিতীয় খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ৫১ – ৫২)

শান্তি লাভের উপায়

একজন প্রশ্ন করিল,- শান্তি লাভের উপায় কি?

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

অশান্তি অকারণে আসে না। সব অশান্তিই একটা না একটা কারণে ভর ক’রেই আসে। কারো অশান্তি আসে লোভের দরুণ। শান্তি লাভের জন্য তাকে লোভ জয় কত্তে হয়। কারো বা অশান্তি আসে ক্রোধের দরুণ। শান্তি লাভের জন্য তাকে অনুশীলন কত্তে হবে অক্রোধের।

কারো কারো বা জগতের প্রায় প্রত্যেকেরই অশান্তি আসে কামের পীড়নে। এই অবস্থায় কামকে জয় করাই হচ্ছে শান্তি লাভের পথ। কিন্তু ঈশ্বরে পরিপূর্ণ বিশ্বাসের অভাব এবং তাঁর চরণে অকপট আত্ম-সমর্পণের অক্ষমতাই সব অশান্তির আসল মূল।

এমতবস্থায় ঈশ্বরে বিশ্বাসকে দৃঢ় করার চেষ্টা করা এবং তাঁতে আত্মসমর্পণের সাধনা অবিরাম করে যেতে থাকাই শান্তি লাভের শ্রেষ্ঠ উপায়।

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

নিজের সসীম ক্ষমতাকে নগণ্য জ্ঞান ক’রে নিজেকে নিঃস্ব অনাথ জেনে ভগবানের নামাশ্রয় নিলে আপনা আপনি আত্মসমর্পণ আসে। ভগবানকে পরমপ্রেমময় এবং প্রাণপ্রিয়তম জেনে তাঁর নাম লক্ষ লক্ষ বার স্মরণ কত্তে থাক্ লে বিনা চেষ্টায় তাঁতে আত্মসমর্পণ আসে। আত্মসমর্পণ এল ত’ তোমার সকল শঙ্কা, আতঙ্ক, বিভীষিকা চিরতরে দূর হ’য়ে গেল জান্ বে।

অখণ্ড-সংহিতা একবিংশ খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ২০২ – ২০৩)

সকলকে লইয়া ঈশ্বর-দর্শন

সন্ধ্যা সাত ঘটিকার সময়ে সমবেত উপাসনা হইল। উপাসনান্তে শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-সমবেত উপাসনা কেবল তোমার আত্মার অফুরন্ত পিপাসারই পরিতৃপ্তির জন্য নয়, নিখিল বিশ্বের নিখিল প্রাণি-সমাজের প্রত্যেকের সাথে তোমার প্রাণের অবিচ্ছেদ্য মিলন বিধানের জন্য এবং

সকলকে নিয়ে এক মহানন্দে পরম-প্রেমস্বরূপ নিত্যসুখাকর শ্রীভগবানের চরণে আত্মসমর্পণের জন্য। একা একা তাঁকে পেয়ে প্রাণে আর কতটুকু সুখ, কতটুকু তৃপ্তি? আমরা তাঁকে পেতে চাই সকলকে নিয়ে, সকলের সাথে।

শ্রীশ্রীবাবামণি আরও বলিলেন,-

অবশ্য, ঈশ্বর-দর্শন ব্যাপারটা মোটেই আপেক্ষিক নয়। আর, আমার ঈশ্বর-দর্শন অপরের দর্শনের অপেক্ষায় দিন-মাস-বৎসর দেরী কত্তে পারে, তাও নয়। আসল কথাটা হচ্ছে এই যে, আমি যেমন এখনি ভগবানকে দেখ্ তে চাই, পেতে চাই, জান্ তে চাই, বুঝ্ তে চাই,

আমি যেমন একটী মূহূর্ত্তেরও জন্য বিলম্ব সহ্য না ক’রে এখনি তাঁর পাদপদ্মে আত্মসমর্পণ কত্তে চাই, ঠিক্ তেমনি সবাই তাঁকে এখনি দেখুক, এখনি জানুক, এখনি বুঝুক, এখনি পাউক, এখনি তাঁতে আত্মদান করুক, -এই প্রার্থনাটা আমার অনুক্ষণ মনোময়, প্রাণময়। এই হ’ল সমবেত উপাসনার প্রকৃত তত্ত্ব।

শান্তির বারতা দ্বিতীয় খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ২৯ -৩০)

ভগবদ্-ভক্তির বিঘ্ন

ঈশ্বরগঞ্জনিবাসী অপর একজন যুবকের প্রশ্নের উত্তরে শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-ভগবদ্-ভক্তি-লাভের বহু বিঘ্ন আছে। তন্মধ্যে প্রধান তিনটী। একটী হচ্ছে, ভক্তিহীন নাস্তিকদের সঙ্গ করা। আর একটী হচ্ছে, ভগবদ্ বিদ্বেষীর দান গ্রহণ করা। তৃতীয়টী হচ্ছে লোকের সঙ্গে বিতণ্ডা করা।

ভগবদ্ ভক্তির পরীক্ষা

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-ভগবদ্ ভক্তির পরীক্ষাও ত্রিবিধ। ভীতি, উত্তেজনা ও প্রলোভন। ভগবদ্ ভক্তির অপরাধে তোমাকে যদি ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলান হয়, তখনো তুমি নির্ভীক থাকতে পার কি না। এর চেয়েও কঠিনতর পরীক্ষা হ’ল, ভগবদ্ বিদ্বেষীরা যখন তোমার ধর্ম্মকার্য্যে অনিষ্ট সম্পাদনে ব্রতী হবে,

তখন তুমি আবশ্যকীয় আত্মরক্ষা কার্য্যেও চিত্তকে সর্ব্বপ্রকার উত্তেজনা, বিদ্বেষ ও পরানিষ্টবুদ্ধি থেকে মুক্ত রাখতে পার কি না। সর্ব্বশেষে হ’ল, চতুর্দ্দিকে যখন ধর্ম্মানুশীলনের সম্পূর্ণ অনুকূল অবস্থা, তখন অজ্ঞাতসারে যে সকল নিরর্থক আড়ম্বর ও বিলাসিতা ক্রমে ক্রমে নিজের আসন দৃঢ়প্রতিষ্ঠ কত্তে চেষ্টা করে, তাদের তুমি বর্জ্জন কত্তে পার কি না।

অখণ্ড-সংহিতা সপ্তম খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ২৪২ – ২৪৩)

উচ্চনীচের ভেদাভেদ অলীক

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

কেউ নিজেকে নীচ জাত বা ছোট জাত ব’লে ভেবে ভেবে মন-মরা হ’য়ে থেকো না। ভারতের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নীচ, উচ্চ, সকলের আত্ম-ত্যাগের ভিতর দিয়ে গঠিত হবে নীচ, ছোট, অন্ত্যজ ব’লে নিজেদিগকে ধিক্কার দিও না। সমাজের সর্ব্ববিধ সেবার ভিতর দিয়ে তোমরা উচ্চ ও মহৎ হবার চেষ্টা কর।

জগতে উচ্চ বা নীচ ব’লে করো কপালে মার্কা মারা থাকে না। নীচ কার্য্যের দ্বারাই মানুষ নীচ হয়, উচ্চ কার্য্যের দ্বারাই মানুষ উচ্চ হয়। জাতিভেদের বিচার, জন্মস্থানের বিচার প্রভৃতিকে তুচ্ছ ক’রে ভবিষ্যৎ ভারতে এক নবমহাবলীয়ান্ বীর্য্যবান্ জাতির আবির্ভাব অতি দ্রুতই অবশ্যম্ভাবী হয়েছে!

তোমরা সেই মহাঘটনায় নিজেদের পবিত্রতা ও ত্যাগ-শক্তির ভিতর দিয়ে সহযোগ প্রদান কর।

শান্তির বারতা দ্বিতীয় খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ৪৭)

শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : দশ>>

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

……………….
আরও পড়ুন-
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : এক
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : দুই
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : তিন
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : চার
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : পাঁচ
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : ছয়
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : সাত
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : আট
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : নয়
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : দশ
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : এগারো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : বারো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : তেরো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : চোদ্দ
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : পনেরো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : ষোল
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : সতেরো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : আঠারো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : উনিশ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!