শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেব

শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : তেরো

নিত্যপ্রভুর সহিত নিত্যসম্বন্ধ

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

তোমার সঙ্গে তোমার নিত্যপ্রভুর যে সম্বন্ধ, সদাপ্রভু পরমেশ্বরের চরণে তোমার যে সত্যিকার আত্মসমর্পণ, তার মধ্যে কোনো প্রকারে কোনো ফাঁক না ঢোকে, সর্ব্বান্তঃ-

করণে সেই দিকে মন দাও। খ্যাতি, কীর্ত্তি, প্রতিষ্ঠা ও যশ অনিত্য, কিন্তু তাঁর সঙ্গে তোমার সম্বন্ধ নিত্য, ক্ষয়হীন, অমর। সেই নিত্য-সম্বন্ধ-জ্ঞানকে নিজের ভিতরে জাগ্রত কর। এইখানেই মানব-জীবনের চরম সার্থকতা।

অখণ্ড-সংহিতা ত্রয়োদশ খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ১২০)

শিক্ষাগুরু কি শিখাইবেন

শ্রীশ্রীবাবামণি বলিলেন,-

শিক্ষাগুরু কি শিখাইবেন? নূতন একটা মন্ত্র? জেনো, ওটা একটা ধাপ্পাবাজী মাত্র। তোমাকে শিষ্য ক’রে হয় তাঁর অর্থ, নয় তাঁর লোকমান বৃদ্ধির সাহায্য হবে, তাই তিনি মন্ত্র দিয়ে তোমাকে ত্রাণ কত্তে চান। কিন্তু যে মন্ত্রটা তুমি আগেই পেয়েছ, তাতেই ত তোমার ত্রাণ হ’তে পারে!

আবার নূতন মন্ত্র কেন? কুমিল্লা থেকে চন্দ্রনাথ যাবার টিকিট তোমার হাতেই রয়েছে। আবার নূতন টিকিট দিয়ে কি হবে? একটা যাত্রীর কটা টিকিট লাগে?

প্রকৃতই শিক্ষাগুরু হ’য়ে যদি কেউ আসেন রে বাপ্, তিনি মন্ত্রের ঝুলি নিয়ে তোমার কাণে উজাড় কর্ব্বেন না, তাঁর জীবনের আচরণ দেখে তুমি তাঁর মত ইশ্বরানুরাগী হবে, প্রেমিক হবে, পবিত্র হবে, সদাচারী হবে, সত্যশীল হবে, জিতেন্দ্রিয় হবে, নিষ্ঠাবান্ হবে, আনন্দময় হবে। জগৎকে খোলা চোখে দেখ বাবা, চ’খ বুঝে অন্ধের মত চ’ল না।

অখণ্ড-সংহিতা ষষ্ঠ খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ৩৯৬)

জীবন অনিত্য কিন্তু তুচ্ছ নয়

অদ্য শ্রীশ্রী বাবামণি লক্ষীপুর হাইস্কুলে জীবন-গঠন সম্পর্কে একটী বক্তৃতা প্রদান করিলেন। উপসংহারে শ্রীশ্রী বাবামণি বলিলেন,-

জীবন যে অনিত্য, এই কথাটী সব সময়ে মনে রাখ্ বে। কিন্তু এই কথাও মনে রাখ্ তে হবে যে, এই অনিত্য জীবনকে এমন কাজে লাগাতে হবে,যেন নিত্য সুখের, নিত্য আনন্দের, নিত্য পরিতৃপ্তির সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়। নৌকায় চড়ে মানুষ নদীর এক পার থেকে অপর পারে যাবার জন্য।

জীবনকে নৌকার মত জ্ঞান করবে। অন্ধকারময় অজ্ঞানতা থেকে এই জীবনটুকুর সহায়তায় জ্যোতির্ম্ময় পরম জ্ঞানে পৌছুতে হবে। বিদ্বেষময় অপ্রেম থেকে এই জীবনটুকুর সহায়তায় মৈত্রী,করুণা ও মুদিতায় পরিপূর্ণ প্রেমের রাজ্যে পৌছুতে হবে।

অসত্যময় দুঃখজাল থেকে মুক্তি পেয়ে এই স্বল্পকাল-পরিমিত এবং ক্ষণভঙ্গুর জীবনটুকুর সহায়তায়ই সত্যময় সুখ-লোকে পৌছুতে হবে। জীবন অনিত্য কিন্তু তুচ্ছ নয়। অনিত্য ব’লেই এর উপরে ভরসা রাখা চলে না কিন্তু অনিত্য হ’লেও এর সদ্ব‍্যবহারের ফল সীমাহীন।

জীবনকে পরিপূর্ণ ভাবে যে কাজে আনে, সে অনিত্য জীবন দিয়েই নিত্যানন্দের অধিকারী হয়। জীবনের একটী দিন বা একটী ক্ষণকেও বৃথা চলে যেতে দিও না। প্রত্যেকটী দিনকে প্রত্যেকটী ক্ষণকে ঈশ্বরারাধনার মধ্য দিয়ে সার্থক কত্তে চেষ্টা কর।

অখণ্ড-সংহিতা চতুর্দ্দশ খণ্ড

সামঞ্জস্যের জীবন

ঢাকা নবাবপুর-নিবাসী অপর এক পত্রলেখকের পত্রের উত্তরে শ্রীশ্রীবাবামণি লিখিলেন,-

তোমাদের প্রত্যেকের কর্ম্মপথ জ্ঞানময়, তপঃপথ প্রেমময় এবং দেহমনপ্রাণের প্রত্যেকটী তরঙ্গ মঙ্গলময় হউক, নিয়ত এই আশীর্ব্বাদ করি। তোমাদের জীবন হউক সামঞ্জস্যের জীবন। কর্ম্মের সহিত জ্ঞান ও ভক্তি চিরকাল নাকি কলহই করিয়াছে।

তপস্যার সম্পর্কে প্রেম নাকি চিরকাল সংস্পর্শ বাঁচাইয়া চলিয়াছে। মানবের দেহমন-প্রাণের তরঙ্গগুলি চিরকাল নাকি অবিরাম অমঙ্গলই প্রসব করিয়াছে। আমি চাহি, তোমরা তোমাদের জীবনের পরমোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দিয়া মানব-মনের সেই কল্পনাকে অসত্য বলিয়া প্রমাণিত কর।

কর্ম্ম কর জ্ঞানী হইয়া, তপস্যা কর প্রেমী হইয়া, দেহমন-প্রাণের তরঙ্গগুলিকে সহস্র গুণ বড়াইয়া বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের দুরন্ত আক্রোশের মধ্য দিয়া আহরণ কর শুধু অবিমিশ্র মঙ্গল।

অখণ্ড-সংহিতা ষোড়শ খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ৮২ -৮৩)

নামামৃত

বহু জনকে শ্রীশ্রীবাবামণি কার্ড-যোগে পত্র লিখিলেন। প্রত্যেকটী পোষ্টকার্ডে একটী করিয়া উপদেশ-বানী বাংলা পয়ার ছন্দে কবিতায়। তন্মধ্যে কয়েকখানার সার নিম্নে উদ্ধৃত হইল।

(১)

জগতের যত বৃদ্ধি, যত বিবর্ত্তন,
সকলের মূলে আছে শুধু একজন।।

এক ছাড়া দুই নাই ব্রহ্মাণ্ড-মাঝারে,
একই জন নানা রূপ ধরে বারে বারে।।
ভাবিতে বিস্ময় লাগে, রহস্য অপার,
তাঁর মধুমাখা নাম কর সারৎসার।।

ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রুচি, সাধ, দেহ, প্রাণ, মন
তাঁর নামে কর নিত্য পূর্ণ সমর্পণ।।
মিথ্যা হ’তে সত্য বাছা সত্যই কঠিন,
নির্ব্বিচারে নামে কর নিজের বিলীন।।

(২)

বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা যত
সবারে করিয়া লও নামে অভিরত।।
নাম সত্য, নাম নিত্য, পরম রতন,
নামের সেবায় লভ দিব্য জাগরণ।।

(৩)

বিপদেই পড় আর সম্পদেই থাক,
ঈশ্বরের পুণ্য নাম বক্ষে ধ’রে রাখো।

কে কি কহে শুনিবার নাহি প্রয়োজন,
ঈশ্বর-সেবার কর নিত্য আয়োজন।।
ভালমন্দ শুভাশুভ করি’ বিস্মরণ,
ঈশ্বরের নামে সদা কর রে রমণ।

নাম সত্য, নাম নিত্য, সর্ব্বসুখাধার,
নামতে মজিলে মন কি চাহিরে আর?
নাম-কৃপা-বলে কর বিশ্বেরে আপন,
নামে কর সর্ব্বজীবে প্রেম-সঞ্চারণ।।

(৪)

মৃত্যুরে করিতে জয় বন্ধু কর তারে,
নির্ভয়ে আহ্বান কর বক্ষে বারে বারে।
মৃত্যু যদি দিয়া থাকে তোরে হাতছানি,
জানিও নিশ্চয় ইহা ঈশ্বরের বাণী।।

মৃত্যুরে করিবে জয় দিয়া আলিঙ্গন,
সমগ্র জীবনে শুধু ইহা কর পণ।
মৃত্যুভয়ে দেশ-সেবা যে করে বর্জ্জন,
তাহারে জানিও অতি দুরন্ত দুর্জ্জন।।

মৃত্যু মৃত্যু মহামন্ত্র জপ বারংবার,
মৃত্যুর বিক্রম ইথে হবে ছারখার।।
সর্ব্বদা প্রভুর নাম কর তুমি সার,
দিগ্বিজয়ে পদানত হবে এ সংসার।।

অখণ্ড-সংহিতা ত্রয়োবিংশ খণ্ড
(পৃষ্ঠা নং ২৪৩ – ২৪৫)

শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : চোদ্দ>>

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

……………….
আরও পড়ুন-
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : এক
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : দুই
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : তিন
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : চার
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : পাঁচ
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : ছয়
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : সাত
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : আট
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : নয়
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : দশ
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : এগারো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : বারো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : তেরো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : চোদ্দ
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : পনেরো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : ষোল
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : সতেরো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : আঠারো
শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংসদেবের বাণী : উনিশ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!