শাহান শাহ্’র দরবারে

শাহান শাহ্’র দরবারে : পর্ব এক

-মূর্শেদূল মেরাজ

শাহান শাহ্’র দরবারে – পর্ব এক

শেষ পর্যন্ত আশিক ঠিক ঠিক মনে রেখেছিল, আমি শাহান শাহ্ রাহাত আলী শাহ্ বাবার দরবারে যাওয়ার বাসনা মনে চেপে রেখেছি। সেই হিসেবেই পরবর্তী পরিকল্পনা সাজানো হলো। সুমন দাস বাউলের একটা প্রস্তাব ছিল, সে একটা রাত লোকনাথ বাবার আশ্রমে থাকতে চায়।

সে কথা শুনে আমরা সকলেই একমত হয়েছি। লোকনাথ বাবার আশ্রমে থাকতে পারার বাসনা কার না আছে। আমরা গণি শাহ্ বাবার দরবার থেকে বিদায় নিয়ে দুপুর দুপুরই বেড়িয়ে পরবো। যাবো লোকনাথ বাবার আশ্রমে। সময় নেহায়াত কম লাগবে না। দূরত্বও বেশ অনেকটাই।

কিন্তু তার মাঝেও আমরা এক ফাঁকে রাহাত আল শাহ্’র দরবারে যাবো। সেখানে অল্প সময় কাটিয়ে সোনারাগাঁও বারদীর দিকে রওনা দিবো। বেশি রাত হলে গাড়ি না পাওয়ার সম্ভবনাও আছে। ছোটভাই রমিজ অবশ্য অভয় দিয়ে বললো, “একটা অটো এখান থেকে নিয়ে নেন দাদা।

সেটাই আপনাদের রাহাত আলী বাবার দরবারে নিয়ে যাবে। সেখানে কিছু সময় কাটিয়ে সেই অটোতেই বাঞ্ছারামপুর ফেরি ঘাটে চলে যাবেন। তারপর ফেরি পার হয়ে অন্য গাড়িতে বারদী। পৌঁছে যাবেন সমস্যা হবে না। অনেক রাত পর্যন্ত গাড়ি চলাচল করে ঐ রাস্তায়।

আর রাহাত শাহ্ বাবার দরবারে আমাদের এক ছোট ভাই আছে শুভ। ওকে বলা আছে আপনাদের সমস্যা হবে না। ও আপনাদের ঘুরিয়ে দেখাবে বাবার দরবার।”

এই ফাঁকে রমিজ সম্পর্কে দুই-এক কথা বলি। দয়াল বাবা গণি শাহ্ বাবার দরবারের খাদেমের পুত্র রমিজ। অন্য সকলের মতো জীবনের অন্যান্য কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায় নি। দরবারের সাথে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছে ছোটবেলা থেকেই।

ফেসবুকেই ওর সাথে পরিচয়। ঢাকায় আসলে প্রায়ই ফোন দেয়। বলে দাদা আপনার এলাকার দিকে এসেছি। আসেন চা খাই। আর চা খাই মানেই লোকনাথ বাবার আশ্রমের পাশের সেই বিখ্যাত চায়ের দোকানের চা। স্বামীবাগের লোকনাথ বাবার আশ্রম এমনিতেই আমার বেশ পছন্দের জায়গা।

আর কেউ সেই জায়গায় ডাকলে না যেয়ে থাকা যায়? এভাবেই রমিজের সাথে পরিচয়। আলাপচারিতা। রমিজ সেই কবে থেকে বলে যাচ্ছে। দাদা আসেন একবার দেখে যান দয়ালের দরবার। আমারো বহু বহু দিনের ইচ্ছে দয়ালের দরবারে যাবার।

কিন্তু যাই যাই করেও নানাবিধ কারণে যাওয়া হয় নি। শেষে রমিজও হাল ছেড়ে দিয়েছে। তারপর হঠাৎ করেই যাওয়া শুরু হয়েছে। গিয়েছি বললে আসলে ভুল বলা হবে। সাধুগুরুদের দরবারে চাইলেই যাওয়া যায় না। যদি সাধুগুরু নিয়ে না যান।

যাক, রমিজের কথা মতো আমরা অটোতে চেপে বসলাম। অটোতে উঠতেই রমিজ আরেকটা বায়না করে বসলো। বললো আমার এক বন্ধুর বাড়িতে কীর্তন হচ্ছে। কাল রাতে যেখানে আপনারা যেতে চেয়েছিলেন শব্দ শুনে সেখানে। সেখানে চলেন।

পাশে কয়েক ঘর দোকান বসেছে কীর্তনকে কেন্দ্র করে। মেলা মেলা একটা ভাব এনেছে বেলুন ওয়ালার বাহারি রঙের বেলুনগুলো। আর মুড়ি-মুড়কি-বাতাসার দোকান। চায়ের স্টলে বয়োজ্যেষ্ঠরা ভিড় করেছে। শীতের দুপুরেও রোদটা বেশ তীব্র।

ও আপনাদের চিনে। দুপুরে সেখানে একটু সেবা নিয়ে তারপর যাবেন। চলেন বেশি সময় লাগবে না। আমরাও না করতে পারলাম না। রাতে দূর থেকে আসা কীর্তনের শব্দ শুনেছিলাম। যাবার ইচ্ছেও ছিল বেশ। কিন্তু রাতে বেশ কুয়াশা থাকায় আর অটো না পাওয়া যাওয়ায় শেষে আর যাওয়া হয় নি।

এখন যদি তার এক ঝলক পাওয়া যায় তা মন্দ হয় না। গণি শাহ্ বাবা কোনো ইচ্ছেরই আসলে কমতি রাখেন না। রমিজ আর তার এক বন্ধু সহ আমরা দুই অটোতে করে সেখানে রওনা দিলাম।

অটোতে চেপে মিনিট পাঁচ/সাতের পথ পেরিয়ে বিশাল শামিয়ানা ঘেরা উন্মুক্ত মাঠে গিয়ে প্রবেশ করলাম। বহুদিন পর হৃদয়গ্রাহী কীর্তনের সুর গেল কানে। বর্তমানে শহুরে পরিবেশে কীর্তনটা অনেকখানিই মেকি হয়ে গেছে। আবেগের বারাবারি মনে হয় মাঝামাঝি।

কান্নাগুলো অভিনয় অভিনয় বা কখনো কখনো অতি অভিনয় মনে হয়। কিন্তু এখানে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। একটা রাত বসে শুনতে পারলে তবে মন জুড়াতো। কিন্তু সেই উপায় তো নেই। পরিকল্পনা ঠিকঠাক হয়ে গেছে। মাথার মধ্যে ঘুরছে রাহাত আলী শাহ্ বাবার দরবার হয়ে লোকনাথ বাবার আশ্রমে যেতে হবে।

এই দুপুর বেলাতেও প্রচুর মানুষ জড়ো হয়ে শুনছে কীর্তন। শামিয়ানার মাঝে বেশি ভাগই নারী সদস্যরা বসে আছেন। প্রায় সকলের চোখেই জল। চলছে কীর্তনের বিরহ পর্ব। ছোটরা নতুন নতুন পোশাক পরে খেলাধুলা করছে মাঠে। তাদের এসবে মন নেই।

পাশে কয়েক ঘর দোকান বসেছে কীর্তনকে কেন্দ্র করে। মেলা মেলা একটা ভাব এনেছে বেলুন ওয়ালার বাহারি রঙের বেলুনগুলো। আর মুড়ি-মুড়কি-বাতাসার দোকান। চায়ের স্টলে বয়োজ্যেষ্ঠরা ভিড় করেছে। শীতের দুপুরেও রোদটা বেশ তীব্র।

আমরা যখন উপস্থিত তখন বিরহের সুর বাজতে শুরু করেছে করনেটে। কি সেই বিরহ। আহ্। আহ্। এমন বিরহের সুরে সকলেই তো রাধা হয়ে যায়। অনুরাগে পরে যায়। কালার প্রেমের প্রত্যাশায় নয়ন ভাসিয়ে খুঁজে বেড়ায় প্রাণপ্রিয় বন্ধুকে।

আমাদের আপাতত পরিকল্পনা হলো- রাহাত আলী শাহ্ হয়ে লোকনাথ বাবার আশ্রম। সেখান থেকে সদরকোঠায়। তারপর যে যার মতো যেতে পারে যার যার ঠিকানায়। তবে আমার চাহিদার তো শেষ নাই। মনে মনে রাহাত শাহ্ বাবার দরবারে যাবার মতো আরেকটা ছোট্ট বাসনা তখনো ঝুলছে।

যে আর ফিরবে না। আর ভালোবাসবে না জেনেও তাকেই প্রেম করে যেতে হয়। তার প্রেমেই পরতে চায় জন্মজন্মান্তর জুড়ে। সেই প্রেম থেকে মুক্তি নেই। আসলেই- ‘অনুরাগ নইলে কি সাধন হয়’?

সেখানে ছোটভাই রাজ শাহা’র সাথে পরিচয় হলো। ওদের বাড়িতেই কীর্তন হচ্ছে। মানে ওর মাতুল বাড়িতে। রাজ সন্তোষী মায়ের একান্ত ভক্ত। ওর কাছেই জানলাম, নিজ বাড়িতেই সন্তোষী মায়ের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছে। সেই বিগ্রহ দেখবার নিমন্ত্রণও জানালো আমাদের।

আমাদের হাতে সময় নেই। আমরা তাড়াহুড়ো করছি। কিন্তু রাজ কথা শোনে না। সে একটা বিশাল ঘরে নিয়ে বসালো। চা-বিস্কুট সেবা দিলো। বাড়ির মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। আমরাও আড্ডায় মেতে উঠলাম। কিন্তু মনে মনে সকলেরই তাড়া।

রাজের এক কথা কীর্তনের সেবা নিয়ে তবে যেতে হবে। সেবা নামছে। অল্প সময়ের মধ্যেই পরিবেশন করা হবে। অগত্যা অপেক্ষায় থাকতে হলো। অবশ্য বেশি সময় অপেক্ষা করতে হলো না। সেবা দেয়া শুরু হলো। আমরাও চাতালে সকলের সাথে বসে পরলাম পাশাপাশি।

সেবার স্বাদ হয়েছে অস্বাধারণ। এটা বলতেই রাজ জোড় করে আমাদের কয়েকগুণ বেশি খাইয়ে নড়ার শক্তি আর রাখলো না। তারপরও ছাড়তে চায় না। আমাদের হাতে সময় থাকলে ফিরতাম কিনা সন্দেহ। অন্ত্যত আমি ফিরতাম না এটা বলাই যায়।

অল্পে আমার মন ভরে না। আমার পুরোটাই চাই। কিন্তু উপায় নেই। দলের সাথে হাঁটলে স্বার্থপরের মতো কোনো কিছু ভাবা ঠিক না। অপরের সুবিধা-অসুবিধাকে গুরুত্ব দিয়েই চলতে হয়। তার উপর সবাই মিলেই একটা পরিকল্পনা করেছি। সেই মতেই চলা ভালো মনে হলো।

যদিও এসব পরিকল্পনা মিনিটে মিনিটে বদলে যায় সেটা আমি জানি। আর এসব পরিকল্পনা কি করে পাল্টাতে হয়। তাও আমার ভালোই জানা আছে। কিন্তু সে সময় পরিকল্পনাটা পরিবর্তন করতে মন চাইলো না। সকলেরই ফেরার একটা তাড়া তৈরি হয়েছে।

আমাদের আপাতত পরিকল্পনা হলো- রাহাত আলী শাহ্ হয়ে লোকনাথ বাবার আশ্রম। সেখান থেকে সদরকোঠায়। তারপর যে যার মতো যেতে পারে যার যার ঠিকানায়। তবে আমার চাহিদার তো শেষ নাই। মনে মনে রাহাত শাহ্ বাবার দরবারে যাবার মতো আরেকটা ছোট্ট বাসনা তখনো ঝুলছে।

ভক্তি পর্বে সারতে সারতেই আশিক খুঁজে বের করে ফেললো ‘শুভ’ কে। বাবার একনিষ্ঠ ভক্ত ছেলে। বাবার রুহানি সন্তান। বেশ অল্প বয়সী ছেলে। ছোটখাটো হাসিখুশি ভালো মানুষ। আলাপ জমলো তার সাথে। জানালো তার নাম- অধম শুভ। এই নামেই সে স্বস্তিবোধ করে।

তা হলো- গোপালদী মহারাজের আশ্রম। বহুদিন ধরে এই আশ্রমের কথা শুনে আসছি। মহারাজের কথা শুনে আসছি। সেই ফর্সা হাজী থেকে যখন সূচনা করেছিলাম এই যাত্রার। তখন থেকেই মনে মনে ছিল। সুযোগ পেলে মহারাজের আশ্রমে যাব অল্প সময়ের জন্য হলেও।

দেখা যাক কি করে সাঁই। এই ভেবে বিষয়টা মনেই চেপে রাখলাম আপাতত। চা জল খেয়ে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অটোতে উঠে বসলাম। অটো চলতে শুরু করলো রাহাত আলী শাহ্ বাবার দরবারে। শুনেছি এই দরবারে নাকি দয়াল বাবা গণি শাহ্’ও গিয়েছেন বেশ কয়েকবার।

অনেকে রাহাত আলী শাহ্ বাবাকে গণি শাহ’ বাবার গুরু বলেও আখ্যায়িত করেন। এমন সাধকের দরবারে না গেলে হয়? তাও আবার বাসনা করেছি দয়াল বাবার দরবা বসে। তিনি কি আর নিরাশ করার মানুষ? তিনি ঠিক ঠিকই ব্যবস্থা করে দিলেন। জয় হোক দয়ালের।

প্রায় ঘণ্টাখানেক চলার পর পৌঁছালাম রাহাত শাহ্ বাবার দরবারে। বেশ জায়গা নিয়ে নির্মিত রাহাত শাহ্ বাবার দরবার। আধুনিক স্থাপত্য হলেও তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় নির্মাণ হলো বাবার সমাধি চত্বরের কারুকাজ। কাঠের অপরূপ কারুকাজ করা অনন্য এক রওজায় শায়িত আছেন বাবা রাহাত আলী শাহ্।

এখন বেশিভাগ মাজারই স্টিলের পাইপ দিয়ে নকশা করা হয়। কাঠের কাজ দেখা যায় খুব কম। খাটের মতো করে সমাধি বেদি ছাড়িয়েও অনেকটা জায়গা নিয়ে বানানো কাঠের ফ্রেমটা দেখেই মন ভরে গেলো।

ভক্তি পর্বে সারতে সারতেই আশিক খুঁজে বের করে ফেললো ‘শুভ’ কে। বাবার একনিষ্ঠ ভক্ত ছেলে। বাবার রুহানি সন্তান। বেশ অল্প বয়সী ছেলে। ছোটখাটো হাসিখুশি ভালো মানুষ। আলাপ জমলো তার সাথে। জানালো তার নাম- অধম শুভ। এই নামেই সে স্বস্তিবোধ করে।

(চলবে…)

<<দয়াময় থেকে দয়ালের দরবারে : কিস্তি দুই ।। শাহান শাহ্’র দরবারে – পর্ব দুই>>

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha[email protected]
……………………………….

………………………..
ভবঘুরে খেরোখাতা: পর্ব এক
ভবঘুরে খেরোখাতা: পর্ব দুই
মনোমোহনের পথে : প্রথম কিস্তি
মনোমোহনের পথে : দ্বিতীয় কিস্তি
মনোমোহনের পথে : তৃতীয় কিস্তি
দয়াময় থেকে দয়ালের দরবারে : কিস্তি এক
দয়াময় থেকে দয়ালের দরবারে : কিস্তি দুই
শাহান শাহ্’র দরবারে : পর্ব এক
শাহান শাহ্’র দরবারে – পর্ব দুই
লোকনাথ বাবার আশ্রম হয়ে মহারাজের আশ্রমে : এক
লোকনাথ বাবার আশ্রম হয়ে মহারাজের আশ্রমে : দুই
লোকনাথ বাবার আশ্রম হয়ে মহারাজের আশ্রমে : তিন
সীতাকুণ্ডের ঝড়ঝড়িতে গড়াগড়ি- এক
সীতাকুণ্ডের ঝড়ঝড়িতে গড়াগড়ি- দুই
সীতাকুণ্ডের ঝড়ঝড়িতে গড়াগড়ি : তিন
সীতাকুণ্ডের ঝড়ঝড়িতে গড়াগড়ি : চার
সীতাকুণ্ডের ঝড়ঝড়িতে গড়াগড়ি : পাঁচ
নিরা গোঁসাইয়ের মতুয়া মহাসম্মেলন- এক
নিরা গোঁসাইয়ের মতুয়া মহাসম্মেলন- দুই
সাঁইজির ধাম হয়ে পাককোলা- এক
সাঁইজির ধাম হয়ে পাককোলা- দুই
টকিমোল্লায় গানে আসর
ফর্সা হাজীতে আরেক দফা
সাঁইজির ধাম হয়ে নহির সাইজির হেমাশ্রমে-এক
সাঁইজির ধাম হয়ে নহির সাইজির হেমাশ্রমে-দুই
সাঁইজির ধাম হয়ে নহির সাইজির হেমাশ্রমে-তিন
সাঁইজির ধাম হয়ে নহির সাইজির হেমাশ্রমে-চার
সাঁইজির ধাম হয়ে নহির সাইজির হেমাশ্রমে-পাঁচ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!