উয়াইস করনি পাগল: এক

উয়াইস করনি পাগল: এক

-মূর্শেদূল মেরাজ

উয়াইস করনি ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে ইয়েমেনের করন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। জাতিসত্তায় ছিলেন আরব। পিতার নাম আবদুল্লাহ এবং মা বেদউরা। পদবি সুলতানুল আশেকিনে রাব্বানি অর্থাৎ আল্লাহ ও তার রাসুলের নয়ন মনি।

উয়াইস করনির পিতা আব্দুল্লাহ খ্যাতিমান আলেম ছিলেন। তিনি উয়াইসের ১০ বছর বয়সেই মৃত্যুবরণ করেন। পিতার মৃত্যুতে চরম আর্থিক অনটনে পড়েন তিনি। অসুস্থ মায়ের সেবায় উয়াইসের দিন কাটতে থাকে। তারপরও তিনি কখনো কারো কাছে হাত পাতেন নি।

তিনি বছরের অধিকাংশ দিনই রোজা রাখতেন। দিনের শেষে শুধু একটি খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। একটির বেশি খেজুর কেনার অর্থ উপার্জন করতে পারলে একটি নিজের জন্য একটা রেখে বাকিগুলো অভাবীদের বিলিয়ে দিতেন।

ধনী ভক্তরা সাহায্য করতে চাইলে তিনি তা ফিরিয়ে দিয়ে বলতেন, ‘আমার নবীজীই উম্মতের জন্য আরাম আয়েশ ছেড়ে দিয়েছেন, আমি তার গোলাম হয়ে কিভাবে আরাম আয়েশ করতে পারি?’

আলি ইবনে আবি তালিব ও উমর ইবনে আল-খাত্তাবের সাথে সাক্ষাতের পর তার কথা দিকে দিকে ছড়িয়ে পরে। তাকে দেখবার জন্য দলে দলে আসতে শুরু করে। পরিচিতি বাড়তে থাকলে উয়াইস করনি মাকে নিয়ে লোকালয় ছেড়ে চলে যান।

জানা যায়, তিনি প্রাথমিক জীবনে মুসা নবীর অনুসারী ছিলেন। নবীজীর আগমনের পর এক আউলিয়ার কাছে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং মাকেও দীক্ষিত করেন। নবীজীর সমসাময়িক হলেও তাদের কখনো সামনাসামনি সাক্ষাৎ হয়নি। তিনি সর্বক্ষণই খোদা ও নবী প্রেমে আপন সাধনায় রত থাকতেন এবং অন্ধ মায়ের দেখাশোনায় সময় কাটাতেন।

উয়াইস করনি দেখতে ছিলেন মধ্যমা আকৃতির, গায়ের রং ফর্সা, চোখ দুটি ছিল নীল, মাথার চুল এলোমেলো। সাধনায় এতই মশগুল থাকতেন যে নিজ দেহের প্রতিও খেয়াল করতেন না। সাধনায় এতোই মত্ত থাকতেন যে ঘুম, আহার সবই ভুলে যেতেন। এতে তার পেট পিঠের সাথে লেগে গিয়ে দেহ ধনুকের মত বাঁকা হয়ে গিয়েছিল। সারা দেহে ছিল শুধু হাড়।

শত ছিন্ন তালি দেওয়া মলিন কাপড় পড়তেন। লোকজন তাকে পাগল বলে পাথর ছুড়ে মারতো, পাথরের আঘাতে রক্ত বের হয়ে গেলেও তিনি কখনও কাউকে অভিশাপ দিতেন না। বলতেন ‘দয়া করে আমাকে ছোট পাথর মেরো, পাথরের আঘাতে রক্ত বের হয়ে আমার অজু যাতে না ভেঙ্গে যায়।’

দিনের বেলা উট চড়িয়ে রুটির ব্যবস্থা করতেন। কথিত আছে, তাকে কখনো হাসতে দেখা যেত না। লোকে যখন হাসত তিনি তখন কাঁদতেন। শুধুমাত্র নবীজীর পোশাক প্রাপ্তির সময় এক ঝলক হাসির রেখা দেখা গিয়েছিল তার ঠোঁটের কোণে।

রহস্যময় উয়াইস করনিকে ঘিরে অগনতি ঘটনা প্রচলিত আছে। তার কোনটা সত্য, কোনটা কল্পনাপ্রসুত তা পৃথক করা মুশকিল। সেই ভেদে না গিয়ে তাকে ঘিরে প্রচলিত কাহিনীর কয়েকটা তুলে ধরা হলো-

খোদা প্রেম
কথিত আছে, খোদা মুসা নবীর খাদেম ইউশা ইবনে নুনকে পরীক্ষা করার জন্য বললেন, ‘অনেকদিন ধরে আমার জীবিত মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বাসনা হচ্ছে।

ইউশা বললেন ‘আপনার তো আহার, নিদ্রার প্রয়োজন নাই, কেন এমন বিচিত্র বাসনা প্রকাশ করছেন?’

খোদা বলেন, ‘হে ইউশা! আমি যা জানি, নিশ্চয়ই তুমি তা জানো না।’

এরপর ইউশা পাত্র আর ছুরি নিয়ে দ্বারে দ্বারে গিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। সবাই তাকে পাগল বলে ফিরিয়ে দেন। শেষে ইউশার সব কথা শুনে উয়াইস করনি বললেন, ‘এতে হতাশ হবার কি আছে? বলুন আপনার কোন অঙ্গের প্রয়োজন?’

ইউশা বললেন, ‘এ বিষয়ে নির্দিষ্ট করে আমাকে জানানো হয় নি।’

উয়াইস করনি ইউশার কাছ থেকে ছুরি নিয়ে খোদার নাম নিয়ে নিজ দেহের সমস্ত অঙ্গ প্রতঙ্গ থেকে মাংস কেটে কেটে দিতে লাগলেন। এমনকি কলিজার কিছু অংশও দিলেন। খোদার প্রতি এই প্রেম দেখে খোদার আরশেও কাঁপতে শুরু করলো।

সন্তুষ্ট হয়ে খোদা উয়াইস করনির অঙ্গ-প্রতঙ্গ পুনরায় পূর্ণ করে দিলেন। খোদাপ্রেমের পরীক্ষায় ইউশা বিফল হলেও, উয়াইস করনি খোদা প্রেমের অনন্য নজির গড়ে সারা জাহানে অদ্বিতীয় হয়ে রইলেন।

বেলালের জীবন দান
আল্লাহ জিব্রাইলের মারফত নবীজীকে জানালেন ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জীন হজরত বেলাল আর ৩ দিনের বেশি বাঁচবে না। তার আয়ু শেষ হয়ে গেছে। নবীজী আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন, ‘দয়া করে আপনি তার আয়ু বৃদ্ধি করে দিন।’

আল্লাহ বললেন, ‘আমার বিধান অপরিবর্তনীয়। পরিবর্তন করা গেলে আপনার দোয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা হয়ে যেত।’

নবীজীর এই নিরশার কথা বাতেনী ভাবে জানতে পেরে উয়াইস করনি বেলালের দরজায় গিয়ে বসে পড়লেন। আজরাইল জান কবজ করতে আসলে তিনি শুকনা রুটি খেতে শুরু করলেন। আজরাইল তাকে দরজা থেকে সরে যেতে বললে উয়াইস করনি বলেন, ‘তুমি জানো না যে খাওয়ার সময়ে বিরক্ত করা আল্লাহর নিষেধ?’

(চলবে…)

……………….
আরো পড়ুন:
উয়াইস করনি পাগল: এক
উয়াইস করনি পাগল: দুই
উয়াইস করনি পাগল: তিন

……………..
তথ্যসূত্র
উইকিপিডিয়া সমূহ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!