উয়াইস করনি পগাল

উয়াইস করনি পাগল: তিন

-মূর্শেদূল মেরাজ

[পূর্বে প্রকাশের পর]

ওমর বললেন, ‘আমরা করছি। আপনিও করুন।’

উয়াইস করনি তখন তার মাকে নিজের ঘাড় থেকে নামিয়ে হজরত আলীকে দিয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। কথিত আছে, আলীকে আল্লাহ সমগ্র দুনিয়া নিজের কনিষ্ঠ আঙ্গুলে তোলার মত শক্তি দিয়েছিলেন। কিন্তু যখনই তিনি উয়াইস করনির মাকে নিজের ঘাড়ে নেন, তখন সাথে সাথে তিনি মাটিতে গলা পর্যন্ত দেবে যান।

উয়াইস করনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানালেন, ‘নবীজীর উম্মতদের গুনাহ মাফ না করলে আমি নবীর দেয়া পোশাক পরব না।’

উয়াইস করনির ভক্তির জোরে আল্লাহর আরশ থরথর করে কাঁপা শুরু করলে আল্লাহ বললেন, ‘যাও হে উয়াইস করনি আমি মুহাম্মদের সমগ্র উম্মতের ৪ আনা গুনাহ মাপ করলাম তুমি সেজদা উঠাও।

উয়াইস করনি বললেন, ‘১৬ আনা গুনাহ মাপ না করা পর্যন্ত আমি সেজদা উঠাবো না।’

সেজদার জোরে আল্লাহর আরশ কুরশি লৌহ কলম ভেঙ্গে চুরমার হওয়ার উপক্রম হলে আল্লাহ বললেন, ‘যাও আমি ১২ আনা মাপ করলাম, তুমি এখন সেজদা উঠাও।’ তবুও উয়াইস করনি সেজদা উঠান নি।

হঠাৎ আলি ‘বাঁচাও’ বলে চিৎকার করায় উয়াইস করনির ধ্যান ভেঙ্গে যায়। তিনি বলেন, ‘আলি তুমি কেন চিৎকার করলে? আর কিছু সময় সেজদায় থাকতে পারলে নবীর সব উম্মতকে বিনা হিসাবে জান্নাতে নিয়ে যেতে পারতাম।’

ওমর জানতে চাইলেন, কেন আপনি নবীজীর সাথে সাক্ষাত করেন নি?

এর জবাব না দিয়ে বললেন, আপনারা তো তাঁকে দেখেছেন; বলুন তো তার পবিত্র ভ্রূ দুটো জোড়া ছিল? না আলাদা?

প্রশ্ন শুনে তারা অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। আশ্চর্যের কথা তারা সে সময় তা কিছুতেই স্মরণ করতে পারলেন না।

ওমর তাকে অর্থ সাহায্য করতে চাইলে উয়াইস করনি পকেট থেকে দুটো পয়সা বের করে বললেন, ‘আমি উট চড়িয়ে এ পয়সা উপার্জন করেছি। আপনি যদি বলতে পারেন এ পয়সা খরচ করার পরও আমি বেঁচে থাকব তাহলে আমার কিছু জিনিসের প্রয়োজন হবে।’

এরপর তিনি অতিথিদের কাছে ক্ষমা চেয়ে শেষ বিচারের দিন আবার দেখা হবে বলে বিদায় নিলেন।

উয়াইস করনি নবীর প্রেমে দাঁত ভাঙেন

উহুদের যুদ্ধে শত্রুর আঘাতে নবীজীর একটি দাঁত ভেঙে যায়। সে সময় ইয়েমেন থেকে ২০০ মাইল দূরে অবস্থান করেও উয়াইস করনি বাতেনী ভাবে সে সংবাদ জানতে পারেন।

নবীর ব্যথায় পূর্ণ ব্যথিত হয়ে পাথর দিয়ে একে একে নিজের সব কয়টি দাঁত ভেঙে ফেলেন। নবী প্রেমের এই উদাহরণ আর কেউ জগতে দেখাতে পারেন নি। তাইতো তিনি আশেকে রাসূল বা রাসূল প্রেমিক।

উয়াইস করনির মৃত্যু

ইবনে বতুতার বর্ণনা অনুযায়ী, ৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে উয়াইস করনি সিফফিনের যুদ্ধে আলি ইবনে আবি তালিবের পক্ষে লড়াইয়ে মারা যান। তাকে সিরিয়ার রাক্কাহতে দাফন করা হয়। তবে তার মৃত্যু নিয়ে আরো কিছু কাহিনী প্রচলিত আছে। প্রচলিত আরেকটি কাহিনী-

উয়াইস করনি নবীজীর মৃত্যুর খবর পেয়ে মদিনায় পাগলের মত ছুটে যান। মদিনায় ঢোকার পূর্বেই নবীজী তার রওজার খাদেমকে স্বপ্নের মাঝে বললেন, ‘শীঘ্রই মদিনা শহরের প্রবেশ দ্বার বন্ধ করে দাও। উয়াইস করনি পাগল যদি আমার রওজায় ঢুকে ইয়া রাসুলুল্লাহ বলে একবার ডাক দেয় তাহলে আমার রওজার ভেতর থাকা অসম্ভব হবে উঠবে।

কিন্তু উয়াইস করনি নবীর রওজায় প্রবেশের জন্য নানা ফন্দি করতে লাগলো। সিন্ধুকের মধ্যে লুকিয়ে, লাকড়ির গাড়ির নিচে শুয়ে মদিনায় প্রবেশের প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে লাগলো। তার দেহে লাকড়ির আঘাতে রক্তাক্ত হলেও তিনি দমলেন না।

শেষে সব চেষ্টা ব্যর্থ হলে মদিনার বাইরে ‘ইয়া নবী’ ‘ইয়া নবী’ বলে কান্না করলে লাগলেন। এভাবে তিন দিন চলার পর, তার কান্না সইতে না পেরে নবীজী পুনরায় খাদেমকে স্বপ্নে বললেন, ‘তুমি পাগলকে ডেকে বল যে মদিনার দক্ষিণে থাকতে আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করবো।

খাদেমের কথা অনুযায়ী উয়াইস করনি মদিনার দক্ষিণ দিকে অবস্থান নিল। কথা মতো নবীজী তার সাথে দেখা করেন। উয়াইস করনি নবীজীকে দেখা মাত্রই তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করেন।

নবীর প্রতি প্রেমের ভাব এতই তীব্র হয়েছিল যে সঙ্গে সঙ্গে তার কলিজা ফেটে তিনি সেখানেই মারা যান। সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়। তার রওজাও সেখানে বিদ্যমান।

উয়াইস করনির সপ্ত রওজা

উয়াইস করনির পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ৭টি রওজার কথা জানা যায়। প্রথম রওজা সিফফিনে, দ্বিতীয় রওজা আজারবাইজানে, তৃতীয় ইয়েমেনে, চতুর্থ পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে, পঞ্চম মদিনার দক্ষিণে জোবায়দায়, ষষ্ঠ গজনিতে ও সপ্তম রওজা বাগদাদে।

কথিত আছে, উয়াইস করনি স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করেন, ‘হে আল্লাহ আমাকে দুনিয়া ও আখিরাতে গোপন রাখ। কেউ যেন আমার সঠিক পরিচয় জানতে না পারে।’

আল্লাহ তার এই দোয়া কবুল করেন। আল্লাহর কুদরতে একজন থেকে সাতজন উয়াইস করনি সৃষ্টি হয়ে সাত দেশে চলে যান। পরবর্তীতে এই সাতজন সাতভাবে সাত জাগায় মৃত্যুবরণ করেন।

১১ মার্চ ২০১৩ সালের মাজার বিরোধী সশস্ত্র দল সিরিয়ায় অবস্থিত উয়াইস করনি রওজা ধ্বংস করে দেয়। পরবর্তীতে তার সম্মানে তুরস্কের সির্ত প্রদেশের বায়কানে একটি মাজার নির্মাণ করা হয়।

উয়াইস করনির মতবাদ

প্রেম ও ভক্তির জোরে খোদা পাওয়ার পথই ছিল উয়াইস করনির মত। তিনি তার জীবদ্দশায় অনুসারীদের এই মতের কথাই জানান। তার নামেই এই মতবাদ উয়াইসি মতবাদ নামে পরিচিত। পরবর্তি যা সুফি মতের উয়াইসি তরিকা নামে ব্যাপক পরিচিত পায়।

(সমাপ্ত)

……………….
আরো পড়ুন:
উয়াইস করনি পাগল: এক
উয়াইস করনি পাগল: দুই

উয়াইস করনি পাগল: তিন

……………..
তথ্যসূত্র
উইকিপিডিয়া সমূহ

………………..
উয়াইস করনি পাগলের কোনো ছবি পাওয়া যায় না। লেখায় ব্যবহৃত ছবিটি খোদাভক্ত এক আশিকের কল্পিত চিত্রকর্ম মাত্র। ছবিটি সংগ্রহকৃত।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!