পঞ্চপ্রেম ধ্যান চক্র আধ্যাত্মিক আত্মজ্ঞান

-মূর্শেদূল মেরাজ

সংস্কৃত ‘যোগ’ শব্দটি ‘যুজ’ ধাতু থেকে ব্যুৎপন্ন। যার অর্থ ‘নিয়ন্ত্রণ করা’, ‘যুক্ত করা’ বা ‘ঐক্যবদ্ধ করা’। আক্ষরিক অর্থে ‘যোগ’ অর্থ- যুক্ত করা বা সংযোগ করা। যিনি নিয়ম মেনে যোগ অনুশীলন করে পরমের সাথে একাত্মার সাধনায় রত থাকে তারাই যোগী বা যোগিনী নামে পরিচিত।

সাধারণভাবে ‘যোগ’ বলতে আমরা যোগব্যায়াম বা যোগাভ্যাসকে বুঝি। কিন্তু যোগের মূল অত্যন্ত গভীর। প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে দেহ ও মনের নিগূঢ় সংযোগ স্থাপনের মধ্য দিয়ে পরম বা স্রষ্টার সাথে যুক্ত হওয়াই হলো ‘যোগ’।

কিছু নিয়মনীতি পদ্ধতির মধ্য দিয়ে দীর্ঘ অনুশীলনে দেহ ও মনের এই সংযোগ স্থাপন করার বিধি ভারতীয় দর্শনে রচিত আছে। এর মূল লক্ষ্য জীবাত্মা আর পরমাত্মার মিলন। আর এই মিলন ঘটাতে পারলে তবেই ‘যোগ’ স্থাপিত হয়।

বৈদিক শাস্ত্রে ‘যোগ’-এর নিয়মনীতি-রীতিনীতি-পদ্ধতি খুব সুশৃঙ্খল ভাবে বর্ণনা করা থাকলেও ; এই ‘যোগ’ আর্যদের সময়কালে উৎপত্তি নাকি আর্যপূর্ব থেকে ধীরেধীরে সমৃদ্ধ হয়েছে তা সুস্পষ্ট নয়। কারণ বিবর্তণের ধারাবাহিকতায় কখন মানুষ তার স্রষ্টা অর্থাৎ যা থেকে সে সৃষ্ট; তার সাথে একাত্ম হতে চেয়েছে-তার চর্চা শুরু করেছে তা নির্দিষ্ট করে বলার উপায় নেই।

ভারতবর্ষে আর্যপূর্ব থেকে আর্য আগমনের পর ‘চিন্তা-চর্চা’য় একই ধারায় বিকাশ লাভ করেছে; নাকি ভিন্ন ধারায় এগিয়ে গেছে সেটাও স্পষ্ট করে বলা কঠিন। আর্যপূর্ব সময়কালের ভারতবর্ষ সম্পর্কে যেহেতু বিশেষ কিছু সেভাবে জানা যায় না। তাই কোনো সম্ভবনাকেই লঘু করে দেখার উপায় নেই।

সাধারণ ভাবে বলা যায়, যবে থেকে সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টার সাথে মিলনের বাসনা জেগেছে। তবে থেকেই অনুসন্ধিৎসু মানুষ নিজ নিজ স্থান-কাল-পাত্র ভেদে নিজ নিজ সাধন-ভজন চালিয়েছে। উদ্ভাবন করেছে নিজস্ব রীতিনীতি-সাধন পদ্ধতি। আর এই পথে এগিয়ে যেতে যেতে জাগতিক অস্থিরতার ভেতরেও মনের প্রশান্তি খোঁজার যে পথ প্রাচীন ভারতের সাধকরা গ্রহণ করেছিল, তাই পরবর্তিতে এই ‘যোগ’-এর বিকাশ ঘটায়।

বিশ্বয়ের বিষয় হলো আধুনিক বিজ্ঞান যেমন গবেষণাগারে বিভিন্ন প্রাপ্ত বস্তুর উপর গবেষণা করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। প্রাচীনকালে ভারতবর্ষের পণ্ডিত মুণি-ঋষিরাও তেমনি গবেষণায় রত ছিল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জ্ঞান আহরনের জন্য। তবে তারা সেজন্য প্রাপ্ত বস্তু অর্থাৎ বর্হি জগতের কোনো বস্তুকে নিয়ে গবেষণায় মনোনিবেশ করে নি।

তারা নিজ দেহের ভেতরেই ব্রহ্মাণ্ড অনুসন্ধানে রত ছিল। তাদের বিশ্বাস- ‘যা আছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে-তা আছে দেহ ভাণ্ডে। আর এই জগৎ যেহেতু সৃষ্ট পঞ্চভুতে অর্থাৎ মাটি, জল, আগুন, বায়ু ও আকাশে। তাই এই ব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু দৃষ্ট হয় তার সকল কিছুই এই পঞ্চভুতে সৃষ্টি। যদি এই পঞ্চভুতের প্রকৃতি জানা যায় এবং তাতে পূর্ণ মনোনিবেশ করে তার স্বরূপের সন্ধান পাওয়া যায় তাহলেই এর স্রষ্টাকে বোঝা সম্ভব।

তারই চেষ্টায় রত সাধককুল নিজ দেহকে বেছে নেয় গবেষণাগার হিসেবে। তাই সাধাকের কাছে দেহ অর্থাৎ যতক্ষণ তার ভেতরে চিত্ত বা আত্মা রয়েছে তা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে মুণি-ঋষিরা আত্মার সাথে পরমাত্মার মিলনের জন্য প্রথমে দেহকে প্রস্তুত করায় মনোনিবেশ করেন।

আর এই দেহকে প্রস্তুত করায় ঋষি পতঞ্জলি অষ্টাঙ্গ মার্গ শাস্ত্রবদ্ধ করেন। যার দ্বারা দেহ প্রস্তুত করে মনকে বশে আনার বিস্তারিত রচনা করেছেন। যাতে চিত্তস্থির হয়। আর সাধকের চিত্তস্থির হলে তবেই স্রষ্টার স্থিতিতে পৌঁছানো যায়। ঋষি পতঞ্জলি ‘যোগসূত্র’ রচনার মধ্য দিয়ে যোগ’কে একটা কাঠামো দিলেও এর উৎপত্তি নিয়ে রয়েছে নানা মতভেদ।

মহেঞ্জোদাড়ো-হরপ্পা সভ্যতার নমুনা থেকে সহজেই ধারণা করা যায় যোগাসনের চর্চা ভারতবর্ষে আর্যদের আগমনের বহু আগে থেকেই ছিল। আর্যপূর্ব ভারতবর্ষে প্রধান দেবতা ছিলেন শিব। আর শিবের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হল ধ্যান। পরবর্তিতে আর্যরা ভারতবর্ষে এসে আর্যপূর্ব ভারতে দ্রাবিড় বিশ্বাসের ধ্যান ও ভক্তির চিন্তাধারায় যুক্ত করে ‘পরমতত্ত্ব’ অর্থাৎ ‘স্রষ্টাতত্ত্ব’।

সে স্রষ্টাতত্ত্ব আর্যদের শাস্ত্র বেদ-উপনিষদে স্পষ্ট। পরবর্তীতে উপনিষদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও আর্যপূর্ব ধ্যানধারণা নিয়ে প্রাচীন ভারতে ছয়টি দার্শনিক শাখার উদ্ভব হয়। শাখাগুলি হলো- কপিলের সাংখ্য, গৌতমের ন্যায়, কণাদের বৈশেষিক, জৈমিনীর পূর্ব মীমাংসা এবং বাদরায়ানের উত্তর মীমাংসা বা বেদান্ত।

বলা যায় কপিল প্রবর্তিত সাংখ্যদর্শনের ভিত্তিতেই যোগদর্শন গঠিত। তবে সাংখ্যদর্শন নিরেশ্বরবাদী হলেও যোগদর্শন হলো ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম হওয়া।

তবে ‘যোগ’ যে যুগের অনুসন্ধানই হোক না কেনো ভারতবর্ষের সাথে তা এমন অঙ্গাঙ্গিভাব জড়িত যে ভারতীয় দর্শন বলতেই যোগ দর্শনকে বোঝায়। ভারতীয় দর্শনে যোগের প্রধান শাখাগুলি হলো- রাজযোগ, কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ ও হঠযোগ।

সাধুগুরুমুণিঋষিরা এই যোগবলেই সাধনায় সিদ্ধিলাভের কথা বলে গেছেন। বলেছেন মুক্তির কথা। জানিয়েছেন, সৃষ্টি যখন যোগবলে স্রষ্টাকে অনুধাবনের শক্তি রপ্ত করে তখন সে ভ্রহ্মাণ্ডের জ্ঞান প্রাপ্ত হয়। ভ্রহ্মাণ্ডের জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে সিদ্ধ পুরুষ জগতের কল্যাণে অনেক কিছুই করার সক্ষমতা অর্জন করে।

এই ক্ষমতাকে অলৌকিক (যা লোকে করতে পারে না) ক্ষমতা ভেবে মুণি-ঋষিদের সম্পর্কে নানাবিধ ধারণার প্রচলন ঘটেছে সমাজে। আবার সুবিধাবাদী মানুষ এই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বা চাতুরি করে লোক ঠকানোকে ব্যবসায় পরিণত করায় পাশ্চাত্য চিন্তায় শিক্ষিত আধুনিক মানুষরা একে একেবারে বাতিল করে দিয়েছে।

এই স্বীকার-অস্বীকারের মাঝে ভারতবর্ষের এই মহান অনুসন্ধানকে সময় যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারেনি। তাতে করেই বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। তবে যে যে বিশ্বাসে বিশ্বাসীই হোক না কেনো যোগের গুরুত্বকে অস্বীকার করতে পারে নি। অনেকে যোগকে পরমের সাথে মিলনের বিষয়টিকে বাদ দিয়ে কেবল ধ্যানকে গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করেছে মাত্র।

‘যোগ’ শব্দটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় কঠোপনিষদে। সেখানে যোগের বর্ণনায় বলা হয়েছে, ইন্দ্রিয় সংযোগ ও মানসিক প্রবৃত্তির উপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চেতনার সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হওয়া। এছাড়াও যোগের উল্লেখ পাওয়া যায়- উপনিষদসমূহ, মহাভারত (ভগবদ্গীতা) ও পতঞ্জলির যোগসূত্রে।

জানা যায়, খৃষ্টপূর্ব ৭০০ শতক থেকে ৫০০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রাচীন গান্ধারা রাজ্যের রাজধানী তক্ষশিলা ছিল জ্ঞানানুশীলনের অন্যতম কেন্দ্র। পাণিনি, যিবেক, চরক, চাণক্য, ব্রহ্মদত্ত, কৌটিল্য ও পতঞ্জলি’র মত মুণি-ঋষিরা তক্ষশিলায় অধ্যয়ন করতেন। তক্ষশিলা পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না ধীরে ধীরে তা উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হয় তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও। ভারতবর্ষের ইতিহাসে তক্ষশিলা অত্যন্ত গুরুত্ববহ।

তক্ষশিলার জ্ঞানীগুণী পণ্ডিতদের মধ্যে পতঞ্জলি ছিলেন একাধারে ভারতীয় যোগ দর্শনের প্রবর্তক, দার্শনিক, ব্যাকরণবিদ ও বিজ্ঞানী। শাস্ত্রগ্রন্থ ‘যোগসূত্র’র সংকলক ছিলেন তিনি। যোগ নিয়ে তার প্রবর্তিত মার্গ ‘পাতঞ্জল দর্শন’ নামে পরিচিত।

পুরাণ মতে, যখন সমস্ত মুণি-ঋষিরা ভগবান বিষ্ণুর কাছে ষড়রিপু থেকে উৎপন্ন বিকার থেকে মুক্তির উপায় জানতে চায়। তখন ভগবান বিষ্ণুর আদেশে আদিশেষ (সচেতনতার প্রতীক) ‘মহর্ষি পতঞ্জলি’ হয়ে পৃথিবীতে আসেন যোগের জ্ঞান দান করার জন্য।

পতঞ্জলি এই জ্ঞান দানের জন্য দুটি শর্ত পেশ করেন। যার একটি ছিল হাজার মানুষ একত্রিত না হলে তিনি ‘যোগসূত্র’ নিয়ে আলোচনা করবেন না। অপরটি ছিল, শিক্ষানবিস আর তার মধ্যে একটি পর্দা রাখতে হবে। যতক্ষণ না জ্ঞান দান শেষ হচ্ছে ততক্ষণ সবাইকে এক জায়গায় উপস্থিত থাকতে হবে। সেই মতো হাজার মানুষ বিন্ধ্য পর্বতমালার দক্ষিণে একত্রিত হন।

পতঞ্জলি তার সাধনপাদের দ্বিতীয় সূত্রে যোগের সংজ্ঞা দিয়ে বলেছেন-

যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ।। যোগসূত্র ১.২

অর্থ: যোগ হল চিত্তের বৃত্তি নিরোধ। অর্থাৎ চিত্তকে বিভিন্ন প্রকার বৃত্তি বা পরিণাম থেমে মুক্ত রাখাই যোগ।

স্বামী বিবেকানন্দ একে আরো স্পষ্ট করে বলেছেন- ‘মানুষ ঘুমিয়ে চক্ষু খুলে রাখলেও তার দর্শনের অনুভূতি হয় না। অর্থাৎ চক্ষুর সাথে চিত্তেরও সম্পর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়। …আমরা হ্রদের তলদেশ দেখিতে পাই না, কারণ উহার উপরিভাগ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরঙ্গে আবৃত। যখন তরঙ্গগুলি শান্ত হয়, জল স্থির হইয়া যায়, তখনই কেবল উহার তলদেশের ক্ষণিক দর্শন পাওয়া সম্ভব।

যদি জল ঘোলা থাকে বা উহা ক্রমাগত নাড়িতে থাকে, তাহা হইলে উহার তলদেশ কখনই দেখা যাইবে না। যদি উহা নির্মল থাকে, এবং উহাতে একটিও তরঙ্গ না থাকে, তবেই আমরা উহার তলদেশ দেখিতে পাইব।.. যিনি মনের এই তরঙ্গগুলি নিজের আয়ত্তে আনিতে পারিয়াছেন, তিনিই শান্ত পুরুষ।’

পতঞ্জলির যোগসূত্রে চর্চার জন্য কিছু পদ্ধতি বা পথ দ্বারা নির্দেশিত রয়েছে। এই পথগুলোকে বলা হয় যোগমার্গ। এর সংখ্যা নিয়ে মতান্তর থাকলেও সাধারণত যোগমার্গগুলো হলো- কর্মযোগ, ক্রিয়াযোগ, জ্ঞানযোগ, ব্যক্তিযোগ, মন্ত্রযোগ, রাজযোগ, লয়যোগ এবং হটযোগ।

পতঞ্জলির যোগসূত্র শাস্ত্র চারটি পদে বা অধ্যায়ে বিভক্ত। যাতে সূত্র আছে ১৯৫টি। এই অধ্যায়গুলো-

১. প্রথম পাদ (সমাধি): যোগের লক্ষণ ও সমাধি নিয়ে আলোচনা।
২. দ্বিতীয় পাদ (সাধনা): সমাধি লাভের পূর্বে অনুসরণীয় ব্যবহারিক যোগ এবং যম, নিয়ম, আসন ইত্যাদি আলোচনা করা হয়েছে।
৩. তৃতীয় পাদ (বিভূতি): ধারণা, ধ্যান, সমাধি ও এসবের ফল এবং বিভূতি বা ঐশ্বর্য আলোচিত হয়েছে।
৪. চতুর্থ পাদ (কৈবল্য): পাঁচ প্রকার সিদ্ধি ও পরা প্রয়োজন কৈবল্যের আলোচনা করা হয়েছে।

আর এই চার অধ্যায় বিভক্ত সূত্রগুলো আটটি অঙ্গে বিভক্ত। এই কারণে একে অষ্টাঙ্গ যোগও বলা হয়। অঙ্গগুলো হলো-

১. যম
২. নিয়ম
৩. আসন
৪. প্রাণায়াম
৫. প্রত্যাহার
৬. ধারণ
৭. ধ্যান
৮. সমাধি

(চলবে…)

………………………………………..
সূত্র :
যোগাসনে রোগ আরোগ্য -ড রমেন মজুমদার।
রোগারোগ্যে যোগব্যায়াম -কানাইলাল সাহা।
স্বামী বিবেকানন্দ বাণী ও রচনা, ১ম খণ্ড।
মহর্ষি পতঞ্জলিকৃত যোগ-দর্শন, গীতাপ্রেস গোরক্ষপুর।
যোগ সন্দর্শন -ডা দিব্যসুন্দর দাস।
যোগ ব্যায়াম -সবিতা মল্লিক।
কণকপ্রভা বন্দ্যোপাধ্যায়; সাংখ্য-পাতঞ্জল দর্শন।
নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য: ধর্ম ও সংস্কৃতি: প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট
রাহুল সাংকৃত্যায়ন; দর্শন-দিকদর্শন (দ্বিতীয় খন্ড)

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!