ভবঘুরে কথা

গত ৪ এপ্রিল রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়নের চররামনগর গ্রামে মোহম্মদ ফকিরের বাড়িতে শুরু হয় সাধুসংঘের বার্ষিক অনুষ্ঠান। চররামনগর গ্রামের মোহম্মদ ফকির দীর্ঘ বিশ বছর যাবৎ তার বাড়িতে এই সাধুসংঘ পালন করে আসছেন। ছোট আকারের সাধুসংঘ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে সাধুগুরু-বাউলদের কাছে। প্রতি বছরেই বেড়েছে এর ব্যাপ্তি। দূরদূরান্ত থেকে সাধুসংঘে অংশ নিতে এসেছে লালন ভক্তরা। পদ্মার বুকে জেগে ওঠা চর রামনগরে প্রায় পুরোটা জুড়েই হয় চাষাবাদ। চরের মধ্যে নেই কোনো পাকা রাস্তা। ক্ষেতের আইল ধরেই হেঁটে যেতে হয় মোহম্মদ ফকিরের বাড়ি। প্রতিবারের মতো এবারো মোহম্মদ ফকির তার বাড়িতে আয়োজন করেন  দুই দিন ব্যাপী একুশতম বাৎসরিক লালনোৎসব ও সাধুসঙ্গ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রায় শতাধিক বাউল সাধক। প্রথম দিনের অনুষ্ঠান চলেছিল ঠিকঠাক মতোই। কিন্তু অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ৫ এপ্রিল ২০১১ সালে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা হামলা চালিয়ে অনুষ্ঠান পণ্ড করে দেয়। অনুষ্ঠান স্থল থেকে জোড়পূর্বক ২৮ বাউলকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। স্থানীয় প্রভাবশালীদের নেতৃত্বে পাশবিক নির্যাতনের পরে জোর করে পাশের মসজিদে নিয়ে তওবা পড়ানো হয় এবং বাউলদের চুল-গোঁফ কেটে দেয়া হয়। কিন্তু দুর্বৃত্তরা অকত্থ্য ভাষায় গালাগালি করে বাউলদের। হুমকি দেয়া হয় ভবিষ্যতে যেন আর গানবাজনা না করা হয়। ছেলের বয়সী নর পশুদের হাতে পায়ে ধরেও কয়েক যুগ ধরে রাখা চুল-গোঁফ বাঁচাতে পারেনি সেদিন মোহম্মদ ফকিরসহ ২৮ বাউল।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়- বাউলদের অনুষ্ঠান পণ্ড করা এবং চুল-গোঁফ কেটে দেয়ার ফতোয়া দিয়েছিল মুফতি রিয়াজ। আর ঘটনা ঘটিয়েছে স্থানীয়  এক নেতা ও তার বাহিনী। ৫ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে চৌবাড়িয়া মাদ্রাসা ও পাড়া বেলগাছি গ্রামের জনৈক ব্যক্তির নেতৃত্বে প্রায় পাঁচ শতাধিক লোক চররামনগর গ্রামে উপস্থিত হয়ে মোহম্মদ ফকিরের বাড়িতে অর্তকিতে হামলা চালিয়ে বাউলদের এলোপাতাড়ি মারধর করে। এসময় তারা বাউলদের বাদ্যযন্ত্র ভেঙে ফেলে সাথে চলতে থাকে গালাগালি। হতবাক বাউলরা তাদের অপরাধ জানতে চাইলে হামরাকারীরা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। এক পর্যায়ে তারা ষাটোর্ধ্ব ২৮ জন বাউল সাধককে জোরপূবর্ক ধরে নিয়ে যায়। বাউলদের কোমড়ে দড়ি বেধে রামনগর গ্রামের মসজিদের পাশে মাটিতে বসিয়ে রাখা হয় দীর্ঘ সময়। এক পর্যায়ে  বাউলদের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে। ফতোয়ায় বলা হয়- বাউলরা বিধর্মী, এদেরকে ধরে তওবা পড়াতে হবে। রায় দেয়ার পর ফতোয়া কার্যকর করা হয়। ২৮ জন বাউলকে লাইন করে একে একে চুল গোঁফ কেটে নেওয়া হয়। এসময় জোড়াজুড়িতে বেশ কয়েকজন বাউল রক্তাক্ত হন।

এই ঘটনার পরও প্রভাবশালী মহলের চাপ চলছিলই। বাউলরা চাইলেও ঘটনা প্রকাশ করতে সাহস পায়নি। ঘটনার ৪ দিন পর ৯ এপ্রিল পাংশা থানা পুলিশ বাউলদের মামলা গ্রহণ করলেও আসামী করা হয়নি সংশ্লিষ্টদের।

কিন্তু ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে প্রচার মাধ্যমের বদৌলতে তা ছড়িয়ে পড়ে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বে। সমালোচনার ঝড় উঠে। প্রতিবাদে পথে নামে সংস্কৃতি কর্মী ও লালন ভক্তরা। এসময় হাইকোর্ট বাউলদের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় একটি রুল জারি করলে প্রসাশনের টনক নড়ে। প্রতিবাদ যখন ক্রমেই বাড়ছিল তখন স্থানীয় সাংসদ দুই পক্ষের সমযোতার ব্যবস্থা করেন। সমঝোতার নামে বাউলদের দিয়ে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করা হয়। যদিও বিষয়টিকে সমঝোতা বলে চালিয়ে দেয়া হয়। তড়িঘড়ি করে আসামিদের মধ্যে ৯ জন আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেয়।


প্রথমেই বয়োজেষ্ঠ্য বাউল সাধকরা তাদের ক্ষোভ ও দুঃখের কথা ব্যক্ত করতে যেয়ে কান্নায় ভেঙে পরেন। তারা বলেন বাউলরা হিংসা-বিদ্বেষ-ক্ষোভ-ঘৃণা সকল কিছুর ঊর্ধ্বে। তাই যা ঘটেছে তা যত কষ্টের আর অপমানেরই হোক না কেন বাউলরা তাদের ক্ষমা করে দিয়েছে। ক্ষমা পরম ধর্ম।

আর দশটা ঘটনার মতো এটিও এখানেই শেষ হতে পারতো কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। সারা দেশের শিল্পী-সংস্কৃতি কর্মী-মিডিয়া কর্মীসহ দেশ বিদেশের অগণিত লালনভক্ত ও বাউল সাধকদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিতে মোহম্মদ বাউল মাথা তুলে দাঁড়াবার শক্তি পান। তিনি আবার ঘোষণা দেন বাৎসরিক লালনোৎসব ও সাধুসঙ্গের বাকি থেকে যাওয়া অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। সারা দেশে মোহম্মদ ফকিরের দাওয়াত নামা পৌঁছে যায় লালন ভক্তদের হাত ধরে। ঘোষণা দেয়া হয় ২৪ ঘণ্টার অনুষ্ঠান সূচী।

সবাইকে অবাক করে ১৫ বৈশাখ/২৮ এপ্রিল তুমুল বৃষ্টি উপেক্ষা করে দেশ বিদেশের হাজার হাজার লালন ভক্ত। ৪ কিলোমিটার বৃষ্টি ভেজা পিচ্ছিল পথ বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি ভক্তকূরের কাছে। বিকাল চারটায় সাধুসঙ্গ শুরুর কথা থাকলেও বৃষ্টি কারণে তা রাত ৮টার দিকে শুরু হয়। প্রথমেই বয়োজেষ্ঠ্য বাউল সাধকরা তাদের ক্ষোভ ও দুঃখের কথা ব্যক্ত করতে যেয়ে কান্নায় ভেঙে পরেন। তারা বলেন বাউলরা হিংসা-বিদ্বেষ-ক্ষোভ-ঘৃণা সকল কিছুর ঊর্ধ্বে। তাই যা ঘটেছে তা যত কষ্টের আর অপমানেরই হোক না কেন বাউলরা তাদের ক্ষমা করে দিয়েছে। ক্ষমা পরম ধর্ম। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি এরকম কোনো ঘটনা ঘটে তবে বাউলরা আর নিরব থাকবে না। আমরা আমাদের মতো আছি। আমরা কারো বিরুদ্ধে কখনো বিবাদে যাই না তাই আমরা আশা করি ভবিষ্যতে আমাদের সাধনাতেও যাতে কেউ বাঁধা না দেয়। আবেগঘন পরিবেশে বাউল সাধকদের বক্তব্য দেয়ার পর বাদ্যযন্ত্র ছাড়া খালি কণ্ঠে ‘গুরু দৈন্য’ গান দিয়ে শুরু হয় মূল পর্ব। নিরবতা ভেঙ্গে প্রবীন বাউল গেয়ে উঠে- ‘গুরু দোহাই তোমার মনকে আমার লওগো সুপথে’। গানে গানেই বাউল সাধকরা তাদের প্রতিবাদ করেন। গানের নিগুর অর্থে ভক্তকূল আর দর্শকদের বুঝতে বেগ পেতে হয়নি কি পরিমাণ ব্যাথা বুকে নিয়ে বাউলরা একত্রিত হয়েছে মোহম্মদ ফকিরের আঙ্গিনায়।


মোহম্মদ ফকিরের কাছে তার অনুভুতি জানতে চাইলে তিনি বলেন- ‘এখন মতে হচ্ছে… আমি এতো সাধুগুরুর মুখ দেখলাম…  তাদের পদধূলি গ্রহণ করলার… এটা হয়তো আমার মনে হয় যে… সাঁইজির তরফের থেকে… মঙ্গলের জন্যই হয়েছে… আমরা সকলকে ক্ষমা করে দিয়েছি… ক্ষমাই পরম ধর্ম…।’

সাধুসঙ্গ সঞ্চালন করেন কুষ্টিয়ার বাউল রব ফকির। মাঝে ‘অধিবাস সেবা’র জন্য কিছু সময় গানের বিরতি হলেও সেবা নেয়ার পর সারারাত ধরে চলে দেশ-বিদেশ থেকে আগত বাউলদের লালন গান। তবে নিগ্রহের ঘটনার আবেগ ধরে রাখতে না পেরে অনেক বাউলই গানের আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন।  বার বার জানতে চান ‘লালন সাধনা করে তারা কি অপরাধ করেছে’? ঘটনার সময় প্রসাশনকে পাশে না পেলেও ২৮-২৯ তারিখ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষ থেকে হাবিলদার পর্যন্ত সকলকেই অনুষ্ঠান সুষ্ঠ ভাবে পালনের জন্য সচেষ্ট থাকতে দেখা যায়।

মোহাম্মদ ফকির

মোহম্মদ ফকিরের কাছে তার অনুভুতি জানতে চাইলে তিনি বলেন- ‘এখন মতে হচ্ছে… আমি এতো সাধুগুরুর মুখ দেখলাম…  তাদের পদধূলি গ্রহণ করলার… এটা হয়তো আমার মনে হয় যে… সাঁইজির তরফের থেকে… মঙ্গলের জন্যই হয়েছে… আমরা সকলকে ক্ষমা করে দিয়েছি… ক্ষমাই পরম ধর্ম…।’

শেষরাতে কিছু সময় গানের বিরতির পর শুরু হয় গোষ্ঠ গান। তারপর পদ্মপাতায় দেয়া হয় বাল্য সেবা, তারপর বিভিন্ন স্থান থেকে আগত বাউলদের গান চলে দুপুর পর্যন্ত। দুপুরে পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের সাধুসঙ্গ। শেষে সকলকে আমন্ত্রণ জানানো হয় আগামী বছর সাধুসঙ্গে যোগ দেয়ার জন্য। তবে ঘোষণা দেয়া হয় এবছর অনাকাঙ্খিত ঘটনার জন্য ১৫ বৈশাখ উৎসবের বাকি অংশ পালন করা হলেও আগামী বছর আবার পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী আগের সময়েই সাধুসঙ্গ আয়োজিত হবে। পূর্ণসেবা শেষে সকলে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গান গাইতে গাইতে ফিরে যায় যে যার গন্তব্যে।


দলীয় কয়েকজন কর্মীকে বাঁচাতে গিয়ে বাংলা সংস্কৃতির উপর এই হামলার বিচার যদি না হয়। যদি সমঝোতা বলে চালিয়ে দেয়া বা জোরপূর্বক মামলা তুলে নেয়াকে রাষ্ট্র মেনে নেয় তবে ‘রাষ্ট্র সবার ধর্ম যার যার’ কথাটির কোনো মূল্য থাকে না।

কীট ও এ্যাপোলো, মোহম্মদ ফকিরের সাধুসঙ্গ

সহজ মানুষ হওয়ার সাধনায় ব্রত বাউলরা দুর্বৃত্তদের ক্ষমা করে দিলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের কি আসলেই ক্ষমা করে দেয়া উচিত? বাউলদের উপর হামলা মানেই তো বাংলা সংস্কৃতির উপর হামলা। এই নগ্ন হামলার যথাযথ বিচার যদি না হয়। মূল আসামীদের যদি বিচারের আওতায় না আনা হয় তবে অপরাধী হব আমরাই। দলীয় কয়েকজন কর্মীকে বাঁচাতে গিয়ে বাংলা সংস্কৃতির উপর এই হামলার বিচার যদি না হয়। যদি সমঝোতা বলে চালিয়ে দেয়া বা জোরপূর্বক মামলা তুলে নেয়াকে রাষ্ট্র মেনে নেয় তবে ‘রাষ্ট্র সবার ধর্ম যার যার’ কথাটির কোনো মূল্য থাকে না। রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন লঙ্ঘন না করে কোনো ধ্বংসজ্ঞক কাজ না করে কেউ যদি তার সাধনা করতে না পারে তবে প্রশ্ন উঠবে অসাম্প্রদায়িতার সংজ্ঞা নিয়ে… মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে…। সমঝোতা করে যদি পার পাওয়া যায় তবে রাষ্ট্রীয় বড় বড় মামলাগুলোতেও কি সে সুযোগ রয়েছে? যদি না থাকে তবে এই ঘটনার অবশ্যই বিচার হওয়া উচিত। তাই এই ঘটনার সুষ্ঠ বিচার রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এপ্রিল ২০১১

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

২ Comments

  • বোকা , সোমবার মার্চ ৪, ২০১৯ @ ৩:৫৪ অপরাহ্ন

    এই ঘটনার কি কোন বিচার হইছিল পরে?

  • ভবঘুরে , রবিবার মার্চ ২৪, ২০১৯ @ ১:৫১ অপরাহ্ন

    অনেক চেষ্টার পর একটা মামলা করা গিয়েছিল…
    পরে সেই মামলাও সম্ভবত তুলে নিতে হয়…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!