গুরুকুল গুরুশিষ্য পরম্পরা সাধু

-মূর্শেদূল মেরাজ

ছয়
মোক্ষ, মুক্তি বা নির্বানের জন্য গুরুর ভূমিকা অপরিসীম। গুরুবাদীদের কাছে গুরুই সকল কিছুর সূচনা, বর্তমান এবং সমাপ্তি। অর্থাৎ গুরুই ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, ‘অগ্রে কর গুরুপুজা শেষে পুজ মোরে’। অর্থাৎ ‘ভগবানের পুজার আগে গুরু পুজা করো।’

আরো বলা হয়েছে, ‘দেবতা রুষ্ট হলে তাকে মানানো যায়, কিন্তু গুরু রুষ্ট হলে তাকে মানানোর সাধ্য দেবতারও নেই।’ সে কারণে সকল শাস্ত্র-ধর্ম-দর্শন-মতাবাদেই গুরুকে দেয়া হয়েছে বিশেষ মর্যাদা। ভিন্ন ভিন্ন মত-পথ-দর্শনে গুরু’র সংজ্ঞা-প্রকৃতিতে আপাত কিছুটা ভিন্নতা লক্ষ্য করা গেলেও; মূল একই।

চৈতন্য চরিতামৃতে বলা হয়েছে-

ব্রহ্মাণ্ড ভ্রমিতে কোন ভাগ্যবান জীব।
গুরু-কৃষ্ণ-প্রসাদে পায় ভক্তিলতা বীজ।।

গুরুবাদীদের বিশ্বাস, গুরুর সাথে তুলনা চলে এমন কিছুই নেই এই বিশ্ব চরাচরে। এমন কিছু হতেও পারে না। হওয়া সম্ভবও নয়। এই বিশ্বাস নিয়েই শিষ্যরা গুরুর স্মরণাপন্ন হন। নিজেকে সমর্পণ করেন গুরুর চরণে। নিবেদন করেন নিজের সকল ভক্তি-শ্রদ্ধা।

মাতৃগুরু, পিতৃগুরু, শিক্ষাগুরু, কুলগুরু, দীক্ষাগুরু ছাড়াও আরো অনেক গুরুর কথাই শাস্ত্র-ধর্ম-দর্শনে উল্লেখ পাওয়া যায়। জীবনে চলার পথে প্রাপ্ত সকল গুরুই ভক্তি-শ্রদ্ধার দাবীদার। তবে গুরুবাদীরা একজনকেই চূড়ান্ত বিচারে জীবনের পাথেয় হিসেবে গুরুরূপে নির্বাচন করেন।

যিনি মনের সকল অন্ধকার দূর করে পরমের সাথে লীন হবার পথ উন্মুক্ত করেন তিনিই গুরু। আর গুরু যদি সদগুরু হন তাহলে শিষ্যের সকল যম যাতনা দূরীভূত হয়। তাই শিষ্যে চোখে গুরু হলেন পরম পাথর। যার সংস্পর্শে পাপীও পরিত্রাণ পায়। আপস্তম্ব গৃহ্যসূত্রে বলা হয়েছে-

স হি বিদ্যাতঃ তং জনয়তি তদস্য শ্রেষ্ঠং জন্ম।
মাতাপিতরৌ তু শরীরমেব জনয়তঃ।।

অর্থাৎ মাতাপিতা জন্ম দেন সত্য। কিন্তু সত্যিকারের জন্ম হয় গুরুর হাতে, আর সেই জন্মই শাস্ত্রবিদের মতে শ্রেষ্ঠ জন্ম।

ভারতবর্ষ সাধুগুরুর দেশ। এ অঞ্চলে প্রচলিত প্রায় সকল প্রাচীন ধারার ধর্ম-দর্শন-মত-পথ অর্থাৎ আস্তিক্য ও নাস্তিক্য উভয় মতবাদই গুরুকে সর্বোচ্চ স্থানে রেখেছে। এখানে গুরুভক্তি দিয়েই সকল কাজের সূচনা হয়। সেটাই রীতি।

গুরুবাদে গুরু যেমন শিষ্যকে প্রতিনিয়ত পরীক্ষার মধ্যে রাখে তেমনি শিষ্যও তার আনুগত্য প্রদর্শনের নানা পথ খুঁজে বেড়ায়। সেকারণে গুরুবাদকে বাইরে থেকে দেখে এর তল খুঁজে পাওয়া মোটেও সহজ নয়। তাই অনেক সময় দেখা যায় বাইরে থেকে কোনো গুরু বা সম্প্রদায়ের নামে নানা অপবাদ-অনাচারের কথা প্রচারিত থাকলেও; শিষ্যকুলের কাছে গুরু সকল সময়ই-সকল অবস্থাতেই পূজনীয়।

কিন্তু কোনো কোনো সম্প্রদায় বা গুরুর স্বেচ্ছাচারী আচরণ-মনোভাব এবং বিকৃত নানাবিধ আচারের খবর ছড়িয়ে পরলে সাধারণ মানুষের গুরুবাদের উপর আস্থা অনেকটা কমতে শুরু করে। অনেকে ধর্ম রক্ষার্থে কুলগুরুকে নমনমো করে দায় সেরেছে।

অন্যদিকে পাশ্চাত্য ধারার শিক্ষাব্যবস্থা এ অঞ্চলে প্রসার লাভ করলে। সে শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ গুরুবাদকে গোড়ামী আক্ষা দিয়ে, তার থেকে যোজন যোজন দূরে চলে যায়। এ সময় গড়ে ওঠা বা ভারতবর্ষের বাইরে থেকে আগত ধর্মমতগুলোতে গুরুবাদের কঠিন বিরোধীতাও প্রকাশ্যে আসে।

আবার অনেক ধর্ম-মতাদর্শে গুরুবাদের আধিপত্যের কারণে সামাজিক অধিকার হারিয়ে নিম্নবিত্ত বিদ্রোহী হয়ে উঠে। তাদের মধ্যে গুরুবাদ বিরোধী কিছু মতও বিকাশ লাভ করে। আবার এটিও দেখা যায় একই ধর্ম-দর্শন-মতাদর্শের একটি শাখা গুরুবাদের উপর ভিক্তি করে গড়ে উঠলেও; অপর আরেকটি শাখা হয়তো ভিন্ন কথা বলে। তারা হয়তো গুরুবাদের ঘোর বিরোধী।

ভারতবর্ষে গুরুবাদের বিভিন্ন ধারা প্রচলিত থাকায় গুরুবাদ সম্পর্কে যাদের সম্মুখ ধারণা নেই। তাদের কাছে এটি এক গভীর রহস্য। কারণ গুরুবাদের মূলকথা সবসময়ই থাকে গুপ্ত। তা গুরু-শিষ্য ভিন্ন বাইরের কেউ জানতে বা সঠিকভাবে বুঝতে পারে না।

গুরুবাদে গুরু যেমন শিষ্যকে প্রতিনিয়ত পরীক্ষার মধ্যে রাখে তেমনি শিষ্যও তার আনুগত্য প্রদর্শনের নানা পথ খুঁজে বেড়ায়। সেকারণে গুরুবাদকে বাইরে থেকে দেখে এর তল খুঁজে পাওয়া মোটেও সহজ নয়। তাই অনেক সময় দেখা যায় বাইরে থেকে কোনো গুরু বা সম্প্রদায়ের নামে নানা অপবাদ-অনাচারের কথা প্রচারিত থাকলেও; শিষ্যকুলের কাছে গুরু সকল সময়ই-সকল অবস্থাতেই পূজনীয়।

তাই সমাজে কে প্রকৃত সদগুরু আর কে গুরু সেজে বসেছে তা নির্ণয় করা আরো কঠিন। সে কারণে সাধারণ মানুষের কাছে গুরু ও গুরুবাদের মূল রস অধরাই থেকে গেছে চিরকাল। আর এইসব ধোয়াশার জন্যই গুরুবাদ নিয়ে সমাজে প্রচলিত আছে না বিভ্রান্তি।

অন্যদিকে ভারতবর্ষের ইতিহাসে দেখা যায়, এখানে প্রত্যেক শাসক এবং শাসন ব্যবস্থাতেই গুরুদের বিশেষ মর্যাদা ছিল। রাজ্য পরিচালনায়ও গুরুদের ভূমিকা ছিল ব্যাপক। কেবল ধর্মীয় বিষয়াদিতেই নয় শাসন ব্যবস্থা, এমনকি যুদ্ধ বিগ্রহের জন্যও গুরুদের মতামত-উপদেশ-পরমার্শকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হতো।

সাত
তবে কি সকলেরই গুরু প্রয়োজন? সকলকে কি গুরু ধরতেই হবে? এ ছাড়া কি নিস্তার নেই? এমন অনেক প্রশ্নই মনে জাগতে পারে। আর জাগাই স্বাভাবিক। এ প্রশ্নের উত্তর সাধারণ ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়- যখন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে। যে প্রশ্ন অজানাকে জানার প্রশ্ন। যে প্রশ্ন অদেখাকে দেখার প্রশ্ন।

যে প্রশ্ন বিশ্বাসের ভিত নড়িয়ে দেয়। যে প্রশ্ন করা শাস্ত্রে পর্যন্ত বারণ। যে প্রশ্ন যথাতথা যাকে তাকে বলা যায় না। আবার সেই প্রশ্নকে ভুলে থাকাও যায় না। যে প্রশ্নের জবাব না জানা পর্যন্ত জীবনের বিশ্বাসে বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী হয়ে ওঠাও দায় হয়ে ওঠে।

আধ্যাত্মবাদ বলে- যার মনে ভক্তি আছে, নির্মলতা আছে, চিন্তায় শুদ্ধতা আছে তারাই সদগুরুর কাছে নিজেকে সমর্পন করতে পারে। ভাববাদীরা বলেন, একবার এ পথে পা মাড়ালে তার আর নিস্তার নেই। আজ হোক কাল হোক, বিশ্বাস করুক না করুক এই প্রেমের সাগরে তাকে ডুবতেই হবে। এটাই বিধান।

এমন প্রশ্ন যখন যার মনে জাগে তাকেই গুরুর সন্ধান করতে হয়। তাকে বলে না দিলেও, পথ দেখিয়ে না দিলেও, সে ঠিকঠিকই গুরুর সন্ধানে নেমে যায়। তবে সকলেই এসকল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আধ্যাত্মিক গুরুর স্মরণাপন্ন হয়; তা অবশ্য নয়। অনেকে এই সব অবদমিত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বইপত্র-রেফারেন্সের আশ্রয় নেয়।

যুক্তিতে ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চেষ্টা করে। অনেকে পরিচিতের মাঝে যাদের জ্ঞান আছে বলে ভাবে, তাদের স্মরণাপন্ন হয়। অনেকে মনের গোপন কুঠুরিতে প্রশ্নমালা লুকিয়ে রেখে স্বাভাবিক জীবন যাপনে রতও থাকে।

আসলে মনে সমর্পনভাব না জাগ্রত হলে, গুরুর সন্ধান যেমন পাওয়া যায় না। আবার সেই ভাব না থাকলে সন্ধান পেলেও গুরুর কাছ থেকে কিছুই আদায় করা যায় না। ভক্তি-শ্রদ্ধা-সমর্পণ ভাব সর্বোপরি প্রেমের জাগরণই গুরুর কাছ থেকে গুরুজ্ঞান লাভের একমাত্র পথ। যতক্ষণ সংশয়-সন্দেহ-বিচারভাব জাগ্রত থাকে ততক্ষণ মানুষ গুরুর কাছে সমর্পিত হতে পারে না।

আধ্যাত্মবাদ বলে- যার মনে ভক্তি আছে, নির্মলতা আছে, চিন্তায় শুদ্ধতা আছে তারাই সদগুরুর কাছে নিজেকে সমর্পন করতে পারে। ভাববাদীরা বলেন, একবার এ পথে পা মাড়ালে তার আর নিস্তার নেই। আজ হোক কাল হোক, বিশ্বাস করুক না করুক এই প্রেমের সাগরে তাকে ডুবতেই হবে। এটাই বিধান।

ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সুফিবাদ-ফকিরি সকল ভক্তিবাদেই গুরুবাদ হলো মূল পরম্পরা। আর এই গুরুকে কেন্দ্র করে যে বিশেষ তিথি অর্থাৎ ‘গুরুপূর্ণিমা’; তা সকলের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। আসলে গুরুকে ভক্তি প্রদর্শনের বিন্দুমাত্র ছাড়ও শিষ্য দিতে চায় না। আর এই মহালগ্ন কে আর হেলায় অবহেলা করে!

তাই সকলেই নিজ নিজ রীতি-আচার-উপাচারে ভক্তিভরে গুরুপূর্ণিমা পালন করে। অনেকে গৌড়াঙ্গ মহাপ্রভুর জন্মতিথির পূর্ণিমা গৌড়ীয় বা দোল পূর্ণিমায় পালন করে গুরুপূর্ণিমা। অনেকে আবার গুরুপূর্ণিমাকে বিশেষ পূর্ণিমায় আবদ্ধ না রেখে আরো বিস্তৃত করেছে। ফকির লালন সাঁইজি বলছেন-

আমি বলি তোরে মন
গুরুর চরণ কর রে ভজন,
গুরুর চরণ পরম
রতন কর রে সাধন।।

মায়াতে মত্ত হলে
গুরুর চরণ না চিনিলে,
সত্য পথ হারাইলে
সব খোয়ালে গুরু-বস্তু ধন।।

ত্রিপীনের ত্রিধারে
মীনরূপে গুরু বিরাজ করে,
কেমন করে ধরবে তারে
মনরে অবুঝ মন।।

মহতের সঙ্গ ধরো
কামের ঘরে কপাট মারো,
ফকির লালন বলে, কোলের ঘোরে
হারালি রে পরশ রতন।।

আট
শাস্ত্র বলে, গুরুর স্মরণ না করলে কোন কাজই সিদ্ধ হয় না। তাই অনুরাগী ভক্তকুল গুরুর স্মরণ না করে নি:শ্বাস পর্য্ন্ত নিতে চায় না। চাতক পাখি যেমন মেঘের জল বিনে জল পান করে না। তেমনি উপযুক্ত শিষ্য গুরু রূপ দর্শন না করে কিছুই করে না।

সাধুরা বলেন, গুরুর জন্য মন প্রকৃত ব্যাকুল হলে, তবেই গুরুর আগমন ঘটে। সাধুগুরুর সান্নিধ্যে থাকতে থাকতে, সাধুসঙ্গ করতে করতে মনে ব্যাকুল ভাবের উদয় হয়। আর ব্যাকুলতা আসলে সদগুরু লাভ হয়। কখনো সদগুরু নিজেই এসে সম্মুখে দাঁড়ান। কখনো হন্য হয়ে খুঁজেও তাঁর দেখা মেলে না। পূর্বজন্মের সুকীর্তি থাকলে তবেই না খুঁজেও গুরু লাভ করে।

অনেকে জীবনের পর জীবন গুরুর সন্ধান করে করেই কাটিয়ে দেয়। আবার অনেকে গুরুকে সম্মুখে পেয়েও সিদ্ধান্তের অভাবে গুরুমুখী হতে পারে না। মনের সংশয়ভাব দূর না হলে গুরুর কাছে সমর্পণ করা কঠিন। গুরুমুখী হওয়ার জন্য সমর্পণভাব যেমন জরুরী তেমনি জরুরী সন্দেহমুক্ত হওয়া।

তবে মনে একবার বৈরাগ্যভাব জাগলে। গুরুর সন্ধান শুরু করলে তবে আর নিস্তার নেই। যতক্ষণ না গুরুর সন্ধান পাওয়া যায় ততক্ষণ জীবন হাহাকারে ভরে উঠে। গুরুর সন্ধানে ব্যাকুল হয়ে অনেকে এ পর্যায়ে ঘর পর্যন্ত ছাড়ে। অনেকে হয় বিবাগী। মহাভারতের বনপর্ব উল্লেখ আছে-

‘ন বিনা গুরুসম্বন্ধ জ্ঞানস্যাধিগমঃ স্মৃতঃ।’

অর্থাৎ গুরুর সঙ্গে সম্পর্ক সাধিত না হলে প্রকৃত জ্ঞান প্রাপ্তি ঘটে না।

স্বামী পরমানন্দ বলেছেন, ‘তোমাকে সদগুরু খুঁজতে হবে না, তিনিই তোমাকে খুঁজে নেবেন। তোমার অন্তরে ভগবৎ লাভের আকাঙ্ক্ষা হলেই তোমার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হবে।’

(চলবে…)

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

……………………………….
আরো পড়ুন:
গুরুপূর্ণিমায় গুরু-শিষ্য পরম্পরা: এক
গুরুপূর্ণিমায় গুরু-শিষ্য পরম্পরা: দুই
গুরুপূর্ণিমায় গুরু-শিষ্য পরম্পরা: তিন
গুরুপূর্ণিমায় গুরু-শিষ্য পরম্পরা: চার
গুরুপূর্ণিমায় গুরু-শিষ্য পরম্পরা: পাঁচ
গুরুপূর্ণিমায় গুরু-শিষ্য পরম্পরা: ছয়

গুরুপূর্ণিমা
গুরুপূর্ণিমা ও ফকির লালন

 

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!