মতুয়া সংগীত

গুরু কৃপা দীনে

স্তব
গুরু কৃপা দীনে অধম অধীনে
অনন্ত অসীম স্বামী
নরাকারে নাথ করি কৃপাপাত
নামিলে মনত ভূমি।।
ছিলে নিরাকার নিলে নরাকার
স্বরূপে সাকার হলে।
আপনা আপনি নিগুণ হে গুণি।
সগুণ সাজিয়া রলে।।
রসে রসময় লীলা লালসায়
অসীম সাজিলে সান্ত।
স্বাদিতে আপনে বিবিধ বিধানে
করুণ-কোমল-কান্ত।
অসীম-অ-সীমা সেথা তোমা আমা
পরিচয় নাই পাই।
সীমায় সীমানা সেথা জানা-শোনা
বাধা বিঘ্ন বটে নাই।।
ইচ্ছায় ঈশ্বর রচে চরাচর
সাকারে আকার ধরে।
ভাগে ভগবান এক বহু হন
বহুধা বিভাগ করে।।
নিজ-রস নিজে রস-লিপ্সু সেজে
পাণি পাতি করে পান।
ভক্ত ভগবান ভিন্ন-ভাব ভাণ
নিয়ে করে নিজে দান।।
যে-ঘটে যা ঘটে তোমাতে তা বটে
ঘট-কর্তা ঘটময়।
তার হে তারক তাপিত তারক
মৃত্যুহারী মৃত্যুঞ্জয়।
ওহে নিরাকার নিয়েছ আকার
নরের আকার ধারী।
যুগে যুগে তুমি সাজি যুগ স্বামী
ধবারে ধরিলে হরি।
ধ্যানে ধরাধর ধরণী-ধাতার
ধরমে ধরিলে ধরা।
মৎস্য মহান গুণে গরীয়ান
উদকে উদ্ধার করা।।
কুর্ম্ম-ক্রিয়া করি বদ্ধ করি বারি
জগতে জাগালে সুখে।
বরি বর দেহ বিরাট বরাহ
দর্পহারী দন্তে মুখে।।
নরের “আয়ণ” নাম নারায়ণ
বরিলে বামন দেহ।
নর আর সিংহ সাজিলে নৃসিংহ
নারকীরে নাহি স্নেহ।।
নাশিলে ক্ষত্রিয় পীড়িতের প্রিয়
জামদগ্নি অবতার।
দূর্ব্বাদল-কান্তি দয়া, ক্ষমা, শান্তি
শ্রীরাঘব রঘুবর।।
বেনু বাজে বনে গোপী মরে প্রাণে
যমুনা উজানে ধায়।
রা’ রা রবে রাধা মিছে চুল-বাঁধা
কলসী কক্ষেতে কয়।।
“শুন লো সজনি জলকে যাবি নি?
আঁধার আসিছে চুপে।
সে’ত ছলা-কলা শুধু কথা বলা
মন-হারা কালো রূপে।।
ফুরা’ল সে-অঙ্ক বেণূ হ’ল শঙ্খ
আশঙ্কা অসুর-কুলে।
কুরুক্ষেত্র রণে সুজন অর্জ্জুনে
বিশ্ব-রূপে দেখা দিলে।।
থামিল তরঙ্গ লীলা হল সাঙ্গ
উত্তঙ্গ হিমাঙ্গ-পদে।
রঙ্গের শিখরে গোমতীর শিরে
জনহীন জনপদে।।
সেদিনে সদায় রক্তের রেখায়
মত্ত মানব দল।
ছিনিমিনি ছলে অতি অবহেলে
বলহীনে বাধে খল।।
অরুণ-অরুণ কোমল-করুণ
কম-কান্তি কৃপাময়।
বুদ্ধ-মুর্ত্তি ধরে শুদ্ধোধন ধরে
রাজপুত্র রাজালয়।।
প্রেম পবিত্রতা অহিংসা-বারতা
জানা’লে জগত-জনে।
ভাই ভাই তাই ভিন্ন ভাব নাই
পরম পীরিত প্রাণে।।
মায়ার মায়ায় সাগর শুকায়
মরুময় মর ধরা।
তুলিলে তরঙ্গ সাজিলে গৌরাঙ্গ
নদীয়ায় নম-গোরা।।
বেহালের বেশে দিলে দেশে দেশে
মধুমাখা হরিনাম।
গলিল গৌরাঙ্গ ব্রজরাণী-অঙ্গ
মিশিল পুরুষোত্তম।।
বুকের বেদনা কিছুতে শোধে না
সাধা সাধি হ’ল সার।
হলে হরিচাঁদ পূর্ণিমার চাঁদ।
পরিপূর্ণ পারাবার।।
যুগল চরণ রকত বরণ
রেশম বরণ কান্তি।
চারু চন্দ্রানন সুদৃশ্য দশন
ঊন নহে এক ক্রান্তি।
নিটোল কপোল বরণে ধবল
অমল মোহন জ্যোতিঃ।।
রক্ত-রাগ শোভা আঁখি মনোলোভা
তরুণ অরুণ-ভাতি।
দীর্ঘ দুই ভূজ বিশ্ব মনোসিজ
‘শাল-প্রাংশু’ বলি কহে।
অতুলন ধন সে-ধন কখন
বচন-বাঁধনে রহে?
সুন্দর ললাট সুপ্রশস্ত তট
তিল ফুল জিনি নাসা।
কেশদাম জিনি ফণীণী-নাগিণী
রাগিণী-কিঙ্কিণী-ভাষা।।
ললিত-লোচন অরুণ-বরণ
ক্ষরিছে করুণা-ধারা।
শীতলিয়া যায় করুণা ধারায়
জর-জর-জারা ধরা।।
অতল সলিলে যথা মণি জ্বলে
দীনবেশে-ঢাকা হরি।
রূপের মাধুরী দু’নয়ন ভরি
হেরিয়া ঝুরিয়া মরি।
শান্ত-সদানন্দ অসীম আনন্দ
প্রেমানন্দ-ময়-বিভু।।
করহে করুণা দিয়ে কৃপা-কণা
পেতে যোগ্য নহি কভু।।
চরণ শরণ আমি অভাজন
করিলাম করপুটে।
আমার আমাকে দিয়াছি তোমাকে
রাখহে চরণ তটে।।
গুরু মৃত্যুঞ্জয় যাঁর করুণায়
এ-ভাগ্য ঘটিল মোর।
পদতটে তাঁর কোটি নমস্কার
অঞ্জলি নয়ন-লোর।।
রচন-বচন শুধু অকারণ
কারণ-কারণ তুমি।
মূঢ় মন্দমতি তাই গাঁথা গাঁথি
অবোধ অজ্ঞান আমি।
অপরাধ ক্ষম প্রিয় প্রিয়তম মম
করিয়াছি অসম্ভ্রম।
বিশ্বময় হরি দুঃখ তাপ-হারী
রাতুল চরণে নমঃ।।
স্তব করি সে তারক পুনঃ পদে পড়ে।
পুনরায় মৃত্যুঞ্জয় তারে তুলে ধরে।।
প্রভু বলে “রে তারক! সুস্থ হও এবে।
বল দেখি ওড়াকান্দী এলে কিবা ভেবে?”
তারক কান্দিয়া কয় “ওগো অন্তয্যামি।
তৃণ হয়ে সিন্ধু বারি মাপিয়াছি আমি।।
ঠাঁই নাই এবে দেখি আমি ভেসে যাই।
দয়াকরে ধর মোরে এই ভিক্ষা চাই।।”
প্রভু বলে “তাই হোক ধরিলাম তোরে।
মিত্যুনে দেখাল পথ তারে ছেড়ে নারে।।
যাও এবে দেশে চলি হয়োনা মলিন।
তারক রে! তোর লাগি আমি যে জামিন।।
হায়! হায়! করি সাধু পড়ে পুনর্ব্বার।
“ওহোরে দয়াল বন্ধু! বলে বারে বার।।
এই ভাবে কৃপাদৃষ্টি লভিল তারক।
নিজে মাতে আর সাথে মাতে কত লোক।
হরি-কৃপাগুণে পেল অলৌকিক শক্তি।
মন-প্রাণ করে সারা পদে অনুরক্তি।।
সংক্ষেপে বলিব কিছু সেই পরিচয়।
বিস্তৃত বলিতে গেলে পুথি বেড়ে যায়।।
মৃত্যুঞ্জয় পদে বসি শাস্ত্র শিখি নিল।
এব শুন কবিগানে কিসে শ্রেষ্ঠ হল?
ধন্য সে তারকচন্দ্র হরি-প্রিয় যিনি।
পদে দন্ডবৎ করি লোটায় ধরণী।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!