মতুয়া সংগীত

ছিল যত লোকজন

ওড়াকান্দী মধ্য ইংরাজী বিদ্যালয়
স্থাপন ও ডক্টর মিডের আগমন

ওড়াকান্দী বাসী ছিল যত লোকজন।
ঘৃতকান্দী নমঃশূদ্রে করিল মিলন।।
সকলে মিলিয়া চলে ঠাকুরের বাড়ী।
প্রণাম করিল সবে প্রভু পদে পড়ি।।
প্রভু বলে “শশীরে ডাকিয়া বল কথা।
তার সাথে আলাপনে কহ নিজ-ব্যথা।।
তবে তো সকলে গেল বড় বাবু ঠাঁই।
বলে “বাবু শুন বলি দুঃখের বালাই।।
আশা করি জ্ঞাত আছ সব সমাচার।
করেছে গিরিশ বসু যেই ব্যবহার।।
তব পিতা গুরুচাঁদ দিলেন আদেশ।
শিক্ষা দিয়া রক্ষা কর নিজ জন্ম দেশ।।
মধ্য ইংরাজী স্কুল করিবারে চাই।
তুমি যদি সাথে থাক ভয় নাহি পাই।।
তোমাকে ভরসা করি এ জাতি-তরণী।
ভাসা’ব অকূল নীরে ভয় নাহি গণি।।

কোন মতে কোন পথে তাহা করা যায়।
দয়া করি বড় বাবু বলুন উপায় “।।
স্বজাতি প্রধান বর্গ এই যদি বলে।
বড় বাবু বলে কথা অতি কুতূহলে।।
“নিবেদন করি আমি স্বজাতির ঠাঁই।
জাগুক আমার জাতি এই মাত্র চাই।।
যে অবধি শুনিয়াছি ছলনা পেয়েছি।
মনো দুঃখে ঘরে যেন মরিয়া রয়েছি।।
হেন দুর দৃষ্ট কেন হ’ল সবাকার।
মনে মনে করিতেছি তাহার বিচার।।
পিতা যবে বলিলেন কথা সবাকারে।
সকল শুনেছি আমি থাকিয়া অন্তরে।।
পিতৃ – আজ্ঞা পেলে মোর কোন বাধা নাই।
গড়া’ব দেশেতে স্কুল মিলিয়া সবাই “।।
বড় বাবু কাছে জানি এ হেন বারতা।
সবে এল মহাপ্রভু আছিলেন যথা।।
কথা বার্ত্তা ঠিক হল স্কুল খোলা হবে।
বাকী শুধু স্থান লাগি স্থান কেবা দিবে।।
প্রভু বলে “স্থান লাগি কোন চিন্তা নাই।
যত লাগে দিব স্থান স্কুল করা চাই “।।
ঠাকুরের ভিটা ছিল বাড়ীর পশ্চিমে!
বাড়ী মধ্যে গণ্য তাহা হল ক্রমে ক্রমে।।
স্কুল লাগি সেই ভিটা দিলেন ঠাকুর।
এই ভাবে স্থানা ভাব হল তবে দূর।।
এই মত হল সেথা স্কুলের পত্তন।
প্রধান শিক্ষক হল শ্রী শশি ভূষণ।।
পণ্ডিতজী রঘুনাথ অতি গুণধাম।
এতদিনে পূর্ণ তাঁর হল মনস্কাম।।
শিক্ষকতা কার্য ছাড়ি যেতে নাহি চাহে।
দ্বিতীয়-পণ্ডিত রূপে এই স্কুলে রহে।।
দলে দলে ছাত্র আসি ভর্ত্তি হল পরে।
পড়িল শিক্ষার সাড়া প্রতি ঘরে ঘরে।।
উত্তম শিক্ষক ছিল শ্রী শশিভূষণ।
তার শিক্ষাগুণে বাধ্য ছিল ছাত্র গণ।।
এই ভাবে কত দিন চলিল স্কুল।
নমঃশূদ্রে শিক্ষা পেল এই তার মূল।।
দেখা দেখি দেশে দেশে নমঃশূদ্র গণ।
স্কুল পাঠশালা আদি করিল গঠন।।
ফরিদপুরের মধ্যে গোপাল গঞ্জেতে।
নমঃশূদ্রে শিক্ষা পেল সবে এই মতে।।
তাহার প্রমাণ দেখি আজো বর্ত্তমান।
শিক্ষা – ক্ষেত্রে ফরিদপুর লভে শীর্ষস্থান।।
নমঃশূদ্র কৃষ্টি বলি যাহা কিছু আছে।
ফরিদপুরের মধ্যে উদ্ভব হয়েছে।।
ক্রমে ক্রমে পাশ্ববর্ত্তী জেলা সমূদয়।
এই শিক্ষা-স্রোত নিয়ে সবে ধন্য হয়।।
গোপালগঞ্জের মধ্যে ওড়াকান্দী গ্রাম।
হরি – আগমনে হল পুণ্যময় ধাম।।
অন্ধজনে দিতে আলো অমানীকে মান।
ওরাকান্দী অবতীর্ণ হল ভগবান।।
যেই আলো ভগবান প্রথমে জ্বালিল।
শতগুণে গুরুচাঁদ বর্দ্ধিত করিল।।
সেই আলোকের জ্যোতিঃ আজি দিশিদিশি।
উজ্জ্বল করেছে ধরা অন্ধকার নাশি।।
তা’তে বলি নমঃশূদ্র – কৃষ্টি যাহা কিছু।
আগে এল ওড়াকান্দী সবে পেল পিছু।।
এই সব কাণ্ড দেখি কায়স্থ সকলে।
কিবা হল কিবা হবে সবে ইহা বলে।।
এই ভাবে ঘরে ঘরে করে কানাকানি।
শুন সবে কি করিল প্রভু গুণমনি।।
শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুচাঁদে যাহা দেখিয়াছি।
তাহা মাত্র এই খণ্ডে আমি বলেতেছি।।
ধর্ম্ম – তত্ত্বে কিবা হল কেবা ধর্ম্ম পায়।
পশ্চাতে বলিব তাহা প্রভুর কৃপায়।।

তবু বলি সর্ব্বজনে মূল তত্ত্ব সার।
সর্ব্বনীতির মধ্যে রহে গুরুচাঁদ আমার।।
শিক্ষা আন্দোলন যবে প্রভু করে দেশে।
ভকত সুজন যত তার কাছে আসে।।
নমঃশূদ্র তেলী মালী আর কুম্ভকার।
কপালী মাহিষ্য দাস চামার কামার।।
পোদ আসে তাঁতী আসে,আসে মালাকার।
কতই মুসলমান আসে ঠিক নাহি তার।।
সবাকে ডাকিয়া প্রভু বলে এই বাণী।
“শুন সবে ভক্তগণ আমি যাহা জানি।।
নমঃশূদ্র কুলে জন্ম হয়েছে আমার।
তবু বলি আমি নাহি নমঃর আকার।।
দলিত পীড়িত যাঁরা দুঃখে কাটে কাল।
ছুঁসনে ছুঁসনে বলে যত জল – চল।।
শিক্ষা-হারা দীক্ষা-হারা ঘরে নাহি ধন।
এই সবে জানি আমি আপনার জন।।
সবাকারে বলি আমি যদি মান ‘ মোরে।
অবিদ্বান পুত্র যেন নাহি থাকে ঘরে।।
খাও না বা খাও তা’তে কোন দুঃখ নাই।
ছেলে পিলে শিক্ষা দেও এই আমি চাই।।
বঙ্গ দেশ ভরি ‘ বার্ত্তা গেল অল্পকালে।
দেশে দেশে স্কুল করে ভকতের দলে।।
কি ভাবে ব্যাপক হল এই শিক্ষা নীতি।
সে কাহিনী আমি নাহি বলিব সম্প্রতি।।
ভক্ত সঙ্ঘ পরিচয় দিব যেই কালে।
সেই সব বার্ত্তা আমি ক’ব কুুতূহলে।।
আর এক কথা মোর মনেতে হইল।
নমঃশূদ্র কি কারণে অগ্রগামী হল।।
এই বঙ্গ সমাজেতে করিলে বিচার।
দুই-দল লোক দেখি বিভিন্ন প্রকার।।
চর্ব্ব চোষ্য লেহ্য পেয় খাদ্যাদি ভক্ষণ।
খট্টা ‘ পরে অট্টালিকা মধ্যেতে শয়ন।।
সুবেশ সুকেশধারী সুখে বসবাস।
বহুমূল্য শাল গায়ে শয্যায়-ফরাস।।
জমিদার মহাজন বিদ্বান পণ্ডিত।
এই সব ধন মানে তাহারা ভূষিত।।
জাতি-ভেদ ইহাদের মধ্যে কিছু নাই।
ব্রাহ্মণ মুসলমান একদল ভাই।।
অন্য দলে দেখি যারা সবে অন্নহীন।
বহু কষ্টে কোন ক্রমে কেটে যায় দিন।।
বসন ভূষণ সব সামান্য প্রকার।
কুঁড়ে ঘরে বাস করে ব্যাধির আগার।।
বুকে ব্যথা তবু মাথা পেতে কষ্ট সয়।
ডাল ভাত পেলে দুটি তাতে তুষ্ট রয়।।
এ দলেও নাহি দেখি কোন জাতিভেদ।
এক সাথে হাসে কাঁদে করে এক-খেদ।।
এই দল মধ্যে নমঃশূদ্র বলবান।
আরো সেই ঘরে এল স্বয়ং ভগবান।।
ধর্ম্ম-রাজ্য বিস্তারিতে শক্তি থাকা চাই।
শক্তি মান ঘরে হরি অবতীর্ণ তাই।।
নমঃশূদ্রে ভিত্তি করি দয়াল ঠাকুর।
পতিতের ব্যথা যত সব কৈল দূর।।
আদর্শ রাখিলা প্রভু নমঃশূদ্র ঘরে।
সে আদর্শ পেল সবে ক্রমে পরস্পরে।।
প্রেম-বন্যা-ঢেউ ওঠে নমঃশূদ্র-ঘরে।
ঢেউ এল তাই পেল পরম পিতারে।।
সে – ঢেউ ছুটিল পরে জগৎ ডুবা’য়ে।
কিবা হিন্দু কিবা যবন গেলরে ভাষিয়ে।।
ভক্ত-সঙ্ঘ-পর্ব্ব যবে হইবে বর্ণনা।
সকলে দেখিবে তা’তে সে সব নিশানা।।
এবে মাত্র কহি কথা শিক্ষা – গতিধারা।
স্কুল পেয়ে নমঃশূদ্র কিবা করে তারা।।
জনে জনে ভক্তগণে প্রভু ডাকি কয়।
পাঠশালা কর সবে নিজ নিজ গাঁয়।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!