মতুয়া সংগীত

তারকের বিবাহ করিতে

শ্রীমত্তারকের বিবাহ
পয়ার।

তারকের বিবাহ করিতে ইচ্ছা নাই।
বিবাহ করিতে হবে কহেন গোঁসাই।।
অনেকে অনেক কহে বিয়া করিবারে।
আজীবন তারকের প্রতিজ্ঞা অন্তরে।।
বিবাহ করিতে প্রভু বল কি কারণ।
না করিব বিবাহ করেছি এই পণ।।
প্রভু কন যদি এই ভবে আসিলাম।
ভাবি মনে এক খেলা খেলিয়া গেলাম।।
চতুর্বিধ ধর্ম মধ্যে প্রধান গার্হস্থ্য।
গৃহস্থ ধার্মিক কর্ম অতি সুপ্রশস্ত।।
লোকে কহে ভ্রমি বারো ঘরে বসি তের।
এবার গৃহস্থ ধর্ম যোগে যত পার।।
তারক বলেন হরি বিবাহ করিব।
গৃহিণী গ্রহণ কৈলে পাশ-বদ্ধ হ’ব।।
অর্থ লোভে নারী লোভে কামাসক্ত হ’য়ে।
তব নাম প্রেম সব যাইব ভুলিয়ে।।
প্রভু কন মম বাক্যে বিবাহ করিলে।
নাম প্রেম বৃদ্ধি হ’বে মম বাক্য বলে।।
আমারে আদর করি করে পাপ কর্ম।
আমার ইচ্ছায় সেই হয় মহাধর্ম।।
মোরে অনাদর করি করে মহাধর্ম।
আমার ইচ্ছায় সেই হয় পাপকর্ম।।
এ বড় নিগূঢ় তত্ত্ব প্রভু মুখ বাক্য।
তদ্রুপ আমার বাক্য হৃদে কর ঐক্য।।
যদি অর্থ নারী লোভে মোরে ভুলে যাবি।
তবু মম দয়া বলে আমাকে পাইবি।।
তারক কহিছে মোর অর্থ কিছু নাই।
কেনা বেচা করি দিন আনি দিন খাই।।
প্রভু হরিচাঁদ কহে তাতে কেন ভাব।
যত অর্থ লাগে তাহা আমি তোরে দিব।।
বিবাহ করিতে প্রভু কন বার বার।
তারক বলেন যেই ইচ্ছা আপনার।।
আসিলেন মৃত্যুঞ্জয় সূর্যনারায়ণ।
প্রভু দু’জনারে কহে সব বিবরণ।।
তোমরা দু’জনে যাও সম্বন্ধ করিতে।
একেবারে চলে যাও ভাঙ্গুড়া গ্রামেতে।।
অগ্রে যাও গঙ্গারামপুর গ্রাম মাঝ।
যে মেয়ে শুনিবে কথা ক’র সেই কাজ।।
তারক চলিল দু’জনারে সঙ্গে ল’য়ে।
গঙ্গারামপুর গ্রামে উত্তরিল গিয়ে।।
সনাতন পাটনি সে দেখিতে পাইল।
সমাদর করি তার বাটী ল’য়ে গেল।।
বলে দয়া করি হেথা করুণ ভোজন।
সনাতন করিল পাকের আয়োজন।।
সেই গ্রামে শ্রীগোবিন্দ নামে ভট্টাচার্য।
তার বাটী হইতেছে তুলটাদি কার্য।।
একমাস পুঁথি হ’ল অদ্য উদযাপন।
এই বাড়ী পুঁথি হবে কহে সনাতন।।
সেই বাড়ী চলিলেন পুঁথি শুনিবারে।
চারি জন এক ঠাই বসে একত্তরে।।
পুঁথি কহে কথক বসিয়া ব্যাসাসনে।
মহাপ্রভু হরিচাঁদ বসে সেই খানে।।
মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস স্বচক্ষে দেখে তাই।
সেই পাঠ সাঙ্গ হ’লে আর দেখা নাই।।
মধ্যাহ্ন ভোজন করি ভাঙ্গুড়া আইল।
কৃষ্ণমোহনের বাড়ী উপনীত হ’ল।।
বলিলেন মৃত্যুঞ্জয় কৃষ্ণমোহনেরে।
এক মেয়ে চাহি মোরা এ ছেলের তরে।।
কহেন কৃষ্ণমোহন আছে এক মেয়ে।
ছেলের লবে না মন সে মেয়ে দেখিয়ে।।
কৃষ্ণ বর্ণা মেয়ে তত শ্রীমতিও নয়।
সে মেয়ে লন যদি তবে দেওয়া যায়।।
মৃত্যুঞ্জয় বলে মোরা শ্রীমতি না চাই।
কথা যদি শুনে তবে মেয়ে ল’য়ে যাই।।
আসিবার কালে ব’লে দিলেন ঠাকুর।
মেয়ে দেখিবারে যাও গঙ্গারামপুর।।
মেয়ে দেখি তথা হ’তে ভাঙ্গুড়া যাইও।
যেই মেয়ে কথা শুনে সে মেয়ে আনিও।।
কৃষ্ণমোহন বলে আমি সাথে সাথে যা’ব।
কি লইয়া যা’বে তথা সম্বন্ধের ভাব।।
বাতাসা লইতে হ’বে সে বাড়ী যাইতে।
তারক বলিল কপর্দক নাই সাথে।।
সোয়াসের বাতাসা লাগিবে পাঁচ আনা।
অবাক হইয়া বসি র’ল তিনজনা।।
হেনকালে একজন জিজ্ঞাসে তথায়।
তারক কাহার নাম আছে কি হেথায়।।
করিতে কবির দল বায়না কারণ।
বহু পথ পরিশ্রমে করেছি ভ্রমণ।।
গোবরা কাছারী হ’তে আমি আসিয়াছি।
জয়পুর গিয়া এই সংবাদ শুনিয়াছি।।
বিবাহের সম্বন্ধ করিতে তিনজন।
এইগ্রামে তারা নাকি ক’রেছে গমন।।
ভাঙ্গুড়া গ্রামের কথা শুনিলাম তথা।
এই যায় এই যায় শুনিলাম কথা।।
অনেকের ঠাই শুনি জিজ্ঞাসা করিলে।
এই যায় এই গেল অনেকেই বলে।।
আহারাদি করিলাম মনোখালী গ্রাম।
এই মাত্র তথা হ’তে আমি আসিলাম।।
যাওয়া মাত্র বায়নার টাকা ল’য়ে হাতে।
সেই লোক বিদায় করিল তরান্বিতে।।
সেই টাকা ভাঙ্গাইয়া বাতাসা কিনিয়া।
চলিলেন চারজন একত্র হইয়া।।
শ্যামচাঁদ কাঁড়ারের বাড়ী উতরিল।
মেয়েটি দেখিব বলে আলোচনা হ’ল।।
মেয়েটি লইয়া শ্যাম আসিল বাহিরে।
মেয়েকে বলিল দণ্ডবৎ করিবারে।।
মৃত্যুঞ্জয় চরণে করিল প্রণিপাত।
পদধূলি নিল শ্রীচরণে দিয়া হাত।।
মৃত্যুঞ্জয় বলে মা মাথার বস্ত্র ফেল।
শুনিয়া মাথার বস্ত্র অমনি ফেলিল।।
মৃত্যুঞ্জয় বলে মাতা মেল দু’নয়ন।
অমনি নয়ন করিলেন উন্মিলন।।
মৃত্যুঞ্জয় বলে মাতা চুল ছেড়ে দেও।
চুলের বন্ধন ছাড়ি ঘরে চলে যাও।।
অমনি দাঁড়ায়ে চুল বন্ধন ছাড়িল।
দণ্ডবৎ করি পরে গৃহে চলে গেল।।
সীতা যেন গবাক্ষে দেখিল রামরূপ।
তারকে নিরখি সতী হইল তদ্রুপ।।
অমনি সম্বন্ধ ঠিক করিল ত্বরায়।
সেই দিন রহিলেন শ্যামের আলয়।।
জিজ্ঞাসিল মৃত্যুঞ্জয় কি লইবা পণ।
শ্যাম বলে লইব না এই মোর পণ।।
গয়াধামে যাব আমি ভেবেছিনু মনে।
এ ছেলেকে কন্যা যদি দিতে পারি দানে।।
মেয়ে দিব এই মম আকাঙ্খা কেবল।
ঘরে বসে পাই তবে গয়া গঙ্গা ফল।।
যে হইতে মাতা জন্মে আমার ভবনে।
সেই হ’তে এই আশা সদা মোর মনে।।
ঈশ্বর মনের আশা করুণ পূরণ।
বিনা পণে কন্যাধনে করিব অর্পণ।।
সম্বন্ধ নির্ণয় করি প্রভুকে বলিল।
প্রভু বলে যার তার যুগে যুগে র’ল।।
প্রভু বলে শ্যাম যদি নাহি লয় পণ।
তথাপি বত্রিশ টাকা করিও প্রেরণ।।
তারক ভেবেছে মনে উপায় কি হবে।
গৃহে নাস্তি কপর্দক কিবা পাঠাইবে।।
মহাপ্রভু বলে ব’সে কি ভাবিস একা।
বৈশাখ মাসেতে বিয়া আমি দিব টাকা।।
মাঘ মাসে হ’ল সেই কার্য নিরূপণ।
চারি মাসে হ’ল সে টাকার সংস্থাপন।।
তিন তারিখেতে তিন ভাগে টাকা দিল।
পণ নয় সাহায্য বলিয়া পাঠাইল।।
বৈশাখ মাসের শেষ আটাশে তারিখ।
বিবাহের সেই দিন হ’য়ে গেল ঠিক।।
বিবাহের দিন একদিন অগ্রে তার।
বায়না কুন্দসী গ্রামে কবি গাওয়ার।।
সেই দিন গ্রামী লোকে ফলাহার দিতে।
এক মন দধির বায়না ছিল তাতে।।
এদিকেতে স্বজাতীর একত্র ভোজন।
বাজারের নেয়ে মাঝি খা’বে সর্বজন।।
বসিলেন সর্বজন ফলাহার জন্য।
পঞ্চাশ পঞ্চান্ন জন লোক হ’ল গণ্য।।
জলপানে পরিপূর্ণ আহার হইল।
সিকি দধি মাত্র তার খরচে লাগিল।।
সেই দই চিনি খই সঙ্গেতে করিয়া।
বরযাত্রা করিলেন নৌকায় উঠিয়া।।
পথে গিয়া সেই দধি সবে মিলে খায়।
চিনি চিঁড়ে দই খই যেন তেন রয়।।
ভাঙ্গুড়া গ্রামেতে গিয়া বাসাবাড়ী করি।
সেই সব দ্রব্য খাওয়াইল সেই বাড়ী।।
এ জাতির বিবাহ পদ্ধতি ব্যবহার।
কন্যা কর্তা বাড়ী কেহ না পায় আহার।।
কন্যা গৃহীতার তথা খেতে দিতে হয়।
যে না পারে না খাওয়ায়, পারিলে খাওয়ায়।।
(যে পারে সে খাওয়ায়, না পারিলে নয়।।)
সেই গ্রামে ভোজ দিতে কৈল আয়োজন।
ভোজ দিতে তণ্ডুল লাগিবেক দুই মণ।।
আর এক মণ লাগে সিধা পত্র দিতে।
চারি মণ দধি লাগে ভোজ ভোজনেতে।।
নিয়াছিল তারক তণ্ডুল চারি মণ।
এক মণ দধি তার আছে অর্ধ মণ।।
তিন মণ চাউল পাকের জন্য দিল।
দুই মণ পাক হ’ল এক মণ র’ল।।
অন্ন দেখি গ্রামবাসী সব লোকে কয়।
এই অন্নে হইবেক হেন মনে হয়।।
দুগ্ধ ক্রয় ক’রেছে পায়স রাঁধিবারে।
পায়স হইল পাক পাকশালা ঘরে।।
গ্রামবাসী এসে লোক বসাইয়া দিল।
দুই প্রাঙ্গণেতে লোক ভোজনে বসিল।।
ডাইল লাবড়া ভাজা ব্যঞ্জন অম্বল।
আহারান্তে সবে বলে উত্তম সকল।।
হয় নাই কভু কোথা এমন ভোজন।
পায়সান্ন দিতে জন্যে করে আয়োজন।।
হেনকালে একজন গোয়ালা আসিল।
দুই মণ দধি কাঁধে ল’য়ে দাঁড়াইল।।
সে বলে আমার এই দধি টুকু লও।
দয়া করি এই দধি খরচে লাগাও।।
এ দধির বায়না ব্রাহ্মণ বাড়ী ছিল।
উদ্বৃত্ত হয়েছে দধি ফেরত করিল।।
অমনি তারক বলে দেও দেও দেও।
সত্বর স্বজাতিগণে এ দধি খাওয়াও।।
সঙ্গে দধি বাটী হ’তে আনা অর্ধ মণ।
সে গ্রামে খরচ গেল দধি দুই মণ।।
দধি ভোজ শেষ হ’লে পায়স ভোজন।
সবে বলে হেন ভাল না খাই কখন।।
বিবাহের পরে জয়পুর আসা হ’ল।
সঙ্গেতে ফেরত দধি অর্ধ মণ ছিল।।
চাউল দু’মণ ফিরে আর জলপান।
তার অর্ধ দধি বাল্য ভোজনে লাগান।।
পাক পরশয়ের জন্য দধি নাহি হ’বে।
দুগ্ধ কিনিলেন ভোজে পরমান্ন দিবে।।
আর আর দ্রব্য সহ হ’য়েছে রন্ধন।
সব লোক বসিলেন করিতে ভোজন।।
খাইলে ভাজা ব্যঞ্জনাদি মৎস্য ঝোল।
ভোজনের শেষে সবে খাইল অম্বল।।
হেনকালে এক জন গোয়ালা আসিল।
এক মণ দধি ল’য়ে উপনীত হ’ল।।
গোপ বলে কুণ্ডু বাড়ী ছিল দধি বায়না।
সব দধি নিল তারা এক মণ নেয় না।।
এই দধি খেতে দিব আমার গরজ।
যাহা ইচ্ছা মূল্য দিও হউক খরচ।।
তারক বলিল এই ঠাকুরের কাম।
আন দধি দিব আমি দুই টাকা দাম।।
পূর্বে এক মণ আর এই এক মণ।
চারি টাকা মূল্য এনে দিলেন তখন।।
ছাতরায় বাসা ছিল রায়চাঁদ ঘোষ।
চারি টাকা মূল্য পেয়ে হইল সন্তোষ।।
ভাঙ্গুড়ার গোয়ালের দুই মণ দই।
চারি টাকা পাইয়া সন্তুষ্ট হ’ল সেই।।
শ্রীহরি-চরিত্র সুধা ভকত আখ্যান।
রচিল তারকচন্দ্র হরি-রস-গান।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!