মতুয়া সংগীত

ভক্ত সবে সর্বক্ষণে

শ্রী শ্রী গুরুচাঁদের গার্হস্থ আশ্রমের নীতি শিক্ষা
ভক্ত সবে সর্বক্ষণে গুরুচাঁদ কয়।
“সর্ব আশ্রমের মূল গৃহাশ্রম হয়।।
যোজন বিস্তৃত শাখা বট বৃক্ষ প্রায়।
বিভিন্ন আশ্রমে ধরি গৃহাশ্রম রয়।।
ব্রহ্মচারী বানপ্রস্থী অথবা সন্ন্যাসী।
গৃহীর আশ্রয় পেতে সবে অভিলাষী।।
গৃহী দেয় অন্নজল গৃহী দেয় অর্থ।
গৃহীর স্বার্থেতে রহে সর্ব জীব স্বার্থ।।
অর্থ ছাড়া বাক্য যথা প্রলাপ বচন।
অর্থ শূন্য গৃহী জনে জানিবে তেমন।।
মহাশক্তি এই অর্থ সবে যাকে চায়।
গৃহীর অর্থেতে দেখ জগত বাঁচায়।।
‘অর্থ অনর্থের মূল’ কহে যেই ভণ্ড,
অর্থর জানে না অর্থ সেই অপগণ্ড।।
এই অর্থ দেখ গৃহী উপার্জন করে।
গৃহীর অর্থেতে তাই বাঁচে সর্ব নরে।।
গার্হস্থ আশ্রম তাই সর্বাশ্রম মূল।
তুলনা মিলে না তার অমূল্য অতুল।।
এই গৃহাশ্রমে যেবা খাঁটি ভাবে রয়।
তাঁর মত মহাসাধু কোথা পাওয়া যায়।।”
মম পিতামহ শ্রীযশোমন্ত ঠাকুর।
লীলা সাঙ্গকালে কথা কহিলা প্রচুর।।
পঞ্চপুত্র কাছে ডাকি সে মহামতি।
শিখা’ল নিগুঢ় মর্ম গৃহধর্ম নীতি।।
পুত্রগণে ডেকে বলে “শুন পুত্রগণ।
জন্মিলে অবশ্য ভবে নিশ্চয় মরণ।।
মোর মনে এই জাগে অল্পকাল পরে।
অবশ্য ত্যজিব দেহ যেতে পরপারে।।
যাত্রার প্রাক্কালে যাহ আমি বলে যাই।
চিরকাল সকলের মনে রাখা চাই।।
পাপ নহে দূরে কোথা পাপ নিজ ঘরে।
নিজ নারী সঙ্গে জীব নিত্য পাপ করে।।
অধিকার আছে ভাবি করে পাপ কর্ম।
নিজ ঘরে নিত্য নরে নাশে গৃহ ধর্ম।।
গৃহস্থ আশ্রম হয় পবিত্র সম্পদ।
পবিত্রতা নষ্ট করি ঘটায় প্রমাদ।।
এজন্য বলিনু সবে থাকিও সামাল।
নারী সঙ্গে বৃথা রঙে হয়োনা পয়মাল।।
একমাত্র এই মূল তত্ত্ব রাখ ঠিক।
এই শিক্ষা আদি শিক্ষা, গৃহীর প্রতীক।।”
মম পিতৃদেব প্রভু শ্রীহরি ঠাকুর।
তিন বাক্য বলে মোরে মধুর মধুর।।
একবাক্যে বলে শিক্ষা দিতে পুত্রগণে।
দ্বিতীয়ে অতন্দ্র থাকি বিজয়ী মরণে।।
তৃতীয় সে আশীর্বাদ কৃপা মম প্রতি।
তিরোভাব কিছু পূর্বে বলিলা সম্প্রতি।।
যশোমন্ত দেব যাহা বলে তাঁর ঠাই।
সেই নীতি পালিবার আজ্ঞা করে সাঁই।।
করজোড়ে নিবেদন করি পিতৃ আগে।
“তব অদর্শনে পিতঃ প্রাণে দ্বন্দ্ব জাগে।।
কি হ’বে করিতে মোর কোন পথে চলি।
দয়া করি পিতা মোরে যাও সব বলি।।”
পিতা ক’ন ‘গুরুচরণ! কি চিন্তা তোমার।
জাগিবে তোমার মনে যা’ কিছু করার।।
মম পিতা যশোমন্ত বলেছেন যাহা।
নিশ্চয় জীবনে তুমি পালিবেক তাহা।।
আমার সাধন ভজন আর কিছু নাই।
পিতৃবাক্য রক্ষা করি তা’তে সব পাই।।
আর শুন বলি কথা ওহে সাধুগণ।
গৃহস্থ আশ্রম নষ্ট কিসের কারণ।।
ব্যভিচার মহাপাপে গৃহাশ্রম নষ্ট।
ব্যভিচার মুক্তি নাই আর লক্ষ্মী ভ্রষ্ট।।
ব্যভিচার বলে কারে শুনিয়াছ তাই।
ঘরে পরে ব্যভিচার আছে সর্ব ঠাই।।
কালাকাল নাহি মানে কাম মুগ্ধ নর।
নিজ নারী লয়ে করে নিত্য ব্যভিচার।।
শুধুই তাহাই নহে ভ্রান্ত নরগণ।
ঘরে পরে করে কত অগম্য গমন।।
এমন হয়েছে দশা দুঃখে মরে যাই।
খুড়ী, মাসী, লঘু, গুরু কিছু মান্য নাই।।
অজা পশু সম নর ব্যভিচারে মত্ত।
গৃহাশ্রম করে নষ্ট হ’য়ে কামোন্মত্ত।।
অগম্য গমনে হেন যেবা করে পাপ।
তার প্রতি পূর্ব পুরুষের অভিশাপ।।
সাবধান সাধু! সব রহ সাবধান।
ব্যভিচার লক্ষ্মীভ্রষ্ট নষ্ট জাতি মান।।
আপন বাঁচা’য়ে যদি রাখিবারে চাও।
নারীকোল দেও ছেড়ে নিদ্রা নাহি যাও।।
কালের দোসর ঘুম ‘কালনিদ্রা’ কয়।
নিদ্রাকালে হরে ধন রক্ষা নাহি পায়।।
বা’ হাতে খর্পর তা ডান হাতে খাণ্ডা।
মার মার শব্দে রণে আসে উগ্রচণ্ডা।।
রাত্রিকালে জীবগণ নিদ্রাকোলে ঢলে।
উগ্রচণ্ডা বলি দেয় জীব দলে দলে।।
‘অতন্দ্র’ যে জন রহে নিদ্রা দূর করি।
তাঁর সঙ্গ উগ্রচণ্ডা চলে পরিহরি।।
অবোধ অজ্ঞান নর ইহা নাহি জানে।
নারী, নিদ্রা লোভে পড়ে ডাকে যে মরণে।।
সাধু সাবধান! কহ সাধু সাবধান!
নিদ্রা, নারী পরিহরি সাজ মহাজন।।
সন্তানের সাধ যদি কভু হয় মনে।
ঋতুকালে দিনমাত্র রহ নারী সনে।।
পবিত্র চরিত্র যাঁর নহে ব্যভিচারী।
সন্তান জন্মিতে পারে স্পর্শিলেই নারী।।
ব্যভিচার দোষে যার নহে ঠিক মূল।
অকুল সাগরে ডুবে নাহি পাবে কূল।।
বারে বারে ক্ষণে ক্ষণে এই বাণী কয়।
ব্যভিচারী হ’লে কিন্তু ঘর সারা দায়।।
ফোঁটা হারালে বটে কলসে না কুলায়।
তীর ছেড়ে দিলে হাতে ফিরে কেবা পায়।।
সময় থাকিতে তাই সামাল! সামাল!
ব্যভিচারী হ’লে কিন্তু সব পয়মাল।।
আপন জীবনে প্রভু পালে এই নীতি।
নিদ্রাহীন প্রেমালাপ করে সারারাতি।।
চারি পুত্র এক কন্যা যবে জন্ম লয়।
পাঁচ দিন মাত্র প্রভু নারী সঙ্গে রয়।।
সত্যভামা দেবী লক্ষ্মীমাতা ঠাকুরানী।
জানিয়া পতির মন সাজিলা যোগিনী।।
পবিত্র চরিত্র দোঁহে রহে ভিন্ন ভিন্ন।
এই ব্রতধারী প্রভু গৃহী শিক্ষা জন্য।।
উদার আদর্শ হেন হবে না’ক আর।
গার্হস্থ ধর্মেতে শ্রেষ্ঠ গুরুচাঁদ আমার।।
তাঁর বাণী তাঁর ভাব জীবে লও সুখে।
লইয়া গৃহীর ধর্ম গুরুচাঁদে ডাকে।।
হয় নাই হবে নারে হেন অবতার।
‘হরি গুরুচাঁদ’ সর্ব অবতার সার।।
আদর্শ গৃহস্থ রূপে ‘হরি গুরুরাজ’।
পয়ার প্রবন্ধে কহে কবি রসরাজ।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!