মতুয়া সংগীত

মাঝে মাঝে যান

অবিশ্বাসী দ্বিজের ভ্রান্তি মোচন
পয়ার

মাঝে মাঝে যান প্রভু ভিক্ষা করিবারে।
ভিক্ষা করি আসিতেন বেলা দ্বিপ্রহরে।।
একজন দ্বিজ তার বাড়ী উলা গ্রাম।
গৃহস্থ ব্রাহ্মণ তিনি ষষ্ঠীচন্দ্র নাম।।
কোলাগ্রামে এসেছিল সাধনার বাটীতে।
দেখিলেন গোস্বামীকে ভকতি করিতে।।
তাহা দেখি ব্রাহ্মণের মনে হ’ল ঘৃণা।
একে যে ভকতি করে নির্বোধ সে জনা।।
অল্প বিদ্যা বুদ্ধিহীন নমঃশুদ্র জাতি।
কারে কি জানিয়া এরা করিছে ভকতি।।
সাধনার পিতাকে বলেন সে ব্রাহ্মণ।
ইহাকে ভকতি কর কিসের কারণ।।
মেয়ে তব সতী সাধ্বী যোগিনীর প্রায়।
কি লাগি দিয়াছ সপে ও টুণ্ডার পায়।।
তাহা শুনি নবকৃষ্ণ বলে ব্রাহ্মণেরে।
সাধুসেবা সবে মিলে করি হর্ষান্তরে।।
কৃষ্ণতুল্য ব্যক্তি ইনি গ্রন্থে লেখে এই।
সর্বরোগী ভোগী ত্যাগী কৃষ্ণতুল্য সেই।।
ব্রাহ্মণ কহিছে ভাল পেয়েছ গোঁসাই।
মহা পাপে মহা রোগ হস্ত পদ নাই।।
নবকৃষ্ণ ক্রোধভরে কহে ব্রাহ্মণেরে।
সাধু নিন্দা কর না এ বাড়ীর উপরে।।
ব্রাহ্মণ চলিল বড় বিমর্ষ মনেতে।
কি বুঝিয়া সাধু বলে না পারি বুঝিতে।।
ক্রোধ দেখি দ্বিজবর অবাক হইল।
সাত পাঁচ ভেবে শেষে বাড়ী চলে গেল।।
আর এক দিন প্রভু আসে উলা হ’তে।
আমাদায় গিয়ে ছিল ভিক্ষার জন্যেতে।।
উলার কুঠির পরে দ্বিজবর ছিল।
গোঁসাই এসেছে বেগে দেখিতে পাইল।।
দ্বিজ গোস্বামীকে দেখে ভাবিতেছে মনে।
টুণ্ডা বেটা এত বেগে চলিছে কেমনে।।
দেখিয়া চিনিল এই সেই টুণ্ডা বেটা।
অঙ্গেতে গলিত কুষ্ঠ সাধু বলে কেটা।।
দশরথ মণ্ডলের বাড়ী গিয়া রয়।
পরম ভকতি করে তাহারা সবায়।।
গোস্বামী লোচন আগে ব্রাহ্মণ পশ্চাতে।
চলিছেন মৌন হ’য়ে ভাবিতে ভাবিতে।।
লোচনের শরীর ছিল যে পরিমাণ।
দ্বিগুণ বলিষ্ঠ দেহ করিছে প্রয়াণ।।
ব্রাহ্মণ দেখিয়া তাহা গণে চমৎকার।
ধাবমান হইল লোচনে দেখিবার।।
নবীন মেঘের বর্ণ যাইতেছে দেখা।
উপরে উঠিছে যেন অনলের শিখা।।
হস্ত পদাঙ্গুলী দেখে অক্ষত সম্পূর্ণ।
নাহি কুষ্ঠরোগ সূর্য মেঘেতে আছন্ন।।
দেখিয়া ব্রাহ্মণ বড় মানিল বিস্ময়।
ভাল করে দেখিবারে ধাবমান হয়।।
ধরিতে না পারে, নারে নিকটে যাইতে।
যত দূর দূরে আছে ততই দূরেতে।।
গোস্বামী হাঁটিছে স্বাভাবিক ব্যবহারে।
ব্রাহ্মণ দৌড়িয়া কাছে যাইতে না পারে।।
ব্রাহ্মণ যাইত দীঘলিয়া নিমন্ত্রণে।
জ্ঞান হারাইয়া যায় গোস্বামীর সনে।।
গোস্বামী উঠিল নবকৃষ্ণের প্রাঙ্গণে।
তামাক খাইব বলে ডাকিল সাধনে।।
পুরুষ বলিতে কেহ বাড়ীতে ছিল না।
যতনে তামাক সেজে দিলেন যতনে।।
ব্রাহ্মণ আসিয়া পরে হৈল উপস্থিত।
অমনি লোচন উঠে চলিল ত্বরিত।।
ভিক্ষা পাত্র রাখি সাধনার নিকটেতে।
ঘাটে গিয়া নামিলেন জলের মধ্যেতে।।
দ্বিজ ষষ্ঠী কহে ধন্য ধন্য তোরা সব।
নমঃশুদ্র কূলে জন্ম নমস্য বৈষ্ণব।।
মানুষ চিনিয়া সবে হয়েছ মানুষ।
ব্রহ্ম কূলে জন্ম ল’য়ে আমরা বিহুশ।।
কই সেই টুণ্ড প্রভু গেছেন কোথায়।
সাধনা কহিছে এইমাত্র ঘাটে যায়।।
ব্রাহ্মণ যাইতেছিল নদীর ঘাটেতে।
স্নান করি আসে ফিরি দেখা হয় পথে।।
একমাত্র কৌপীন কটিতে দড়ি গ্রন্থি।
সিক্ত অঙ্গে এসেছেন ক্লান্তভাব অতি।।
পূর্ববৎ ক্ষত অঙ্গ অঙ্গুলি বিচ্ছিন্ন।
টুণ্ড হস্ত টুণ্ড পদ কত ক্ষত চিহ্ন।।
দাদা! দাদা! বলিয়া কাতরে ছাড়ে ডাক।
দেখিয়া শুনিয়া দ্বিজ হইল অবাক।।
কি দেখিনু কি হইনু কি করিনু ধার্য।
ব্রাহ্মণ দেখিয়া বড় মানিল আশ্চর্য।।
হেনকালে ভোলানাথ আসিল বাটীতে।
লোচন চলিয়া গেল সাধনার সাথে।।
সাধনার পশ্চিমের গৃহেতে বসিল।
ব্রাহ্মণ আসিয়া কতক্ষণ চেয়ে র’ল।।
ফিরে গিয়া বলিলেন ভোলানাথ ঠাই।
দ্বিজ বলে কি বলি আমাতে আমি নাই।।
দুই চক্ষে বারি ধারা বক্ষঃ ভেসে যায়।
ভোলানাথ নিকটেতে কেঁদে কেঁদে কয়।।
শুন ওহে ভোলানাথ কি বলিব আর।
টুণ্ড বেটা বলেছিল অবজ্ঞা আমার।।
তার প্রতিফল পাইলাম হাতে হাতে।
আমি যাহা দেখিয়াছি না পারি কহিতে।।
ভোলানাথ বলে দ্বিজ কি বলিবা আর।
আমার গোঁসাই হয় ব্রাহ্মণ উপর।।
ওঢ়াকাঁদি বাবা মোর স্বয়ং অবতার।
ঘুরে ফিরে লীলা করে চেলা বেলা তার।।
অন্য অন্য যুগে যত অবতার হন।
এ যুগের ভক্ত তাহা হ’তে বলবান।।
টুণ্ড হ’য়ে থাকে প্রভু আমার বাটীতে।
বাবা হরিচাঁদ ভক্ত কে পারে চিনিতে।।
যদি কিছু দেখে থাক কাহারে না কও।
দেখিয়াছ ভাগ্যক্রমে চুপ করে রও।।
জাননা শুননা কিবা গাও বরাবরি।
সুধা গৌর নয়রে আমার গৌর হরি।।
অপরূপ রূপ কিবা মধুর মাধুরী।
কখনও পুরুষ হয় কখনও বা নারী।।
শুনিয়া ঠাকুর আর বাক্য না স্ফুরিল।
ব্রাহ্মণ অনেক ক্ষণ মৌন হ’য়ে র’ল।।
কবি ভাবি’ কহে ভাই রবি ডুবে গেল।
লোচনের প্রতি সবে হরি হরি বল।।

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!