কামাখ্যা মন্দির

-নূর মোহাম্মদ মিলু

ভারতের আসাম রাজ্যের গুয়াহাটি শহরের পশ্চিমাংশে নীলাচল পর্বতে এই কামাখ্যা মন্দির। এটি ভারতবর্ষের ৫১ সতীপীঠের অন্যতম। এই মন্দির চত্বরে- ভুবনেশ্বরী, বগলামুখী, ছিন্নমস্তা, ত্রিপুরাসুন্দরী, তারা, কালী, ভৈরবী, ধূমাবতী, মাতঙ্গী এবং কমলা নামের দশমহাবিদ্যার মন্দিরও আছে। এর মধ্যে ত্রিপুরাসুন্দরী, মাতঙ্গী ও কমলা দেবী প্রধান মন্দিরে পূজিত হন। অন্যান্য দেবীদের জন্য পৃথক মন্দির আছে। বিশেষত তন্ত্রসাধকদের কাছে এই কামাখ্যা মন্দির পবিত্র তীর্থ।

কামাখ্যা মন্দিরে চারটি কক্ষ- গর্ভগৃহ এবং চলন্ত, পঞ্চরত্ন ও নাটমন্দির নামে তিনটি মণ্ডপ। গর্ভগৃহটি পঞ্চরথ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। অন্যগুলির স্থাপত্য তেজপুরের সূর্যমন্দিরের সমতুল্য। এগুলিতে খাজুরাহো বা অন্যান্য মধ্যভারতীয় মন্দিরের আদলে নির্মিত খোদাইচিত্র দেখা যায়। মন্দিরের চূড়াগুলি মৌচাকের মতো দেখতে। নিম্ন আসামের বহু মন্দিরে এই ধরনের চূড়া দেখা যায়। গর্ভগৃহটি আসলে ভূগর্ভস্থ একটি গুহা। এখানে কোনো মূর্তি নেই। শুধু একটি পাথরের সরু গর্ত দেখা যায়।

গর্ভগৃহটি ছোটো ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। সরু খাড়াই সিঁড়ি পেরিয়ে এখানে পৌঁছাতে হয়। ভেতরে ঢালু পাথরের একটি খণ্ড আছে যেটি যোনির আকৃতিবিশিষ্ট। এরমাঝে প্রায় দশ ইঞ্চি গভীর একটি গর্ত। ভূগর্ভস্থ প্রস্রবনের জল বেরিয়ে গর্তটি সবসময় ভর্তি থাকে। এই গর্তটিই দেবী কামাখ্যা নামে পূজিত এবং দেবীর পীঠ হিসেবে প্রসিদ্ধ।

কামাখ্যা মন্দির চত্বরের অন্যান্য মন্দিরগুলিতেেও একই রকম যোনি-আকৃতিবিশিষ্ট পাথর দেখা যায়, যা ভূগর্ভস্থ প্রস্রবনের জল দ্বারা পূর্ণ থাকে।

বর্তমান মন্দির ভবনটি অহোম রাজাদের রাজত্বকালে নির্মিত। এরমধ্যে প্রাচীন কোচ স্থাপত্যটি সযত্নে রক্ষিত হয়েছে। খ্রীস্টীয় দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময় মন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে ১৫৬৫ সাল নাগাদ কোচ রাজা চিলরায় মধ্যযুগীয় মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী অনুসারে মন্দিরটি পুনরায় নির্মাণ করে দেন।

বর্তমানে যে মৌচাক-আকারের চূড়াটি দেখা যায়, তা নিম্ন আসামের মন্দির স্থাপত্যের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মন্দিরের বাইরে গণেশ ও অন্যান্য হিন্দু দেবদেবীদের মূর্তি খোদিত আছে। মন্দিরের তিনটি প্রধান কক্ষ। পশ্চিমের কক্ষটি বৃহৎ ও আয়তাকার। সাধারণ তীর্থযাত্রীরা এটি পূজার জন্য ব্যবহার করে না।

মাঝের কক্ষটি বর্গাকার। এখানে দেবীর একটি ছোট মূর্তি আছে। এই মূর্তিটি পরবর্তীকালে এখানে স্থাপিত হয়। এই কক্ষের দেওয়ালে নরনারায়ণ, অন্যান্য দেবদেবী ও তৎসম্পর্কিত শিলালেখ খোদিত আছে। মাঝের কক্ষটিই মূল গর্ভগৃহে নিয়ে যায়।

এটি গুহার আকৃতিবিশিষ্ট। এখানে কোনো মূর্তি নেই। শুধু যোনি-আকৃতিবিশিষ্ট পাথর ও ভূগর্ভস্থ প্রস্রবনটি আছে। প্রতিবছর গ্রীষ্মকালে অম্বুবাচী মেলার সময় কামাখ্যা দেবীর ঋতুমতী হওয়ার ঘটনাকে উদযাপন করা হয়। এই সময় মূল গর্ভগৃহের প্রস্রবনের জল আয়রণ অক্সাইডের প্রভাবে লাল হয়ে থাকে। ফলে এটিকে ঋতুস্রাবের মতো দেখতে হয়।

প্রাচীন কামরূপ রাজ্যের বর্মণ রাজবংশের শাসনকালে (৩৫০-৬৫০ খ্রিস্টাব্দ) এবং সপ্তম শতাব্দীর চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং-এর রচনাতেও কামাখ্যা উপেক্ষিত হয়েছে। সেই সময় কামাখ্যাকে অব্রাহ্মণ কিরাত জাতীয় উপাস্য দেবী মনে করা হত।

নবম শতাব্দীতে ম্লেচ্ছ রাজবংশের বানমলবর্মদেবের তেজপুর লিপিতে প্রথম কামাখ্যার শিলালিপি-উল্লেখ পাওয়া যায়। এই শিলালিপি থেকে প্রমাণিত হয় খ্রীস্টীয় অষ্টম-নবম শতাব্দীতে এখানে একটি বিশাল মন্দির ছিল।

জনশ্রুতি অনুসারে, সুলেমান কিরানির (১৫৬৬-১৫৭২) সেনাপতি কালাপাহাড় এই মন্দির ধ্বংস করেছিল। তবে ঐতিহাসিক প্রমাণ থেকে জানা যায় যে, আলাউদ্দিন হুসেন শাহ কামতা রাজ্য আক্রমণ করার সময় (১৪৯৮ খিস্টাব্দ) এই মন্দির ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

কথিত আছে, কোচ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বসিংহ এই ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান। তিনিই এই মন্দিরে পূজার পুনর্প্রবর্তন করেন। তার পুত্র নরনারায়ণের রাজত্বকালে ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দিরটি নির্মাণের কাজ শেষ হয়। পুনর্নির্মাণের সময় পুরনো মন্দিরের উপাদান ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে অহোম রাজ্যের রাজারা এই মন্দিরটি আরও বড় করে তোলেন। অন্যান্য মন্দিরগুলি পরে নির্মিত।

জনশ্রুতি অনুসারে, কোচবিহার রাজপরিবারকে দেবী কামাখ্যাই পূজার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। কোচবিহার রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতা ভিন্ন এই মন্দির পরিচালনা কষ্টকর হয়ে ওঠে। ১৬৫৮ সালে অহোম রাজা জয়ধ্বজ সিংহ নিম্ন আসাম জয় করলে এই মন্দির সম্পর্কে তাঁদের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। অহোম রাজারা শাক্ত বা শৈব ধর্মাবলম্বী হতেন। তাঁরাই এই মন্দির সংস্কার ও পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত্ব নিতেন।

রুদ্র সিংহ (রাজত্বকাল ১৬৯৬-১৭১৪) বৃদ্ধবয়সে গুরুর কাছে দীক্ষাগ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু প্রজা ব্রাহ্মণের কাছে মাথা নত করতে পারবেন না বলে তিনি পশ্চিমবঙ্গে দূত পাঠান। নদিয়া জেলার শান্তিপুরের কাছে মালিপোতার বিশিষ্ট শাক্ত পণ্ডিত কৃষ্ণরাম ভট্টাচার্যকে তিনি আসামে আসার অনুরোধ করেন। কৃষ্ণরাম জানালেন, কামাখ্যা মন্দিরের দায়িত্ব দিলে, তবেই তিনি আসাম যাবেন। রাজা নিজে দীক্ষা না নিলেও, তার পুত্রদের ও অন্যান্য ব্রাহ্মণদের কৃষ্ণরামের কাছে দীক্ষা নিতে নির্দেশ দেন।

রুদ্র সিংহের মৃত্যুর পর তার জ্যেষ্ঠপুত্র শিব সিংহ (রাজত্বকাল ১৭১৪-১৭৪৪) রাজা হন। তিনি কামাখ্যা মন্দির ও পার্শ্ববর্তী বিরাট একটি ভূখণ্ড কৃষ্ণরামকে দেবত্তোর সম্পত্তি হিসেবে দান করেন। তাকে ও তার বংশধরদের পর্বতীয়া গোঁসাই বলা হত। সম্ভবত তারা নীলাচল পর্বতের উপর থাকতেন বলে এই নামকরণ হয়। কামাখ্যা মন্দিরের অনেক পুরোহিত ও আসামের অনেক আধুনিক শাক্ত এই পর্বতীয়া গোঁসাইদের শিষ্য।

অনুমিত হয়, প্রাচীনকালে কামাখ্যা ছিল খাসি উপজাতির বলিদানের জায়গা। এখনও বলিদান এখানে পূজার অঙ্গ। এখানে অনেক ভক্তই দেবীর উদ্দেশ্যে ছাগলবলি দেন।

কালিকা পুরাণ অনুসারে, কামাখ্যায় পূজা করলে সকল ইচ্ছা পূর্ণ হয়। শিবের তরুণী স্ত্রী ও মোক্ষদাত্রী শক্তিই কামাখ্যা নামে পরিচিত।

১২ খ্রিস্টপূর্বে নীলাচল পর্বতে মঙ্গোলরা আক্রমণ কলে প্রথম তান্ত্রিক কামাখ্যা মন্দিরটি ধ্বংস হয়। দ্বিতীয় তান্ত্রিক মন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় মুসলমান আক্রমণের সময়। আসামের অন্যান্য দেবীদের মতো, দেবী কামাখ্যার পূজাতেও আর্য ও অনার্য সংস্কৃতির মিশ্রণ দেখা যায়।

দেবীকে যেসব নামে পূজা করা হয় তার মধ্যে অনেক স্থানীয় আর্য ও অনার্য দেবদেবীর নাম আছে। যোগিনী তন্ত্র অনুসারে, এই যোগিনী পীঠের ধর্মের উৎস কিরাতদের ধর্ম। বাণীকান্ত কাকতির মতে, গারো উপজাতির মানুষেরা কামাখ্যায় শূকর বলি দিত। এই প্রথা নরনারায়ণ-কর্তৃক নিযুক্ত পুরোহিতদের মধ্যেও দেখা যেত।

কামাখ্যার পূজা বামাচার ও দক্ষিণাচার উভয় মতেই হয়। সাধারণত ফুল দিয়েই পূজা দেওয়া হয়। মাঝে মাঝে পশুবলি হয়। স্ত্রীপশু বলি সাধারণত নিষিদ্ধ হলেও, বহু পশুবলির ক্ষেত্রে এই নিয়মে ছাড় দেওয়া হয়।

বারাণসীর বৈদিক ঋষি বাৎস্যায়ন খ্রীস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে নেপালের রাজার দ্বারস্থ হয়ে উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলিকে হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত ও তাদের নরবলি প্রথার গ্রহণযোগ্য বিকল্প চালু করার জন্য অনুরোধ করেন। বাৎস্যায়নের মতে, পূর্ব হিমালয়ের গারো পাহাড়ে তারা দেবীর তান্ত্রিক পূজা প্রচলিত ছিল। সেখানে আদিবাসীরা দেবীর যোনিকে ‘কামাকি’ নামে পূজা করত। ব্রাহ্মণ্যযুগে কালিকাপুরাণে সব দেবীকেই মহাশক্তির অংশ বলা হয়েছে। সেই হিসেবে, কামাখ্যাও মহাশক্তির অংশ হিসেবে পূজিত হন।

কালিকা পুরাণের মতে, কামাখ্যা মন্দিরে সতী শিবের সঙ্গে বিহার করেন। এখানে তাঁর মৃতদেহের যোনি অংশটি বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। দেবীভাগবত পুরাণের ১০৮ পীঠের তালিকায় যদিও এই তীর্থের নাম নেই। তবে অপর একটি তালিকায় কামাখ্যা নাম পাওয়া যায়। যোগিনী তন্ত্রে অবশ্য কালিকা পুরাণের মতকে অগ্রাহ্য করে কামাখ্যা কালী বলা হয়েছে এবং যোনির প্রতীকতত্ত্বের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তন্ত্রসাধনার কেন্দ্র হওয়ায় বার্ষিক অম্বুবাচী মেলা অনুষ্ঠানে এখানে প্রচুর মানুষ আসেন। এছাড়া বার্ষিক মনসা পূজাও মহাসমারোহে আয়োজিত হয়, দুর্গাপূজা কামাক্ষ্যা মন্দিরের একটি অন্যতম প্রধান উৎসব।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!