ভবঘুরেকথা
শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব

মহিমার পাণ্ডিত্য – মণি সেন, অধর ও মিটিং (Meeting)

ঠাকুর পশ্চিমের গোল বারান্দায় মহিমা প্রভৃতির সহিত হঠযোগীর কথা কহিতেছেন। রামপ্রসন্ন ভক্ত কৃষ্ণকিশোরের পুত্র, তাই ঠাকুর তাহাকে স্নেহ করেন।

শ্রীরামকৃষ্ণ – রামপ্রসন্ন কেবল ওইরকম করে হো-হো করে বেড়াচ্ছে। সেদিন এখানে এসে বললে – একটু কথা কবে না। প্রাণায়াম করে নাক টিপে বসে রইল; খেতে দিলাম, তা খেলে না। আর-একদিন ডেকে বসালুম। তা পায়ের উপর পা দিয়ে বসল – কাপ্তেনের দিকে পা-টা দিয়ে। ওর মার দুঃখ দেখে কাঁদি।

(মহিমার প্রতি) –  ওই হঠযোগীর কথা তোমায় বলতে বলেছে। সাড়ে ছ আনা দিন খরচ। এদিকে আবার নিজে বলবে না।”

মহিমা – বললে শোনে কে? (ঠাকুরের ও সকলের হাস্য)

ঠাকুর ঘরের মধ্যে আসিয়া নিজের আসনে বসিয়াছেন। শ্রীযুক্ত মণি সেন (যাঁদের পেনেটীতে ঠাকুরবাড়ি) দু-একটি বন্ধুসঙ্গে আসিয়াছেন ও ঠাকুরের হাত ভাঙা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা পড়া করিতেছেন। তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে একজন ডাক্তার।

ঠাকুর ডাক্তার প্রতাপ মজুমদারের ঔষধ সেবন করিতেছেন। মণিবাবুর সঙ্গী ডাক্তার তাঁহার ব্যবস্থার অনুমোদন করিলেন না। ঠাকুর তাঁহাকে বলিতেছেন, “সে (প্রতাপ) তো বোকা নয়, তুমি অমন কথা বলছ কেন?”

এমন সময় লাটু উচ্চৈঃস্বরে বলিতেছেন শিশি পড়ে ভেঙে গেছে।

মণি (সেন) হঠযোগীর কথা শুনিয়া বলিতেছেন – হঠযোগী কাকে বলে? হট্‌ (Hot) মানে তো গরম।

মণি সেনের ডাক্তার সম্বন্ধে ঠাকুর ভক্তদের পরে বলিলেন – “ওকে জানি। যদু মল্লিককে বলেছিলাম, এ-ডাক্তার তোমার ওলম্বাকুল, – অমুক ডাক্তারের চেয়েও মোটা বুদ্ধি।”

শ্রীযুক্ত মাস্টারের সহিত একান্তে কথা

এখনও সন্ধ্যা হয় নাই। ঠাকুর নিজের আসনে বসিয়া মাস্টারের সহিত কথা কহিতেছেন। তিনি খাটের পাশে পাপোশ পশ্চিমাস্য হইয়া বসিয়া আছেন। এদিকে মহিমাচরণ পশ্চিমের গোল বারান্দায় বসিয়া মণি সেনের ডাক্তারের সহিত উচ্চৈঃস্বরে শাস্ত্রালাপ করিতেছেন। ঠাকুর নিজের আসন হইতে শুনিতে পাইতেছেন ও ঈষৎ হাস্য করিয়া মাস্টারকে বলিতেছেন – “ওই ঝাড়ছে! রজোগুণ! রজোগুণে একটু পাণ্ডিত্য দেখাতে, লেকচার দিতে ইচ্ছা হয়। সত্ত্বগুণে অন্তর্মুখ হয়, – আর গোপন। কিন্তু খুব লোক! ঈশ্বর কথায় এত উল্লাস!”

অধর আসিয়া প্রণাম করিলেন ও মাস্টারের পাশে বসিলেন।

শ্রীযুক্ত অধর সেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, বয়ঃক্রম ত্রিশ বৎসর হইবে। অনেক দিন ধরিয়া সমস্ত দিন আফিসের পরিশ্রমের পর ঠাকুরের কাছে প্রায় প্রত্যহ সন্ধ্যার পার আসেন। তাঁহার বাটী কলিকাতা শোভাবাজার বেনেটোলায়। অধর কয়েকদিন আসেন নাই।

শ্রীরামকৃষ্ণ – কিগো, এতদিন আস নাই কেন?

অধর – আজ্ঞা, অনেকগুণো কাজে পড়ে গিছলাম। ইস্কুলের দরুন সভা এবং আর আর মিটিং-এ যেতে হয়েছিল।

শ্রীরামকৃষ্ণ – মিটিং, ইস্কুল – এই সব লয়ে একেবারে ভুলে গিছলে।

অধর (বিনীত ভাবে) – আজ্ঞা সব চাপা পড়ে গিছল। আপনার হাতটা কেমন আছে?

শ্রীরামকৃষ্ণ – এই দেখ এখনো সারে নাই। প্রতাপের ঔষধ খাচ্ছিলাম।

কিয়ৎক্ষণ পরে ঠাকুর হঠাৎ অধরকে বলিতেছেন – “দেখো এ-সব অনিত্য – মিটিং, ইস্কুল, আফিস – এ-সব অনিত্য। ঈশ্বরই বস্তু আর সব অবস্তু। সব মন দিয়ে তাঁকেই আরাধনা করা উচিত।”

অধর চুপ করিয়া আছেন।

শ্রীরামকৃষ্ণ – এ-সব অনিত্য। শরীর এই আছে এই নাই। তাড়াতাড়ি তাঁকে ডেকে নিতে হয়।১

“তোমাদের সব ত্যাগ করবার দরকার নাই। কচ্ছপের মতো সংসারে থাক। কচ্ছপ নিজে জলে চরে বেড়ায়; – কিন্তু ডিম আড়াতে রাখে – সব মনটা তার ডিম যেখানে, সেখানে পড়ে থাকে।

“কাপ্তেনের বেশ স্বভাব হয়েছে। যখন পূজা করতে বসে, ঠিক একটি ঋষির মতো! – এদিকে কর্পূরের আরতি; সুন্দর স্তব পাঠ করে। পূজা করে যখন ওঠে, চক্ষে যেন পিঁপড়ে কামড়েছে! আর সর্বদা গীতা, ভাগবত – এ-সব পাঠ করে। আমি দু-একটা ইংরেজী কথা কয়েছিলাম, – তা রাগ কল্লে। বলে – ইংরেজী পড়া লোক ভ্রষ্টাচারী!”

কিয়ৎক্ষণ পরে অধর অতি বিনীতভাবে বলিতেছেন –

“আপনার আমাদের বাড়িতে অনেকদিন যাওয়া হয় নাই। বৈঠকখানা ঘরে গন্ধ হয়েছিল – আর যেন সব অন্ধকার!”

ভক্তের এই কথা শুনিয়া ঠাকুরের স্নেহ-সাগর যেন উথলিয়া উঠিল। তিনি হঠাৎ দণ্ডায়মান হইয়া ভাবে অধর ও মাস্টারের মস্তক ও হৃদয় স্পর্শ করিয়া আশীর্বাদ করিলেন। আর সস্নেহে বলিতেছেন – “আমি তোমাদের নারায়ণ দেখছি! তোমরাই আমার আপনার লোক!”

এইবার মহিমাচরণ ঘরের মধ্যে আসিয়া বসিলেন।

শ্রীরামকৃষ্ণ (মহিমার প্রতি) – ধৈর্যতার কথা তখন যা বলেছিলে তা ঠিক। বীর্যধারণ না করলে এ-সব (উপদেশ) ধারণ হয় না।

“একজন চৈতন্যদেবকে বললে, এদের (ভক্তদের) এত উপদেশ দেন, তেমন উন্নতি করতে পাচ্ছে না কেন? তিনি বললেন – এরা যোষিৎসঙ্গ করে সব অপব্যয় করে। তাই ধারণা করতে পারে না। ফুটো কলসীতে জল রাখলে জল ক্রমে ক্রমে বেরিয়ে যায়।”

মহিমা প্রভৃতি ভক্তেরা চুপ করিয়া আছেন! কিয়ৎক্ষণ পরে মহিমাচরণ বলিতেছেন – ঈশ্বরের কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা করুন – যাতে আমাদের সেই শক্তি হয়।

শ্রীরামকৃষ্ণ – এখনও সাবধান হও! আষাঢ় মাসের জল, বটে, রোধ করা শক্ত। কিন্তু জল অনেক তো বেরিয়ে গেছে! – এখন বাঁধ দিলে থাকবে।

…………………………………………………..
১ অধর কয়েক মাস পরেই দেহত্যাগ করিলেন।

-১৮৮৪, ২৩শে মার্চ-

………………………
রামকৃষ্ণ কথামৃত : অষ্টাদশ অধ্যায় : বিংশ পরিচ্ছেদ

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!