শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব

রামকৃষ্ণ কথামৃত : অষ্টাদশ অধ্যায় : পঞ্চম পরিচ্ছেদ

১৮৮৪, ৫ই জানুয়ারি
গুরুদেব শ্রীরামকৃষ্ণ – ভক্তজন্য ক্রন্দন ও প্রার্থনা

বেলা চারিটা বাজিয়াছে। পঞ্চবটীঘরে শ্রীযুক্ত রাখাল, আরও দু-একটি ভক্ত মণির কীর্তন গান শুনিতেছেন –

গান – ঘরের বাহিরে দণ্ডে শতবার তিলে তিলে এসে যায়।

রাখাল গান শুনিয়া ভাবাবিষ্ট হইয়াছেন।

কিয়ৎক্ষণ পরে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পঞ্চবটিতে আসিয়াছেন। তাঁহার সঙ্গে বাবুরাম, হরিশ – ক্রমে রাখাল ও মণি।

রাখাল – ইনি আজ বেশ কীর্তন করে আনন্দ দিয়েছেন।

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবাবিষ্ট হইয়া গান গাহিতেছেন:

বাঁচলাম সখি, শুনি কৃষ্ণনাম (ভাল কথার মন্দও ভাল)।

(মণির প্রতি) – এই সব গান গাইবে – ‘সব সখি মিলি বৈঠল, (এই তো রাই ভাল ছিল)। (বুঝি হাট ভাল!)’

আবার বলিতেছেন, “এই আর কি! – ভক্তি, ভক্ত নিয়ে থাকা।”

[শ্রীরাধা ও যশোদা সংবাদ – ঠাকুরের “আপনার লোক” ]

“কৃষ্ণ মথুরায় গেলে যশোদা শ্রীমতীর কাছে এসেছিলেন। শ্রীমতী ধ্যানস্থ ছিলেন। তারপর যশোদাকে বললেন, ‘আমি অদ্যাশক্তি, তুমি আমার কাছে কিছু বর লও।’ যশোদা বললেন, ‘বর আর কি দিবে! – তবে এই বলো – যেন কায়মনোবাক্যে তারই সেবা করতে পারি, – যেন এই চক্ষে তার ভক্তের দর্শন হয়; – এই মনে তার ধ্যান চিন্তা যেন হয় – আর বাক্য দ্বারা তার নামগুনগান যেন হয়।’

“তবে যাদের খুব পাকা হয়ে গেছে, তাদের ভক্ত না হলেও চলে – কখন কখন ভক্ত ভাল লাগে না। পঙ্খের কাজের উপর চুনকাম ফেটে যায় অর্থাৎ যার তিনি অন্তরে বাহিরে তাদের এইরূপ অবস্থা।”

ঠাকুর ঝাউতলা হইতে ফিরিয়া আসিয়া পঞ্চবটীমূলে মণিকে আবার বলিতেছেন – “তোমার মেয়ে সুর – এইরকম গান অভ্যাস করতে পার? – ‘সখি সে বন কত দূর! – যে বনে আমার শ্যামসুন্দর।’

(বাবুরাম দৃষ্টে, মণির প্রতি) – “দেখ, যারা আপনার তারা হল পর – রামলাল আর সব যেন আর কেউ। যারা পর তারা হল আপনার, – দেখ না, বাবুরামকে বলছি – ‘বাহ্যে যা – মুখ ধো।’ এখন ভক্তরাই আত্মীয়।”

মণি – আজ্ঞা, হাঁ।

[উন্মাদের পূর্বে পঞ্চবটীতে সাধন ১৮৫৭-৫৮ – চিচ্ছক্তি ও চিদাত্মা ]

শ্রীরামকৃষ্ণ (পঞ্চবটী দৃষ্টে) – এই পঞ্চবটীতে বসতাম। কালে উন্মাদ হলাম। তাও গেল। কালই ব্রহ্ম। যিনি কালের সহিত রমণ করেন, তিনিই কালী – আদ্যাশক্তি। অটলকে টলিয়ে দেন।

এই বলিয়া ঠাকুর গান গাহিতেছেন – ‘ভাব কি ভেবে পরাণ গেল। যার নামে হর কাল, পদে মহাকাল, তার কালোরূপ কেন হল!’

“আজ শনিবার, মা-কালীর ঘরে যেও।”

বকুলতলার নিকট আসিয়া ঠাকুর মণিকে বলিতেছেন –

“চিদাত্মা আর চিচ্ছক্তি। চিদাত্মা পুরুষ, চিচ্ছক্তি প্রকৃতি। চিদাত্মা শ্রীকৃষ্ণ, চিচ্ছক্তি শ্রীরাধা। ভক্ত ওই চিচ্ছক্তির এক-একটি রূপ।

“অন্যান্য ভক্তেরা সখীভাব বা দাসভাবে থাকবে। এই মূলকথা।”

সন্ধ্যার পর ঠাকুর কালীঘরে গিয়াছেন। মণি সেখানে মার চিন্তা করিতেছেন দেখিয়া ঠাকুর প্রসন্ন হইয়াছেন।

[ভক্তজন্য জগন্মাতার কাছে ক্রন্দন – ভক্তদের আশীর্বাদ ]

সমস্ত দেবালয়ে আরতি হইয়া গেল। ঠাকুর ঘরে তক্তার উপর বসিয়া মার চিন্তা করিতেছেন। মেঝেতে কেবল মণি বসিয়া আছেন।

ঠাকুর সমাধিস্থ হইয়াছেন।

কিয়ৎক্ষণ পরে সমাধু ভঙ্গ হইতেছে। এখন ভাবের পূর্ণ মাত্রা – ঠাকুর মার সঙ্গে কথা কহিতেছেন। ছোটছেলে যেমন মার কাছে আবদার করে কথা কয়। মাকে করুণস্বরে বলিতেছেন, “ওমা, কেন সে রূপ দেখালি নি! সেই ভুবনমোহন রূপ! এত করে তোকে বললাম! তা তোকে বললে তো তুই শুনবিনি! তুই ইচ্ছাময়ী।” সুর করে মাকে এই কথাগুলি বললেন, শুনলে পাষাণ বিগলিত হয়। ঠাকুর আবার মার সঙ্গে কথা কহিতেছেন –

“মা বিশ্বাস চাই। যাক শালার বিচার। সাত চোনার বিচার এক চোনায় যায়। বিশ্বাস চাই (গুরুবাক্যে বিশ্বাস) – বালকের মতো বিশ্বাস। মা বলেছে, ওখানে ভূত আছে, তা ঠিক জেনে আছে, – যে ভূত আছে। মা বলেছে, ওখানে জুজু। তো তাই ঠিক জেনে আছে। মা বলেছে, ও তোর দাদা হয় – তো জেনে আছে পাঁচ সিকে পাঁচ আনা দাদা। বিশ্বাস চাই!

“কিন্তু মা! ওদেরই বা দোষ কি! ওরা কি করবে! বিচার একবার তো করে নিতে হয়! দেখ না ওই সেদিন এত করে বললাম, তা কিছু হল না – আজ কেন একেবারে – * * * *”

ঠাকুর মার কাছে করুণ গদ্‌গদস্বরে কাঁদিতে কাঁদিতে প্রার্থনা করিতেছেন। কি আশ্চর্য! ভক্তদের জন্য মার কাছে কাঁদছেন – “মা, যারা যারা তোমার কাছে আসছে, তাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করো! সব ত্যাগ করিও না মা! আচ্ছা, শেষে যা হয় করো!

“মা, সংসারে যদি রাখো, তো এক-একবার দেখা দিস! না হলে কেমন করে থাকবে। এক-একবার দেখা না দিলে উৎসাহ কেমন করে মা! তারপর শেষে যা হয় করো!”

ঠাকুর এখনও ভাবাবিষ্ট। সেই অবস্থায় হঠাৎ মণিকে বলিতেছেন, “দেখো, তুমি যা বিচার করেছো, অনেক হয়েছে। আর না। বল আর করবে না?”

মনী করজোড়ে বলিতেছেন, আজ্ঞা না।

শ্রীরামকৃষ্ণ – অনেক হয়েছে। তুমি প্রথম আসতে মাত্র তোমায় তো আমি বলেছিলাম – তোমার ঘর – আমি তো সব জানি?

মণি – (কৃতাঞ্জলি) – আজ্ঞা হাঁ।

শ্রীরামকৃষ্ণ – তোমার ঘর, তুমি কে, তোমার অন্তর বাহির, তোমার আগেকার কথা, তোমার পরে কি হবে – এ-সব তো আমি জানি?

মণি (করজোড়ে) – আজ্ঞা হাঁ।

শ্রীরামকৃষ্ণ – ছেলে হয়েছে শুনে বকেছিলাম। এখন গিয়ে বাড়িতে থাকো – তাদের জানিও যেন তুমি তাদের আপনার। ভিতরে জানবে তুমিও তাদের আপনার নও, তারাও তোমার আপনার নয়।

মণি চুপ করিয়া আছেন। ঠাকুর আবার কথা কহিতেছেন।

শ্রীরামকৃষ্ণ – আর বাপের সঙ্গে প্রীত করো – এখন উড়তে শিখে – তুমি বাপকে অষ্টাঙ্গে প্রণাম করতে পারবে না?

মণি (করজোড়ে) – আজ্ঞা হাঁ।

শ্রীরামকৃষ্ণ – তোমায় আর কি বলব, তুমি তো সব জানো? – সব তো বুঝেছো?

(মণি চুপ করিয়া আছেন।)

ঠাকুর – সব তো বুঝেছো?

মণি – আজ্ঞা, একটু একটু বুঝেছি।

শ্রীরামকৃষ্ণ – অনেকটা তো বুঝেছো। রাখাল যে এখানে আছে, ওর বাপ সন্তুষ্ট আছে।

মণি হাতজোড় করিয়া চুপ করিয়া আছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ আবার বলিতেছেন, “তুমি যা ভাবছো তাও হয়ে যাবে।”

[ভক্তসঙ্গে কীর্তনানন্দে – মা ও জননী – কেন নরলীলা ]

ঠাকর এইবার প্রকৃতিস্থ হইয়াছেন। ঘরে রাখাল, রামলাল। রামলালকে গান গাহিতে বলিতেছেন। রামলাল গান গাহিতেছেন:

গান - সমর আলো করে কার কামিনী।

গান - কে রণে নাচিছে বামা নীরদবরণী।

শোণিত সায়রে যেন ভাসিছে নব নলিনী ৷৷

শ্রীরামকৃষ্ণ – মা আর জননী। যিনি জগৎরূপে আছেন – সর্বব্যাপী হয়ে তিনিই মা। জননী যিনি জন্ম স্থান। আমি মা বলতে বলতে সমাধিস্থ হতুম; – মা বলতে বলতে যেন জগতের ঈশ্বরীকে টেনে আনতুম! যেমন জেলেরা জাল ফেলে, তারপর আনেকক্ষণ পরে জাল গুটোতে থাকে। বড় বড় মাছ সব পড়েছে।

[গৌরী পণ্ডিতের কথা – কালী ও শ্রীগৌরাঙ্গে এক ]

“গৌরী বলেছিল, কালী গৌরাঙ্গ এক বোধ হলে, তবে ঠিক জ্ঞান হয়। যিনি ব্রহ্ম তিনিই শক্তি (কালী)। তিনি নবরূপে শ্রীগৌরাঙ্গ।”

ঠাকুর কি ইঙ্গিত করিয়া বলিতেছেন, যিনি আদ্যাশক্তি তিনিই নররূপী শ্রীরামকৃষ্ণ হইয়া আসিয়াছেন। শ্রীযুক্ত রামলাল ঠাকুরের আদেশে আবার গাহিতেছেন – এবারে শ্রীগৌরাঙ্গলীলা।

গান – কি দেখিলাম রে, কেশব ভারতীর কুটিরে, অপরূপ জ্যোতিঃ,
শ্রীগৌরাঙ্গমূরতি, দু’নয়নে প্রেম বহে শতধারে!

গান – গৌর প্রেমের ঢেউ লেগেছে গায়।

শ্রীরামকৃষ্ণ (মণির প্রতি) – যাঁরই নিত্য তাঁরই লীলা। ভক্তের জন্য লীলা। তাঁকে নররূপে দেখতে পেলে তবে তো ভক্তেরা ভালবাসতে পারবে, তবেই ভাই-ভগিনী, বাপ-মা সন্তানের মতো স্নেহ করতে পারবে।

“তিনি ভক্তের ভালবাসার জন্য ছোটটি হয়ে লীলা করতে আসেন।”

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!