শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব

রামকৃষ্ণ কথামৃত : অষ্টাদশ অধ্যায় : নবম পরিচ্ছেদ

১৮৮৪, ২রা ফেব্রুয়ারি
মহিমাচরণের প্রতি উপদেশ

সন্ধ্যার পর ঠাকুরবাড়িতে আরতি হইয়া গেল। কিয়ৎক্ষণ পরে অধর কলিকাতা হইতে আসিলেন ও ঠাকুরকে ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিলেন। ঘরে মহিমাচরণ, রাখাল, মাস্টার। হাজরাও এক-একবার আসিতেছেন।

অধর – আপনি কেমন আছেন?

শ্রীরামকৃষ্ণ (স্নেহমাখা স্বরে) – এই দেখো! হাতে লেগে কি হয়েছে। (সহাস্যে) আছি আর কেমন!

অধর মেঝেতে ভক্তসঙ্গে বসিয়া আছেন। ঠাকুর তাহাকে বলিতেছেন, “তুমি একবার এইটে হাত বুলিয়া দাও তো!”

অধর ছোট খাটটির উত্তর প্রান্তে বসিয়া ঠাকুরের শ্রীচরণ সেবা করিতেছেন। ঠাকুর মহিমাচরণের সহিত আবার কথা কহিতেছেন।

[মূলকথা অহেতুকী ভক্তি – “স্ব-স্বরূপকে জানো” ]

শ্রীরামকৃষ্ণ (মহিমার প্রতি) – অহেতুকী ভক্তি, – তুমি এইটি যদি সাধতে পার, তাহলে বেশ হয়।

“মুক্তি, মান, টাকা, রোগ ভাল হওয়া, কিছুই চাই না; – কেবল তোমায় চাই। এর নাম অহেতুকী ভক্তি। বাবুর কাছে অনেকেই আসে – নানা কামনা করে; কিন্তু যদি কেউ কিছুই চায় না কেবল ভালবাসে বলে বাবুকে দেখতে আসে, তাহলে বাবুরও ভালবাসা তার উপর হয়।

“প্রহ্লাদের অহেতুকী ভক্তি – ঈশ্বরের প্রতি শুদ্ধ নিষ্কাম ভালবাসা।”

মহিমাচরণ চুপ করিয়া আছেন। ঠাকুর আবার তাহাকে বলিতেছেন, “আচ্ছা, তোমার যেমন ভাব সেইরূপ বলি, শোন।

(মহিমার প্রতি) – “বেদান্তমতে স্ব-স্বরূপকে চিনতে হয়। কিন্তু অহং ত্যাগ না করলে হয় না। অহং একটি লাঠির স্বরুপ – যেন জলকে দুভাগ কচ্ছে। আমি আলাদা, তুমি আলাদা।

“সমাধিস্থ হয়ে এই অহং চলে গেলে ব্রহ্মকে বোধে বোধ হয়।”

ভক্তেরা হয়তো কেহ কেহ ভাবিতেছেন, ঠাকুরের কি ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছে? তা যদি হয়ে থাকে তবে উনি ‘আমি’ ‘আমি’ করিতেছেন কেন?

ঠাকুর আবার কথা কহিতেছেন – ‘আমি’ মহিম চক্রবর্তী, – বিদ্বান, এই ‘আমি’ ত্যাগ করতে হবে। বিদ্যার ‘আমি’তে দোষ নাই। শঙ্করাচার্য লোকশিক্ষার জন্য “বিদ্যার আমি” রেখেছিলেন।

“স্ত্রীলোক সম্বন্ধে খুব সাবধান না থাকলে ব্রহ্মজ্ঞান হয় না। তাই সংসারে কঠিন। যত সিয়ান হও না কেন, কাজলের ঘরে থাকলে গায়ে কালি লাগবে। যুবতীর সঙ্গে নিষ্কামেরও কাম হয়।

“তবে জ্ঞানীর পক্ষে স্বদারায় কখন কখন গমন দোষের নয়। যেমন মলমূত্রত্যাগ তেমনই রেতঃত্যাগ – পায়খানা আর মনে নাই।

“আধা-ছানার মণ্ডা কখন বা খেলে। (মহিমার হাস্য) সংসারীর পক্ষে তত দোষের নয়।”

[সন্ন্যাসীর কঠিন নিয়ম ও ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ]

“সন্নাসীর পক্ষে খুব দোষের। সন্ন্যাসী স্ত্রীলোকের চিত্রপট পর্যন্ত দেখবে না। সন্ন্যাসীর পক্ষে স্ত্রীলোক, – থুথু ফেলে থুথু খাওয়া।

“স্ত্রীলোকদের সঙ্গে সন্ন্যাসী বসে বসে কথা কবে না। – হাজার ভক্ত হলেও। জিতেন্দ্রিয় হলেও আলাপ করবে না।

“সন্ন্যাসী কামিনী-কাঞ্চন দুই-ই ত্যাগ করবে – যেমন মেয়ের পট পর্যন্ত দেখবে না, তেমনি কাঞ্চন – টাকা – স্পর্শ করবে না। টাকা কাছে থাকলেও খারাপ! হিসাব, দুশ্চিন্তা, টাকার অহংকার, লোকের উপর ক্রোধ, কাছে থাকলে এই সব এসে পড়ে। – সূর্য দেখা যাচ্ছিল মেঘ এসে সব ঢেকে দিলে।

“তাইতো মারোয়াড়ী যখন হৃদের কাছে টাকা জমা দিতে চাইলে, আমি বললাম, ‘তাও হবে না – কাছে থাকলেই মেঘ উঠবে।’

“সন্ন্যাসীর এ কঠিন নিয়ম কেন? তার নিজের মঙ্গলের জন্যেও বটে, আর লোকশিক্ষার জন্য। সন্ন্যাসী যদিও নির্লিপ্ত হয় – জিতেন্দ্রিয় হয় – তবু লোকশিক্ষার জন্য কামিনী-কাঞ্চন এইরূপে ত্যাগ করবে।

“সন্ন্যাসীর ষোল আনা ত্যাগ দেখলে তবে তো লোকের সাহস হবে! তবেই তো তারা কামিনী-কাঞ্চন ত্যাগ করতে চেষ্টা করবে!

“এ-ত্যাগশিক্ষা যদি সন্ন্যাসী না দেয়, তবে কে দিবে!”

[জনকাদির ঈশ্বরলাভের পর সংসার – ঋষি ও শূকরমাংস ]

“তাঁকে লাভ করে তবে সংসারে থাকা যায়। যেমন মাখম তুলে জলে ফেলে রাখা। জনক ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে তবে সংসারে ছিলেন।

“জনক দুখান তরবার ঘোরাতেন – জ্ঞানের আবার কর্মের। সন্ন্যাসী কর্মত্যাগ করে। তাই কেবল একখানা তরবার – জ্ঞানের। জনকের মতো জ্ঞানী সংসারী গাছের নিচের ফল উপরের ফল দুই-ই খেতে পারে। সাধুসেবা, অতিথি-সৎকার – এ-সব পারে। মাকে বলেছিলাম, ‘মা, আমি শুঁটকে সাধু হব না।’

“ব্রহ্মজ্ঞানলাভের পর খাওয়ারও বিচার থাকে না। ব্রহ্মজ্ঞানী ঋষি ব্রহ্মানন্দের পর সব খেতে পারত – শূকরমাংস পর্যন্ত।”

[চার আশ্রম, যোগতত্ত্ব ও শ্রীরামকৃষ্ণ ]

(মহিমার প্রতি) – “মোটামুটি দুই প্রকার যোগ – কর্মযোগ আর মনোযোগ, – কর্মের দ্বারা যোগ আর মনের দ্বারা যোগ।

“ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ, বানপ্রস্থ আর সন্ন্যাস – এর মধ্যে প্রথম তিনটিতে কর্ম করতে হয়। সন্ন্যাসীর দণ্ডকমণ্ডলু, ভিক্ষা পাত্র ধারণ করতে হয়। সন্ন্যাসী নিত্যকর্ম করে। কিন্তু হয়তো মনের যোগ নাই – জ্ঞান নাই, ঈশ্বরে মন নাই। কোন কোন সন্ন্যাসী নিত্যকর্ম কিছু কিছু রাখে, লোকশিক্ষার জন্য। গৃহস্থ বা অন্যান্য আশ্রমী যদি নিষ্কামকর্ম করতে পারে, তাহলে তাদের কর্মের দ্বারা যোগ হয়।

“পরমহংস অবস্থায় – যেমন শুকদেবাদির – কর্ম সব উঠে যায়। পূজা, জপ, তর্পণ, সন্ধ্যা – এই সব কর্ম। এ-অবস্থায় কেবল মনের যোগ। বাহিরের কর্ম কখন কখন সাধ করে – লোকশিক্ষার জন্য। কিন্তু সর্বদা স্মরণমনন থাকে।”

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!