শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব

রামকৃষ্ণ কথামৃত : গুরুশিষ্য-সংবাদ – গুহ্যকথা

গুরুশিষ্য-সংবাদ – গুহ্যকথা

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহার সেই পূর্বপরিচিত ঘরে ছোট খাটটিতে বসিয়া মণির সহিত নিভৃতে কথা কহিতেছেন। মণি মেঝেতে বসিয়া আছেন। আজ শুক্রবার, ৭ই সেপ্টম্বর, ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দ, ২২ শে ভাদ্র, শুক্লা ষষ্ঠী তিথি, রাত আন্দাজ সাড়ে সাতটা বাজিয়াছে।

শ্রীরামকৃষ্ণ – সেদিন কলকাতায় গেলাম। গাড়িতে যেতে যেতে দেখলাম, জীব সব নিম্নদৃষ্টি – সব্বাইয়ের পেটের চিন্তা। সব পেটের জন্য দৌড়ুচ্ছে! সকলেরই মন কামিনী-কাঞ্চনে। তবে দুই-একটি দেখলাম, ঊর্ধ্বদৃষ্টি – ঈশ্বরের দিকে মন আছে।

মণি – আজকাল আরও পেটের চিন্তা বাড়িয়া দিয়েছে। ইংরেজদের অনুকরণ করতে গিয়ে লোকদের বিলাসের আরও মন হয়েছে, তাই অভাব বেড়েছে।

শ্রীরামকৃষ্ণ – ওদের ঈশ্বর সম্বন্ধে কি মত?

মণি – ওরা নিরাকারবাদী।

[পূর্বকথা – শ্রীরামকৃষ্ণের ব্রহ্মজ্ঞানের অবস্থায় অভেদদর্শন – ইংরেজ
হিন্দু, অন্ত্যজ জাতি (Depressed classes), পশু, কীট,
বিষ্ঠা, মূত্র – সর্বভূতে এক চৈতন্যদর্শন ]

শ্রীরামকৃষ্ণ – আমাদের এখানেও ওই মত আছে।

কিয়ৎকাল দুইজনেই চুপ করিয়া আছেন। ঠাকুর এইবার নিজের ব্রহ্মজ্ঞানের অবস্থা বর্ণনা করিতেছেন।

শ্রীরামকৃষ্ণ – আমি একদিন দেখলাম, এক চৈতন্য – অভেদ। প্রথমে দেখালে, অনেক মানুষ, জীবজন্তু রয়েছে – তার ভিতর বাবুরা আছে, ইংরেজ, মুসলমান, আমি নিজে, মুদ্দোফরাস, কুকুর, আবার একজন দেড়ে মুসলমান হাতে এক সানকি, তাতে ভাত রয়েছে। সেই সানকির ভাত সব্বাইয়ের মুখে একটু একটু দিয়ে গেল, আমিও একটু আস্বাদ করলুম!

“আর-একদিন দেখালে, বিষ্ঠা, মূত্র, অন্ন ব্যঞ্জন সবরকম খাবার জিনিস, – সব পড়ে রয়েছে। হঠাৎ ভিতর থেকে জীবাত্মা বেরিয়ে গিয়ে একটি আগুনের শিখার মতো সব আস্বাদ করলে। যেন জিহ্বা লকলক করতে করতে সব জিনিস একবার আস্বাদ করলে! বিষ্ঠা, মূত্র – সব আস্বাদ করলে! দেখালে যে, সব এক – অভেদ!”

[পূর্বকথা – পার্ষদর্শন – ঠাকুর কি অবতার? ]

শ্রীরামকৃষ্ণ (মণির প্রতি) – আবার একবার দেখালে যে, এখানকার সব ভক্ত আছে – পার্ষদ – আপনার লোক। যাই আরতির শাঁখঘন্টা বেজে উঠত, অমনি কুঠির ছাদের উপর উঠে ব্যকুল হয়ে চিৎকার করে বলতাম, “ওরে তোরা কে কোথায় আছিস আয়! তোদের দেখবার জন্য আমার প্রাণ যায়।”

“আচ্ছা, আমার এই দর্শন বিষয়ে তোমার কিরূপ বোধ হয়?”

মণি – আপনি তাঁর বিলাসের স্থান! – এই বুঝেছি, আপনি যন্ত্র, তিনি যন্ত্রী; জীবদের যেন তিনি কলে ফেলে তৈয়ার করেছেন, কিন্তু আপনাকে তিনি নিজের হাতে গড়েছেন।

শ্রীরামকৃষ্ণ – আচ্ছা, হাজরা বলে, দর্শনের পরে ষড়ৈশ্বর্য হয়।

মণি – যারা শুদ্ধাভক্তি চায় তারা ঈশ্বরের ঐশ্বর্য দেখতে চায় না।

শ্রীরামকৃষ্ণ – বোধ হয়, হাজরা আর-জন্মে দরিদ্র ছিল, তাই অত ঐশ্বর্য দেখতে চায়। হাজরা এখন আবার বলেছে, রাঁধুনি-বামুনের সঙ্গে আমি কি কথা কই! আবার বলে, খাজাঞ্চীকে বলে তোমাকে ওই সব জিনিস দেওয়াব! (মণির উচ্চহাস্য)

(সহাস্য) – ও ওই সব কথা বলতে থাকে, আর আমি চুপ করে থাকি।

[মানুষ-অবতার ভক্তের সহজে ধারণা হয় – ঐশ্বর্য ও মাধুর্য ]

মণি – আপনি তো অনেকবার বলে দিয়েছেন, যে শুদ্ধভক্ত সে ঐশ্বর্য দেখতে চায় না। যে শুদ্ধভক্ত সে ঈশ্বরকে গোপালভাবে দেখতে চায়। – প্রথমে ঈশ্বর চুম্বক পাথর হন আর ভক্ত ছুঁচ হন – শেষে ভক্তই চুম্বক পাথর হন আর ঈশ্বর ছুঁচ হন – অর্থাৎ ভক্তের কাছে ঈশ্বর ছোট হয়ে যান।

শ্রীরামকৃষ্ণ – যেমন ঠিক সূর্যোদয়ের সময়ে সূর্য। সে সূর্যকে অনায়াসে দেখতে পারা যায় – চক্ষু ঝলসে যায় না – বরং চক্ষের তৃপ্তি হয়। ভক্তের জন্য ভগবানের নরম ভাব হয়ে যায় – তিনি ঐশ্বর্য ত্যাগ করে ভক্তের কাছে আসেন।

দুইজনে আবার চুপ করিয়া আছেন।

মণি – এ-সব দর্শন ভাবি, কেন সত্য হবে না – যদি এ-সব অসত্য হয় এ-সংসার আরও অসত্য – কেননা যন্ত্র মন একই। ও-সব দর্শন শুদ্ধমনে হচ্ছে আর সংসারের বস্তু এই মনে দেখা হচ্ছে।

শ্রীরামকৃষ্ণ – এবার দেখছি, তোমার খুব অনিত্য বোধ হয়েছে! আচ্ছা, হাজরা কেমন বল।

মণি – ও একরকমের লোক! (ঠাকুরের হাস্য)

শ্রীরামকৃষ্ণ – আচ্ছা, আমার সঙ্গে আর কারু মেলে?

মণি – আজ্ঞে না।

শ্রীরামকৃষ্ণ – কোন পরমহংসের সঙ্গে?

মণি – আজ্ঞে না। আপনার তুলনা নাই।

শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) – অচিনে গাছ শুনেছ?

মণি – আজ্ঞে না।

শ্রীরামকৃষ্ণ – সে একরকম গাছ আছে – তাকে কেউ দেখে চিনতে পারে না।

মণি – আজ্ঞে, আপনাকেও চিনবার জো নাই। আপনাকে যে যত বুঝবে সে ততই উন্নত হবে!

মণি চুপ করিয়া ভাবিতেছেন, ঠাকুর “সূর্যোদয়ের সূর্য” আর “অচিনে গাছ” এই সব কথা যা বললেন, এরই নাম কি অবতার? এরই নাম কি নরলীলা? ঠাকুর কি অবতার? তাই পার্ষদদের দেখবার জন্য ব্যাকুল হয়ে কুঠির ছাদে দাঁড়িয়ে ডাকতেন, “ওরে তোরা কে কোথায় আছিস আয়?”

-১৮৮৩, ৭ই সেপ্টম্বর-

…………………..
রামকৃষ্ণ কথামৃত : চর্তুদশ অধ্যায় : ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!