ভবঘুরেকথা
শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব

দক্ষিণেশ্বরে ৺কালীপূজা মহানিশায় শ্রীরামকৃষ্ণ ভজনানন্দে

গভীর অমাবশ্যা নিশি। আবার জগতের মার পূজা। শ্রীরামকৃষ্ণ ছোট খাটটিতে বালিশে হেলান দিয়া আছেন। কিন্তু অন্তর্মুখ, মাঝে মাঝে ভক্তদের সঙ্গে একটি-দুইটি কথা কহিতেছেন।

হঠাৎ মাস্টার ও ভক্তদের প্রতি তাকাইয়া বলিতেছেন, আহা, ছেলেটির কি ধ্যান! (হরিপদের প্রতি) – কেমন রে? কি ধ্যান!

হরিপদ – আজ্ঞা হাঁ, ঠিক কাষ্ঠের মতো।

শ্রীরামকৃষ্ণ (কিশোরীর প্রতি) – ও ছেলেটিকে জান? নিরঞ্জনের কিরকম ভাই হয়।

আবার সকলেই নিঃস্তব্ধ। হরিপদ ঠাকুরের পদসেবা করিতেছেন।

ঠাকুর বৈকালে চণ্ডীর গান শুনিয়াছেন। গানের ফুট উঠিতেছে। আস্তে আস্তে গাইতেছেন:

কে জানে কালী কেমন, ষড়দর্শনে না পায় দরশন।।
মূলাধারে সহস্রারে সদা যোগী করে মনন।

কালী পদ্মবনে হংসসনে হংসীরূপে করে রমণ।।
আত্মারামের আত্মাকালী, প্রমাণ প্রণবের মতন।
তিনি ঘটে ঘটে বিরাজ করেন ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা যেমন।।
মায়ের উদরে ব্রহ্মাণ্ড-ভাণ্ড প্রকাণ্ড তা জান কেমন।

মহাকাল জেনেছেন কালীর মর্ম অন্য কেবা জানে তেমন।।
প্রসাদ ভাষে লোকে হাসে সন্তরণে সিন্ধু তরণ।
আমার মন বুঝেছে প্রাণ বুঝে না, ধরবে শশী হয়ে বামন।।

ঠাকুর উঠিয়া বসিলেন। আজ মায়ের পূজা – মায়ের নাম করিবেন! আবার উৎসাহের সহিত গাইতেছেন-

এ সব ক্ষেপা মায়ের খেলা

(যার মায়ার ত্রিভুবন বিভোলা) (মাগীর আপ্তভাবে গুপ্তলীলা)
সে যে আপনি ক্ষেপা, কর্তা ক্ষেপা, ক্ষেপা দুটো চেলা।।
কি রূপ কি গুণ ভঙ্গী, কি ভাব কিছুই যায় না বলা।
যার নাম জপিয়ে কপাল পোড়ে কণ্ঠে বিষের জ্বালা।।
সগুণে নির্গুণে বাঁধিয়ে বিবাদ, ঢ্যালা দিয়ে ভাঙছে ঢ্যালা।
মাগী সকল বিষয়ে সমান রাজী নারাজ কেবল কাজের বেলা।।
প্রসাদ বলে থাকো বসে ভবর্ণবে ভাসিয়ে ভেলা।
যখন আসবে জোয়ার উজিয়ে যাবে, ভাঁটিয়ে যাবে ভাঁটার বেলা।।

ঠাকুর গান করিতে করিতে মাতোয়ারা হইয়াছেন। বলিলেন, এ-সব মাতালের ভাবে গান। বলিয়া গাইতেছেন:

(১) এবার কালী তোমায় খাব।
(২) তাই তোমাকে সুধাই কালী।
(৩) সদানন্দময়ী কালী, মহাকালের মনোমোহিনী।
তুমি আপনি নাচ, আপনি গাও, আপনি দাও মা করতালি।।
আদিভূতা সনাতনী, শূন্যরূপা শশীভালী।
ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যখন, মুণ্ডমালা কোথায় পেলি।।
সবে রাত্রে তুমি যন্ত্রী, আমরা তোমার তন্ত্রে চলি।
যেমন রাখ তেমনি থাকি মা, যেমন বলাও তেমনি বলি।।
অশান্ত কমলাকান্ত দিয়ে বলে গালাগালি।
এবার সর্বনাশী ধরে অসি, ধর্মাধর্ম দুটো খেলি।।
(৪) জয় কালী জয় কালী বলে যদি আমার প্রাণ যায়।
শিবত্ব হইব প্রাপ্ত, কাজ কি বারাণসী তায়।।
অনন্তরূপিণী কালী, কালীর অন্ত কেবা পায়?
কিঞ্চিৎ মাহাত্ম জেনে শিব পড়েছেন রাঙা পায়।।

গান সমাপ্ত হইল এমন সময়ে রাজনারায়ণের ছেলে দুটি আসিয়া প্রণাম করিল। নাটমন্দিরে বৈকালে রাজনারায়ণ চন্ডীর গান গাইয়াছিলেন, ছেলে দুটিও সঙ্গে সঙ্গে গাইয়াছিল। ঠাকুর ছেলে দুটির আঙ্গে আবার গাইতেছেন: ‘এ সব ক্ষেপা মেয়ের খেলা’।

ছোট ছেলেটি ঠাকুরকে বলিতেছেন, – ওই গানটি একবার যদি –

‘পরম দয়াল হে প্রভু’ –

ঠাকুর বলিলেন, “গৌর নিতাই তোমরা দুভাই?” – এই বলিয়া গানটি গাইতেছেন:

গৌর নিতাই তোমরা দুভাই পরম দয়াল হে প্রভু।

গান সমাপ্ত হইল। রামলালের ঘরে আসিয়াছেন। ঠাকুর বলিতেছেন, ‘একটু গা, আজ পূজা।’ রামলাল গাইতেছেন:

(১) সমর আলো করে কার কামিনী!

সজল জলদ জিনিয়া কায়, দশনে প্রকাশে দামিনী।।
এলায়ে চাঁচর চিকুর পাশ, সুরাসুর মাঝে না করে ত্রাস
অট্টহাসে দানব নাশে, রণ প্রকাশে রঙ্গিণী।।
কিবা শোভা করে শ্রমজ বিন্দু, ঘনতনু ঘেরি কুমুদবন্ধু,
অমিয় সিন্ধু হেরিয়ে ইন্দু, মলিন এ কোন মোহিনী।।
এ কি অসম্ভব ভব পরাভব, পদতলে শবসদৃশ নীরব,
কমলাকান্ত কর অনুভব, কে বটে ও গজগামিনী।।

(২) কে রণে নাচিছে বামা নীরদবরণী।

ঠাকুর প্রেমানন্দে নাচিতেছেন। নাচিতে নাচিতে গান ধরিলেন-

মজলো আমার মন ভ্রমরা শ্যামাপদ নীলকমলে!

গান ও নৃত্য সমাপ্ত হইল। ভক্তেরা আবার সকলে মেঝেতে বসিয়াছেন। ঠাকুরও ছোট খাটটিতে বসিলেন।

মাস্টারকে বলিতেছেন, তুমি এলে না, চণ্ডীর গান কেমন হলো।

-১৮৮৪, ১৮ই অক্টোবর-

………………….
রামকৃষ্ণ কথামৃত : দ্বাত্রিংশ অধ্যায় : চর্তুদশ পরিচ্ছেদ

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!