ভবঘুরেকথা
শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব

নীলকণ্ঠ প্রভৃতি ভক্তগণসঙ্গে সংকীর্তনানন্দে

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ঘরে নিজের আসনে বসিয়া আছেন। বেলা প্রায় তিনটা হইবে। নীলকণ্ঠ পাঁচ-সাতজন সাঙ্গোপাঙ্গ লইয়া ঠাকুরের ঘরে আসিয়া উপস্থিত। ঠাকুর পূর্বাস্য হইয়া তাহাকে যেন অভ্যর্থনা করিতে অগ্রসর হইলেন। নীলকণ্ঠ ঘরের পূর্ব দ্বার দিয়া আসিয়া ঠাকুরকে ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিতেছেন।

ঠাকুর সমাধিস্ত! – তাঁহার পশ্চাতে বাবুরাম, সম্মুখে মাস্টার, নীলকণ্ঠ ও চমৎকৃত অন্যান্য যাত্রাওয়ালারা। খাটের উত্তর ধারে দীননাথ খাজাঞ্চী আসিয়া দর্শন করিতেছেন। দেখিতে দেখিতে ঘর ঠাকুরবাড়ির লোকে পরিপূর্ণ হইল। কিয়ৎক্ষণ পরে ঠাকুরের কিঞ্চিত ভাব উপশম হইতেছে। ঠাকুর মেঝেতে মাদুরে বসিয়াছেন – সম্মুখে নীলকণ্ঠ ও চতুর্দিকে ভক্তগণ।

শ্রীরামকৃষ্ণ (আবিষ্ট হইয়া) – আমি ভাল আছি।

নীলকণ্ঠ (কৃতাঞ্জলি হইয়া) – আমায়ও ভাল করুন।

শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) – তুমি তো ভাল আছ। ‘ক’য়ে আকার ‘কা’, আবার আকার দিয়ে কি হবে? ‘কা’-এর উপর আবার আকার দিলে সেই ‘কা’-ই থাকে। (সকলের হাস্য)

নীলকণ্ঠ – আজ্ঞা, এই সংসারে পড়ে রয়েছি!

শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) – তোমায় সংসারে রেখেছেন পাঁচজনের জন্য।

“অষ্টপাশ। তা সব যায় না। দু-একটা পাশ তিনি রেখে দেন – লোকশিক্ষার জন্য! তুমি যাত্রাটি করেছো, তোমার ভক্তি দেখে কত লোকের উপকার হচ্ছে। আর তুমি সব ছেড়ে দিলে এঁরা (যাত্রাওয়ালারা) কোথায় যাবেন।

“তিনি তোমার দ্বারা কাজ করিয়ে নিচ্ছেন। কাজ শেষ হলে তুমি আর ফিরবে না। গৃহিণী সমস্ত সংসারের কাজ সেরে, – সকলকে খাইয়ে-দাইয়ে, দাস-দাসীদের পর্যন্ত খাইয়ে-দাইয়ে – নাইতে যায়; – তখন আর ডাকাডাকি করলেও ফিরে আসে না।”

নীলকণ্ঠ – আমায় আশীর্বাদ করুন।

শ্রীরামকৃষ্ণ – কৃষ্ণের বিরহে যশোদা উন্মাদিনী, – শ্রীমতীর কাছে গিয়েছেন। শ্রীমতী তখন ধ্যান কচ্ছিলেন। তিনি আবিষ্ট হয়ে যশোদাকে বললেন – ”আমি সেই মূল প্রকৃতি আদ্যাশক্তি! তুমি আমার কাছে বর নাও!” যশোদা বললেন, ‘আর কি বর দেবে! এই বলো যেন কায়মনোবাক্যে তাঁর চিন্তা, তাঁর সেবা করতে পারি। কর্ণেতে যেন তাঁর নামগুণগান শুনতে পাই, হাতে যেন তাঁর ও তাঁর ভক্তের সেবা করতে পারি, – চক্ষে যেন তাঁর রূপ, তাঁর ভক্ত, দর্শন করতে পারি।

“তোমার যেকালে তাঁর নাম করতে চক্ষু জলে ভেসে যায়, সেকালে আর তোমার ভাবনা কি? – তাঁর উপর তোমার ভালবাসা এসেছে।

“অনেক জানার নাম অজ্ঞান, – এক জানার নাম জ্ঞান – অর্থাৎ এক ঈশ্বর সত্য সর্বভূতে রয়েছেন। তাঁর সঙ্গে আলাপের নাম বিজ্ঞান – তাঁকে লাভ করে নানাভাবে ভালবাসার নাম বিজ্ঞান।

“আবার আছে – তিনি এক-দুয়ের পার – বাক্য মনের অতীত। লীলা থেকে নিত্য, আবার নিত্য থেকে লীলায় আসা, – এর নাম পাকা ভক্তি।

“তাহলেই হল, – তাঁর কৃপার উপর সব নির্ভর করছে।

“কিন্তু তা বলে তাঁকে ডাকতে হবে – চুপ করে থাকলে হবে না। উকিল হাকিমকে সব বলে শেষে বলে – “আমি যা বলবার বললাম এখন হাকিমের হাত’।”

“কিয়ৎক্ষণ পরে ঠাকুর বলিতেছেন – তুমি সকালে অত গাইলে, আবার এখানে এসেছ কষ্ট করে। এখানে কিন্তু অনারারী (Honorary)।

নীলকণ্ঠ – কেন?

শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) – বুঝেছি, আপনি যা বলবেন।

নীলকণ্ঠ – অমূল্য রতন নিয়ে যাব!!!

শ্রীরামকৃষ্ণ – সে অমূল্য রতন আপনার কাছে। আবার ‘ক’য়ে আকার দিলে কি হবে? না হলে তোমার গান অত ভাল লাগে কেন? রামপ্রসাদ সিদ্ধ, তাই তার গান ভাল লাগে।

“সাধারণ জীবকে বলে মানুষ। যার চৈতন্য হয়েছে, সেই মানহুঁস। তুমি তাই মানহুঁস।

“তোমার গান হবে শুনে আমি আপনি যাচ্ছিলাম – তা নিয়োগীও বলতে এসেছিল।”

ঠাকুর ছোট তক্তপোশের উপর নিজের আসনে গিয়া বসিয়াছেন। নীলকণ্ঠকে বলিতেছেন, একটু মায়ের নাম শুনব।

নীলকণ্ঠ সাঙ্গোপাঙ্গ লইয়া গান গাইতেছেন:

গান – শ্যামাপদে আশ, নদীর তীরে বাস।

গান – মহিষমর্দিনী।

এই গান শুনিতে শুনিতে ঠাকুর দাঁড়াইয়া সমাধিস্থ!

নীলকণ্ঠ গানে বলিতেছেন, ‘যার জটায় গঙ্গা, তিনি রাজরাজেশ্বরীকে হদয়ে ধারণ করিয়া আছেন।’

ঠাকুর প্রেমোন্মত্ত হইয়া নৃত্য করিতেছেন। নীলকণ্ঠ ও ভক্তগণ তাঁহাকে বেড়িয়া বেড়িয়া গান গাহিতেছেন ও নৃত্য করিতেছেন।

গান – শিব শিব।

এই গানের সঙ্গেও ঠাকুর ভক্তসঙ্গে নৃত্য করিতে লাগিলেন।

গান সমাপ্ত হইল। ঠাকুর নীলকণ্ঠকে বলিতেছেন, – আমি আপনার সেই-গানটি শুনব, কলকাতায় যা শুনেছিলাম।

মাস্টার – শ্রীগৌরাঙ্গসুন্দর নব নটবর, তপত কাঞ্চন কায়।

শ্রীরামকৃষ্ণ – হাঁ, হাঁ।

নীলকন্ঠ গাইতেছেন:

শ্রীগৌরাঙ্গসুন্দর, নব নটবর, তপত কাঞ্চন কায়।

‘প্রেমের বন্যে ভেসে যায়’ – এই ধুয়া ধরিয়া ঠাকুর নীলকণ্ঠাদি ভক্তসঙ্গে আবার নাচিতেছেন, সে অপূর্ব নৃত্য যাঁহারা দেখিয়াছিলেন তাঁহারা কখনই ভুলিবেন না। ঘর লোকে পরিপূর্ণ সকলেই উন্মত্তপ্রায়। ঘরটি যেন শ্রীবাসের আঙ্গিনা হইয়াছে।

শ্রীযুক্ত মনোমোহন ভাবাবিষ্ট হইলেন। তাঁহার বাটীর কয়েকটি মেয়ে আসিয়াছেন; তাঁহারা উত্তরের বারান্দা হইতে এই অপূর্ব নৃত্য ও সংকীর্তন দর্শন করিতেছেন। তাঁহাদের মধ্যেও একজনের ভাব হইয়াছিল। মনোমোহন ঠাকুরের ভক্ত ও শ্রীযুক্ত রাখালের সম্বন্ধী।

ঠাকুর আবার গান ধরিলেন:

যাদের হরি বলতে নয়ন ঝুরে, তারা দুভাই এসেছে রে!

সংকীর্তন করিতে করিতে ঠাকুর নীলকণ্ঠাদি ভক্তসঙ্গে নৃত্য করিতেছেন। ও আখর দিতেছেন –

‘রাধার প্রেমে মাতোয়ারা, তারা দুভাই এসেছে রে।’

উচ্চ সংকীর্তন শুনিয়া চতুর্দিকে লোক আসিয়া জমিয়াছে। দক্ষিণের, উত্তরের ও পশ্চিমের গোল বারান্দায়, সব লোক দাঁড়াইয়া। যাঁহারা নৌকা করিয়া যাইতেছেন, তাঁহারাও এই মধুর সংকীর্তনের শব্দ শুনিয়া আকৃষ্ট হইয়াছেন।

কীর্তন সমাপ্ত হইল। ঠাকুর জগন্মাতাকে প্রণাম করিতেছেন ও বলিতেছেন – ভাগবত-ভক্ত-ভগবান – জ্ঞানীদের নমস্কার, যোগীদের নমস্কার, ভক্তদের নমস্কার।

এইবার ঠাকুর নীলকণ্ঠাদি ভক্তসঙ্গে পশ্চিমের গোল বারান্দায় আসিয়া বসিয়াছেন। সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে। আজ কোজাগর পূর্ণিমার পরদিন। চতুর্দিকে চাঁদের আলো। ঠাকুর নীলকণ্ঠের সহিত আনন্দে কথা কহিতেছেন।

ঠাকুর কে? ‘আমি’ খুঁজে পাই নাই – “ঘরে আনবো চণ্ডী”

নীলকণ্ঠ – আপনিই সাক্ষাৎ গৌরাঙ্গ।

শ্রীরামকৃষ্ণ – ও গুনো কি! – আমি সকলের দাস।

“গঙ্গারই ঢেউ। ঢেউ-এর কখন গঙ্গা হয়?”

নীলকণ্ঠ – আপনি যা বলুন, আমরা আপনাকে তাই দেখছি!

শ্রীরামকৃষ্ণ (কিঞ্চিৎ ভাবাবিষ্ট হইয়া, করুণস্বরে) – বাপু, আমার ‘আমি’ খুঁজতে যাই, কিন্তু খুঁজে পাই না।

“হনুমান বলেছিলেন – হে রাম, কখন ভাবি তুমি পূর্ণ, আমি অংশ – তুমি প্রভু আমি দাস, – আবার যখন তত্ত্বজ্ঞান হয় – তখন দেখি, তুমিই আমি, আমিই তুমি!”

নীলকণ্ঠ – আর কি বলব আমাদের কৃপা করবেন।

শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) – তুমি কত লোককে পার করছ – তোমার গান শুনে কত লোকের উদ্দীপন হচ্ছে।

নীলকণ্ঠ – পার করছি বলছেন। কিন্তু আশীর্বাদ করুন, যেন নিজে ডুবি না!

শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) – যদি ডোবো তো ওই সুধাহ্রদে!

ঠাকুর নীলকণ্ঠকে পাইয়া আনন্দিত হইয়াছেন। তাঁহাকে আবার বলিতেছেন “তোমার এখানে আসা! – যাকে অনেক সাধ্য-সাধনা করে তবে পাওয়া যায়! তবে একটা গান শোন:

গিরি! গণেশ আমার শুভকারী। –
পূজে গণপতি, পেলাম হৈমবতী
যাও হে গিরিরাজ, আন গিয়ে গৌরী।।
বিল্ববৃক্ষমূলে পাতিয়ে বোধন,
গণেশের কল্যাণে গৌরীর আগমন।
ঘরে আনবো চণ্ডী, শুনবো কত চণ্ডী,
কত আসবেন দণ্ডী, যোগী জটাধারী।।

“চণ্ডী যেকালে এসেছেন – সেকালে কত যোগী জটাধারীও আসবে।”

ঠাকুর হাসিতেছেন। কিয়ৎক্ষণ পরে মাস্টার, বাবুরাম প্রভৃতি ভক্তদের বলিতেছেন – “আমার বড় হাসি পাচ্ছে। ভাবছি – এঁদের (যাত্রাওয়ালাদের) আবার আমি গান শোনাচ্ছি।”

নীলকণ্ঠ – আমরা যে গান গেয়ে বেড়াই, তার পুরস্কার আজ হল।

শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্য) – কোন জিনিস বেচলে এক খাঁমচা ফাউ দেয় – তোমরা ওখানে গাইলে, এখানে ফাউ দিলে। (সকলের হাস্য)

-১৮৮৪, ৫ই অক্টোবর-

……………………
রামকৃষ্ণ কথামৃত : দ্বাত্রিংশ অধ্যায় : পঞ্চম পরিচ্ছেদ

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!