শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব

কেশবাদি ব্রাহ্মদিগকে কর্মযোগ সম্বন্ধে উপদেশ

তস্মাদসক্তঃ সততং কার্যং কর্ম সমাচর ৷
অসক্তো হ্যাচরন্‌ কর্ম পরমাপ্নোতি পুরুষঃ ৷৷
[গীতা – ৩।১৯]

শ্রীরামকৃষ্ণ (কেশবাদি ভক্তের প্রতি) – তোমরা বল “জগতের উপকার করা।” জগৎ কি এতটুকু গা! আর তুমি কে, যে জগতের উপকার করবে? তাঁকে সাধনের দ্বারা সাক্ষাৎকার কর। তাঁকে লাভ কর। তিনি শক্তি দিলে তবে সকলের হিত করতে পার। নচেৎ নয়।

একজন ভক্ত – যতদিন না লাভ হয়, ততদিন সব কর্ম ত্যাগ করব?

শ্রীরামকৃষ্ণ – না; কর্ম ত্যাগ করবে কেন? ঈশ্বরের চিন্তা, তাঁর নামগুণগান, নিত্যকর্ম – এ-সব করতে হবে।

ব্রাহ্মভক্ত – সংসারের কর্ম? বিষয়কর্ম?

শ্রীরামকৃষ্ণ – হাঁ, তাও করবে, সংসারযাত্রার জন্য যেটুকু দরকার। কিন্তু কেঁদে নির্জনে তাঁর কাছে প্রার্থনা করতে হবে, যাতে ওই কর্মগুলি নিষ্কামভাবে করা যায়। আর বলবে, হে ঈশ্বর, আমার বিষয়কর্ম কমিয়ে দাও, কেন না ঠাকুর দেখছি যে, বেশি কর্ম জুটলে তোমায় ভুলে যাই। মনে করছি, নিষ্কামকর্ম করছি, কিন্তু সকাম হয়ে পড়ে। হয়তো দান সদাব্রত বেশি করতে গিয়ে লোকমান্য হতে ইচ্ছা হয়ে পড়ে।

[পূর্বকথা – শম্ভু মল্লিকের সহিত দানাদি কর্মকাণ্ডের কথা ]

“শম্ভু মল্লিক হাসপাতাল, ডাক্তারখানা, স্কুল, রাস্তা, পুষ্করিণীর কথা বলেছিল। আমি বললাম, সম্মুখে যেটা পড়ল, না করলে নয়, সেটাই নিষ্কাম হয়ে করতে হয়। ইচ্ছা করে বেশি কাজ জড়ানো ভালো নয় – ঈশ্বরকে ভুলে যেতে হয়। কালীঘাটে দানই করতে লাগল; কালীদর্শন আর হলো না। (হাস্য) আগে জো-সো করে, ধাক্কাধুক্কি খেয়েও কালীদর্শন করতে হয়, তারপর দান যত কর আর না কর।

ইচ্ছা হয় খুব কর। ঈশ্বরলাভের জন্যই কর্ম। শম্ভুকে তাই বললুম, যদি ঈশ্বর সাক্ষাৎকার হন, তাঁকে কি বলবে কতকগুলো হাসপাতাল, ডিস্পেন্সারি করে দাও? (হাস্য) ভক্ত কখনও তা বলে না বরং বলবে, ‘ঠাকুর! আমায় পাদপদ্মে স্থান দাও, নিজের সঙ্গে সর্বদা রাখ, পাদপদ্মে শুদ্ধাভক্তি দাও।’

“কর্মযোগ বড় কঠিন। শাস্ত্রে যে-কর্ম করতে বলেছে, কলিকালে করা বড় কঠিন। অন্নগত প্রাণ। বেশি কর্ম চলে না। জ্বর হলে কবিরাজী চিকিৎসা করতে গেলে এদিকে রোগীর হয়ে যায়। বেশি দেরি সয় না। এখন ডি গুপ্ত! কলিযুগে ভক্তিযোগ, ভগবানের নামগুণগান আর প্রার্থনা।

ভক্তিযোগই যুগধর্ম। (ব্রাহ্মভক্তদের প্রতি) তোমাদেরও ভক্তিযোগ, তোমরা হরিনাম কর, মায়ের নামগুণগাণ কর, তোমরা ধন্য! তোমাদের ভাবটি বেশ। বেদান্তবাদীদের মতো তোমরা জগৎকে স্বপ্নবৎ বল না। ওরূপ ব্রহ্মজ্ঞানী তোমরা নও, তোমরা ভক্ত। তোমরা ঈশ্বরকে ব্যক্তি (Person) বল, এও বেশ। তোমরা ভক্ত। ব্যকুল হয়ে ডাকলে তাঁকে অবশ্য পাবে।”

-১৮৮২, ২৭শে অক্টোবর-

..………………….
রামকৃষ্ণ কথামৃত : পঞ্চম অধ্যায় : নবম পরিচ্ছেদ

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- voboghurekotha@gmail.com
……………………………….

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

error: Content is protected !!