ফকির লালন সাঁইজি

-মূর্শেদূল মেরাজ

এতে অনেক সাধুগুরুই প্রকাশ্যে এসেছেন ভক্ত-শিষ্য-অনুরাগী-অনুগামীদের ভেতর দিয়ে। কিন্তু দীর্ঘ দিন নিজেদের গুটিয়ে রাখতে রাখতে প্রকাশ্যে আসবার পর। হঠাৎ করে অনেকেই আর সেই বেগটা সামলে উঠতে পারছেন না।

তার উপর অনেক সাধুগুরুরই নেই জনসম্মুখে কথা বলবার অভ্যাস। অনেকে আবার শহুরে মানুষদের সামনে ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না কি বলতে হবে। কতটা বলতে হবে। সেই কথা আবার কতটা দূরে যাবে। কত মানুষের কাছে পৌঁছাবে সেই সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ধারণা নেই অনেক সাধুগুরুর।

আর যারা সাধুগুরুদের এভাবে প্রচার করছেন তারাও তাদের সীমাটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। অনেক সাধুগুরু বিষয়টা না বুঝে এমন সব কথা বলে ফেলছেন। যা প্রকাশ্যে বলবার প্রয়োজন ছিল না। আবার অনেকে সাঁইজির বাণীকে এমনভাবে বিশ্লেষণ করছেন যাতে লালন সম্পর্কে মানুষ আরো বিভ্রান্ত হচ্ছে।

অনেকে আবার এই প্রচার-প্রসারের মোহে গুরু সেজে বসেছেন। যাদেরকে সাধু মহলে ডাকা হয় সাজুনে বা পোশাকি ফকির। বলা যায়, এই পোশাকি ফকিররাই সাধুকুলকে কুলশিত করে চলেছেন। আর তারা যেহেতু লোক সম্মুখে বেশি আসেন। বেশি কথা বলেন।

তাদের পরিচিতি বেশি। তাই নতুন সাধকরা তাদের জালের ধরা পরে বেশি। কারণ তাদের খুঁজে পাওয়াই অধিকতর সহজতর। আর এইরূপ পোশাকী গুরু নামধারীরা ফকিরিতে এসেও নাম-যশের মোহ থেকে বের হতে পারেন না।

তাদের মূল উদ্দেশ্যই হয় যতবেশি সম্ভব ভক্ত-শিষ্য তৈরি করা। যতবেশি ভ্ক্ত-শিষ্য বানানো যায় ততই উপার্জন; ততই প্রতিপত্তি। আর যদি প্রভাবশালী-ক্ষমতাশালী-বিত্তশালী লোকজন ভক্ত হয়; তাহলে তো কথাই নেই। ভক্তদের ধরে রাখবার জন্য তারা সকল কিছুই করে থাকে।

আর এই সকল পোশাকী সাধুগুরুর আড়ালে হারিয়ে যাওয়া সাধুগুরুদের দিনাতিপাত হয় দৈন্য দশায়। যদিও ফকিররা কারো কাছ থেকে কিছু প্রত্যাশা করেন না। তারা তো জিন্দা মরা। তারপরও তাদের সামনে দিয়ে যখন অযোগ্যরা প্রচার-প্রসারে এসে সাঁইজিকে নিজের সম্পত্তি মনে করেন; তখন নিশ্চয়ই তারাও আঘাত পান।

পারস্পরিক যোগাযোগ-আলাপচারিতা-সখ্যতা না থাকায় কমিউনিটি বড় হয়নি। হয়নি একসাথে মিলেমিশে কাজ করার প্রবণতা। হয়নি কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সকলে মিলে এক জায়গায় বসার প্রবণতা। হয়নি উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলায় একজনের পাশে সকলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানোর বোধ।

অন্যদিকে আজকাল ভক্তকুলও মিডিয়ার বদৌলতে এমন সাধুগুরুর স্মরণাপন্ন হতে চান; যে গুরু চাকচিক্যময়। জ্ঞান-গুণ-কর্ম-ভক্তি থেকেও প্রভাব-প্রতিপত্তি তাদের বেশি আকর্ষিত করে। এতে ভক্তকুলেরও এককভাবে দোষ দেয়া যায় না।

বর্তমান সময়টাই এমন যে, সকলেই পণ্যের গুণগত মান থেকে পণ্যের মোড়কের চাকচিক্যতেই বেশি মুগ্ধ হয়। আর ঝটপট পেয়ে ফেলার প্রবণতা তো রয়েছেই। তাই প্রকৃত সাধুগুরুরা নিজেদের আরো গুটিয়ে নিয়েছেন।

আবার সময়ের সাথে চলতে গিয়ে যে সকল সাধুগুরুরা নিজেদেরকে প্রচার-প্রসারে নিয়ে এসেছেন। তাদের মাঝে অল্প জনই সাঁইজির আদি ভাব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। আবার যারা গুটিয়ে রেখেছেন নিজেদের। তারাও যে সবক্ষেত্রে আদিভাব ধরে রাখতে পেরেছেন এমনটাও নয়।

আসল সমস্যাটা হলো। সাধুগুরুদের মাঝে পারস্পরিক যোগাযোগের কোনো ক্ষেত্র তৈরি হয় নি। অনেক সাধুগুরুরা তা সচেতন ভাবে চানও না। আবার অনেকে চাইলেও তা করে উঠতে পারেন না। আর এতে সাধুগুরু নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য যেমন গড়ে উঠেনি।

তেমনি সাধুগুরুদের সম্মেলিত যে শক্তি তা গঠন হয়নি। হয়নি ভক্তকুলদের পারস্পরিক যোগসূত্র। প্রত্যেকেই আছেন নিজ নিজ গুরু। আর নিজ নিজ গুরুবাড়ি নিয়ে। এতে অনেক সময়ই অন্যদের প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন। ভক্তি প্রদর্শন। সহমর্মিতা। সহযোগীতার মতোভাব। তা গড়ে উঠে নি।

পারস্পরিক যোগাযোগ-আলাপচারিতা-সখ্যতা না থাকায় কমিউনিটি বড় হয়নি। হয়নি একসাথে মিলেমিশে কাজ করার প্রবণতা। হয়নি কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সকলে মিলে এক জায়গায় বসার প্রবণতা। হয়নি উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলায় একজনের পাশে সকলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানোর বোধ।

আর সেকারণে সাধুগুরুদের হাত ধরে সাঁইজিকে নিয়ে বড় ধরনের সম্মিলিত কোনো কাজও শুরু হয় নি এখনো। সাধুগুরুফকির বাউলশিল্পীরা যখন কোনো সংকটে পরে তখনো তাই পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার ফকিরকুলের শিরোমণি লালন সাঁইজির অনুষ্ঠান যখন বন্ধ হয়ে যায়।

তখনো কথা বলবার মতো শক্তি পায় না সাধুগুরুরা। কেবলমাত্র বিচ্ছিন্নতাই তাদেরকে সেই শক্তি দিতে পারেনি। যে শক্তির দাবীদার তারা। লালন ফকিরকে বা লালন ফকিরের গানকে ভালোবাসে না এমন মানুষ বিরল। যার মধ্যে নূন্যতম বোধ আছে সেই মানুষ লালনকে অস্বীকার করতে পারে না।

তারপরও তারা এই মত-পথ ছাড়েন নি। ছাড়েন নি গুরুর চরণ। ছাড়েন নি ফকির লালন সাঁইজিকে। তারজন্য তাদের চরণে ভক্তি। আর বিনয়ের সাথে প্রার্থনা, তাদের পারস্পরিক যোগাযোগটা আরো সুদৃঢ় হোক। ফকির লালন সাঁইজির তাগিদেই সকলে এক ছায়াতলে এসে একতা তৈরি করুক এটাই প্রত্যাশা।

তাই সাধুগুরুদের নিজেদের একা ভাববার কিছু নেই। প্রয়োজন তাদের সম্মিলিত অবস্থান। তাহলেই অনেক কাজ অনেক বেশি সহজ হবে। এরই বড় অভাব এখন। এই কাজটি হচ্ছে না বলেই। অনেক কাজ হচ্ছে না। বা অনেক কাজ যথাযথ ভাবে হচ্ছে না।

এইসকল নানাবিধ কারণে সাঁইজি মতাদর্শ যে পরিমাণ বিকাশ হবার কথা ছিল। পারস্পরিক ঐক্যের যে সুর বাজানোর কথা ছিল। সামাজিক সচেতনায় যে ভূমিকা রাখবার কথা ছিল। ফকিরি ধারা ফকিরদের মাঝে সাধুগুরুভক্তশিষ্যদের মাঝে যে মাত্রায় বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল।

সেসব অনেক কিছুই যথার্থভাবে হয়নি বলেই আপাত দৃষ্টিতে মনে হয়। এই ব্যর্থতার দায় কারো একার উপর চাপিয়ে দেয়া যৌক্তিক হবে না সত্য। তবে সাফল্যের মালা যারা গলায় পরিধান করেন। ব্যর্থতার কিঞ্চিৎ দায়ও তাদের নিতেই হয়। এটাই বিধি।

সমাজের সাথে মানিয়ে চলতে গিয়ে নানান সময় নানান পদক্ষেপ নিতে হয়েছে সাধুগুরুদের। অনেক সাধুগুরুদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের সংগ্রামের কথা। পরিবার-সমাজ-পারিপাশ্বিকর্তা তাদেরকে কিভাবে একঘরা করেছে। অনাহারে রেখেছে। প্রহার করেছে। দূরদূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে।

তারপরও তারা এই মত-পথ ছাড়েন নি। ছাড়েন নি গুরুর চরণ। ছাড়েন নি ফকির লালন সাঁইজিকে। তারজন্য তাদের চরণে ভক্তি। আর বিনয়ের সাথে প্রার্থনা, তাদের পারস্পরিক যোগাযোগটা আরো সুদৃঢ় হোক। ফকির লালন সাঁইজির তাগিদেই সকলে এক ছায়াতলে এসে একতা তৈরি করুক এটাই প্রত্যাশা।

সবশেষে সকল কথার পরও একটা কথা থেকেই যায়। যখন সময় হবে তখন সাঁই নিজেই নিজের কাজটা ঠিক ঠিকই সঠিক মানুষকে দিয়ে করিয়ে নিবেনই। আমরা কেবল আমাদের ভাবনা তুলে ধরতে পারি। ভুল-ত্রুটির জন্য ক্ষমা চাইতে পারি। নিজেকে শুধরে নিতে চেষ্টা চালাতে পারি প্রতি নি:শ্বাসে। কারণ সাঁইজি তো বলেইছেন-

এই বেলা তোর ঘরের খবর
জেনে নে রে মন,
কেবা জাগে কেবা ঘুমায়
কে কারে দেখায় স্বপন।।

শব্দের ঘরে কে বারাম দেয়
নিঃশব্দে কে আছে সদাই,
যেদিন হবে মহাপ্রলয়
কে কার করে দমন।।

দেহের গুরু আছে কেবা
শিষ্য হয়ে কে দেয় সেবা,
যেদিনে তাই জানতে পাবা
কোলের ঘোর যাবে তখন।।

যে ঘরামি ঘর বেঁধেছে
কোনখানে সে বসে আছে,
সিরাজ সাঁই কয় তাই না খুঁজে
দিন তো বয়ে যায় লালন।।

লালন চর্চায় ভক্তকুল (দীক্ষাধারী)

লালন ফকিরকে ধারণ করবার দায়িত্ব যারা নিজ দায়িত্বে নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তাদের অন্যতম হলেন সাঁইজির ভক্তকুল। আর ভক্তকুলের মধ্যে যারা গুরু আশ্রিত তারা এই দায়িত্ব পালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সাঁইজিকে খোঁজার সন্ধানে বের হয়ে, লালন ফকিরকে ভালোবেসে তাঁকে জানবার বাসনায়।

ভক্তকুল নিজ নিজ গুরুর কাছে দীক্ষা নেন। যদিও দীক্ষা নেয়ার পেছনে আরো নানাবিধ কারণ থাকতেই পারে। গুরুবাদী মতবাদে দীক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। বলা হয়ে থাকে, যথার্থ গুরুর কাছে দীক্ষা গ্রহণ না করলে সাধন পথের সূচনাই হয় না। দীক্ষা গ্রহণ করলে তবেই হয় যাত্রা শুরু।

আর যাত্রা শুরু হলে দায়িত্ব-কর্তব্যও চলে আসে। সেটাও অস্বীকার করার উপায় থাকে না। আর সেই দায়িত্ব মাথায় নিয়ে দীক্ষাধারী ভক্তকে পথ চলতে হয়। নিজ গুরুকে ভক্তি করে-সেবা করে শিখতে হয় জীবনাচার। মানতে হয় বিধি-বিধান।

আর করণকারণের ভেতর দিয়ে নিজেকে জানার যাত্রায় এগিয়ে যেতে হয়। যেখানে পথ প্রদর্শক নিজ গুরু। আর আরাধ্য ফকিরকুলের শিরোমণি ফকির লালন সাঁই

(চলবে…)

<<লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব দুই ।। লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব চার>>

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

……………………………………
আরো পড়ুন-
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব এক
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব দুই
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব তিন
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব চার
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব পাঁচ
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব ছয়
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব সাত
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব আট
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব নয়
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব দশ
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব এগারো
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব বারো
লালন চর্চা কোন পথে? : পর্ব তেরো

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!