শ্রীকৃষ্ণের মেয়ে-জামাই

শ্রীকৃষ্ণের মেয়ে-জামাই

-স্বামী জয়ানন্দ

ভাবছেন তো, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মেয়ে কবে হলো! আবার সেই মেয়ের বিয়ে কবে হলো! আবার জামাই বা কবে হলো! আছে আছে। আমরা কম বেশি সবাই জানি যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্তদের মধ্যে শ্রীরাধা এবং গোপীনিরাই প্রধান, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের মেয়ের কথা তো শুনিনি!

ভাবছেন! সামনে জামাইষষ্ঠী আসছে দেখে মহারাজ বুঝি ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মেয়ে-জামাই’-এর গল্প ফেঁদে বসলেন! বিষয়টি একেবারেই সেরকম নয়। তাহলে বলি শুনুন-

পুরাণের অনেক ঘটনার কথা আমরা হয়তো জানি। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের থেকে আমরা কালিয় নাগের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারি। মহানাগরাজ কালিয়ের স্ত্রী ছিলেন নাগেশ্বরী সুবলা। পুষ্করতীর্থে নাগরাজ কালিয় তার স্ত্রী সুবলা ও অন্যান্য আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে বসবাস করতেন।

সুবলার জীবনের সাথে আমরা হয়তো খুব একটা পরিচিত নই। কিন্তু এই সুবলা নারী চরিত্র ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য বহন করে। সেটি হলো- একমাত্র সুবলাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে পিতারূপে ভজনা করেছেন। আর শ্রীকৃষ্ণের কন্যারূপী ভক্ত হচ্ছেন সুবলা।

এবারে ঝামেলার কথায় আসি! পুষ্করতীর্থের সর্পকুলের মধ্যে একটি প্রচলিত নিয়ম ছিল যে, তারা প্রতিদিন ভগবান শ্রীবিষ্ণু বা শ্রীহরির বাহন গরুড়ের পূজো করে তার উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য দান করতেন। নাগরাজ কালিয় প্রতিদিন গরুড়ের পূজো করে তাকে নানা রকমের নৈবেদ্য দান করতেন।

হঠাৎ একদিন নাগরাজ কালিয় দর্পভরে গরুড়ের পূজো করলেন না এমনকি নিবেদনের সমস্ত কিছু কালিয় নিজেই গ্রহণ করতে উদ্যত হলেন। তা দেখে গরুড় আর যায় কোথায়! ভয়ঙ্কর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। গরুড় আর কালিয়’র মধ্যে ভয়ানক যুদ্ধ শুরু হলো। কালিয় যুদ্ধে হেরে গিয়ে যমুনার তীরে কালিয়দহে আশ্রয় নিল আর সঙ্গে সঙ্গে কালিয়দহের সমস্ত জল বিষময় হয়ে গেল।

একদিন বালক শ্রীকৃষ্ণ গোপবালকদের সাথে গোচারণে যমুনার তীরে গেলেন। গরুগুলি তৃষ্ণার্ত হলে কালিয়দহের জল পান করতে গিয়ে বিষাক্ত জল পান করামাত্র মারা যায়। শ্রীকৃষ্ণ যোগমায়াবলে মৃত গরুগুলোকে বাঁচিয়ে তুলে কালিয়নাগকে বধ করার জন্য কালিয়দহে ঝাঁপ দিলেন।

শিশু শ্রীকৃষ্ণকে কালিয়নাগ গ্রাস করতে গিয়ে তার সমস্ত শরীর জ্বলতে লাগলো। বালক শ্রীকৃষ্ণ নাগরাজের মাথায় চড়ে নৃত্য করতে লাগলো। ভগবানের পায়ের চাপে নাগরাজ মুর্ছিত হয়ে মরণাপন্ন হলো। নাগরাজের পত্নী সুবলা সেখানে উপস্থিত হয়ে স্বামীর ঐরূপ অবস্থা দেখে স্বামীর প্রাণরক্ষার জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্তব করতে লাগলো। সুবলা একাগ্র চিত্তে স্তব করে বালক শ্রীকৃষ্ণের পা দুটি নিজের হাতে ধারণ করে শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হলো।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সুবলার ভক্তিতে প্রসন্ন হয়ে বললেন, ‘দেবী! তুমি ভয় পেয়োনা, চিন্তিত হয়ো না। আমি তোমার স্বামীর প্রাণদান করবো। কিন্তু তোমাদেরকে এই কালিয়দহ ছেড়ে গিয়ে তোমাদেরকে রমণক দ্বীপে গিয়ে বাস করতে হবে।

আর তোমার স্বামী অমর হবে। আমার পায়ের আঘাতের চিহ্ন কালিয়র মাথায় এঁকে দিলাম। গরুড় এই চিহ্ন দেখলে কালিয়কে আর বধ করবে না। তুমি আমাকে পিতারূপে আমার ভজনা করেছ। তাই তুমি হলে আমার কন্যা আর কালিয় হলো আমার জামাতা।

সুবলার ভক্তিতে শ্রীকৃষ্ণ এতটাই প্রসন্ন হলেন যে তাকে জ্যোতিরূপে দর্শন দিতেই সুবলার স্বামীর জন্য যে এত চিন্তাছিল, সে স্বামী সংসার সব ভুলে গেল এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে বললো, ‘হে প্রভু! সংসারে আমার আর মন নেই। আমি রমণক দ্বীপে যাব না। আমাকে তোমার সাথে নিয়ে চলো।’

শ্রীকৃষ্ণ নাগেশ্বরীর কথায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে বৈকুণ্ঠধামে পাঠিয়ে দিলেন। শ্রীকৃষ্ণ সুবলার একটি ছায়া সৃষ্টি করে কালিয়নাগের পাশে রেখে কালিয়র চেতনা ফিরিয়ে দিলেন। আর প্রকৃত সুবলা বৈকুণ্ঠধামে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণের ধ্যানে মগ্ন হলো।

এ তো গেলো পৌরাণিক ঘটনার বিবরণ। কিন্তু এখান থেকে আমরা কি বুঝলাম? বুঝলাম এই- ভগবানের সাক্ষাৎ লাভ হলে স্বামী-সংসার সব মূল্যহীন হয়ে যায়। ভগবৎ সুখ -আনন্দ লাভ করতে চাইলে সংসার সুখকে সম্পূর্ণ রূপে বাদ দিতে হবে।

ভগবৎ আনন্দ আর সংসার সুখ কখনো একসাথে লাভ করা যায় না। যারা মনে করে ‘আমার দুই চাই’ তারা ভগবৎ অনুভূতির স্বাদ আস্বাদন করতে পারে না। বাসনা ত্যাগ হলেই ঈশ্বর দর্শন হতে পারে, তার জন্য বাহ্যিক ত্যাগের প্রয়োজন নেই।

প্রসঙ্গত বলে রাখি, সমাজে সংসারে ব্যবহারিক জীবনে ভয়ে কিংবা ভক্তিতে যাকে যা নৈবেদ্য, পূজো এতদিন দিয়ে আসছেন তাকে তা দিয়ে যাবেন। ঠিক বেঠিক কিংবা উচিত অনুচিত বিচার করে নৈবেদ্য বন্ধ করতে যাবেন না। বন্ধ করলে ‌আপনিও ভয়ঙ্কর বিপদের মধ্যে পড়তে পারেন নাগরাজ কালিয়র মতো!

নৈবেদ্য দেয়া বন্ধ করে অযথা নিজেকে বিপদে ফেলতে যাবেন না। আপনার সহধর্মিণীর কি এত ক্ষমতা আছে যে, আপনার স্ত্রীর অনুরোধে ভগবান আপনার জীবন পুনরায় ফিরিয়ে দেবেন! গীতায় আছে, আপনি নিজেই নিজের বন্ধু, নিজেই নিজের শত্রু।

আরো মনে রাখবেন; যে কল্যাণের চেষ্টা করে তার কল্যাণ হয়। আমরা দেবতার চরণে ফুল দিই। কিন্তু অসময়ে ছাগলের পায়েও ফুল দিতে হয়। এটি আমার কথা নয় – শ্রীমা সারদা দেবীর কথা। একই ছুরি পূজোর কাজে ফল কাটার জন্য লাগে, আবার পশু-পাখির মাংস কাটার জন্য কষাই-এর দোকানেও লাগে।

এও মনে রাখবেন, -ছাগলের পায়ে ফুল দিলে ছাগল কখনো দেবতা হয়ে যায় না, ছালগ ছাগলই থাকে। অতএব মাথা ঠাণ্ডা রাখুন। বুঝে পা ফেলুন। চারপাশ দেখে চলতে শিখুন। ভালো থাকা কিংবা আনন্দে থাকা, দুঃখ কিংবা অশান্তিতে থাকা সবটাই আপনার মানসিক অবস্থা -অনুভবের ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ আপনি যেভাবে থাকতে চাইবেন সেভাবেই অপনি আপনার মনকে গড়ে তুলুন।

……………………………………
স্বামী জয়ানন্দজীর অন্যান্য লেখা পড়ুন:
আপন স্বরূপ
মানসিক বিপর্যয়ে মুক্তির পথ
সম্পর্ক বিপর্যয়ে মুক্তির পথ

এতো চিন্তা কিসের?

শ্রীকৃষ্ণের মেয়ে-জামাই
শ্রীরাধা’র দুঃখ

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!