ভবঘুরে কথা

অফিস থেকে ফিরতে গিয়ে প্রতিদিনই নতুন নতুন বিড়ম্বনায় পরতে হয়। একদিন হয়তো বাস নেই, একদিন রাস্তায় জ্যাম, দুই-এক ফোটা বৃষ্টিতে ইদানিং ঢাকার রাস্তা ডুবে যায়। অফিস থেকে ফিরার সময় প্রায়ই দেখা যায় রাস্তায় হাঁটু পানি। বিড়ম্বনার এক শেষ। বাস দেখা যায় কিন্তু হাঁটু পানি পেরিয়ে বাসে উঠা যাচ্ছে না। আবার বাস স্টপিজে এসে থেমেছে কিন্তু রাস্তায় পানি নামা যাচ্ছে না। সেদিনও এমনি একটা সন্ধ্যা। প্রায় হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট গুটিয়ে গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের সামনে নামলাম। সেখান থেকে বেশ কিছুটা পথ হেঁটে বাড়িতে যেতে হবে। এমনিতেই এ দিকটাতে রিকশাওয়ালার কাছাকাছি কোথাও যেতে চায় না। তারা ঢাকার বাইরে থেকে আগত যাত্রীদের তাদের রিকশার যাত্রী করতে চায়। তাদের ঠকিয়ে আয়টা তাদের ভালোই হয়। শহরে থেকেও শহরের রিকশাওলারা যাত্রী হিসেবে আমাদেরকে খুব একটা পছন্দ করে না। অগত্যা কি আর করা বাস থেকে নেমে হাঁটা শুরু। গোলাপ শাহ মাজার থেকে হেঁটে গুলিস্তান সিনেমা হলের সামনে এসে দেখি বিপদ আরো বড়।

আন্ডারপাসের সামনে ময়লা পানি আর রাস্তায় বড় বড় বাস জ্যাম লেগে আছে। সুতরাং সামনে যাবার পথ আপাতত বন্ধ। পেছনের অবস্থা আরো খারাপ। আমার মতো অনেকেই পেছনে দাঁড়িয়ে গেছে। আরো এসে দাঁড়াচ্ছে। সামনেও অনেকে দাঁড়িয়ে আছে। তবে সবচেয়ে মাজার ব্যাপারটা ঘটছে আমার ডান পাশে। আমিও অন্য সবার মতো দেখতে চেষ্টা করলাম কি হচ্ছে আসলে। আন্ডারপাসের ওপাশটায় সব সময়ই দেখি কয়েকজন ফেরিওয়ালা জড়োসড়ো হয়ে ট্রেরে উপর ফার্স্ট ফুড বিক্রি করে। বেশ কম দামের এই ফার্স্ট ফুডের ফেরিওয়ালাদের প্রধান ক্রেতা শহরের নিম্ন আয়ের মানুষরা। বিশেষ করে দেখা যায় শ্রমজীবী রিকশাওয়ালারা। প্রথমদিকে তাদের একজনকে দেখতাম একজন ফেরিওয়ালাকে শুননো মুখে বসে থাকতে। এখন বেশ কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছে। মনে হয় তাদের ব্যবসা বেশ ভালোই জমে ওঠেছে। সবসময়ই দেখা যায় রিকশাওয়ালাদের ভীড় লেগে থাকে।


পরের কথাটা কি বলবো? কি বললে কথা চালিয়ে যাওয়া যায় কিছুতেই খুঁজে পাই না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রের দেখা যায় হু-হা দিয়ে কথা সারি। কি না বুঝলে হেসে কাটিয়ে যায়। তবে রাস্তার পাশে হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটি সম্পর্কে কৌতুহল ক্রমেই বাড়ছে।

ইদানিং ফার্স্ট ফুডের পাশাপাশি দেখা যায় বিভিন্ন দামী দামী দেখতে মিষ্টির আইটেম। এই বৃষ্টির রাতেও না রাত না সন্ধ্যায়ও তারা ইট দিয়ে উঁচু করে বাক্স-পেটরা রেখে তার উপরে বসে বিক্রি করছে। তবে পাবলিক কিন্তু একেবারে তাদের দেখছে না দেখছে। ফেরিওয়ালাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি দামী জিপসী মোটর সাইকেল। পাশে সাতাইশ-আটাইশ বছরের সুদর্শন-স্বাস্থ্যবান-অভিজাত (পোষাকে-আশাকে) এক যুবক হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে ঐ ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে বেছে বেছে মিষ্টি কিনছে। বিভিন্ন আইটেম থেকে বেছে বেছে বিভিন্ন পদের মিষ্টি কিনছে। সকলেই দেখছে বিষয়টি কিন্তু ঠিক মেলাতে পারছে না। পোশাকে আশাকে যা দেখা যাচ্ছে ঐ যুবকের রাস্তার পাশের ফেরিওয়ালাদের বাসি-নষ্ট বা নিম্নমানের মিষ্টি কেনার কথা হয়। বরঞ্চ অভিজাত কোন মিষ্টির দোকান থেকে এই যুবক বের হচ্ছে তার পেছন পেছন মিষ্টি দোকানের উর্দি পরা তরুণ তার মিষ্টির বোঝা নিয়ে বেড়িয়ে আসছে এই দৃশ্যটা হতো স্বাভাবিক। কিন্তু এই যুবক এখানে কেন সবার মনে একই প্রশ্ন।

রাস্তার অল্প আলোতেও তার বাইকের হ্যান্ডেলের নেটের ঝুলে থাকা ব্যাগের মধ্যে কাগজের ঠোঙ্গার মধ্যে থেকে রাস্তা থেকে কেনা মিষ্টি দেখা যাচ্ছে। তারমানে যুবকটি আজ হয়তো বেড়িয়েছে রাস্তা থেকে মিষ্টি সংগ্রহের জন্য। গবেষক নাকি? তার গবেষণার বিষয় হচ্ছে ‘ঢাকার ফুটপাথের অভিজাত মিষ্টি’। কিন্তু যুবকটিকে গবেষক মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে ব্যবসায়ী। পুরানো ঢাকার কোন ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর পুত্র হতে পারে। অল্প বয়সে বাবার প্রতিষ্ঠানে বসেই বহু টাকা নাড়াচাড়া করছে। আমি একটু বেরসিক টাইপের মানুষ। মানুষের সঙ্গে গায়ে পরে তো দূরের কথা। কেউ কথা বললেও তার সঙ্গে বেশিক্ষণ কথা চালিয়ে যেতে পারি না। পরের কথাটা কি বলবো? কি বললে কথা চালিয়ে যাওয়া যায় কিছুতেই খুঁজে পাই না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রের দেখা যায় হু-হা দিয়ে কথা সারি। কি না বুঝলে হেসে কাটিয়ে যায়। তবে রাস্তার পাশে হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটি সম্পর্কে কৌতুহল ক্রমেই বাড়ছে। তাই অনেকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি। উৎসাহী অফিস ফেরত যাত্রীদের প্রায় সকলেই এখন তাকে দেখছে। তবে যুবকটি মাথা নিচু করে গভীর মনোযোগ দিয়ে মিষ্টি বাচছে। দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো একে অন্যের সঙ্গে যুবকটি প্রসঙ্গে গুজগুজ করছে। তবে পরিস্কার কিছু শোনা যাচ্ছে না। নেটের ব্যাগ ভর্তি মিষ্টি নিয়ে যুবকটি উঠে দাঁড়ালো। দেখলো আমরা সকলেই অবাক দৃষ্টিতে তাকে দেখছি। বাসের জানালা দিয়ে অনেক যাত্রীও তাকিয়ে আছে যুবকের দিকে।


মিষ্টি খাওয়াইতে হইব। হ্যালায় বিয়ায় দাওয়াত দিসি তখন আহে নাই। গিফট দেওয়ন লাগবো এর ল্যাইগা আহে নাই। অখন ফাউ মিষ্টি খাওয়ানের লাইগা পাগল হয়ইয়া গেছে। আমিও কম না। সারা ঢাকা ঘুইড়া ঘুইড়া রাস্তা থেইকা মিষ্টি কিনতাসি

হাস্যজ্জ্বল যুবক সকলের দিকে তাকিয়ে শব্দহীন হাসি হাসতে লাগলো যেন খুব মজা পেয়েছে। অনেক টা বানরের খেলা দেখাবার পরে বানরের মালিক যেভাবে হাতে সে রকম। যেন বলতে চায় কি রকম মজা দেখালাম ভাই। দেখেছেন তো আমার কেরামতি। আমি ছাড়া এই মজা আর কেউ দেখাতে পারবে না। যুবকটিও সেই হাসি হেসে নিরবতা ভেঙে যে কথা বললো সকলে তাতে সত্যিকারের মজাই পেয়েছিলাম। যুবকের কথাগুলো ছিল অনেকটা এরকম-


বুদ্ধি আছে হা হা হা… রাস্তায় জ্যাম কমেছে বাস চলতে শুরু করেছে। দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো নড়েচড়ে উঠলো।

হালায় বিয়া করছি আমি আর মার্কেটের সবাই কয় মিষ্টি খাওয়াইতে হইব। হ্যালায় বিয়ায় দাওয়াত দিসি তখন আহে নাই। গিফট দেওয়ন লাগবো এর ল্যাইগা আহে নাই। অখন ফাউ মিষ্টি খাওয়ানের লাইগা পাগল হয়ইয়া গেছে। আমিও কম না। সারা ঢাকা ঘুইড়া ঘুইড়া রাস্তা থেইকা মিষ্টি কিনতাসি। কালকা হালাগো পেট ভইরা মিষ্টি খাওয়াই সবতের প্যাট খারাপ না করলে আমার নামও মহব্বত না। হ্যালারা আমারে নলা মনে করছে।

যাত্রীরাও কেউ কেউ বলে উঠলো- ভাই আপনের বুদ্ধি আছে হা হা হা… রাস্তায় জ্যাম কমেছে বাস চলতে শুরু করেছে। দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো নড়েচড়ে উঠলো। রাস্তা পার হবার পথ খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পরছি আমরা। যুবকটি মটর সাইকেল স্ট্যাড দিল। যুবক কিছুদূর যাওয়ার পরেও সেই রেস থেকে গেল। এক রিকশাওলা বলে উঠলো ব্যাটার বহুত জাউরা। বুদ্ধিটা কি করছে।

মনে মনে যুবকের বুদ্ধি প্রশংসা (!) করতে করতে আমিও বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলাম। সেই সন্ধ্যা বাড়ি ফিরতে আরো অনেক কেলেঙ্গারির মধ্যে পরতে হয়েছে। বৃষ্টির দিনে ঢাকা শহরে রাস্তা থেকে বাড়ি ফিরতে বা বাড়ি থেকে বাইওে যেতে কত যে বিড়ম্বনা আর কেলেঙ্কারির মুখোমুখি হতে হয় তাতো যাদের প্রতিদিন বাড়ির বাইরে বেরুতে হয় তাদেও সবারই জানা। সে গল্প তাহলে থাক । আজ এখানেই শেষ করি।

নির্মাতা
ভবঘুরে কথা'র নির্মাতা

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!