আচার্য শঙ্করাচার্য

আচার্য শঙ্কর ঘুরতে ঘুরতে আবার শৃঙ্গেরীতে এসে উপনীত হলেন। পৌরাণিক যুগের ঋষি বিভাণ্ডক ও ঋষ্যশৃঙ্গের তপস্যাপূত এই মনোরম স্থানটিতে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠার এক বাসনা ছিল শঙ্করের।

কর্ণাটকের রাজা সুধন্বা ইতিমধ্যে শঙ্করাচার্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন‌। তাঁর আনুকূল্য ও সাহায্যে শিষ্যরা মঠ প্রতিষ্ঠায় উৎসাহী হয়ে উঠল। তাদের মিলিত চেষ্টায় ধীরে ধীরে গড়ে উঠল প্রসিদ্ধ শৃঙ্গেরী মঠ। মহাসমারোহে সে মঠে সারদাদেবীর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করলেন শঙ্কর।

এই শৃঙ্গেরী মঠে বেশ কিছুকাল অবস্থান করেন শঙ্কর এবং এখানে বহু গ্রন্থ রচনা করেন। শাস্ত্র আলোচনা করতে করতে এক একদিন ভাবে উদ্দীপিত হয়ে উঠতেন আচার্য এবং তাঁর মুখ থেকে তখন অমূল্য জ্ঞানগর্ভ তত্ত্বসমূহ নির্গত হত এবং সুযোগ্য শিষ্যরা সেগুলি সযত্নে লিখে রাখতেন।

উচ্চকোটির সাধক শিষ্যদের শিক্ষার জন্য তাদের আত্মাভিমান বা অহংবোধ দূর করার জন্য আচার্য একদিন মাঠে বসে এক অলৌকিক যোগবিভূতি প্রদর্শন করেন। গিরি নামে আচার্যের এক প্রিয় শিষ্য ছিল। তাকে তিনি খুবই ভালবাসতেন।

কিন্তু সে ছিল একেবারে নিরক্ষর। কোন শাস্ত্রজ্ঞান ছিল না তার। শাস্ত্রজ্ঞানলাভে তার কোন চেষ্টাও ছিল না। সে শুধু পরম নিষ্ঠা ও ঐকান্তিক ভক্তির সঙ্গে গুরুর সেবা করে যেত। সে যেন উপলব্ধি করেছে গুরুসেবা এবং গুরুভক্তিই হলো শিষ্যদের সকল সিদ্ধির মূল।

তবে শাস্ত্রকথা বা বিচার বিতর্ক সে কিছু বুঝতে না পারলেও গুরুদেব যখন শিষ্যদের সামনে শাস্ত্র আলোচনা করতেন বা কোন তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে বোঝাতে গিরি তখন ঘরের এককোণে জোড়হাত করে দাঁড়িয়ে থাকত ভক্তিভরে। কোনদিন এর ব্যতিক্রম দেখা যেত না। নিজে কিছু শিখতে না চাইলেও গুরুর ভাষণ রোজ তার শোনা চাই।

একদিন আচার্য বললেন, এক গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব তিনি ব্যাখ্যা করবেন। আলোচ্য তত্ত্বের গ্রন্থটি সামনে রেখে প্রস্তুত হয়ে বসলেন আচার্য। শিষ্যরাও পরম আগ্রহভরে বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু আচার্য গ্রন্থটি খুলছেন না। শুধু নীরবে বসে আছেন। যেন কার প্রতীক্ষায় আছেন।

ক্রমে অধৈর্য হয়ে উঠল শিষ্যরা। অবশেষে এক সময় পদ্মপাদ সাহস করে আচার্যকে বললেন, গুরুদেব! আমরা ত সবাই উপস্থিত আছি। এবার ব্যাখ্যা শুরু করুন।

শঙ্কর তখন বললেন, তোমরা ত সবাই আছ। কিন্তু গিরিকে দেখছি না ত?

শিষ্যরা তখন বললেন, গিরি নদীর জলে গুরুদেবের বহির্বাস ও কমণ্ডলু ধুতে গেছে‌। তার আসতে একটু দেরী হবে।

আচার্য কিন্তু কোন কথা না বলে নীরবে বসে রইলেন। পুঁথি খুললেন না। তখন পদ্মপাদ আশ্চর্য হয়ে বললেন, কিন্তু গুরুদেব! গিরি ত এসব কঠিন তত্ত্ব বুঝতে পারবে না। ও একেবারে নিরক্ষর।

আচার্য বললেন, তবু তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করা উচিত। সে ত রোজ দাঁড়িয়ে থেকে ভক্তিভরে আমাদের আলোচনা সব শোনে।

তার কাজ শেষ করে গিরি ঘরের মধ্যে এসে এককোণে তেমনি করে করজোড়ে দাঁড়িয়ে রইল।

আচার্য তখন তাকে বললেন, গিরি! রোজই ত তুমি আমাদের শাস্ত্র আলোচনা ও ব্যাখ্যা শোন। আজ তুমিই কিছু শ্লোক আবৃত্তি করে শুনিয়ে দাও। আমরা তা শুনব। আমার ত মনে হয় তুমিই সে শ্লোক রচনা করতে পারবে।

যে ব্যক্তি একেবারে নিরক্ষর, যার কোন শাস্ত্রজ্ঞানই নেই, সে কি করে শ্লোক রচনা করবে তা বুঝতে পারল না শিষ্যরা। এদিকে গুরুদেবের আদেশ শোনামাত্র এক গভীর ভাবাবেশে চোখ দুটি নিমীলিত করল গিরি। সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ থেকে অনর্গল বেরিয়ে আসতে থাকে স্বরচিত অপূর্ব শ্লোকরাশি।

নির্ভুল তোটক ছন্দে রচিত সেই সব শ্লোকের মধ্যে গুরু মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে থাকে। অকৃত্রিম গুরুভক্তি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে তার অপূর্ব বাকবিভূতির মধ্যে।

এই সব শ্লোক শুনে এক অপার বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন উপস্থিত শিষ্যরা। তারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করল গুরুভক্তির মহিমা। তারা বুঝতে পারল সর্বশক্তিমান গুরুর কৃপায় লেখাপড়া না শিখেই জ্ঞান সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছে মূর্খ গিরি।

তাঁর বেদান্ত ধর্ম ও শুদ্ধ অদ্বৈত জ্ঞানের প্রচারের উদ্দেশ্যে শেষবারের মতো পরিক্রমায় বেড়িয়ে পড়লেন আচার্য শঙ্কর। ত্যাগ, বৈরাগ্য ও জ্ঞানের ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ সুসংগঠিত শিষ্যদল নিয়ে যখন যেখানে উপস্থিত হলেন তিনি, উচ্চকোটির সাধক ও পণ্ডিতের দল নির্বিচারে মেনে নিতে লাগলেন তাঁর মতবাদ। মন্ত্রমুগ্ধের মত মাথা নত করলেন তাঁর সামনে।

এই অলৌকিক লীলার মাধ্যমে গুরুদেব সেদিন একই সঙ্গে শিষ্যদের মন থেকে জ্ঞানের অভিমান উৎপাটিত করলেন এবং গুরুভক্তির মাহাত্ম্যটিকে প্রকটিত করে তুললেন। সন্ন্যাসী দীক্ষার পর আচার্যের সেবক শিষ্য গিরির নাম হয় তোটকাচার্য। পরবর্তীকালে এক মহাজ্ঞানী সাধকরূপে প্রতিষ্ঠালাভ করে সে।

শৃঙ্গেরী মঠে বসে আচার্য একদিন শিষ্যদের সামনে ব্যাখ্যা করছিলেন, এমন সময় হঠাৎ চমকে উঠলেন তিনি। জিবের উপর বারবার মাতৃস্তনের স্বাদ পেতে লাগলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে ধ্যানযোগে জানতে পারলেন তাঁর মা অন্তিম শয্যায় শায়িতা। পুত্রকে একবার শেষবারের মত দেখতে চান তিনি।

সঙ্গে সঙ্গে অতীত দিনের একটি কথা মনে পড়ে গেল তাঁর। গৃহত্যাগের সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাঁর মাকে, যেখানে যত দূরেই থাকুন তিনি মার মৃত্যুকালে এসে দেখা দেবেন তাঁকে।

কিন্তু শৃঙ্গেরী থেকে কেরলের কানাড়ি গ্রাম বহুদূরের পথ। যেতে অনেক সময় লাগবে। অথচ সময় নেই। দেরী করা চলবে না মোটেই, মার অন্তিমকাল উপস্থিত। আচার্য শঙ্কর তাই যোগবিভূতি-বলে অতি অল্প সময়ের মধ্যে দীর্ঘপথ অতিক্রম করে উপস্থিত হন মার কাছে।

দীর্ঘ চব্বিশ বছর পর মিলন হলো মাতাপুত্রের মধ্যে। আনন্দে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল মার চোখ থেকে। শেষবারের মত একবার পুত্রমুখ দেখে নিশ্চিন্তে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারবেন তিনি। মার মৃত্যুশয্যার পাশে বসে ভগবানের মহিমা কীর্তন করতে লাগলেন শঙ্কর। নিজে নির্গুণ ব্রহ্মের উপাসক হয়েও সেদিন মার জন্য সগুণ
ব্রহ্মের স্তুতিগান করতে লাগলেন তিনি। তাঁর মা-ও তাঁর সুরে সুর মিলিয়ে প্রার্থনা করতে লাগলেন ভগবানের।

মার মৃত্যুর পর মৃতদেহের সৎকার নিয়ে সংকটে পড়লেন শঙ্কর। কারণ তাঁর জ্ঞাতিরা তাঁর জ্ঞানসাধনার বিরোধী হওয়ায় তারা আগেই সমাজচ্যুত করে শঙ্করকে। তাই তারা তাঁর মার মৃতদেহ সৎকারের কাজে অংশগ্রহণ করতে চাইল না। এজন্য তাঁকে একাই এ কাজ সম্পন্ন করতে হলো। মার শ্রাদ্ধাদিকার্যও সম্পন্ন করলেন তিনি। এইভাবে তাঁর পূর্বপ্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেন তিনি।

তাঁর বেদান্ত ধর্ম ও শুদ্ধ অদ্বৈত জ্ঞানের প্রচারের উদ্দেশ্যে শেষবারের মতো পরিক্রমায় বেড়িয়ে পড়লেন আচার্য শঙ্কর। ত্যাগ, বৈরাগ্য ও জ্ঞানের ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ সুসংগঠিত শিষ্যদল নিয়ে যখন যেখানে উপস্থিত হলেন তিনি, উচ্চকোটির সাধক ও পণ্ডিতের দল নির্বিচারে মেনে নিতে লাগলেন তাঁর মতবাদ। মন্ত্রমুগ্ধের মত মাথা নত করলেন তাঁর সামনে।

একদিকে বৌদ্ধধর্ম অন্যদিকে বৈদিক কর্মকাণ্ডের প্রচারের মূলে এক চরম আঘাত হানল শঙ্করের প্রচলিত অদ্বৈত বেদান্তবাদ। বৈদিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে যে সব ফাঁক বা ত্রুটিবিচ্যুতি ছিল তার সুযোগে নানা অনাচার ও কুসংস্কার প্রবল হয়ে ওঠে সেই সেকালের সমাজে।

তাঁর অন্তরঙ্গ শিষ্যগণ বিষন্ন মুখে কম্পিত অন্তরে তাঁকে ঘিরে বসে রইলেন। তাঁরা বুঝতে পারলেন তাঁদের পরমারাধ্য গুরুদেবের এ সমাধি আর ভাঙ্গবে না। তবু তাঁরা শোকে আকুল হলেন না। তাঁরা বুঝতে পারলেন আত্মজ্ঞানী মহাপুরুষ তাঁদের গুরুদেব এ বিষয়ে আত্মজ্ঞানের এক মহাবাণী করে আগেই শিক্ষা দিয়ে গেছেন।

শঙ্কর প্রচারিত শুদ্ধ জ্ঞানসাধনার নির্মল ধারা সমাজের যত সব কুসংস্কারের জঞ্জাল বিদূরিত করে দিল নিঃশেষে। দিশাহারা মুমুক্ষু ও ধর্মপিপাসু মানুষদের দিল এক নূতন পথের আলো। এক নূতন প্রাণস্পন্দন জেগে উঠল দেশের ধর্ম ও সমাজজীবনে। বিভিন্ন তীর্থক্ষেত্রে, নগরে ও গ্রামে ও সাধক সমাজের সকলে অবিসম্বাদিতভাবে যুগাচার্য ও ধর্মনায়করূপে মেনে নিল আচার্য শঙ্করকে।

শঙ্করাচার্য তাঁর অপূর্ব সংগঠনী প্রতিভার দ্বারা ভারতের চারপ্রান্তে চারটি মঠ বা তাঁর কর্মক্ষেত্র স্থাপন করলেন। দ্বারকায় সারদামঠ, পুরীতে গোবর্ধন মঠ, জ্যোতির্ধামে যোশীমঠ ও রামেশ্বরে শৃঙ্গেরী মঠ স্থাপন করে সুরেশ্বর, পদ্মপাদ, তোটকাচার্য ও হস্তামলকাচার্য এই চারজন সুযোগ্য শিষ্যের উপর মঠ পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পণ করলেন।

গিরি, পুরী, ভারতী প্রভৃতি বিভিন্ন দলীয় সন্ন্যাসীদের এইসব মঠের অধীনে রেখে তাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ করে দলের শঙ্করাচার্য।

এটি তাঁর এক উজ্জ্বল কীর্তি।

কয়েক বছর পরিক্রমা ও প্রচারকার্যের পর আবার উত্তরাখণ্ডে হিমালয়ের কোলে ফিরে গেলেন আচার্য শঙ্কর। গুরুর নির্দেশমত সব কর্ম তিনি সম্পন্ন করেছেন। অদ্বৈত ব্রহ্মজ্ঞান ও আত্মজ্ঞানের ভাবধারার নির্মল স্রোত ভারতের ধর্মক্ষেত্রে অবারিত প্রবাহিত চলেছে। সকল প্রতিদ্বন্দ্বীর কণ্ঠকে নীরব করে দিকে দিকে উড্ডীন হয়েছে তাঁর বিজয়পতাকা।

এবার তাঁর কর্মশেষ। এবার চিরবিশ্রামের মহালগ্নটি সমাগত। এবার দেবাদিদেব মহাদেবের উদ্দেশ্য এক অপূর্ব স্তবগাথা রচনা করলেন শঙ্কর। শেষবারের মত আরাধনা ও অর্ঘ্য নিবেদনের পর শিষ্যদের জানিয়ে দিয়ে মগ্ন হয়ে পড়লেন এক মহাসমাধিতে‌।

তাঁর অন্তরঙ্গ শিষ্যগণ বিষন্ন মুখে কম্পিত অন্তরে তাঁকে ঘিরে বসে রইলেন। তাঁরা বুঝতে পারলেন তাঁদের পরমারাধ্য গুরুদেবের এ সমাধি আর ভাঙ্গবে না। তবু তাঁরা শোকে আকুল হলেন না। তাঁরা বুঝতে পারলেন আত্মজ্ঞানী মহাপুরুষ তাঁদের গুরুদেব এ বিষয়ে আত্মজ্ঞানের এক মহাবাণী করে আগেই শিক্ষা দিয়ে গেছেন।

আমরা কি করব? কোথায় যাব? কি গ্রহণ করব, বর্জনই বা কি করব? আমাদের সকল কর্ম ও চিন্তায়, গমনে আগমনে, গ্রহণে বর্জনে যখন একই আত্মার সুক্ষ্ম স্রোতধারা চিরপ্রবাহিত তখন শোকের অবকাশ কোথায়? শোক মানেই জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে এক শোচনীয় ভেদজ্ঞান। শোক মানেই ত বিশুদ্ধ আত্মজ্ঞানের অভাব।

(সমাপ্ত)

…………………………………
আরো পড়ুন:
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: এক
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: দুই
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: তিন
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: চার
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: পাঁচ
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: ছয়

……………………………….
ভাববাদ-আধ্যাত্মবাদ-সাধুগুরু নিয়ে লিখুন ভবঘুরেকথা.কম-এ
লেখা পাঠিয়ে দিন- [email protected]
……………………………….

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!