আচার্য শঙ্করাচার্য

আচার্য শঙ্করাচার্য: এক

কেরল প্রদেশের কানাড়ি নামে এক ক্ষুদ্র গ্রামে এক নম্বুদ্রী ব্রাহ্মণ আচার্য বাস করতেন। শাস্ত্রচর্চা, অধ্যাপনা, শিবের আরাধনাই নিষ্ঠাবান এই ব্রাহ্মণ শিবগুরুর জীবনের ব্রত ছিল‌। শিবগুরুর স্ত্রী বিশিষ্টা দেবীও একজন ধর্মপরায়ণ মহিলা ছিলেন।

গ্রামের প্রান্তে ছিল চন্দ্রমৌলীশ্বরের মন্দির। সে মন্দিরে এক জাগ্রত শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত ছিল। আচার্য শিবগুরু ও তাঁর স্ত্রী বিশিষ্টা দেবী সেই মন্দিরে নিয়মিত গিয়ে জপ তপ ও শিবের আরাধনা করতেন। কিন্তু তাঁদের মনে শুধু একটাই দুঃখ, বিয়ের পর দীর্ঘকাল গত হলেও তাঁদের কোন সন্তান হয়নি। তাঁরা তাদের দুঃখের কথা প্রায়ই নিবেদন করতেন শিবকে।

একদিন শিবগুরু যখন শিবের ধ্যানে তন্ময় হয়ে ছিলেন, সহসা এক দৈববাণী শুনতে পেলেন কানে, বৎস! তোমার প্রতি প্রসন্ন হয়েছি আমি। বরদান করছি, শিবকল্প মহাজ্ঞানী এক পুত্র লাভ করবে তুমি। দিকে দিকে প্রচারিত হবে তার খ্যাতি।

বাড়ি ফিরে সঙ্গে সঙ্গে এই দৈববাণীর কথা স্ত্রীকে জানালেন শিবগুরু। দুজনেরই আনন্দের সীমা রইল না। বাংলা ৭৮৮ সনের বৈশাখ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে দুপুর বেলায় শিবগুরুর স্ত্রী বিশিষ্টা দেবী এক পুত্র সন্তান প্রসব করলেন। অপূর্ব তার রূপ। নবজাতকের নাম রাখা হল শঙ্কর।

মাত্র তিন বছর বয়সের শঙ্করের বুদ্ধিবৃত্তির তীক্ষ্ণতা আর স্মৃতিশক্তির প্রখরতা দেখে আশ্চর্য হয়ে যান শিবগুরু। তিনি এই অল্পকাল হতেই ছেলেকে পড়াতে শুরু করলেন উৎসাহের সঙ্গে। তার একান্ত বাসনা পুত্রকে সর্বশাস্ত্রে সুপণ্ডিত করে তুলবেন তিনি।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই দেহত্যাগ করে ইহলোক ত্যাগ করেন শিবগুরু। একদিকে স্বামীশোকে কাতর আর অন্যদিকে সংসার চালানো ও পুত্রকে মানুষ করে তোলার চিন্তায় বিষণ্ণ বোধ করতে লাগলেন বিশিষ্টা দেবী। শঙ্করের বয়স তখন মাত্র পাঁচ। এই সময়েই পুত্রের উপনয়ন দিলেন বিশিষ্টা দেবী। উপনয়নের পর তাকে শাস্ত্রপাঠের জন্য গুরুগৃহে পাঠানো হলো।

শঙ্কর শুধু দেখতে সুদর্শনই ছিল না, তার মেধা ছিল তীক্ষ্ণ। গুরুমশাই তাই তাকে প্রথম থেকেই স্নেহ করতেন। টোলের একধারে বসে তার প্রাথমিক পাঠের সব পড়া তৈরি করে শঙ্কর। কিন্তু সে শুধু নিজের পড়া পড়ত না। আচার্য উচ্চশ্রেণীর ছাত্রদের যেসব শাস্ত্র পড়াতেন সব শুনে যেত সে।

শঙ্কর ছিল শ্রুতিধর, একবার যা সে শুনত তা পরে হুবহু বলে দিতে পারত। এক একদিন সে আচার্যের সামনে উচ্চশ্রেণীর পাঠ্য শুনিয়ে দিত। তাতে আশ্চর্য হয়ে যেতো টোলের সকলে।

আচার্য বুঝলো, শঙ্কর সাধারণ ছেলে নয়। ঈশ্বরপ্রদত্ত মহাপ্রতিভার অধিকারী সে। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের বিরাট সম্ভাবনার বীজ নিহিত আছে তার এই বাল্যজীবনের মধ্যে‌। সেদিন থেকে আচার্য উচ্চশ্রেণীর পাঠ্যক্রম নির্দিষ্ট করে দিলেন শঙ্করের জন্য।

শঙ্করের বয়স তখন মাত্র পাঁচ। এরপর দু’বছরের মধ্যে সেই টোলের সব পাঠ্য বিষয় অক্লান্ত চেষ্টায় আয়ত্ত করে ফেলল শঙ্কর। বেদ বেদান্ত, স্মৃতি, পুরাণ প্রভৃতি সব শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করে মাত্র সাত বছর বয়সে বাড়ি ফিরে এল শঙ্কর টোল থেকে।

বাড়ি ফিরে এসেই সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করল শঙ্কর মাকে। এত কম বয়সে এত শাস্ত্র কখনো কেউ আয়ত্ত করতে পারে না। গর্বে ফুলে উঠল মায়ের বুক। শঙ্করের প্রতিভার কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল।

মা আনন্দের আবেগে পুত্রকে বললেন, আজ তুই তোর পিতার মুখ উজ্জ্বল করেছিস। তার কত আশা ছিল তুই সব শাস্ত্রে সুপণ্ডিত হয়ে বংশের মুখ উজ্জ্বল করবি। আজ সত্যিই তুই তাই করেছিস। শঙ্কর এবার বলল, আমি এখন স্থির করেছি আমি এখন হতে ঘরে বসে অধ্যাপনা করব। আর বাকি সময়ে তোমার চরণসেবা করব। আশীর্বাদ করো যেন সফল হতে পারি।

মা ছেলেকে কোলে নিয়ে আশীর্বাদ করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই বাড়িতে এক চতুষ্পাঠী খুলে বসলেন শঙ্কর। সকলে আশ্চর্য হয়ে গেল। স্থানীয় পণ্ডিতরা তাচ্ছিল্য ভাবে বলাবলি করতে লাগলেন, অনভিজ্ঞ বালক, শাস্ত্রের কি জানে? কি সে পড়াবে? তারা প্রথম প্রথম আমল দিতে চাইলেন না।

কিন্তু তারা বুঝতে পারলেন না শাস্ত্রজ্ঞান, স্মৃতিশক্তি, বুদ্ধিমত্তা ও তর্কপ্রতিভার অধিকার শঙ্করের জন্মগত। ক্রমে এই সব কিছুর পরিচয় পেয়ে তারা বাধ্য হলেন বালক শঙ্করের কাছে মাথা নত করতে। শঙ্করের চতুষ্পাঠীতে ছাত্রসংখ্যা বেড়ে যেতে লাগল দিনে দিনে। তার অধ্যাপনার খ্যাতি ছড়িয়ে পরতে লাগল দিনে দিনে।

শঙ্করের মাতৃভক্তি ছিল গভীর। প্রতিদিন অধ্যাপনা ও পূজা-অর্চনার অবশিষ্ট সময়টুকু মায়ের সেবা করে কাটাতেন তিনি। জননী বিশিষ্টা দেবী তখন বয়সে বৃদ্ধা হলেও ধর্মপরায়ণার তৎপরতা কিছুমাত্র কমে নি তার। প্রতিদিন নিয়মিত কুলদেবতা কেশবের পূজা দিতেন। পূজার আগে রোজ গ্রাম হতে কিছুটা দূরে আলোয়াই নদীতে স্নান করে আসতেন।

একদিন সকালে আলোয়াই নদীতে স্নান করতে গিয়ে তাঁর ফিরে আসতে দেরী হওয়ায় উৎকণ্ঠিত হয়ে পরলেন শঙ্কর। তিনি তখন নিজে নদীর পথে হেঁটে যেতে লাগলেন। দেখলেন, মাঠের ধারে অশক্ত দেহে পথ হাঁটতে হাঁটতে অবসন্ন হয়ে মূর্ছিত হয়ে পরে আছেন মা। তাকে ঘিরে ভিড় জমে গেছে লোকের।

অনেক সেবাশুশ্রূষা করার পর মায়ের জ্ঞান ফিরে এল। শঙ্কর বুঝলেন এত দূরে রোজ নদীতে স্নান করতে আসা অসম্ভব তার মায়ের পক্ষে। তাই তিনি সেদিন ভগবানের কাছে কাতর প্রার্থনা জানালেন, আমার মা বৃদ্ধা হয়েছেন। প্রতিদিন তার এই পথশ্রম ও দেহকষ্ট আমায় যেন দেখতে না হয়। কৃপা করে তুমি আলোয়াই নদীর স্রোতটাকে আমাদের বাড়ির কাছে এনে দাও।

এ জীবনে আমার কোন প্রার্থনাই নেই। শুধু নদীর স্রোতধারাটি বাড়ির কাছে নিয়ে এস। ভগবান এই ব্রহ্মচারী সত্যসাধক বালকের প্রার্থনা পূরণ না করে পারলেন না। দেখতে দেখতে কুল ভেঙ্গে ভেঙ্গে আলোয়াই নদী সত্যই শঙ্করের বাড়ির কাছে এসে পরল। বালক শঙ্করের অধ্যাপনার খ্যাতির সঙ্গে সঙ্গে এই অলৌকিক শক্তির কথাও ছড়িয়ে পড়ল লোকের মুখে মুখে।

শঙ্করের এই প্রতিভা ও অলৌকিক শক্তির কথা ক্রমে একদিন কেরলের রাজা চন্দ্রশেখরের কানেও গেল। আলোয়াই নদীর গতি পরিবর্তনের কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলেন মহারাজা। বিদ্যানুরাগী ও বিদ্বান রাজা কৌতূহলী হয়ে শঙ্করকে দেখতে চাইলেন। তাঁর প্রতিভা উপযুক্ত মর্যাদা দিতে চাইলেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি একদিন তাঁর মন্ত্রীকে শঙ্করের বাড়িতে পাঠালেন, তাঁকে তাঁর রাজপ্রাসাদে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য।

কিন্তু শঙ্কর মন্ত্রীকে বললেন, মন্ত্রীবর! আমি ভিক্ষুক ব্রাহ্মণ, রাজসভায় যাবার আমার কোন প্রয়োজন নেই। আমার শাস্ত্রজ্ঞানকে নিয়ে ব্যবসা করতে চাই না। লোকের মঙ্গলের জন্য আমি তা বিতরণ করতে চাই। দয়া করে রাজা মহারাজের সান্নিধ্যে যেতে আমায় বলবেন না।

মন্ত্রী মশাই হতাশ হয়ে রাজার কাছে ফিরে গেলেন। বালক শঙ্করের তেজোদৃপ্ত কথাগুলি রাজাকে বললেন তিনি। এই সব কথা শুনে শঙ্করের প্রতি কেরলরাজের শ্রদ্ধা ও কৌতূহল বেড়ে গেল। রাজা তখন শঙ্করকে দর্শন করতে ও তাঁর সঙ্গে তত্ত্ব আলোচনা করতে নিজেই একদিন শঙ্করের বাড়িতে উপস্থিত হলেন।

শঙ্করকে দেখে তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ আলোচনার পর রাজা সব বুঝতে পারলেন। এ বালক সর্বশাস্ত্রে পারদর্শীতা লাভ করেছে এই বয়সেই। বালক শঙ্করের অনেক সাধুবাদ দিয়ে প্রণাম করার পর সহস্র স্বর্ণমুদ্রার এক উপঢৌকন দিলেন কেরলরাজ।

কিন্তু শঙ্কর একটি মুদ্রাও স্পর্শ করলেন না। রাজার মন্ত্রীদের দিয়ে দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিলেন সব মুদ্রা। সামান্য বালক বয়সে শঙ্করেরর এই অসাধারণ ত্যাগের মহিমা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন রাজা চন্দ্রশেখর। সব দিক দিয়ে সে অসাধারণ।

শঙ্করের এই অসাধারণত্বের কথা জীবনে কোনদিন ভুলতে পারেন নি তিনি। একবার শঙ্করের বাড়িতে কয়েকজন প্রসিদ্ধ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত এসে উপস্থিত হন। বালক অধ্যাপক শঙ্করের খ্যাতির কথা শুনে তাঁরা নিজেরা আলাপ পরিচয় করতে এসেছেন তাঁর সঙ্গে।

শঙ্করের সঙ্গে আলাপ আলোচনার পর তারা সত্যিই আশ্চর্য হয়ে গেলেন। তারা তখন বিশিষ্টা দেবীকে তার পুত্রের কোষ্ঠী বা জন্ম কুণ্ডলীটি আনতে বললেন। মা শঙ্করের কোষ্ঠী আনলে তা বিচার করে তারা দেখলেন, এই বালক পরবর্তীকালে যুগাচার্য ও অধ্যাত্ম জগতের এক বিরাট নেতারূপে শুধু আপন বংশ নয়, সারাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। সে কথা তার মা বিশিষ্টা দেবীকে জানালেন।

মা বিশিষ্টা দেবী তখন পণ্ডিতদের বললেন, কিন্তু আমার ছেলের পরমায়ু কতদূর তা একবার দেখুন তো। কোষ্ঠী বিচার করে পণ্ডিতরা দেখলেন অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী হয়েও এ বালক বড় স্বল্পায়ু। কিন্তু সে কথা তারা মাকে মুখ ফুটে বলতে পারছিলেন না।

কিন্তু বিশিষ্টা দেবী বারবার সেকথা জানতে চাইলে অবশেষে পণ্ডিতরা বললেন, কি আর বলব মা, তোমার ছেলের পরমায়ু বেশী নেই। ষোল আর বত্রিশ বছর বয়সে এর মৃত্যুযোগ দেখতে পাচ্ছি।

একথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে কাঁদতে লাগলেন বিশিষ্টা দেবী। এই পুত্রই তার একমাত্র সন্তান, একমাত্র সম্বল ও আশা ভরসা। বৃদ্ধ বয়সে এরই মুখ দেখে সব শোক দুঃখ ভুলে আছেন। কিন্তু সেই পুত্র যদি স্বল্পায়ু হয় তাহলে সে দুঃখ তিনি মরেও ভুলতে পারবেন না।

দৈবজ্ঞ ব্রাহ্মণরা যা বলে গেলেন শঙ্কর তা শুনল। সঙ্গে সঙ্গে জন্ম-জন্মান্তরের সাত্ত্বিক সংস্কার জেগে উঠল তাঁর মধ্যে। মোক্ষলাভের বাসনায় আলোড়িত হয়ে উঠল তাঁর সমগ্র চিত্ত।

কথাটা একদিন মাকে খুলে বললেন আচার্য শঙ্কর। বললেন, জীবন অনিত্য, এই স্বল্পপরিসর জীবনে যদি আত্মজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করতে না পারি তাহলে জীবনের সার্থকতা কোথায়? স্থির করেছি, সন্ন্যাস নিয়ে সদগুরুর সন্ধানে বেরিয়ে পড়ব বাড়ি ছেড়‌।

মা কিছুতেই সংসার ত্যাগের অনুমতি দেবেন না।অথচ‌ মার অনুমতি ছাড়া সন্ন্যাস গ্রহণ করা হবে না। অবশেষে একদিন এক আকস্মিক বিপদের মধ্যে পরে সে অনুমতি পেয়ে গেলেন শঙ্কর।

(চলবে)

…………………………………
আরো পড়ুন:
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: এক
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: দুই
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: তিন
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: চার
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: পাঁচ
আচার্য্য শঙ্করাচার্য: ছয়

………………………………..
আরও আধ্যাত্মিক তথ্য পেতে ও জানতে:
পুণঃপ্রচারে বিনীত-প্রণয় সেন

প্রাসঙ্গিক লেখা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!